সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের অলীক মানুষ উপন্যাসটিকে নির্দিষ্ট কোনো ঘরানার মধ্যে ফেলা যায় না। এটি একই সঙ্গে একটি সামাজিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক, লৌকিক ও অলৌকিক উপন্যাস। পশ্চিমা সাহিত্যে Magic Realism বা জাদুবস্তবতা নিয়ে বহুমূখী চর্চা হলেও বাংলা সাহিত্যে তা অন্তত একটা সময় দুর্লভ ছিল। অন্তত সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ যে সময় লিখেছেন সে সময় বর্তমানের মতো এতো আলাপ হতো না জাদুবাস্তবতা নিয়ে। লেখক এই উপন্যাসে জাদুবস্তবতা নিয়ে একটি পরীক্ষা চালিয়েছেন এবং বলা যায় উনি সম্পূর্ণ সফল। এই একটি কারণে পাশাপাশি আরো অনেক কারণে অলীক মানুষ বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্যসাধারণ রচনা।

উনিশ-বিশ শতকের পটভূমিতে এক মুসলিম পির পরিবারের লৌকিক-অলৌকিক ওতপ্রোত জীবনের কাহিনী অলীক মানুষ। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র শফিউজ্জামানের পিতা—যার পুরো নাম সৈয়দ আবুল কাশেম মুহাম্মদ ওয়াদি-উজ-জামান আল-হুসায়নি আল-খুরাসানি—সাধারণ মানুষের কাছে বদিউজ্জামান বা বদুপির হিসেবে পরিচিত। বদুপির ফরায়েজি আন্দোলনের প্রবক্তা হাজী শরীয়তুল্লাহর শিষ্য। কালক্রমে তিনি একজন ফরায়েজি ধর্মগুরু হিসেবে আবির্ভূত হন। বদিউজ্জামান ছিলেন যেমন অমায়িক, মিষ্টভাষী আর ভাবপ্রবণ, তেমনি খামখেয়ালি, জেদি আর হঠকারী। বারবার ঠাঁইনাড়া হওয়া ছিল স্বভাব।

গল্পে দেখা যায় মৌলানার সঙ্গে আসমান থেকে জিনেরা নিশুতি রাতে দলিজঘরে দেখা করতে আসত। জানলা দিয়ে ঠিকরে পড়ত সাদা রোশনি। ধর্মভীরু গ্রামের মানুষ সাদা আলখাল্লা আর পাগড়ি পরা বদিউজ্জামানকে দেখলে মনে করত, ‘এই মানুষ দুনিয়ার নন।’ এভাবে সাধারণ মানুষের কাছে বদিউজ্জামান ওরফে বদুপির এক মিথে পরিণত হন।

উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ আর একটি চরিত্র বদিউজ্জামানের কনিষ্ঠ পুত্র শফিউজ্জামান। পিতা তাকে ইংরেজি শিক্ষার অনুমতি প্রদান করেন। ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে প্রকৃতি, নারী আর বিদেশি দর্শনের প্রভাবে সে ‘ধর্মচ্যুত’ হয়ে পড়ে। মেহরুর বউ আসমার কাছে সে প্রথম যৌবনের পাঠ লাভ করে, লালবাগ শহরে কাল্লু পাঠানের বউ সিতারার প্ররোচনায় পান্না পেশোয়ারির মাথা ফাটিয়ে চলে আসে। এর মধ্যে প্রিয়জনের সঙ্গে আপন ভ্রাতার বিবাহ তার নিজস্ব জগতকে বিস্রস্ত করে দেয়। এরপর ব্রাহ্মশিক্ষা ও স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে হত্যা করে ইংরেজ শাসককে। ফেরারি হওয়ার পর শফির নাম হয় ছবিলাল, তার সম্পর্কেও লৌকিক-অলৌকিক বিভিন্ন ঘটনা প্রচার হতে থাকে। দায়রা আদালতে তার ফাঁসির হুকুম হলে স্মৃতিতে উঠে আসে একজন সাদা ও একজন কালো মানুষ, শৈশবে যারা তার সম্মুখীন হয়েছিল। বস্তুত, এভাবেই তার পিতার সঙ্গে তার দ্বন্দ্বমূলক একটি সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।

দেওয়ান আবদুল বারি চৌধুরী ওরফে বারু মিয়া শফির ইংরেজি শিক্ষার পিছনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনিই শফিকে প্রকৃতির পাঠ শিক্ষা দেন। এছাড়া দেবনারায়ণ রায়, স্বাধীনবালা, হরিনারায়ণ ত্রিবেদী, রত্নময়ী, গোবিন্দবাবু, দিলরুখ বেগম ওরফে রুকু প্রমূখ চরিত্রসমূহ শফির চিন্তা ও কাজে প্রভূত প্রভাব রেখেছিল।

মৌলানা বদিউজ্জামান এবং তার পুত্র শফিউজ্জামান—দুটো চরিত্রকেই মনে হয় আত্মদ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত দুজন মানুষ। তারা ক্রমাগত যেন নিজের সঙ্গেই যুদ্ধ করে চলছে। যেমন উপন্যাসের শেষদিকে মস্তান বাবার সঙ্গে বদুপিরের সংলাপের একাংশ:

“-এইবার তুমি সত্যিই বদি-উজ-জামান হইলে!

-কেন এ কথা কহিতেছ?

-সে কহিল, তুমি আলেম লোক। বদি কথার অর্থ জান না? বদি হলো পাপ। তুমি এতদিনে জমানার পাপ হইলে। তোমার জন্য সুনিশ্চিত দোজখ।”

প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, বদুপিরের প্রকৃত নাম ওয়াদি-উজ-জামান, যার অর্থ জমানার নদী (ওয়াদি বলতে এমন কিছু নদী বোঝায় যা কিছু সময় শুকিয়ে থাকে)।

আবার স্বদেশী আন্দোলনের সময় শফির সহযোগী কিছু ব্যক্তি যখন তাকে মুসলিম হিসেবে সম্বোধন করে, তখন তার নিজস্ব উপলব্ধি এমন, “আমি হিন্দু বা মুসলমান নহি, একজন মনুষ্য– দ্বিপদ প্রাণীদিগের একটি সামান্য নিদর্শনমাত্র।”

‘অলীক মানুষ’ উপন্যাসের বর্ণনার ধরণ কিছুটা বিক্ষিপ্ত। উপন্যাসটি কখনো সরলরেখায় চলে না। কখনও সিধে ন্যারেটিভ, কখনও মিথ ও কিংবদন্তি, আবার কখনও ব্যক্তিগত ডায়েরি বা সংবাদপত্রের কাটিং মিলিয়ে মিশিয়ে ধূসর এক সময় ও বিস্ময়কর কিছু মানুষের বৃত্তান্ত।

উপন্যাসের প্রারম্ভে লেখক এইচ জি ওয়েলসের একটি উক্তি দিয়েছেন—

Hatred is one of the passions that can master a life, and there is a temperament very prone to it, ready to see life in terms of vindictive melodrama, ready to find stimulus and satisfaction in frightful demonstrations of ‘justice’ and ‘revenge’.

মানুষের জীবনের ঘৃণা, সুবিচার ও প্রতিশোধ বিষয়ক এই উক্তিটি উপন্যাসের সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ।

হুমায়ুন কবির প্রতিষ্ঠিত ‘মাসিক চতুরঙ্গ’ পত্রিকায় দুই বছর ধরে মহাকাব্যিক এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল। গ্রন্থাকারে দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। প্রকাশের পর উপন্যাসটি ১৯৯০ সালে ভুয়ালকা পুরস্কার, ১৯৯৪ সালে বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কার, একই বছর সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে সুরমা চৌধুরী মেমোরিয়াল আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করে।

পরিশেষে বইয়ের পরিচিতির সঙ্গে মিলিয়ে বলা যায়, অলীক মানুষ বাঙালি হিন্দু-মুসলিম জীবনের এযাবৎ অনাবিষ্কৃত একটি সত্যিকার ঐতিহাসিক সনদ। একজন ধর্মগুরু ও তার ধর্মদ্রোহী সন্তান—এই দুটি পরস্পরবিরোধী সত্তার মানসিক টানাপোড়েন উপন্যাসের প্রধান বিষয়। বাস্তব, অবাস্তব, পরাবাস্তব বা জাদুবস্তবতার দ্বন্দ্ব, লৌকিক-অলৌকিক, প্রেম-অপ্রেম ইত্যাদি বিপরীত গতির মাঝখানে রক্তমাংসের মানুষ কীভাবে অলীক মানুষে পরিণত হয় শক্তিমান ঔপন্যাসিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ তা দক্ষতার সঙ্গে চিত্রিত করেছেন। বহু অর্থেই এই উপন্যাস বঙ্গভূমির ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণের প্রামাণ্য দলিল।

আরাফাত কবির: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়