সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে পড়ল, পরিবারের এক সদস্য অসুস্থ। কিংবা ব্যাংক ঋণের কিস্তি, বাড়িভাড়া ও সংসারের খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা মাথায় ঘুরছে। কারো হয়তো ব্যক্তিগত সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে, কেউ আবার প্রিয়জনকে হারানোর শোক কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। কিন্তু এসবের মধ্যেও প্রতিদিনের মতো অফিসে যেতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছে পালন করতে হবে নিজের দায়িত্ব। দিন শেষে বাড়ি ফিরে আবার সামলাতে হবে ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিষয়।

আমাদের অনেকের জীবনেই এমন পরিস্থিতি আসে। মনের ভেতর নানা চিন্তা ও অস্থিরতা নিয়েও প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজ করে যেতে হয়। বাইরে থেকে দেখে হয়তো বোঝার উপায় নেই, একজন মানুষ কতটা মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলছেন, কাজ করছেন, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন; অথচ মনের ভেতর হয়তো চলছে অন্য কিছু।

এভাবে মানসিক চাপ সামলে দিনের পর দিন কাজ করে যাওয়ার প্রভাব পড়তে পারে শরীর ও মনে। মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে, ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে, অল্পতেই বিরক্তি বা ক্লান্তি আসতে পারে। কখনো কাজের প্রতি আগ্রহও কমে যেতে পারে।

তাহলে ব্যক্তিগত জীবনের নানা দুশ্চিন্তা নিয়েও প্রতিদিনের কাজ কীভাবে সামলাবেন? মানসিক চাপের মধ্যে নিজেকে ভালো রাখার উপায়ই বা কী?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ‘ডুয়িং হোয়াট ম্যাটার্স ইন টাইমস অব স্ট্রেস’ নির্দেশিকায় মানসিক চাপ সামলাতে কয়েকটি সহজ কৌশলের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, কঠিন চিন্তা থেকে কিছুটা মনোযোগ সরিয়ে বর্তমান মুহূর্তে ফিরে আসা, নিজের অনুভূতিকে স্বীকার করা এবং নিজের প্রতি সদয় হওয়া। নির্দেশিকাটিতে বলা হয়েছে, প্রতিদিন অল্প কয়েক মিনিট অনুশীলন করেও এসব কৌশল কাজে লাগানো যায়।

মনের ওপর চাপ পড়লে প্রভাব পড়ে শরীরেও

মানসিক চাপের সময় শরীর স্বাভাবিকভাবেই একধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়। চাপের পরিস্থিতিতে শরীরের স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়তে পারে। স্বল্প সময়ের জন্য এটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হলেও দীর্ঘদিন চাপের মধ্যে থাকলে শরীর ও মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মনোযোগ কমে যায়: ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকলে অফিসের কাজে মন বসানো কঠিন হতে পারে। একই বিষয় বারবার পড়েও বুঝতে সমস্যা হয়। ছোটখাটো ভুল হতে পারে। কোনো কাজ করতে গিয়ে বারবার মন অন্যদিকে চলে যায়।

অল্পতেই বিরক্তি: মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে ধৈর্য কমে যেতে পারে। সামান্য কথাতেও বিরক্তি তৈরি হয়। কখনো সহকর্মী বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় তর্কে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।

ঘুমের সমস্যা: দিনের ভাগে কাজের ব্যস্ততায় দুশ্চিন্তা কিছুটা চাপা থাকলেও রাতে বিছানায় গেলে তা আবার মাথায় ঘুরতে শুরু করে। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় কিংবা সকালে ঘুম থেকে উঠেও ক্লান্ত লাগে।

শারীরিক অস্বস্তি: দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকলে মাথাব্যথা, পেশিতে টান, ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা, পেটের সমস্যা কিংবা বুক ধড়ফড় করার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে এসব সমস্যার অন্য শারীরিক কারণও থাকতে পারে।

কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায়: ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা দীর্ঘস্থায়ী হলে আগে যে কাজগুলো করতে ভালো লাগত, সেগুলোও বিরক্তিকর মনে হতে পারে। সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগতে পারে। এমনকি অবসর সময়েও কোনো কিছু উপভোগ করতে ইচ্ছা নাও করতে পারে।

মানসিক চাপ সামলে অফিসের কাজ করবেন কিভাবে

ব্যক্তিগত জীবনের সব সমস্যা চাইলেই দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয়। কোনো কোনো পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরেও থাকে। তাই সমস্যা পুরোপুরি দূর হওয়ার অপেক্ষা না করে এর মধ্যে কীভাবে নিজের যত্ন নেয়া যায়, সেটি জানা জরুরি।

১. সব চিন্তা একসঙ্গে সামলানোর চেষ্টা করবেন না

মনের মধ্যে অনেক দুশ্চিন্তা জমে থাকলে সবকিছু একসঙ্গে সমাধান করতে ইচ্ছা হতে পারে। কিন্তু এতে অস্থিরতা আরো বাড়তে পারে। কোন বিষয়টি এখনই সামলানো প্রয়োজন, আর কোনটি পরে দেখা যাবে, তা আলাদা করার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে একটি কাগজে নিজের চিন্তা ও করণীয় বিষয়গুলো লিখে রাখুন। এতে মাথার মধ্যে বারবার একই চিন্তা ঘুরতে থাকার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে।

২. কাজের সময় শুধু একটি কাজে মনোযোগ দিন

ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে মন অন্যদিকে চলে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে অফিসের কাজের সময় একসঙ্গে অনেক কিছু নিয়ে ভাবতে গেলে কাজ আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তাই একবারে একটি কাজ হাতে নিন। বড় কাজ হলে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করুন। একটি ধাপ শেষ হলে পরেরটিতে যান। মনোযোগ হারিয়ে ফেললে নিজেকে দোষ না দিয়ে আবার কাজে ফেরার চেষ্টা করুন।

৩. নিজের অনুভূতি চেপে রাখবেন না

অনেকেই মনে করেন, ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে কারো সঙ্গে কথা বলা উচিত নয়। বিশেষ করে অফিসে গেলে সবকিছু স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সব সময় নিজের অনুভূতি চেপে রাখলে মানসিক চাপ আরো বাড়তে পারে।

বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবারের সদস্য কিংবা কাছের কারো সঙ্গে নিজের মনের কথা ভাগ করে নিতে পারেন। কখনো শুধু কারো কাছে নিজের সমস্যার কথা বললেও মন কিছুটা হালকা হয়। প্রয়োজনে মনোবিজ্ঞানী বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

৪. কাজের ফাঁকে নিজেকে একটু সময় দিন

একটানা কাজ মানসিক ক্লান্তি বাড়তে পারে। তাই কাজের ফাঁকে ছোট বিরতি নিন। কয়েক মিনিট হাঁটুন, পানি পান করুন কিংবা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের পরিবেশ দেখুন।

এ সময় ফোনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল না করে কিছুক্ষণ নিজের মতো থাকতে পারেন। এতে মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে সুবিধা হতে পারে।

৫. শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন করুন

দুশ্চিন্তা বা অস্থিরতা বেড়ে গেলে কয়েক মিনিট ধীরে শ্বাস নেয়া ও ছাড়ার অনুশীলন করতে পারেন। আরাম করে বসে নাক দিয়ে ধীরে শ্বাস নিন, এরপর ধীরে ধীরে ছাড়ুন। কয়েকবার এভাবে করুন।

এ ধরনের অনুশীলন শরীরের দুশ্চিন্তা কমাতে এবং সাময়িকভাবে মন শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে।

৬. নিজের ঘুম ও খাবারের যত্ন নিন

মানসিক চাপের সময় অনেকের ঘুম ও খাওয়ার রুটিন এলোমেলো হয়ে যায়। কেউ ঠিকমতো খেতে পারেন না, আবার কেউ অতিরিক্ত খাবার খেতে শুরু করেন। ঘুমের সময়ও কমে যায়।

এসব অভ্যাস মানসিক ক্লান্তি আরো বাড়াতে পারে। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। সুষম খাবার খান এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন। ঘুমের আগে অতিরিক্ত চা-কফি ও ফোন ব্যবহার কমানোও উপকারী হতে পারে।

৭. প্রতিদিন কিছুটা শারীরিক সক্রিয়তা রাখুন

হাঁটা, হালকা ব্যায়াম কিংবা পছন্দের কোনো শারীরিক কর্মকাণ্ড মানসিক চাপ সামলাতে সহায়ক হতে পারে। অফিস থেকে ফিরে ২০-৩০ মিনিট হাঁটতে পারেন। চাইলে ছুটির দিনে সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা কিংবা পছন্দের কোনো খেলায় অংশ নিতে পারেন।

নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড মেজাজ ভালো রাখতে, ঘুমের উন্নতি করতে এবং উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

৮. সব সময় ভালো থাকার ভান করবেন না

মানসিক চাপের মধ্যে থেকেও প্রতিদিন সব কাজ নিখুঁতভাবে করতে হবে, এমন প্রত্যাশা নিজের ওপর চাপিয়ে দেয়া ঠিক নয়। কোনো দিন কাজের গতি কম হতে পারে, কোনো দিন মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া জরুরি। সব সমস্যার সমাধান একদিনে করতে হবে না। প্রয়োজন হলে কিছুটা বিশ্রাম নিন, নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিন এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করুন।

কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন?

মানসিক চাপ সাময়িক হলে অনেক সময় নিজের যত্ন, বিশ্রাম ও কাছের মানুষের সহযোগিতায় পরিস্থিতি সামলানো যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ থাকা, অতিরিক্ত উদ্বেগ, ঘুম ও খাওয়ার সমস্যা, কোনো কিছুতে আগ্রহ না পাওয়া কিংবা দৈনন্দিন কাজ করতে অসুবিধা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

এ ধরনের সমস্যা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেয়া ভালো। নিজের ক্ষতি করার চিন্তা এলে অপেক্ষা না করে দ্রুত পেশাদার সহায়তা নিতে হবে।

নিজের জন্য একটু সময় রাখুন

জীবনে সবকিছু সব সময় পরিকল্পনামতো চলে না। ব্যক্তিগত জীবনে সমস্যা থাকবে, দুশ্চিন্তা থাকবে, কখনো কঠিন সময়ও আসবে। কিন্তু এসবের মধ্যেও প্রতিদিনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের মানসিক অবস্থাকে অবহেলা করা উচিত নয়।

মনে রাখতে হবে, কাজের দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিজের ভালো থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যে নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখা, প্রয়োজন হলে অন্যের সাহায্য চাওয়া এবং নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া—এসবই মানসিক চাপ সামলানোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।