এই জীবনপুরে পরিব্রাজকের কোনো সাকিন থাকে না। মায়াময় কোনো স্মৃতির উপলক্ষ্য থাকে না। এই তীব্র অভাববোধের কারণেই গন্তব্যের বদলে পথটা, সফরটা তার কাছে পরম আরাধ্য হয়ে ওঠে। চলতি পথে সে মানুষকে যত জানে, তত কম প্রত্যাশা করতে শেখে। এই পথমুখী উজাড় জীবনে ছুটতে ছুটতে অপসৃয়মান দৃশ্যের মতো মানুষের ব্যাপারে তার ধারণা পরিবর্তিত হয়। তবু অভ্যাশবসে সে মানুষকে বিশ্বাস করতে চায়, বিশ্বাস করে ঠকেও। তাতেও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, আফসোস নেই। বারবার থিতু হতে চাওয়া, ঘর বসানোর ঝোঁক যখনই পাল্লায় ভারী হয়, তার অন্তর্গত রক্তের ভেতর খেলা করে রহুর উদাত্ত আহ্বান। পথের ডাকে সাড়া না দিলেও আদিপুরুষের পাপের ভারে কিংবা প্রাকৃতিক বিপর্যয়-দাঙ্গার মতো ক্রমশ বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হয়ে অগ্নিমোহাবিষ্ট পতঙ্গের মতো সে নেমে পড়ে পথে।
কে এই রহু? অথচ বাজিকরদের কাছে এই রহুই সব। আল্লাহ, ভগবান বা যীশুর সঙ্গে মিল নেই তার। নেই কোনো অলৌকিক গুণাবলি। মরুর বুকে পানির নহর বইয়ে দিতে পারে না। মৃতকে হাতের ছোঁয়ায় জীবিত করতে পারে না। শক্ত হাতে বিনাশ করতে পারে না দুষ্কৃতকারীদের। অভাবও দূর করতে পারে না। তারপরও বাজিকরদের কাছে এই রহুই সব। রহুর ডাক এড়াতে পারে না সে। না আছে জাতপাত, না আছে ধর্ম। না তারা হিন্দু, না মুসলমান, না খ্রিষ্টান। তারা গরুও খায়, শুয়োরও খায়। তাদের ভাষা-সংস্কৃতি, এমনকি ধর্মীয় আচার সে সংগ্রহ করেছে পথে পথেই। যে অঞ্চলে যায়, খুব দ্রুত রপ্ত করে সেখানকার ভাষা, সংস্কৃতি। পরিচয়ের প্রশ্নে তাই তারা কেবল বাজিকর। হাটেগঞ্জে ঘুরে নানা খেলা দেখানো, দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া, শারীরিক কসরৎ, ভেলকি লাগিয়ে টাকা দ্বিগুণ করে দেয়া, ভানুমতির খেলার নানা ভোজবাজি ও বানরের নাচ দেখিয়ে, জড়িবুটি বেচে জীবন কাটিয়ে গেছে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।
জীবিকার মূল নির্ভরতার কৃষিকাজ নয়, পশুপালন। মেলা, উৎসব কিংবা সমৃদ্ধ লোকালয়ের খোঁজে তার যাত্রা ছিল ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু ঘুরতে ঘুরতে জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে এই বাজিকর চায় স্থায়ী হতে, এক টুকরো ঠাঁইয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায় দিগ্বিদিক। তার যেহেতু কোনো ধর্ম নেই সে আশ্রয় নিতে পারে না সেখানে, তার মাঝে কোনো জাত নেই, পথে পথে সে সংগ্রহ করেছে নানা দেবতা, তার গায়ে সবচেয়ে শক্তভাবে লেগে আছে তার পূর্বপুরুষের স্মৃতি। সমাজে অন্তর্ভুক্ত হতে চেষ্টা করে ক্লান্ত বাজিকরের স্থায়ী হওয়ার এক তীব্র বাসনার উপাখ্যান ‘রহু চণ্ডালের হাড়’। থিতু হয়ে সমাজের মূলস্রোতের সাথে মিশে যাওয়ার এই তীব্র আকাঙ্খার জন্য তাদের দিতে হয়েছে চড়া মূল্য।
ফরাসিদের ভেতর একটা চল আছে। চল্লিশের নিচের কোনো ছোকরা লেখককে তারা তোয়াক্কা করতে চায় না। অভিজিৎ সেন যখন আশির দশকে তার এই প্রথম উপন্যাস পাঠকের হাতে তুলে দিচ্ছেন, তার বয়সও তখন চল্লিশ ছুঁইছুঁই। তার রহু চণ্ডালের হাড় একেবারেই আলাদা গতের লেখা। ব্রিটিশ-রুশ-মার্কিন উপন্যাসের যেসব ছাঁদ আমাদের নাগালে আছে, রহু চণ্ডালের হাড়কে তাদের সঙ্গে মেলানো দায়। ম্যাজিক রিয়েলিজমের চেনা লবজেও একে আঁটানো যায় না। বাংলার সংস্কৃতি ও ইতিহাসের যেসব গলিঘুঁজিতে নগরকেন্দ্রিক সাহিত্যের ব্যাপারীরা বড়ো একটা যাতায়াত করেন না, সেসব দিকেই অভিজিৎ সেনের বরাবরের মনোযোগ। বাজিকরদের এই যাযাবর জীবনের ঔপনিবেশিক ভারতের চড়াই-উতরাই কীভাবে তাদের প্রভাবিত করেছে তার রংবেরঙের বুনোটে এই ভাঙা হাড়ের পদাবলীর বিস্তার। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীর চোখ দিয়ে, সাম্যবাদী সমাজচিন্তকের মরমি মন নিয়ে এই আখ্যানকে কলমে ধরেছিলেন লেখক। যে-আখ্যানে কোনো নায়ক নেই, যেখানে কিংবদন্তি আর অতিকথা পাশাপাশি পথ চলে, তাকে ‘মহাকাব্যিক’ বললে কিঞ্চিৎ বেখাপ্পা শোনায়। তবে আজকালকার পরিভাষায় যাকে নিম্নবর্গীয় ও প্রান্তিক মানুষের আখ্যান বলা হচ্ছে, সাব-অল্টার্ন বলে দেগে দেয়া হচ্ছে, তার দাঁড়িপাল্লায় উপন্যাসের মাপজোখ করলে ওজনে বেশ ভারী দেখায় রহু চণ্ডালের হাড়কে। কারণ অভিজিৎ খাপছাড়া এক যাযাবর জাতের কয়েক পুরুষের আনাগোনার বৃত্তান্ত শোনাতে বসে লাগাতার সুইফোঁড়ে বুনে দিয়েছেন সমাজ বিবর্তনের মার্কসবাদী পাঠের এক চোরা বয়ান। পুঁজির সর্বগ্রাসী ক্ষুধার মাঝে ডুবে কাতর ফাঁকা ও ফাঁপা ব্যক্তির গল্প অভিজিৎ সেন বলেন নি। তিনি যে শক্তির ইঙ্গিত দেন, তা কোনো ব্যক্তির নয়, কেবল একটি গোষ্ঠীর নয়, বরং মানুষের শক্তি।
‘রহু চণ্ডালের হাড়’ উপন্যাসের কথক লুবিনি নামের এক বৃদ্ধার নাতি শারিবাকে গল্প শোনানোর মধ্য দিয়ে উঠে আসে যাযাবর বাজিকরের দেড়শো বছরের দীর্ঘ পরিক্রমা। আত্মমগ্ন হয়ে সে বাজিকরের দিনযাপনের মৌখিক ইতিহাস বলে যায়, কীভাবে তারা গোরখপুর, রাজমহল, মালদা, নমনকুড়ি, রাজশাহী, আমনুরা, পাঁচবিবিসহ উত্তরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। এর কিছু লুবিনির চোখে দেখা, কিছু শুধুই মুখে মুখে বেঁচে থাকা ইতিহাস। বাজিকরের নতুন প্রজন্ম যখন জানতে চায় কেন তাদের এই ঘুরে বেড়ানো তাদেরকে কেন দুর্ভাগ্য তাড়া করে বেড়ায়? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সে নিয়ে আসে আদিপাপের ধারণাও। এ আদিপাপের কল্পিত বোঝা তার মাথায় বদ্ধমূল, এবং প্রতিটি জায়গায় তার সঙ্গে হয়ে যাওয়া অন্যায়কে সে এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই মোকাবেলা করে, তার পশু কেড়ে নিলে কিংবা তার দলের নারীকে ছিনিয়ে নিলে তার আপোষ করে লোকালয় ছাড়তে হয়, আদিপাপের দায় নিয়ে সে ঘুরে বেড়ায়। ইহুদিরা হাজার বছর ঘুরে বেড়িয়েছে তাদের প্রমিজড ল্যান্ডের খোঁজে। ঈশ্বর তাদের পছন্দ করেন, তাই পছন্দের বান্দাদের জন্য তিনি খাস তালুক দেখে রেখেছেন। কিন্তু বাজিকরদের কোনো দেশ তাদের জন্য অপেক্ষা করে না, নিজের দেশ গড়ে নিতে হবে নিজ হাতে।
‘রহু চণ্ডালের হাড়’ উপন্যাসে সাধারণ মানুষের অলিখিত ইতিহাসের সন্ধান যেমন মেলে, তেমনি ভৌগোলিক সম্প্রসারণও নজরে আসে। বাজিকরদের কোনো স্থিতি নেই বলেই একটা বড় অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে এ আখ্যান। এসব অঞ্চলের সঙ্গে বাজিকরদের ভাষা-সংস্কৃতির পাল্টে পাল্টে যাওয়া, ভৌগোলিক পরিবেশ, মানসিকতা, প্রকৃতি ও কৃষি সবই অভিজিৎ তুলে এনেছেন খুব যত্ন নিয়ে। এমন মূলোৎপাটিত জনগোষ্ঠীকে সুনির্দিষ্ট কোনো ভাষায় কথা বলানো সহজ নয়। গোরখপুর থেকে আরও পুবে রাজমহল-মালদা-নমনকুড়ি, রাজশাহী-আমনুরা ঘুরে পাঁচবিবি পর্যন্ত তাদের কেবল স্থানবদল হয়। প্রতিবারই তাদের মনে হয়, এটা তাদের দেশ, এই তো তাদের স্বপ্নের নিকানো উঠান। কিন্তু হায়! সেই স্বপ্ন প্রতিবারই অধরা থেকে যায় দনু পীতেম কিংবা লুবিনিদের কাছে।
লুবিনি তার নাতি শারিবাকে বলে ‘কুথায় হারাই গেল গোরখপুর?’ গোরখপুর বাজিকরদের আদি নিবাস, সেখানে ঘর্ঘরা নামে এক পবিত্র নদী বয়ে যায়। কিন্তু সেই নদীর সন্ধান আর মেলে না। বদলে বাজিকর পাটখেত নিড়াতে জানে না,মার খায়। হালে মই দিতে জানে না,মার খায়। আচানক চুরির দায়ে ধরা পড়ে,মার খায়,জেল হয়। গ্রামে মড়ক লাগে,দোষ হয় বাজিকরের। বাচ্চাকাচ্চা চুরি গেল,হারিয়ে গেল,মারো শালা বাজিকরকে,দাও ঘর জ্বালিয়ে। যখনই কৃষিকাজ করে একটু আলোর মুখ দেখে বাজিকর,ফসলের ভাগ নিংড়ে নেয় জোতদার। হাজার তরমুজে ভরা নৌকায় খুনোখুনি হয়ে নৌকা ডুবে,বাজিকর জেলে যায়। প্রতিহিংসাবশত হাতি দিয়ে ঘরদোর ভেঙে দিয়ে যায় প্রভুরা।
অভিজিৎ সেনের ‘রহু চণ্ডালের হাড়’ উপন্যাসের পুরো কাহিনিই এমনভাবে বর্ণিত হয়, যেন কোনো রূপকথা বা লোককথার গল্প। কাহিনিটি যখন শুরু হয় লুবিনির জবানিতে, তখন শ্রোতা ছিল তার নাতি শারিবা। লুবিনির কাহিনিতে ক্রমে কিংবদন্তি ও ইতিহাস মিশে যেতে থাকে। রহু আর দনুর সঙ্গে দেখা হয়ে যায় পীতেম ও জামিরের। কিংবদন্তি চরিত্রের সঙ্গে ইতিহাসের চরিত্রদের। নবজাত শিশুকে দেখে পীতেম যখন বলে ওঠে 'রহু রহু', তখন ইতিহাস কিংবদন্তি হয়ে উঠতে থাকে। এক্ষেত্রে বাখতিনের 'পলিফোনি' র রূপ লক্ষ্য করা যায়। 'পলি' অর্থাৎ 'বহু', 'ফোনি' র উৎসে আছে 'ফোন' অর্থাৎ 'ধ্বনি' বা 'স্বর'। রুশ সাহিত্য সমালোচক বাখতিনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী কোনো একটি সাহিত্যকর্মে অনেক চরিত্র এবং তাদের অনেক স্বর থাকাই সাহিত্যকর্মটিকে পলিফোনিক করে তোলে না। চরিত্র অনেক থাকলেও এবং তাদের অনেক রকম স্বর থাকলেও তা কোনো না কোনো ভাবে লেখকের একক স্বরের ও একক চেতনার বিভিন্ন মাউথপিসরূপ অর্থাৎ মুখপাত্ররূপ প্রকাশ হতে পারে। সেরকম ক্ষেত্রে বহু চরিত্র ও বহুস্বরের মধ্যেও যার প্রকাশ ঘটবে তা মূলত একক স্বর ও একক চেতনা। বহুর মধ্য দিয়ে লেখকের একক স্বর ও একক চেতনার এমন প্রকাশকে বাখতিন বলেছেন মনোলজিজম (monologism)। সত্যিকারের পলিফোনি অর্জিত হলে সাহিত্যকর্মটিতে মনোলজিজমের স্থান থাকবে না।এই উপন্যাসে খেয়াল করে দেখলে,লুবিনিকে বাজিকরদের গল্পের মাউথপিস মনে হয়। লুবিনির বলা গল্পের মধ্য দিয়ে বর্ণিত হলেও দনু-পীতেম-ধন্ধু-বালি-পরতাপ-জামির-ইয়াসিনের মতো বাজিকর তো বটেই, সাথে সাথে তাদের চারপাশের মূলস্রোতের চরিত্রগুলোর দুনিয়া সম্পর্কে স্বাধীন বোধ ও ব্যাখ্যা আছে এবং দুনিয়ার সাথে তাদের স্বাধীন সম্পর্ক আছে। লুবিনির মৃত্যুর পরও চলতে থাকে উপন্যাসের আখ্যান। এই অজস্র চরিত্রের নিজস্ব স্বরের সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে অভিজিৎ সেনের রুহু চণ্ডালের হাড় পেয়েছে পলিফোনিক রূপ।
কখনো আলতামিরা গুহায় আদিম মানুষের আঁকা ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়ালে যে আমি আমূল শিহরণে কেঁপে উঠবো, সেই শিহরণই জেগে উঠেছে ‘রহু চণ্ডালের হাড়’ পড়তে গিয়ে। আমি এমন একজন লেখকের রচনার সমালোচনার কথা ভাবতে পারি না। শুধু পাতায় পাতায় ছড়ানো মণি-মুক্তোগুলোর দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হতে পারি, সম্মোহিতের মতো বসে থাকতে পারি।
আজরফ ইসলাম অর্ক: মেডিক্যাল শিক্ষার্থী










