২৬ জুন ২০২১ তারিখে এএলআরডি ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে ‘জনশুমারি ২০২১: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভাজিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিসংখ্যান’ শীর্ষক একটি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে এ ক্রোড়পত্র



দেওয়ান হানিফ মাহমুদ 

সম্পাদক

বণিক বার্তা

১৯৯১ সালের জনশুমারির পর থেকে একটা বড় তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। তখন বলা হয়েছিল, আমাদের দেশে ২৯টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে। এর পর থেকে নৃতাত্ত্বিক ও নৃবিজ্ঞানীদের অনেকেই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন। সরকারের বাইরে তাদের প্রত্যেকেই বলেছেন, জনশুমারিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের যে সংখ্যা উল্লেখ করা হচ্ছে তার চেয়ে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি এখানে অনেক বেশি। কেউ বলেছেন, সমতল ও পাহাড় মিলিয়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৬০-এর মতো। কেউ জানিয়েছেন ৪৬টি। কিন্তু সরকারি হিসাবে সংখ্যাটা কম। আজ আমাদের সঙ্গে আলোচক হিসেবে অনেকে রয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে এবং দেশীয় বিভিন্ন জায়গায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন। আজকের আলোচনা থেকে পরবর্তীতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে। ২০২১ সালের জনশুমারিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিস্তারিত তথ্য ও উপাত্ত অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। সে প্রেক্ষাপট থেকে আজকের আলোচনাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, এমপি আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। তার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নিলে এ বিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য শুমারি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের সংখ্যা নিয়ে যে তর্ক-বিতর্ক চলছে তার বিপরীতে আমরা একটি বাস্তবমুখী সমাধানের পথ-নিদের্শনা পাব বলে আশা করছি।


খুশী কবির

চেয়ারপারসন, এএলআরডি ও সমন্বয়ক, নিজেরা করি

২০২১ সালে আদমশুমারিতে সঠিকভাবে সবার অন্তর্ভুক্তি কাম্য। গণশুমারির মাধ্যমে আমরা কী ধরনের কর্মসূচি নিতে যাচ্ছি, কী প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হচ্ছি তা গুরুত্বপূর্ণ। টেকসই উন্নয়নের মূল প্রতিপাদ্য কাউকে পেছনে ফেলে অগ্রসর হওয়া যাবে না। সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সেখানে গণশুমারির সঠিক তথ্য আমাদের সবচেয়ে বেশি সাহায্য করবে। আমি এখানে দুটো বিষয় স্পষ্ট করতে চাই। এক. এখন আমরা সরকারিভাবে ‘আদিবাসী’ শব্দটা ব্যবহার করি না, বলি ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হলে তো সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি নৃগোষ্ঠী থাকে। তাহলে বাঙালি কি একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী? ভারতে গেলে আমি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হয়ে যাই কিনা! জাতিসংঘ আদিবাসীদের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিয়েছে। বাংলাদেশে পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে আদিবাসী গোষ্ঠী রয়েছে। তাদের আলাদা করে দেখা যাবে না। কারণ তাদের ব্যাপারে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। আমাদের আরো দেখতে হবে যে তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়। একটা পৃথিবীর যেমন বৈচিত্র্য দরকার তেমনি একটি দেশ ও জাতিরও বৈচিত্র্য দরকার। আমরা যেমন চাই না প্রকৃতির কোনো কিছু বিলুপ্ত হোক, তেমনি চাই না কোনো প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটুক। আদিবাসীদের অনেকে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। তাদের এ বিষয়গুলো আমাদের সামনে নিয়ে আসতে হবে। এমনকি কভিড-১৯-এর জন্য আমরা যে পরিকল্পনাগুলো নিচ্ছি সেখানেও আদিবাসীদের কথা চিন্তা করতে হবে।


ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়

সার্কেল চিফ, চাকমা সার্কেল

রাঙামাটি

আজ আমি যে বিষয়গুলো উপস্থাপন করছি, এটা আমার ব্যক্তিগত নয়; আমার সঙ্গে সহমত পোষণ করেন বাংলাদেশ পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটি ও বাংলাদেশ ইন্ডিজেনাস পিপলস নেটওয়ার্ক অন বায়োডাইভার্সিটি অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ। বিগত সময়ের জনশুমারিতে আদিবাসীদের যথেষ্ট পরিমাণ ভুল তথ্য উঠে আসার কারণে আমরা অত্যন্ত চিন্তিত। পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং দেশের অন্যত্র অঞ্চলে, ব্রিটিশ আমলেও (পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে ১৮৬০-১৯৪৭), জাতিসত্তাগতভাবে বিভাজিত তথ্য সরকারি পরিসংখ্যানে পাওয়া যেত। তবে বিগত কয়েক দশকের জনশুমারি ও গৃহগণনায় কিছু মাত্রায় সম্প্রদায়গত বিভাজিত তথ্য উঠে এলেও এবং জনশুমারির প্রতিবেদনে ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত অন্যান্য পরিসংখ্যানে তা আংশিকভাবে প্রতিফলিত হলেও পূর্বোক্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য প্রকাশনার তথ্য বড়জোর অপর্যাপ্ত, না হয় ত্রুটিপূর্ণ, বিশেষ করে ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তার ক্ষেত্রে। এভাবে উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের বরেন্দ্র ভূমিতে ৭ থেকে ১০ হাজার চাকমা দেখানো হচ্ছিল। আর খাসিয়া জাতির মানুষের কথা সরকারি দলিলে পাওয়া যায়, যেখানে অত সংখ্যায় তারা নেই। ধর্মীয় সম্প্রদায়গত তথ্য বনাম জাতিগত তথ্যের ক্ষেত্রে আমরা দেখি অনেক সময় ধর্মীয় সম্প্রদায়গত তথ্য পাওয়া গেলেও অর্থাৎ মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান ভেদে জাতিগতভাবে, অর্থাৎ চাকমা, সান্তাল, মান্দি (গারো), খিয়াং, প্রভৃতি জাতির মানুষের তথ্য খুঁজলে তা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশনায় পাওয়া যায় না। কোনো প্রতিবেদনে আদিবাসীসহ সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ও আর্থসামাজিক অবস্থার তথ্য প্রকাশ হয় না। এ পর্যায়ে বলব, জাতিগতভাবে বিভাজিত তথ্য এবং পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও এসডিজিতে তার ভূমিকা কী? ওইরূপ তথ্য না থাকলে সরকার কীভাবে তার অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং এসডিজির কার্যক্রমগুলো প্রেক্ষিত-উপযোগী কায়দায় বাস্তবায়ন করবে। জাতিগতভাবে বিভাজিত তথ্য থাকার এবং না থাকার পেছনের কারণগুলো দেখতে হবে। বিভাজিত তথ্য না থাকার মূল কারণ অর্থ বা অন্যান্য সম্পদের অভাব নয়, বরং এর কারণ কোনো ক্ষেত্রে অজ্ঞতা, কোনো ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কোনো সময় রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব বা স্বল্পতা। অন্তর্ভুক্তিমূলক জনশুমারির বিষয়ে পরিসংখ্যান ব্যুরোর সঙ্গে আদিবাসী প্রতিনিধিদের সংলাপে ব্যুরোর কর্মকর্তারা সদিচ্ছা প্রকাশ করেন, তবে তারা অর্থ ও জনবলের অভাবের কথা জানান। এরই মধ্যে আদিবাসী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক এবং জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রধানের সঙ্গে সংলাপ হয়েছে। তারা এ বিষয়ে সরকারকে যথাযথ কারিগরি সহায়তা করার ক্ষেত্রে তাদের সদিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। দেশের ৫০টির অধিক আদিবাসী জাতির সংখ্যা, জাতিগুলোর জনসংখ্যা, জনগোষ্ঠীর সদস্যদের লিঙ্গ, বয়স, বৈবাহিক অবস্থা ইত্যাদি নিয়ামকের প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসহ জাতিগতভাবে বিভাজিত এবং পর্যাপ্ত ও সঠিক তথ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করা হোক। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বা ইকো পার্ক, জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য প্রভৃতি এলাকার অধিবাসী কিনা, অপুনর্বাসিত শরণার্থী বা অভ্যন্তরীণ উদবাস্তু কিনা, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের কাছে হারানো ভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য দরখাস্ত করেছেন কিনা এবং তাদের মাতৃভাষা কী, সে সম্পর্কে তথ্যাদি সংগ্রহ করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কভিড-১৯ প্রতিরোধী টিকা, কভিড-১৯ রিলিফ প্যাকেজ, খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় জল, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা, সেলফোন সংযোগ, ইন্টারনেট ও অন্যান্য অনলাইন ক্লাস, বাজার ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ-সুবিধার অভিগম্যতা আছে কিনা সেসব তথ্য নেয়া জরুরি। আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে নিয়োজিত গণনাকারীরা যাতে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব সঠিক এবং অন্যভাবে দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদন করতে পারেন, তার জন্য যথাযথ এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা দেয়ার বিষয় নিশ্চিত করা হোক। পরিসংখ্যান ব্যুরো, ডেপুটি কমিশনার ও জনগণনার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট অন্যরাসহ সংশ্লিষ্ট জাতিসত্তার প্রতিনিধিদের সঙ্গে যথাযথ ও পর্যাপ্ত পরামর্শ করা এবং তাদের সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ, ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করার অনুরোধ রইল।


ড. মেসবাহ কামাল

উপাচার্য, প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনের মধ্য দিয়ে ২৭টি আদিবাসী গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে, কিন্তু আসলে তাদের সংখ্যা অনেক বেশি। সে ব্যাপারে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করা হয়েছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করার জন্য। সেখানে অন্যদের সঙ্গে আমিও ছিলাম। ৭৮টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে আমরা একটা প্রতিবেদন দিয়েছি। তার মধ্যে আমরা দলিত, হরিজনসহ বেশ কয়েকটি কমিউনিটিকে চিহ্নিত করেছি, যারা এখনো অচ্ছুত, অস্পৃশ্য এই একবিংশ শতাব্দীতেও। প্রতিবেদনে আমরা তাদের আলাদা একটা ক্যাটাগরি হিসেবে চিহ্নিত করেছি। চা জনগোষ্ঠীর ১৬৫টি কমিউনিটিকে চিহ্নিত করেছি। ভারত, পাকিস্তান, নেপালে ‘ওবিসি’ বলে একটা কনস্টিটিউশনাল ক্যাটাগরি তৈরি হয়েছে। ওই আদলে বাংলাদেশেও আলাদা ক্যাটাগরি করতে হবে, যারা আদিবাসীর মধ্যে পড়ে না, দলিত-হরিজনের মধ্যে পড়ে না, চা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও পড়ে না, কিন্তু পিছিয়ে থাকা মানুষ—এ রকম ১৭টি কমিউনিটিকে চিহ্নিত করে আমরা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে একটা রিপোর্ট দিয়েছি। তবে সরকারের ২৭টি জনগোষ্ঠীর তালিকায় আবার তিনটি জনগোষ্ঠীর পুনরাবৃত্তি ছিল। যেমন মারমারা মগ নামেও ছিল। আসলে সরকারের তালিকায় ছিল ২৪টি জনগোষ্ঠী। এর সঙ্গে আরো ২৬টিকে যুক্ত করে মোট ৫০টি জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, যা অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ, কিন্তু এটাও যথেষ্ট নয়। কারণ তাদের বাইরেও আরো ছোট ছোট আদিবাসী জনগোষ্ঠী আছে। এক্ষেত্রে আমার কিছু প্রস্তাব আছে: প্রথমত, সরকার যে ৫০টি জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দিয়েছে আগামী জনশুমারির ফর্মে তাদের উল্লেখ করতে হবে। ফর্মে যদি ৫০টি জনগোষ্ঠীর নাম থাকে এবং ‘অন্যান্য’ নামে আলাদা বক্স থাকে তাহলে ওই ৫০টি জাতিসত্তা চিহ্নিত হবে এবং কোন জেলার কোন ইউনিয়নের কোন গ্রামে বাস করে তা চিহ্নিত হবে। এতে সরকারের জন্য সহায়তামূলক কর্মসূচি নেয়া এবং তাদের কাছে পৌঁছা সহজ হবে। এমনকি সরকার তাদের সহায়তার উদ্দেশ্যে অন্যান্য উদ্যোগও নিতে পারবে। যেসব এলাকায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি তাদের জন্য ইউনিয়ন পরিষদে একটা স্থায়ী কমিটি করার মতো কাজগুলো করা সহজ হবে। দ্বিতীয়ত, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আমরা বছর তিনেক আগে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছি, সেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনকে ধরে দেশের একেবারে পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছে সহায়তা কার্যক্রম পৌঁছে দেয়া সম্ভব। বাংলাদেশে ১৫ লাখ হরিজন রয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বাংলাদেশে ৬৫ লাখ দলিত আছে। আমরা চা বাগানের সম্প্রদায়গুলোকে চিহ্নিত করে দিয়েছি। অন্যান্য পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়কে যদি সরকার থেকে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়, তাহলে ডিসি ও ইউএনওরা ব্যবস্থা নেবেন।


ড. সাদেকা হালিম

ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

গত দুই দশক থেকে বিভিন্ন প্লাটফর্মে আমরা আদিবাসীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নিয়ে বলছি। আমরা যখনই আদমশুমারি করি তখন কোনো একটা অজ্ঞাত কারণে তা সুকৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছি। ফলে আদিবাসীদের মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ৫ শতাংশ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি তাই আমাদের খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের গবেষণা অনুসারে, চার লাখ আদিবাসী সম্প্রদায় ১১ হাজার গ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। আমরা যদি আদিবাসীদের বিভাজিত তথ্যটা নিয়ে আসি, তাহলে গবেষণার খুবই গুরুত্ব আছে। কিন্তু পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে ধর্মীয় পার্থক্য রয়েছে। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক একজন মানুষ ছিলেন। অথচ আমরা এখন দেখছি ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের ইশতেহারগুলো থেকেও আদিবাসী শব্দটা বাদ দেয়া হয়েছে। এটাও কিন্তু একটা রাজনৈতিক বিষয়। বাংলাদেশ সরকার আইএলওর ১০৭ অনুসমর্থন করেছে, ১৬৯ করেনি, কিন্তু সেখানে স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ১০৭-এর ধারা এক ও দুইয়ে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, অন্যান্য যারা জাতিসত্তা আছে, তাদের স্বকীয়তা, তাদের সংস্কৃতি, তাদের ভূমির প্রতি মালিকানা তা আমরা সমর্থন করব। বাংলাদেশ বাঙালি জাতিসত্তার দেশ, কিন্তু আমাদের যে বহুমাত্রিকতা ও বৈচিত্র্য রয়েছে তা আমাকে অনুধাবন করতে হবে। কারণ তা আমাদের শক্তি। বিভাজিত তথ্যগুলো যদি আমরা না আনি তাহলে উন্নয়নের যে গাড়িতে আমরা উঠেছি সেখান থেকে তারা ছিটকে পড়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে যে শুধু মারমা, ত্রিপুরা, লুসাই গোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা কম আসছে। আমাদের কাছে যদি জাতিসত্তার বিভাজিত তথ্য থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আমরা ইতিবাচক সমতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। শিক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নারীর উন্নয়ন ও জাতিসত্তার উন্নয়নের জন্য আদিবাসীদের বিভাজিত তথ্য প্রয়োজন। এটা রাজশাহী, রংপুর, জয়পুরহাট, সিলেট, মৌলভীবাজার, খুলনা, চট্টগ্রাম—সব জায়গায় কিন্তু তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আমি আশা করব, একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে এ কাজগুলো করা যেতে পারে। কমিটিতে অবশ্যই আদিবাসী প্রতিনিধি, পরিসংখ্যানবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, আদিবাসী ইতিহাসবিদদের উপস্থিতির মাধ্যমে পরিবর্তন নিয়ে আসা সম্ভব।


সঞ্জীব দ্রং

সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম

এবার যে জনশুমারি হবে সেখানে যে ফরম্যাটটা দেয়া হয়, এ ফরম্যাটে আপনারা দেখবেন শেষের দিকে একটা কলাম রাখা হয়েছে, সেখানে সরকার স্বীকৃত আদিবাসী ৫০টি সম্প্রদায়ের কোড নাম্বার দেয়া হয়েছে এবং এর বাইরেও অন্যান্য নামে একটা বক্স রয়েছে। তার মানে এবার যে জনশুমারি হবে তাতে ৫০টি জাতির তথ্য আসার কথা। তাই লোকগণনা যখন হবে তখন যেন আদিবাসী অঞ্চলগুলোতে আদিবাসী স্বেচ্ছাসেবক বা তথ্য সংগ্রহকারী কিংবা মাঠ কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। অতীতে কিছু কিছু জায়গায় বড় ধরনের ভুল হয়েছে। ভুলগুলো যদিও ইচ্ছাকৃত নয়। যেমন ১৯৯১ সালে রাজশাহী অঞ্চলের জন্য বারোশর মতো খাসিয়া রয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমরা সেখানে খোঁজ নিয়ে কোনো খাসিয়া জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি পাইনি। আবার ২০০১ সালে নওগাঁসহ উত্তরবঙ্গে ২৪ হাজার চাকমা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল। এ ধরনের ভুল এখন হবে না। আমরা আশা করছি, এ বছরের আদমশুমারিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঠিক তথ্যগুলো থাকবে। কিন্তু পরিসংখ্যান ব্যুরোয় আলোচনা করে যে বিষয়টা জেনেছি, তা হচ্ছে সেখানে শুধু আদিবাসীদের সংখ্যাগত তথ্যগুলো থাকবে, কিন্তু এখানে জানা যাবে না, গারোদের শিক্ষার হার কত কিংবা তাদের স্বাস্থ্যের কী অবস্থা অথবা খাসিয়াদের মাতৃমৃত্যু কত, মণিপুরিদের শিশুমৃত্যুর হার কত, তাদের বেকারত্বের হার, অর্থনৈতিক অবস্থার তথ্য এখানে পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ এ ধরনের বিভাজিত তথ্য এ জনশুমারিতে পাওয়া যাবে না। আদিবাসীদের জন্য একটা বিশেষ জনশুমারি হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া শুধু আদিবাসী অঞ্চল নয়, জেলা পর্যায়ের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষকে যুক্ত করা হয়। মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৪১টি মাতৃভাষা রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি হচ্ছে আদিবাসীদের। এটিকে আমাদের উদযাপন করতে হবে এবং স্বীকৃতি দিতে হবে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হওয়ার পর ১৯৫৯ সালে অর্থাৎ ১২ বছরের মাথায় জহরলাল নেহরু এবং তার সভাসদেরা একটা ট্রাইবল পলিসি গ্রহণ করেছিলেন। সেখানে পাঁচটি নীতির কথা বলা হয়েছে। আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে পথ চলতে চাই। আমার মনে হয়, স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে বাংলাদেশের আদিবাসীদের জন্য একটি আদিবাসী নীতি হওয়া জরুরি।


শামসুল হুদা

নির্বাহী পরিচালক

এএলআরডি

তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির এ যুগেও তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমরা সময়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছি। আমরা হয়তো উন্নয়নের অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়েছি, কিন্তু এক্ষেত্রে এখনো অনেক পেছনে আছি। আমি এক্ষেত্রে অগ্রগতি আশা করব। আসন্ন জনশুমারিতে আদিবাসীদের বিভাজিত তথ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিসংখ্যানের সন্নিবেশ তো চাই। পাশাপাশি সার্বিক তথ্য ব্যবস্থাপনায়ও উন্নতি ঘটাতে পারে। আমি যেহেতু ভূমি নিয়ে কাজ করি, সেহেতু এ-সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক একটা তথ্য দিই। যেমন আমাদের দেশে নদীভাঙন একটা বড় সমস্যা। সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে নদীভাঙনের বছরওয়ারি পরিসংখ্যান চাইলে আমরা পাব না। ভূমিহীনের সংখ্যা এ বছর যা আছে, তা হয়তো আগামী বছর বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু হালনাগাদ এ পরিসংখ্যান আমরা কোথাও পাব না। হয়তো কৃষিসম্পর্কিত কিছু তথ্য আমরা কৃষিশুমারি থেকে পাই। অথচ গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্যই পাই না এবং নিয়মিত পাই না। এসব পরিসংখ্যান নির্দিষ্ট সময়ে সংগ্রহ করা হয়, সবসময় করা হয় না। এ সমস্যা দূর করতে আমাদের এমন একটা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে সব হালাগাদ তথ্য সহজেই পেতে পারি। সেটা এক বছর, ছয় মাস, তিন মাস কিংবা কিছু তথ্য এক মাসেরও হতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) যথেষ্ট ক্ষমতায়িত নয়। লোকবলের দিক থেকে অনেক দুর্বল, অর্থবলের দিক থেকেও নাজুক। দ্বিতীয়ত, আমরা এসডিজির কথা বলছি। এসডিজি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আমরা অনেক মতবিনিময় সভা করেছি। সেসব সভায় সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এমডিজি বাস্তবায়নে আমাদের সুনাম আছে, এসডিজির ক্ষেত্রে এ সুনাম যাতে আরো বাড়ে সেজন্য আমরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছি। এসডিজির লক্ষ্যগুলো টেকসইভাবে অর্জন করতে হলে আমাদের অবশ্যই বিভাজিত তথ্য দরকার। এ বিভাজিত তথ্য ছাড়া আমরা উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন করতে পারব না। কাজেই নারী, আদিবাসী, কৃষিসহ সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, এক্ষেত্রে বাড়াতে হবে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। তৃতীয়ত, আদিবাসীদের এলাকায় জনশুমারির সময় আদিবাসীদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি রাখার যে দাবি করা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে সরকার তাদের বেতন দিতে পারে। পাশাপাশি আমরা যারা বেসরকারিভাবে আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করছি, তারা এ কাজে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ দিতে পারি। এতে সরকারের ওপর থেকে চাপ কমবে এবং আদিবাসীদের তথ্যগুলো সঠিকভাবে উঠে আসবে।


পল্লব চাকমা

নির্বাহী পরিচালক

কাপেং ফাউন্ডেশন

অনেক কারণে আমাদের আদিবাসীদের বিভাজিত তথ্য দরকার। আমরা যদি এসডিজি অর্জন, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় নিয়ে আসতে চাই, তাহলে এসব জনগোষ্ঠীর বিভাজিত তথ্য অবশ্যই সংগ্রহ করতে হবে। বিভাজিত তথ্য না থাকলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা সমতলের আদিবাসীকে প্রাধান্য দেব, নাকি পাবর্ত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের প্রাধান্য দেব, নাকি অন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দেব তা যথাযথভাবে ঠিক করতে পারব না। আমরা জানি, বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসীদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই হলো সমতলের আদিবাসী। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের ধারণা যে পার্বত্য চট্টগ্রামেই অধিকাংশ আদিবাসী বাস করে। আসলে সমতলেই বেশি সংখ্যায় আদিবাসী বাস করে এবং আদের আর্থসামাজিক অবস্থা আরো বেশি খারাপ। এ সমতলের আদিবাসীদের জন্য আমরা যদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করি, তাহলে তাদের সম্পর্কে আমাদের অনুপুঙ্খ তথ্য থাকা বাঞ্ছনীয়। সমতলের আদিবাসীরা যাতে জনগণনা থেকে বাদ পড়ে না যায়, সেজন্য গুরুত্ব দেয়া দরকার।



হ্লা চিং নু 

নির্বাহী পরিচালক বিএনকেএস, বান্দরবান

আমরা দেখেছি, যখনই জনশুমারি হয় তখন আমাদের দেশে, বিশেষ করে পার্বত্য এলাকায় অনেক ফাঁকি দেয়া হয়। যেসব পাড়া বা গ্রাম একটু দুর্গম, সেখানে দেখা যায় কোনো একটা বাজারে তথ্য সংগ্রহকারীরা বসেন। নামগুলো হেডম্যান বা পরিচিত মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে অনেক ভুল তথ্য ও মিথ্যা তথ্য উঠে আসে। এবার জনশুমারির তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আদিবাসী স্বেচ্ছাসেবীদের সম্পৃক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। এটা শুভ উদ্যোগ। পাশাপাশি স্থানীয় সংস্থাগুলোকেও সম্পৃক্ত করা জরুরি। আমরা জানি যে সরকারের লোকবল সংকট আছে। সেক্ষেত্রে এনজিওগুলো, স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে যুক্ত করলে কাজটি সহজ ও দ্রুত বেগবান হবে। আরেকটি বিষয়ে জোর দিতে বলব। সেটি হলো নারী উন্নয়ন।

সেখানকার নারীরা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সম্পত্তির অধিকার চর্চা করতে পারছে না। এসব ক্ষেত্রে তারা বঞ্চিত। বহুমাত্রিক এসব তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। নইলে সার্বিক অবস্থা প্রতিফলিত হবে না।

 


কৃষ্ণপদ মুন্ডা

নির্বাহী পরিচালক, সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থা সাতক্ষীরা

আমরা বর্তমানে ডিজিটাল সময়ে রয়েছি। কিন্তু উপজেলা-জেলা বাতায়নগুলোতে এখনো ভুল তথ্য দেয়া আছে। সেখানে হালনাগাদ কোনো তথ্য নেই। আমাদের সাতক্ষীরা জেলার বাতায়নে মুন্ডা, মাহাতো, ওরাওঁ, রাজবংশী, ভগবেনীমসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নাম আছে। কিন্তু তাদের সংখ্যাটা আবার নেই। আমি দেখেছি মুন্ডাদের তথ্য কিছুটা আছে। অন্য আদিবাসীদের তথ্য উপজেলা-জেলা বাতায়নে সেভাবে উঠে আসেনি। এটা আমাদের বড় ঘাটতি। কারণ জনশুমারির রিপোর্ট সবাই পায় না বা সব জায়গায় পৌঁছে না। কিন্তু মানুষ এখন উপজেলা-জেলা তথ্য বাতায়নে ক্লিক করে জানার চেষ্টা করে সুনির্দিষ্ট জেলা বা উপজেলার অবস্থা কেমন। অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং খানা জরিপ কিংবা বসবাসকারী জনগোষ্ঠী সম্পর্কে। এসব তথ্য সবসময়ই হালনাগাদ রাখা দরকার। পেশাগত জায়গাটিও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। দেখা যায়, খানা জরিপ আছে এমন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গড়ে কৃষক ও শ্রমজীবী পেশাটা দিয়ে দেয়া হয়। আমার মনে হয় যারা খানা জরিপ বা বিভিন্ন জরিপের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া উচিত। ভাষা সম্পর্কেও ধারণা দেয়া দরকার।

 


বিভূতী ভূষণ মাহাতো 

কেন্দ্রীয় সদস্য, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ

রাজশাহী

আলোচনাটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমি কয়েকটি বিষয় তুলে ধরছি। আসলে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হলে প্রয়োজন সঠিক পরিসংখ্যান। এটা ছাড়া পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কখনই সম্ভব হয় না। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তাদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য না থাকলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। আমরা উত্তরবঙ্গে কাজ করি। সেখানে দেখেছি আমাদের অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের নৃগোষ্ঠী তালিকা থেকে বাদ রয়ে গেছে। সংখ্যার ক্ষেত্রেও অনেক পার্থক্য রয়েছে। সেজন্য আমরা চাই আগামী শুমারিতে যেন আদিবাসীদের সঠিক তথ্য উঠে আসে। 

 



হরি পূর্ণা ত্রিপুরা 

আদিবাসী অধিকার কর্মী

তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ২৫টি তথ্যসংবলিত একটি ফর্ম আছে। এবার সেখানে এথনিসিটি যোগ করে ২৬টি তথ্য সংযোজন করা হয়েছে। কাজেই এথনিসিটির তথ্যে জনগোষ্ঠীর নাম এবং অন্য তথ্যে আর্থসামাজিক অবস্থা উঠে আসবে, তা মূল রিপোর্টে নিয়ে আসা যায়। সেখানে শুধু আদিবাসীদের সংখ্যা আসবে, অন্যান্য তথ্য আসবে না, আমি এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। দ্বিতীয়ত, আরেকটি বিষয় আছে সেটি হলো লং সার্ভে ফরম। সেখানে ৮১টি তথ্য সংগ্রহ করা হয়। নিশ্চয়ই এবারের যে ফর্ম হবে, তাতেও এ রকম তথ্য থাকবে। সেখানেও আদিবাসীদের শনাক্ত করা, তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা চিহ্নিত করা সম্ভব।

 





ফজলে হোসেন বাদশা, এমপি

আহ্বায়ক, আদিবাসীবিষয়ক সংসদীয় ককাস

উপস্থাপিত পাঁচটি দাবিনামার মধ্যে ৪ ও ৫ নং দাবি জরিপের পদ্ধতিগত প্রশ্নগুলোর প্রতিফলন ঘটেছে। এ দুটি দাবি জরিপকাজে নিয়োজিত কর্মী বাহিনীর দক্ষতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দাবিনামা। যেসব এলাকায় আদিবাসী জনবসতি আছে, সেখানে যারা জরিপ করবেন তাদের একটা বিশেষ প্রশিক্ষণ দরকার। ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা যে সরকার নির্ধারণ করেছে অন্তত তাদের চিহ্নিত করতে পারে, সেই দক্ষতা জরিপকারীদের থাকা দরকার। এক্ষেত্রে অনেকে বলেছে সহায়তা করবে। অনেকে সহায়তা করতে পারে। আমার মনে হয় এ দুটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে লোকবল দিয়ে কাজ করানো হবে, তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আমার মনে হয়, আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলো এক্ষেত্রে সরকারকে সহায়তা করলে কাজটি সহজ হবে। আরেকটি বিষয় হলো ইউনিয়ন পরিষদ। ইউনিয়ন পরিষদেও কিন্তু একটা সুযোগ আছে। যেসব এলাকায় আদিবাসীরা আছে তাদের সমস্যা, সংকট দেখাশোনার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে একটি বিশেষ কমিটি করার বিধি রয়েছে। কিন্তু আমরা দেখি, কোনো ইউনিয়ন পরিষদ কাজটি করে না। তারা সবসময় এসব সমস্যা এড়িয়ে যায়। আদমশুমারির আগে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদকে যেসব এলাকায় আদিবাসীরা আছে, সেখানে বিশেষ কমিটি করে তাদের দ্বারা এলাকাগুলো চিহ্নিত করি, তাহলে কাজটি সহজ হবে। আদমশুমারির উদ্দেশ্য, আদিবাসীদের সংখ্যা, ভাষা, আর্থসামাজিক অবস্থা, সমস্যা-সংকট জেনে আমরা সেসব সমাধানে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারি। নিম্ন আদালতের অনেক বিচারকেরই ৫০টি স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। যথাযথ জ্ঞান না থাকলে রায় যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের পক্ষে যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কাজেই বিচারকদেরও একটা প্রশিক্ষণ দরকার। এটা হলে তাদেরও রায় দেয়ার ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়বে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি জনশুমারির মাধ্যমে আদিবাসীদের সংখ্যা ও সমস্যা-সংকট চিহ্নিত করতে পারি, তাহলে কাজ করা সহজ হবে। আদিবাসীদের জন্য আমরা কী উন্নয়ন চাই, আদিবাসীদের কীভাবে কাজে লাগাব এবং তাদের জীবনমান কীভাবে উন্নত হবে, এ বিষয়ে একটি বিল সংসদে জমা দিয়েছি। এটি পাস হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।


এমএ মান্নান, এমপি

মন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়

আজকের আলোচনার মূল বিষয় ছিল জনশুমারির বিষয়টি।  বিষয়টির গুরুত্ব সীমাহীন। ১০ বছর পরপর এটি করা হয়। এখন নতুন করে আরেকটি জনশুমারি করা হবে। এরই মধ্যে এটি আমাদের সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কভিডের কারণে জানুয়ারিতে আমরা জনশুমারি শুরু করতে পারিনি। অক্টোবর থেকে শুরু করব ঠিক করেছি। পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা নামে একটি সরকারি বিভাগই আছে। তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এটি পুরনো সরকারি অফিস। এর গুরুত্ব সচেতন নাগরিকমাত্রই জানেন।

জনমনে একটা সংশয় ছিল পরিসংখ্যানের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে। অনেকেই সন্দেহও করতেন যে আদৌ এসব সত্য কিনা। এখন সন্দেহের পর্যায় পার হয়ে এসেছি। কারণ দেখা যাচ্ছে, সংখ্যাগুলোকে ব্যাকওয়ার্ড টেস্ট করে প্রতিষ্ঠা করা যায়। যেমন মাথাপিছু আয়। হয়তো একজনের আছে ২ হাজার ২০০ ডলার, অন্যের হয়তো আছে ৫ হাজার ডলার। এখানে গড় করে এটা বের করা যায়। আর খরচের হার, জীবনযাত্রার মান নানা দিক থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পণ্ডিতেরা বলেন যে বিবিএসের পরিসংখ্যানগুলো গ্রহণযোগ্য। এটা একটা বিশাল কৃতিত্বের ব্যাপার এবং এতে আমরা খুব আনন্দবোধ করি। আমি নিয়মিতভাবে আশ্বস্ত করছি যে যারা কাজ করছেন তারা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন সঠিক তথ্যের সন্নিবেশ ঘটাতে। তাদের মধ্যে একটা অহংবোধ এসেছে যে তারা ভালো কাজ করছেন। সরকারপ্রধান নানা উৎসাহ দিচ্ছেন। এখন কাজটি তো করতে হবে। তারা একা পারবেন না। আমাদের সবারই সাহায্য-সহযোগিতা প্রয়োজন।

যেকোনো পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে গেলে সবার আগে জনশুমারি আমাদের সামনে থাকতে হবে। এক্ষেত্রে যে কথাটি ঘুরেফিরে সবাই বলেছেন, যে জায়গায় জনশুমারি হবে, সে জায়গার লোকজন যেন তা করে। স্থানীয়দের জনশুমারির কাজে নিয়োগ দিতে পারলে ভালো হবে। আদিবাসীদের সংজ্ঞা নিয়ে একটি জটিলতা আছে। সেটি নিয়ে আমরা কাজ করছি। সরকার কাজ বন্ধ রাখার পক্ষে নয়। সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে কাজ বন্ধ রাখলে জটিলতা বাড়বে। আমরা প্রতিটি জনগোষ্ঠী ও সংস্কৃতিকে সমান গুরুত্ব দিই। পাশাপাশি আদিবাসীরা যাতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কভিডের টিকা পায়, এ দাবি আমি সরকারের কাছে উপস্থাপন করব।

 শ্রুতলিখন: হুমায়ুন কবির ও রুহিনা ফেরদৌস