আমরা সারাজীবন আসলে একটা ঘরের খোঁজেই এক পা, দু পা করে হাঁটি। আমাদের একান্ত, নিজস্ব ঘর। ঘরের মেঝেতে, বিছানায়, আসবাবে পড়ে থাকবে আমাদের হাত ও পায়ের কসরত। সেই ঘর স্মৃতি ও সময়ের অনন্ত আশ্রয়। তুচ্ছ দৈনন্দিনতার হাওয়ায় দখিনের জানালার বেসামাল পর্দা ফুলে ফুলে উঠবে। সমস্ত জীবন আমরা খুব করে খুঁজি সেই ঘর। পাই না, পৌঁছাতে পারি না। মনের মাঝে একবার পাবার ভ্রম তৈরি হলে যৌথ স্বপ্নের ভাঙনের অনুনাদে যৌথ ডানার আকাশ ভেঙে যায়। অথচ ভাঙনের আগে সারাজীবন হেঁটে হেঁটে আমরা একটা মুহূর্তের কাছেই হয়তো পৌঁছাতে চাই।
‘আনবাড়ি’ উপন্যাসিকার পাতায় পাতায় গার্হস্থ্য জীবন ছাপিয়ে চড়া হয়েছে সেই ভাঙনের সুর। ওক কাঠের বইয়ের তাক, পায়ে পায়ে ঘুরতে থাকা বিল ক্লিনটন নামের বিড়াল, বাদামি হয়ে আসা বাঁধাকপি, বন্ধুদের সঙ্গে তুমুল আড্ডা কিংবা দূরের জানালায় মার্কের ছায়া দেখতে দেখতে রিনা নামের মেয়েটার নির্জন বাস। রিনার এই নিঃসঙ্গতা বুকাওস্কির ‘Alone with Everybody’ কবিতাকে ঘুরেফিরে টেনে আনে। বারবার মনে হয়, কথক রিনার মতোই যা কিছু আমরা আঁকড়ে ধরতে যাই, মুঠো আলগা হয়ে যায়। এই বেরহমি দুনিয়ায় রিনাদের কাউকে দোষ দেয়ার সাধ্য হয় না। কিন্তু জীবন এমন... রাসেলের ছায়াও আমার কাছে চেনা চেনা লাগে। রিনারা দুঃখ লুকাতে পারে, রাসেলদেরও বোঝে।
কিন্তু দিনশেষে উল্টে যাওয়া কচ্ছপের মতো অসহায় হতে হয় রিনাদের। আর আত্মার ভেতর ধাক্কা মারতে থাকে একটাই আওয়াজ; পরাজয়ে ভেঙে পড়বার আওয়াজ।
সহজ ভঙ্গিতে বলা বড্ড পরিচিত একটা গল্পের শেষ পাতা অবধি যেতে কেন এত ভার চেপে বসে ঠিক টের পাওয়া যায় না৷ নোয়াহ বোমবাখের সিনেমা নাকি অ্যানি আর্নোর ভীষণ ব্যক্তিগত জীবনের পদাবলী ঠিক কীসের সাথে তুলনা করা যায় আনবাড়িকে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েও বেশ থতমত পরিস্থিতির উদ্রেক হয়। মেমোয়ার বলে তর্ক তোলা গেলেও ‘আনবাড়ি’ আদতে একটা উপন্যাসিকা। লুনা রুশদীর ডাইভার্সিফায়েড অটোবায়োগ্রাফি? খুব সম্ভব। ওয়েলিংটনে বর্ষাহত দিন, অকল্যান্ডে রাত হলেই জীবন্ত হয়ে ওঠা স্ট্রিপ ক্লাবের হোর্ডিং,অফিসের জানালার বাইরে অ্যান্টেনায় বসা গাঙচিল, লাল রঙের ছাতা,পায়া ভাঙা চেয়ার আর প্রবাস জীবনের প্রচণ্ড হোমসিকনেসের আদলে শব্দ-বর্ণ-গন্ধ নিয়ে মূর্ত হয়ে আছে ‘আনবাড়ি’। বিড়ালের নাম বিল ক্লিনটন দিয়ে কি মনিকা লিউনস্কির সঙ্গে বিলের সম্পর্কের বিধ্বস্ত পরিণতির কথাই ইঙ্গিত করতে চাইলেন? কী জানি! ফাঁকে ফাঁকে গোজা মার্ক স্ট্র্যান্ডের মন কেমন করা কবিতাগুলো যেন আরো একটু মেলানকোলি ঢুকিয়ে দেয় শিরায় শিরায়। এই বিষণ্ণতা একবারের জন্যও মনে হয় না আরোপিত।
‘মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছা করে আমি কেমন আছি, কিন্তু ঠিক ঠিক বুঝতে পারি না। বেশির ভাগ সময় খুব গাঢ় কোনো অনুভূতি কাজ করে না। হঠাৎ কিছুই ভালো লাগে না। সেসব সময় মনে হয় কোনোদিনই আর কিছু ভালো লাগবে না আমার, হয়তো প্রিয় সব কিছু পেরিয়ে এসেছি, ফেলে এসেছি বহু আগের কোনো সময়ে। এখন হয়তো অবিকল সেই রকম দেখতে কিছু জায়গা আছে, কিছু মানুষ আছে, সেই একই রকম শব্দ, গন্ধ, পারিপার্শ্বিক আছে তবু ঠিক সেই মানুষ সেই জায়গাগুলো কোথাও আর নেই। শুধু কিছু ছাপ, কিছু ছায়া রয়ে গেছে...’
একেকটা শহরে, একেকটা মানুষের জীবনে আমাদের ছাপ থেকে যায়। আর শহরটাও মিশে থাকে চেনা মানুষের মতো আমাদের গল্পে। এভাবে একেকটা বাড়ির ড্যাম্প হয়ে ফুলে ছেঁয়ে যাওয়া দেয়ালে, জানালায়, কার্নিশে,পায়া ভাঙা টেবিলে, বারান্দায় আর নরম আলোয় আমাদের গল্প লেগে থাকে। স্লো মোশনে ঝাপসা হতে হতে পড়ে থাকে শুধু কান্নার ক্বাসিদা।
আজরফ ইসলাম অর্ক: মেডিক্যাল স্টুডেন্ট










