আমরা সবাই শুনেছি—‘সকালের পাখি শিকার পায়।‘ কিন্তু সত্যিই কি তাই? রাতজাগা মানুষরা কি সত্যিই পিছিয়ে থাকে? নাকি তাদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টিশীলতার গোপন রহস্য? আধুনিক সমাজে কাজের সংস্কৃতি অবশ্য রাতজাগা মানুষের জন্য খুব একটা অনুকূল নয়। বরং, ভোর ৪টায় উঠে জগিং করা মানুষদের জন্যই তাড়াতাড়ি ঘুমানোর সংস্কৃতি বেশ সুবিধাজনক। তবে ‘রাতের পেঁচারা' নিজেদের 'ভোরের পাখিদের' চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ও সৃজনশীল ভাবতে পারে। ফ্রাঞ্জ কাফকা বা বব ডিলানও তো রাতে কাজ করতেন। এমনকি কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণাও সে ধারণাকে সমর্থন করত।
তবে অভ্যাসেরও পরিবর্তন হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বও পাল্টায়। ভোরে উঠতে হয় বলে রাত ৯টায় চোখে বাসা বাধতে থাকে রাজ্যের ঘুম। এক সময় যে রাতভর জেগে থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল, সেটা এখন ভেবে অবাকও হন অনেকে। রাতজাগা পেঁচা থেকে ভোরের পাখিতে পরিণত হওয়া, বডি ক্লক পাল্টে যাওয়া নিয়ে বিজ্ঞান কী বলে, চলুন দেখে নিই।
ঘুম বিশেষজ্ঞ ড. ক্রিস্টেন নাটসন বলেন, ‘আমাদের প্রত্যেকের শরীরে একটি অভ্যন্তরীণ জৈব ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম আছে—যা ঘুম, হরমোন নিঃসরণ, রক্তচাপ, এমনকি মনোযোগের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণ করে।‘ এই ঘড়িই নির্ধারণ করে আপনি কোন শ্রেণির মানুষ— ভোরের পাখি নাকি রাতজাগা পেঁচা।
এই সার্কাডিয়ান রিদম পুরোপুরি পরিবর্তন করা কঠিন, এটি বয়সের সঙ্গে বদলাতে থাকে। কৈশোরে বডি ক্লক বা শরীরের ঘড়ি দেরিতে চলে—তাই কিশোররা রাতজাগা হয়। কিন্তু বয়স বাড়লে আমরা ক্রমে সকালের মানুষ হয়ে উঠি। আশির কোঠায় গিয়ে প্রায় সবাই হয়ে যায় ‘আর্লি বার্ড ‘।
দীর্ঘদিন ধরে একধরনের বিশ্বাস চালু আছে—রাতজাগা মানুষরা নাকি বেশি সৃজনশীল ও বুদ্ধিমান। ২০০৭ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, রাতজাগা ব্যক্তিরা ডাইভারজেন্ট থিংকিং বা সৃজনশীল চিন্তায় দক্ষ। ২০০৯ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকসের মনোবিজ্ঞানী সাতোশি কানাজাওয়া প্রায় ২০ হাজার কিশোরের ঘুমের অভ্যাস ও আইকিউ তুলনা করে দেখেন—বুদ্ধিমানরা সাধারণত বেশি রাত জাগে। ২০২৪ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের এক গবেষণায়ও পাওয়া যায়—রাতজাগা মানুষের কগনিটিভ ফাংশন বা বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি।
তবে, ঘুম বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন—এসব গবেষণা সরলভাবে গ্রহণ করা ঠিক নয়। হতে পারে, বুদ্ধিমান শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার জন্য রাত জাগে, তাই তাদের রাতজাগা অভ্যাস তৈরি হয়েছে। তবু, যেমন বলা হয়—রাতের নীরবতা অনেকের কাছে সৃষ্টির প্রেরণা, ঠিক তেমনই ভোরের আলো অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
এসব গবেষণা রাতগাজা পেঁচাদের পক্ষে গেলে কিছু অন্ধকার দিকের কারণেই এসব ফলাফলকে সরলভাবে গ্রহণে সতর্ক বিশেষজ্ঞরা। ২০১৮ সালে নাটসনের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, নাইট আউল বা রাতগাজা মানুষদের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি ১০% বেশি। তারা ঘুমের অনিয়ম, দুশ্চিন্তা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যায় বেশি ভোগে।
২০২৪ সালের স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের গবেষণায় বলা হয়েছে—রাতজাগা জীবনযাপন মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। রাতে মানুষ বেশি একাকী বোধ করে, এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস (মদ্যপান, জাঙ্কফুড, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম) বাড়ে।
আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, রাতজাগা মানুষদের মধ্যে কগনিটিভ ডিক্লাইন বা চিন্তাশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি বেশি। তবে এর প্রায় ২৫% ক্ষেত্রে কারণ হলো জীবনযাত্রা, জিনগত নয়।
প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো— বডি ক্লক বদলানো সম্ভব কিনা। উত্তর হলো— পুরোপুরি না, তবে কিছুটা সম্ভব। ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির ঘুমবিজ্ঞানী ড. ম্যাথিউ ওয়াকার বলেন, ‘রাতজাগা মানুষ প্রতিদিন সকালের সূর্যালোক, নির্দিষ্ট সময়ে ব্যায়াম, সময়মতো খাবার ও বিকালের পর ক্যাফেইন এড়িয়ে চললে তিন সপ্তাহের মধ্যে ঘুমের সময় প্রায় দুই ঘণ্টা এগিয়ে আনতে পারে।‘ তবে তিনি সতর্ক করেন, ‘এই রুটিন চিরকাল মানা কঠিন। তাই নিজের ক্রোনোটাইপ বুঝে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনযাপনই সেরা উপায়।‘
ঘুমবিশেষজ্ঞ ড. মাইকেল ব্রিউসের মতে— সবাই রাতজাগা বা সকালের পাখি নয়। প্রায় অর্ধেক মানুষই মাঝামাঝি, যাদের বলা হয় ‘বিয়ার টাইপ’। তারা দিনে মাঝামাঝি সময়ে সবচেয়ে উৎপাদনশীল।
নিজের প্রাকৃতিক ঘড়ি বুঝতে হলে এক সপ্তাহ অ্যালার্ম ছাড়া ঘুমানোর পরামর্শ দেন গবেষকরা। অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন, স্ক্রিন টাইম কমান—তাহলে শরীর নিজেই জানিয়ে দেবে, কখন ঘুমোতে হবে, কখন উঠতে হবে।
বিজ্ঞান বলছে, ভোরের পাখি বা রাতজাগা পেঁচা—দুজনেরই সুবিধা-অসুবিধা আছে। মূল কথা হলো, নিজের শরীরের ঘড়ির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, তাল মিলিয়ে চলা। যেমন ঘুমবিশেষজ্ঞ ওয়াকার রসিকতা করে বলেন, ‘মনে রাখবেন— ভোরের পাখি হয়তো পোকা ধরে। কিন্তু দ্বিতীয় ইঁদুরটি পনির পায়!’
তাই, আপনি ভোরের পাখি বা রাতজাগা পেঁচা কিংবা মাঝের আরামপ্রিয় ‘বিয়ার’— যাই হোন না কেন, আপনার সেরা জীবনটাই বেছে নিন।
দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে










