ভেনিজুয়েলার সঙ্গে সম্পৃক্ত নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন দুটি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। উত্তর আটলান্টিক ও ক্যারিবীয় সাগরে টানা দুই অভিযানে জাহাজ দুটির নিয়ন্ত্রণ নেয় মার্কিন বাহিনী। এর মধ্যে একটি রুশ পতাকাবাহী জাহাজ। জাহাজটির নাম ‘মারিনেরা’। আগে সেটি ‘বেলা-১’ নামে পরিচিত ছিল। গত মাসে জাহাজটি রাশিয়ার নামে নিবন্ধন করা হয়। ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ২০২৪ সালে ওই জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ওয়াশিংটন।
রাশিয়ার পতাকাবাহী ট্যাংকার জব্দ করার পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে মস্কো। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দল ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির আইনপ্রণেতা আন্দ্রেই কলিশাস এ ঘটনাকে জলদস্যুতা বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর রাশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন। অন্যদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, জাহাজে থাকা রুশ নাগরিকদের অধিকার ও স্বার্থ যেন সম্মানিত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র যেন তাদের যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরতে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপিয়ান কমান্ড এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে জানিয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের অভিযোগে বেলা-১ নামের বাণিজ্যিক জাহাজটি জব্দ করা হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরই যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি-বিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস্টি নোম আরেকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে জানান, ক্যারিবীয় সাগরে সোফিয়া নামের আরেক ট্যাংকারেরও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে মার্কিন বাহিনী। নোমের ভাষ্য, দুটো জাহাজই হয় সর্বশেষ ভেনিজুয়েলায় নোঙর করেছিল, না হয় ভেনিজুয়েলার দিকেই যাচ্ছিল।
এক মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, বেলা-১ জাহাজটি প্রথমে মার্কিন সামরিক বাহিনী জব্দ করে এবং পরে তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়। জাহাজটি ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসে। অভিযোগ ছিল, এটি লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ-সংযুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পণ্য চোরাচালানে জড়িত। গত ডিসেম্বরে ক্যারিবীয় সাগর দিয়ে ভেনিজুয়েলার উদ্দেশে যাত্রাকালে মার্কিন কোস্টগার্ড জাহাজটিতে তল্লাশি চালাতে চাইলেও বেলা-১ তা প্রত্যাখ্যান করে এবং আটলান্টিক পাড়ি দিতে থাকে। ওই সময়ের মধ্যে জাহাজটির নাম পরিবর্তন করে মারিনেরা রাখা হয়। এটি রুশ পতাকাবাহী জাহাজ হিসেবে নিবন্ধিত হয় বলে শিপিং ডাটাবেজগুলোর তথ্যে দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রকে ৩-৫ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল দেবে ভেনিজুয়েলা: যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ২০০ কোটি ডলার সমমূল্যের ৩-৫ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি রফতানি করতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে কারাকাস। এ চুক্তির ফলে ভেনিজুয়েলার জ্বালানি সরবরাহ এখন চীনের বদলে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঘুরবে এবং ভেনিজুয়েলা বড় ধরনের জ্বালানি উৎপাদন হ্রাস এড়াতে সক্ষম হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থানীয় সময় মঙ্গলবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের চাওয়ার প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে কারাকাস। এ চুক্তি তারই শক্ত ইঙ্গিত। অবশ্য ট্রাম্প আগেই মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জন্য সুযোগ উন্মুক্ত করতে বলেছিলেন, অন্যথায় আরো সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি চান অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্র ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে ভেনিজুয়েলার জ্বালানি শিল্পে পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার দিক।
এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা, যার ফলে চীনের দিকে যাওয়া জ্বালানি সরবরাহ অন্যদিকে ঘুরবে এবং একই সঙ্গে ভেনিজুয়েলাকে জ্বালানি উৎপাদনে আরো বড় কাটছাঁট এড়াতে সহায়তা করবে।’ চুক্তি অনুযায়ী ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ভেনিজুয়েলার জ্বালানি মূলত চীন থেকে সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরে পাঠানো হবে। ট্রাম্প বলেন, ‘জ্বালানি বাজারদরে বিক্রি করা হবে এবং এর আয় যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে থাকবে। চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটকে।’
এ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত রফতানি অবরোধে সৃষ্ট ভেনিজুয়েলার জ্বালানি মজুদ সংকট কিছুটা কমবে এবং রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি পিডিভিএসএকে আরো উৎপাদন কমানোর চাপ থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করবে। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে ভেনিজুয়েলার জ্বালানি পাঠাতে শেভরনের ভূমিকা আগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
গতকাল রয়টার্সকে দুটি সূত্র জানিয়েছে, আটকে পড়া এ অপরিশোধিত জ্বালানি যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ করার জন্য প্রাথমিকভাবে চীনের দিকে যাওয়ার কথা থাকা কার্গোগুলোকে নতুন করে বরাদ্দ দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। গত এক দশকে চীনই ছিল ভেনিজুয়েলার প্রধান ক্রেতা। বিশেষ করে ২০২০ সালে ভেনিজুয়েলার জ্বালানি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর চীনের গুরুত্ব বেড়েছিল।
জ্বালানি শিল্পসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ট্রাম্প চান, এ প্রক্রিয়া দ্রুত ঘটুক; যাতে তিনি একে একটি বড় বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। তবে এ বিষয়ে ভেনিজুয়েলা সরকার বা দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি পিডিভিএসএ কোনো মন্তব্য করেনি।
চুক্তি ঘোষণার পর অতিরিক্ত সরবরাহের আশঙ্কায় জ্বালানির দাম কমেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের জন্য নিলাম পদ্ধতি চালু এবং ভবিষ্যতে ভেনিজুয়েলার জ্বালানি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত জ্বালানি মজুদে ব্যবহার করা যায় কিনা এসব বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে বিশ্লেষকরা বিবিসিকে বলেছেন, ট্রাম্পের এ পরিকল্পনায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে এবং দামে বড় প্রভাব পড়বে না। তাদের মতে, বিনিয়োগের আগে কোম্পানিগুলো সরকার ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা চাইবে। বিনিয়োগ হলেও সেসব প্রকল্প থেকে ফল পেতে অনেক বছর সময় লেগে যেতে পারে।
যদিও মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বারগাম মনে করেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম কমবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে। আমেরিকান প্রযুক্তির সহায়তায় ভেনিজুয়েলার বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনেরও এটি একটি বড় সুযোগ।
এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি ভেনিজেুয়েলায়: নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পার হলেও এখনো স্বাভাবিক গতি ফেরেনি দেশটিতে। অস্থিরতা ও লুটপাটের আশঙ্কায় বহু ব্যবসায়ী এ খাতে তাদের দোকান বন্ধ রেখেছেন। যেসব দোকান খোলা রয়েছে, সেগুলোর বাইরে লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনিজুয়েলার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিয়মিত অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালু রাখার আহ্বান জানিয়েছে। তবে এর পরও রাজধানী কারাকাসের অনেক দোকানপাট এখন বন্ধ। এর মধ্যেই সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুদ করতে শুরু করেছে অনেক পরিবার।
গত এক দশকে অস্থির মূল্যবৃদ্ধি ও পণ্যের সংকটে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন ভেনিজুয়েলানরা। দেশটির এ অবস্থার জন্য বিশেষজ্ঞরা সাধারণত দুর্নীতি, অপব্যবস্থাপনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে দেশটিতে অস্থিরতা-আশঙ্কার মাত্রা অতীতের সবসময়কে ছাড়িয়ে গেছে।
গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের কথা ভাবছে ট্রাম্প প্রশাসন: ভেনিজুয়েলার পর গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাসহ ‘বিভিন্ন বিকল্প’ নিয়ে আলোচনা করছে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউজ জানায়, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘জাতীয় নিরাপত্তা অগ্রাধিকার’। প্রেসিডেন্ট ও তার দল পররাষ্ট্রনীতির এ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ব্যবহারের বিষয়টি সবসময়ই সর্বাধিনায়কের বিবেচনার আওতায় থাকে।
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদেই গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। আর গত বছরের মার্চে ট্রাম্প বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ পেতে যুক্তরাষ্ট্র ‘যত দূর যেতে হয়, তত দূর যাবে’। অঞ্চলটির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ নতুন করে সামনে আসে ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের পর। এ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে মাদক ও অস্ত্র পাচারের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে নিয়ে যায়।
এর পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড ‘অত্যন্ত প্রয়োজনীয়’। যদিও ডেনমার্ক দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আসছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডে হামলা চালায়, তবে তা ন্যাটোর অবসান ডেকে আনবে।’










