পড়াশোনা কিংবা ক্যারিয়ারের প্রয়োজনে জন্মস্থান ছেড়ে বড় শহরে ছোটাই ছিল তরুণ প্রজন্মের সাফল্যের প্রচলিত মাপকাঠি। নিজের চেনা শহর বা গ্রামে ফেরা হতো কেবল উৎসব, ছুটি কিংবা জরুরি পারিবারিক প্রয়োজনে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চেনা সমীকরণ বদলে গিয়ে শুরু হয়েছে এক নীরব বিপরীতমুখী যাত্রা। বাধ্য হয়ে কিংবা কোনো পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে নয়; একবিংশ শতাব্দীর তরুণ প্রজন্ম ‘‌জেন-জি’ সম্পূর্ণ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় বেছে নিচ্ছে তাদের শৈশবের চেনা ঠিকানা। বাহ্যিক কোলাহলের চেয়ে মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মপরিচয় ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে অগ্রাধিকার দেয়ার এ কৌশল তরুণদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে।

high-rent-low-savings-uncertain-jobs-why-is-gen-z-returning-home-to-live-with-parents-all-you-need-to-know-about-the-boomerang-generation

সামাজিক বা অর্থনৈতিক কোনো গুঞ্জন নয়, সাম্প্রতিক বিভিন্ন বৈশ্বিক গবেষণা ও জরিপের তথ্যে জেন-জি তরুণদের ঘরে ফেরার এ বাস্তবচিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘‌রিয়েলটর ডটকম’র সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৩৫ বছরের কম বয়সী প্রায় আড়াই কোটিরও বেশি তরুণ মা-বাবার সঙ্গে বসবাস করছেন, যা দেশটির গণনাকৃত ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ এমনকি মহামারীকালের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। আবাসন বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘‌ক্লেভার রিয়েল এস্টেট’র এক বৈশ্বিক জরিপ বলছে, সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি শেষ করা তরুণদের প্রায় ৪৯ শতাংশই স্বাধীনভাবে থাকার বদলে নিজেদের পুরোনো ঠিকানায় ফিরে গেছেন। সেইসঙ্গে সাম্প্রতিক স্নাতকদের অর্ধেকই এখনো আর্থিক সহায়তার জন্য মা-বাবার ওপর নির্ভরশীল। প্রতি চারজন জেন-জির একজন স্বীকার করেছেন, তাদের আবাসন ও দৈনন্দিন সব ধরনের বিল পরিবার থেকেই পরিশোধ করা হচ্ছে।

এ নীরব গণ-প্রত্যাবর্তনের পেছনে কাজ করছে বড় শহরের অর্থনৈতিক সমীকরণ ও অনাকাঙ্ক্ষিত জীবনযাত্রার ব্যয়। রিয়েলটর ডটকম-এর তথ্যমতে, ২০১৯ সালের তুলনায় বর্তমানে গড়পড়তা বাড়ি কেনার খরচ বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ এবং গড়ে বাড়িভাড়া বেড়েছে ১৮ শতাংশ। তরুণেরা ক্যারিয়ারের শুরুতে যে আয় করছেন, তার সিংহভাগই যদি মাথার ওপরের ছাদ রক্ষা করতে চলে যায়, তবে ভবিষ্যৎ সঞ্চয় বা নতুন কিছু শুরু করার আর কোনো সুযোগ থাকে না। ফলে পরিবারের সাথে বা চেনা শহরে থাকার মাধ্যমে বাড়িভাড়ার বেঁচে যাওয়া অর্থকে জেন-জি তরুণরা কোনো নতুন স্টার্টআপ, ব্যক্তিগত শখ বা নিজস্ব দক্ষতার পেছনে বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখছে।

couple-moving-boxes

তবে কেবল আর্থিক হিসেবই শেষ কথা নয়; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে লিংকডইন বা ইনস্টাগ্রামের কৃত্রিম ও নিখুঁত জীবন প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় তরুণরা ক্লান্ত। বড় শহরের অনাত্মীয় ও যান্ত্রিক সম্পর্কের ভিড়ে চেনা শহর কাজ করছে এক ধরনের ‘‌আইডেন্টিটি অ্যাঙ্কর’ বা আত্মপরিচয়ের নোঙর হিসেবে। নিজের পুরোনো ঘর, শৈশবের বন্ধু আর পরিচিত মুখগুলোর মাঝে ফিরলে কোনো রূপক মুখোশ পরে থাকার প্রয়োজন পড়ে না। এটি তরুণদের সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে জাহির করার চাপ মুক্ত করে সম্পূর্ণ নিজস্ব শর্তে নিজের ভেতরের সত্তাকে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ দেয়।

62deb1bad571050018ad60bb

ঘরে ফেরার বিশ্বজনীন কারণগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের শহুরে বাস্তবতার অদ্ভুত মিল রয়েছে। এ ধারায় সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে দূরবর্তী কাজের সুযোগ বা ‘‌রিমোট ওয়ার্ক’ সংস্কৃতি। গতিশীল ইন্টারনেট আর ল্যাপটপ থাকলে ছোট শহরে বসেই এখন আন্তর্জাতিক মানের পেশাগত পারফরম্যান্স দেয়া সম্ভব। ফলে ভৌগোলিক অবস্থানের সাথে ক্যারিয়ারের সাফল্যের যে বাধ্যবাধকতা একসময় ছিল, তা আলগা হয়ে গেছে। জেন-জি আজ বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে যে জীবন মানেই কেবল অবিরাম প্রতিযোগিতা নয়। আর তাই কৃত্রিম চটকদারিতার চেয়ে মানসিক শান্তি, একাকীত্বের চেয়ে পারিবারিক সান্নিধ্য এবং অহেতুক দৌড়ের চেয়ে স্থায়ী স্থায়িত্বকে বেছে নিচ্ছে তারা।

ইউএসএ টুডে অবলম্বনে