ব্যায়াম করছেন নিয়মিত। তবু কোমর, ঘাড় বা কাঁধে বারবার ব্যথা হচ্ছে? শরীরের কোনো অংশ শক্ত লাগে, কোনো কোনো ব্যায়ামে ভারসাম্য রাখতে কষ্ট হয়? এ অবস্থায় মনে হতে পারে, আরো একটু স্ট্রেচিং করলেই হয়তো সমস্যাটা কমবে। কিন্তু সব সময় এমনটা নাও হতে পারে।

কখনো শরীরের এক অংশের দুর্বলতা বা নড়াচড়ার সমস্যার কারণে অন্য অংশের পেশিকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। একে বলা হয় মাসল কমপেনসেশন। অর্থাৎ, যে পেশির যে কাজ করার কথা, সেটি ঠিকমতো করতে না পারলে অন্য পেশি সেই কাজের কিছুটা দায়িত্ব নিয়ে নেয়।

শুনতে শরীরিক অবস্থা স্বাভাবিক মনে হলেও সমস্যা হয় যখন এই অভ্যাস দীর্ঘদিন চলতে থাকে। অতিরিক্ত কাজ করা পেশি দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে যে পেশির কাজ করার কথা, সেটি আরো দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে টান, অস্বস্তি, ব্যথা এমনকি আঘাতের ঝুঁকিও।

muscle_compensation2

সমস্যা শুরু হয় কীভাবে?

শরীরের পেশি, জোড় ও অন্যান্য টিস্যু একসঙ্গে কাজ করেই আমাদের নড়াচড়া সম্ভব করে। কোনো একটি অংশ ঠিকমতো কাজ না করলে শরীরের অন্য অংশ সেটি সামলে নেয়ার চেষ্টা করে।

দীর্ঘ সময় বসে থাকা এর একটি সাধারণ কারণ। এতে নিতম্ব ও শরীরের গভীরের কিছু পেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। একই সময়ে হিপ ফ্লেক্সর নামে পরিচিত পেশিতে শক্তভাব তৈরি হতে পারে। তখন স্কোয়াট, লাঞ্জের মতো ব্যয়াম এমনকি হাঁটার সময়ও কোমর ও উরুর পেছনের পেশিকে বেশি কাজ করতে হয়।

একইভাবে দীর্ঘ সময় ফোন বা কম্পিউটারের দিকে ঝুঁকে থাকলেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। এতে বুক ও পিঠের মাঝের অংশ শক্ত হয়ে যায়। ফলে হাত ওপরে তোলার মতো কাজে ঘাড় ও কাঁধের কিছু পেশিকে বেশি কাজ করতে হয়। শরীর ঘোরানোর সময় আবার কোমরের ওপরও বাড়তি চাপ পড়তে পারে।

পুরোনো কোনো চোট থেকেও এমন সমস্যা তৈরি হতে পারে। যেমন গোড়ালির চোট পুরোপুরি ঠিক না হলে হাঁটার সময় শরীরের ভর অন্য পা বা নিতম্বের দিকে বেশি চলে যেতে পারে। অর্থাৎ, ব্যথা বা অস্বস্তি যে জায়গায় দেখা দিচ্ছে, সমস্যার শুরু সব সময় সেখানেই নাও হতে পারে।

muscle_compensation

শরীর কি অন্য পেশির ওপর ভর করছে?

ব্যায়াম করার সময় নিজের শরীরের নড়াচড়ার দিকে একটু খেয়াল করলেই কিছু বিষয় বোঝা যেতে পারে। স্কোয়াট বা লাঞ্জ করার সময় নিতম্ব ও উরুর বদলে কোমর বা উরুর পেছনের পেশিতে বেশি চাপ অনুভব করছেন? তাহলে নিতম্ব ও মাঝের অংশের পেশি ঠিকভাবে কাজে অংশ নিচ্ছে না কি না, তা দেখা দরকার।

হাত মাথার ওপর তুললে কাঁধ অজান্তেই ওপরে উঠে যাচ্ছে বা ঘাড় শক্ত হয়ে যাচ্ছে? এর পেছনে পিঠের মাঝের অংশ ও পাঁজরের নড়াচড়া সীমিত হওয়ার বিষয়টি থাকতে পারে।

পেটের পেশির ব্যায়াম করার সময় পেটের বদলে হিপ ফ্লেক্সরে বেশি চাপ লাগলে বুঝে নিতে হবে— শরীরের অভ্যন্তরীণ পেশি ঠিকভাবে কাজ করছে না।

ব্যায়ামের সময় এক পাশ বেশি ব্যবহার করছেন? পুরোনো চোট বা সব সময় শরীরের একটি পাশ বেশি ব্যবহারের অভ্যাস এর পেছনে থাকতে পারে।

ব্যায়ামের পর নির্দিষ্ট কোনো পেশিতে অস্বাভাবিক ব্যথা বা অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিলে বুঝবেন, অতিরিক্ত চাপের কারণে পেশিটি স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

muscle_compensation4

তাহলে কী করবেন?

এ ধরনের সমস্যা ঠিক করতে সব সময় কঠিন বা দীর্ঘ ব্যায়ামের প্রয়োজন হয় না। বরং প্রথমে শরীর কীভাবে নড়ছে, সেটি ঠিক করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন হলে ফিজিওথেরাপিস্ট বা অন্য কোনো মুভমেন্ট বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেয়া যেতে পারে।

এক. ব্যায়ামের গতি কমান

দ্রুত ব্যায়াম করলে কোন পেশি বেশি কাজ করছে, তা বোঝা কঠিন। তাই ধীরে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যায়াম করলে শরীরের নড়াচড়া খেয়াল করা সহজ হয়। স্কোয়াট, ঝুঁকে ওঠা, ধাক্কা দেয়া, টানা, শরীর ঘোরানো এবং শরীরের মাঝের অংশ স্থির রাখার মতো প্রাথমিক নড়াচড়াগুলো দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।

দুই. শ্বাস নেওয়ার ধরন ঠিক করুন

শুধু ব্যায়ামের সময় নয়, শ্বাস নেয়ার ধরনও শরীরের নড়াচড়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। অগভীর বা শুধু বুক দিয়ে শ্বাস নিলে ঘাড়, কাঁধ ও পিঠের কিছু পেশি অতিরিক্ত কাজ করতে পারে।

শ্বাস নেয়ার সময় নিচের পাঁজর দুই পাশে ছড়িয়ে যাচ্ছে কিনা, সেদিকে খেয়াল করা যেতে পারে। শ্বাস ছাড়ার সময় পাঁজর ধীরে ভেতর ও নিচের দিকে নামতে দিন। এতে ডায়াফ্রাম ও শরীরের গভীরের পেশিগুলোকে ঠিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়।

তিন. যেখানে নড়াচড়া কম, সেখানে কাজ করুন

শরীরের কিছু অংশ শক্ত হয়ে গেলে অন্য অংশকে বাড়তি কাজ করতে হয়। বিশেষ করে হিপ ফ্লেক্সর শক্ত হয়ে গেলে কোমর ও উরুর পেছনের পেশির ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে।

শরীরের ওপরের অংশেও একই বিষয় দেখা যায়। পাঁজরের খাঁচা ও পিঠের মাঝের অংশ শক্ত হয়ে গেলে শরীর ঘোরানোর সময় কোমরকে বেশি নড়তে হতে পারে। তাই শুধু যেখানে ব্যথা হচ্ছে, সেখানেই কাজ না করে শরীরের নড়াচড়ার পুরো ব্যবস্থাটিও বিবেচনা করা জরুরি।

কিছু ব্যায়ামে একসঙ্গে একাধিক অংশের নড়াচড়া করানো যায়। যেমন ‘উইন্ডমিল টুইস্ট’ ধরনের ব্যায়ামে উরুর পেছনের পেশি, কোমর, পাঁজর, পিঠের মাঝের অংশ ও কাঁধ একসঙ্গে কাজ করে।

সিএনএন অবলম্বনে