আমাদের প্রত্যেকের শরীরের একটি নিজস্ব গন্ধ আছে। আঙুলের ছাপের মতো গায়ের গন্ধও অনন্য। তবে এটি গন্ধ কেবল পরিচ্ছন্নতা বা সুগন্ধির ওপর নির্ভর করে না। আমাদের খাদ্যাভ্যাস, হরমোন, মানসিক অবস্থা, ব্যক্তিত্বও এর ওপর প্রভাব ফেলে। এমনকি আমরা পুরুষ না নারী, তরুণ না বৃদ্ধ, সুখী না বিষণ্ণ এসবও গায়ের গন্ধে ভূমিকা রাখে।
সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু একটি বড় উপাদান পুরোপুরি আমাদের হাতে। আর সেটি—আমাদের খাবার।

অন্ত্র ও ত্বকের মাধ্যমে খাবার শরীরের গন্ধ নিয়ন্ত্রণ করে। নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লিনা বেগদাচের মতে, খাবার হজমের সময় আমাদের অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়া নানা রাসায়নিক ক্রিয়ায় অংশ নেয়, যার ফলে কিছু গ্যাসজাত যৌগ তৈরি হয়। এগুলো নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে এলে মুখে দুর্গন্ধ বা হ্যালিটোসিস হয়।
আরেক পথ হলো ত্বক। খাবারের রাসায়নিক উপাদান রক্তের মাধ্যমে ত্বকে পৌঁছে ঘামের সঙ্গে বেরিয়ে আসে। ঘাম নিজে গন্ধহীন হলেও ত্বকের ব্যাকটেরিয়া ঘামের সঙ্গে মিশে গন্ধ তৈরি করে।
রসুন শরীরে আকর্ষণীয় গন্ধ তৈরি করে
রসুন ও পেঁয়াজ খেলে নিঃশ্বাসে গন্ধ হয়, এটা সবাই জানে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, রসুন খাওয়া মানুষদের শরীরের গন্ধ অনেক সময় আকর্ষণীয় হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পুরুষ রসুন বেশি খান, তাদের ঘামের গন্ধ নারীদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, রসুনে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও জীবাণুনাশক উপাদান শরীরকে সুস্থ রাখে, যা গন্ধকেও আনন্দদায়ক করে তোলে। অন্যদিকে, বেশি কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার সবচেয়ে কম আকর্ষণীয় গন্ধ তৈরি করে।
ফল, সবজির সঙ্গে মিষ্টি গন্ধের সম্পর্ক
অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি ফল ও সবজি খান, তাদের শরীর থেকে আসে ফুলেল, মিষ্টি গন্ধ। ফলমূলের ক্যারোটিনয়েড নামের যৌগ ত্বককে হালকা হলুদাভ করে, যাতে মুখকেও উজ্জ্বল দেখায়।

ক্যাবেজ, ফুলকপি, ব্রকলির মতো সবজি সালফারযুক্ত যৌগে ভরা—এগুলো ঘামের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তীব্র গন্ধ তৈরি করতে পারে। কিন্তু শরীরের সুস্থতায় এগুলোর অবদানও অনেক। তাই এ গন্ধ সব সময় বিরক্তিকর নয়।
মাংস, মাছ তীব্র গন্ধ তৈরি করে
মাংস ও মাছ শরীরে ভেঙে তৈরি করে ফ্যাট ও অ্যামিনো অ্যাসিড, যা ঘামের সঙ্গে বেরিয়ে এক ধরনের তীব্র গন্ধ তৈরি করে। গবেষণায় দেখা যায়, নিরামিষভোজী পুরুষদের গন্ধ বেশি আকর্ষণীয়, মনোরম ও হালকা।
মাছ ও ডিমের মতো খাবারে থাকা ট্রাইমিথাইলামিন যৌগ কখনও কখনও ‘ফিশ ওডর সিনড্রোম’ তৈরি করতে পারে। এটি বিরল জিনগত অবস্থা যেখানে শরীর থেকে মাছের মতো তীব্র গন্ধ বের হয়।
অ্যালকোহল ও কফির প্রভাব
অ্যালকোহল শরীরে ভেঙে অ্যাসিটালডিহাইড তৈরি করে। যার গন্ধ বেশ তীব্র ও অ্যালকোহলের মতোই। এটি শুধু নিঃশ্বাস নয়, ঘামেও বের হয়। নিয়মিত মদ্যপানে মুখে ব্যাকটেরিয়া বেড়ে গিয়ে দীর্ঘস্থায়ী মুখের দুর্গন্ধ তৈরি করে।

অন্যদিকে, কফির ক্যাফেইন ঘামগ্রন্থি সক্রিয় করে, ফলে বগল ও কুঁচকির মতো স্থানে ঘাম বাড়ে, যেখানে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত জন্মায় এবং দুর্গন্ধ বাড়ে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিয়ারপানকারীরা মশাদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়—তবে মানুষদের নয়!
উপবাসেও বদলায় গন্ধ
হাভলিচেকের একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, যারা ৪৮ ঘণ্টা উপবাসে ছিলেন, তাদের শরীরের গন্ধ খানিকটা বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। তবে এর বিপরীতে, সুইজারল্যান্ডের এক গবেষণায় দেখা যায়, উপবাসে থাকলে নিঃশ্বাসের গন্ধ কটু হয়।
গায়ের গন্ধ চরিত্রের ইঙ্গিত
শরীরের গন্ধ শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, ব্যক্তিত্বেরও আভাস দেয়। মিষ্টি ও আকর্ষণীয় গন্ধ আত্মবিশ্বাস ও উন্মুক্ততার প্রতীক। অন্যদিকে, মাংস ও অ্যালকোহলে ভরপুর খাদ্যাভ্যাস শরীরের গন্ধকে ভারী ও তীব্র করে তোলে। যা ব্যক্তিত্বে আধিপত্যের অনুভূতি জাগাতে পারে।
বিবিসি অবলম্বনে










