ভারত ও পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মার্চের শেষ থেকেই যে গ্রীষ্ম শুরু হয়েছে, তা এখন ভয়াবহ তাপপ্রবাহে রূপ নিয়েছে। অসময়ে শুরু হওয়ায় এই তাপদাহ কয়েকশ কোটি মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। এতে শুধু এই অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিই বাড়াছে না তাদের পরীক্ষায় ফেলছে টিকে থাকার ক্ষমতা ওপর। দেখা দিয়েছে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট। বিরূপ প্রভাব ফেলেছে কৃষি উৎপাদনের ওপর্।
এই অঞ্চলে সাধারণত মে ও জুন মাসে এই অঞ্চলে তাপদাহ শুরু হয়, কিন্তু এবার তা অনেক আগেই এসেছে। এটি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাকিস্তানের আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, এপ্রিলের ১৪ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত দেশটির কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তানে তাপমাত্রা প্রায় ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা উত্তর আমেরিকার ডেথ ভ্যালির গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রার সমতুল্য।
দেরা মুরাদ জামালি শহরের বাসিন্দা আইয়ুব খোসা বলেন, এই তাপপ্রবাহ এমন তীব্রতায় এসেছে যা পুরোপুরি অস্বস্তিকর। তিনি জানান, দৈনিক ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
ইসলামাবাদের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ মেহরুনিসা মালিক বলেন, খাদ্য সংকট, খরা ও হিমবাহ গলে বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, যেসব মানুষ স্বাভাবিক আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি জানান, এই খামারগুলোতে ফসল এখনো কাটার উপযুক্ত হয়নি, কিন্তু তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ায় ফসলের ফলন কমে যাচ্ছে। পানির প্রয়োজন বাড়ছে, পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই ফুল পড়ে যাচ্ছে, ফল আসছে না, কৃষিকাজের স্বাভাবিক চক্র সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ছে।
গত কয়েক বছরে দাবদাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে কয়লার ঘাটতি দেখা দিয়েছে, লাখ লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ট্রেন বাতিল করা হয়েছে, স্কুল বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
করাচিভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল কনফেডারেশন অফ মিডওয়াইভস-এর উপদেষ্টা নেহা মানকানি বলেন, গ্রীষ্মকালে ৮০ শতাংশ শিশু সময়ের আগেই জন্মায়। তাদের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা দেখা দেয়। আমরা গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-অ্যাক্ল্যাম্পসিয়ার মতো জটিলতাও বেশি দেখতে পাই, যা মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ।
করাচির পরিবেশকর্মী ও কৃষক তোফিক পাশা জানান, এটা এখন কেবল আবহাওয়া নয়, এক বড় রকমের জীবিকার সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অব্যাহত তাপপ্রবাহ গোটা অঞ্চলজুড়ে মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের আকার নিচ্ছে।
এদিকে ভারতেও একই ধরনের তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। এপ্রিলের শুরুতেই দিল্লিসহ দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। দিল্লির মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এই গরম ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে শিশুসহ বয়স্ক ও অসুস্থদের ওপর। রাজস্থান, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এবং ওড়িশার কৃষিপ্রধান অঞ্চলেও এই গরমে কর্মজীবীরা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছেন। শ্রমিকেরা জানান, সকালে মাঠে কাজ করতে বের হলেই মাথা ঘোরে, বমি বমি ভাব হয়, পানি না পেয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ১০টি দেশের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান তাপপ্রবাহজনিত মৃত্যুর হারে শীর্ষে রয়েছে। গত দুই দশকে এই দুই দেশে কয়েক হাজার মানুষ এই গরমে মারা গেছেন, যাদের বেশিরভাগই দরিদ্র, শ্রমজীবী, কৃষক এবং শিশু।
এ পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি, পানি সংরক্ষণ প্রকল্প, হাসপাতাল ও স্কুলে ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।










