২৯ মে ২০২১ তারিখে এএলআরডি, এইচডিআরসি ও বণিক বার্তার উদ্যোগে ‘গ্রামীণ নারী ও আদিবাসীদের প্রতি বৈষম্য রোধ এবং কৃষির সংস্কারে বাজেট বৃদ্ধির গুরুত্ব’ শীর্ষক একটি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে এ ক্রোড়পত্র।

 


দেওয়ান হানিফ মাহমুদ

সম্পাদক

বণিক বার্তা

আজকের আলোচনার বিষয় গ্রামীণ নারী ও আদিবাসীদের প্রতি বৈষম্য রোধ এবং কৃষির সংস্কারে বাজেট বৃদ্ধির গুরুত্ব। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ কভিডের আঘাতে আমাদের দেশে প্রান্তিক মানুষ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত গোছানো কোনো তথ্য নেই। তবে বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, দেশে এখন দারিদ্র্যের হার ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, নতুন করে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দরিদ্রের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। এর বেশির ভাগ অংশই গ্রামীণ নারী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। ২০১৮ সালে বিবিএসের জেন্ডার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, কর্মজীবী নারীদের একটা বড় অংশ কৃষি ও সেবা খাতে নিয়োজিত। কভিডে ব্যাপক মাত্রায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ মুহূর্তে একটি বড় কাজ হলো এসব মানুষকে অভিঘাত থেকে সুরক্ষা দেয়া। সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষদের জন্য একটি সুরক্ষার বেড়াজাল তৈরি করে তাদের রক্ষা করা জরুরি। তাদের নগদ সহায়তা দেয়া, ভবিষ্যতে তাদের ক্ষমতায়নের জন্য বাজেট কী করতে পারে, তা নিয়ে সম্মানিত আলোচকরা আরো গভীরভাবে আলোকপাত করবেন বলে আশা করছি।


রওশন জাহান মনি

উপনির্বাহী পরিচালক

এএলআরডি

এ আলোচনাই প্রথম নয়, এর আগে আমরা চারটি আঞ্চলিক সভা আয়োজন করেছিলাম। যেখানে তৃণমূলের মতামত তুলে আনার জন্য জনগণের পাশে থেকে যারা কাজ করেন—এনজিওকর্মী, উন্নয়নকর্মী ও সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে শিক্ষাবিদরাও উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই মিলে সুপারিশ দিয়েছেন। অনেকেই বলতে পারেন, মে মাসের শেষে আলোচনা কেন। এখন সুপারিশ দিয়ে তো তেমন লাভ নেই। কারণ জুনে বাজেট পেশ করা হবে। সেক্ষেত্রে এএলআরডি এইচডিআরসি-এর সহায়তায় তিন বছর ধরে বাজেটভিত্তিক এ ধরনের আলোচনার প্রক্রিয়া সচল রেখেছি। এর উদ্দেশ্য বাজেটে যেন তৃণমূলের মতামত উঠে আসে। সব ক্ষেত্র না ধরে আমরা প্রথমে আদিবাসীদের বাজেট, তারপর নারী এবং এবার যুক্ত হয়েছে ক্ষুদ্র কৃষি, যেগুলো এএলআরডির ম্যান্ডেট এবং সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন, বেঁচে থাকা ও প্রান্তিকতার ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়কে ধারণ করে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। আমাদের আলোচনার ফোকাসটি ছিল বাজেট বৃদ্ধি। এটা বাদ দিয়ে আমরা কথা বলতে চাই না। কিন্তু তার সঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে কিংবা সবার আগ্রহের জায়গা হলো— বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং তাদের কথা বলার জায়গাটি নিশ্চিত করা। যে প্রক্রিয়ায় জাতীয় বাজেটটি প্রণীত এবং উপস্থাপিত হয়, তাতে অনেক কিছুই বাদ পড়ে যায়। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, এটি একটি জাতীয় বাজেট। কিন্তু জাতীয় তো আঞ্চলিককে বাদ দিয়ে নয়। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ছোট হলেও এর অনেক বহুমাত্রিকতা রয়েছে। কাজেই চারটি অঞ্চল থেকে উঠে এসেছে যে আমাদের এলাকায় তো বাজেট নিয়ে আলোচনা হয় না। এ আলোচনা সবখানে হওয়া দরকার। তাই আমরা বছরব্যাপী আলোচনাটি চলমান রাখার চেষ্টা করব। বাজেট এল। এটি কীভাবে খরচ হচ্ছে, কোথায় হচ্ছে, খাতওয়ারি বাজেট নিয়ে জোরেশোরে কথা হয়েছে। আজকের আলোচনায় উঠে আসা সুপাারিশ আমলে নিলে একটি জনমুখী, কৃষক, নারী ও প্রান্তজনবান্ধব বাজেট প্রণীত হবে। বৃহত্তর কল্যাণ নিশ্চিত হবে।



ড. আবুল বারকাত

প্রধান উপদেষ্টা

এইচডিআরসি

সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

কভিড বিশ্ব অর্থনীতির চাকা শ্লথ করে দিয়েছে। আমাদের দেশের কৃষি, শিল্প, সেবা—এক কথায় প্রতিটি খাত-উপখাতেই করোনাজনিত লকডাউনের তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ। আগামী দিনগুলোয় করোনা আরো ভয়ংকর হলে এ শ্রেণীর মানুষের ক্ষতি আরো বাড়বে। গত এক বছরে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে দেড় থেকে দ্বিগুণ মানুষ। ফলে প্রান্তিক শ্রেণীর প্রতি বৈষম্য বেড়েছে।

বাংলাদেশে মোট শ্রমজীবীদের ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। তার মধ্যে কৃষি, শস্য, কৃষি, কুটির শিল্প, শাকসবজি, প্রাণিসম্পদ, মত্স্য সম্পদে যারা কাজ করেন, সবই অনানুষ্ঠানিক খাত। তারা অর্থনীতির প্রাণ। তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন। এখন নতুন দরিদ্র একটা বড় প্রপঞ্চ। গত বছরের মে মাসের হিসাবে ৬ কোটি ৮০ লাখ গরিব ছিল। এখন এক বছর পার হয়েছে। কাজেই তার সঙ্গে অন্তত তিন-চার কোটি যোগ হবে। 

আমাদের এ গবেষণায় তিনটি উদ্দেশ্য ছিল। প্রথম উদ্দেশ্য, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে খুদে পারিবারিক কৃষক, গ্রামীণ নারী ও আদিবাসী মানুষের জন্য বাজেট বরাদ্দ পর্যালোচনা। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে সেবা প্রদানেচ্ছু ভূমি প্রশাসন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠায় অর্থাৎ কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ আছে কিনা এবং যা-ও আছে তা বাস্তবায়ন হয় কিনা খতিয়ে দেখা।

তৃতীয়ত, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট খাতগুলোয় করোনা মহামারী উদ্ভূত পরিবর্তিত বাস্তবতায় যুক্তিসংগত বাজেট বরাদ্দের জন্য করণীয় নির্ধারণ এবং বরাদ্দ কত হওয়া উচিত।

দুই-তৃতীয়াংশ (৭২ শতাংশ) খুদে পারিবারিক কৃষক উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পান না। বাজেট বক্তৃতায় পারিবারিক কৃষি কীভাবে আছে। প্রথমত, উন্নয়ন নীতিমালায় পারিবারিক কৃষির বিষয়টিই অস্বীকৃত। স্বীকৃতি না থাকলে অর্থমন্ত্রী যে-ই হোন না কেন, পারিবারিক কৃষি সম্পর্কে বাজেট বক্তৃতায় বলার খুব একটা সুযোগ নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে তা পারিবারিক কৃষির জন্য হতো সুখবর। কিন্তু মাঠ গবেষণায় আমরা  দেখেছি, কভিড-১৯ মহামারীজনিত লকডাউনের সময় এবং পরবর্তী সময়ে কৃষি উপকরণ সরবরাহের ঘাটতি ও উচ্চমূল্যের কারণে অনেক প্রান্তিক কৃষক স্বাভাবিক চাষাবাদেও সক্ষম হয়নি। বাজেট বক্তৃতায় বিবৃত রাসায়নিক সারের বিক্রয়মূল্য অপরিবর্তিত রাখা, জলবায়ু পরিবর্তনে সহনশীল বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন অব্যাহত রাখা, শস্যের বহুমুখীকরণ, ফসলের সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমানো, কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং সর্বোপরি কৃষি ভর্তুকি বাবদ ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা—প্রতিটি পদক্ষেপ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পারিবারিক কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বিপুলসংখ্যক দরিদ্র খুদে কৃষি খানাকে সহায়তা করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পারিবারিক কৃষিতে নিয়োজিত অধিকাংশ কৃষক বাজেট বক্তৃতায় প্রতিশ্রুত বিভিন্ন সহায়তার বাইরে।

গ্রামীণ নারী ও বাজেট: গ্রামীণ নারীর সংখ্যা ৫ কোটি ৩০ লাখ। গ্রামীণ নারীর বড় অংশই প্রান্তিক, দরিদ্র ও ভূমিহীন। নভেল করোনাভাইরাস ও লকডাউন নারীর এই প্রান্তিকতা গভীরতর করেছে। নিম্ন মজুরি ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ভুগতে থাকা যুব নারী কর্মীরাই মহামারীতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নারী দিনমজুরদের বড় অংশ কর্মহীন হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটিয়েছেন এবং কাটাচ্ছেন। গ্রামের ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারা পড়েছেন মহাবিপাকে—দীর্ঘ লকডাউনে তাদের আয়ের পথ রুদ্ধ।

নারীর ক্ষমতায়নে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘তথ্য আপা’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ চালু আছে। তবে অধিকাংশ গ্রামীণ নারীই ‘তথ্য আপা’র দেখা-সাক্ষাৎ পাননি। নির্যাতনের শিকার নারীদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। নির্যাতিত দরিদ্র গ্রামীণ নারীদের কাছে এ উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

আদিবাসী মানুষ ও জাতীয় বাজেট: আদিবাসী মানুষ—মানবসত্তার মর্যাদা ও মানব উন্নয়নের সম্ভাব্য সব মাপকাঠিতেই অতি দরিদ্র-অতি প্রান্তিক-বহিঃস্থ মানুষ। করোনার আগে যখন জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৮ শতাংশ, তখন আদিবাসী অধ্যুষিত জেলাগুলোয় তা ছিল ৬০ শতাংশের ওপরে।

আদিবাসী মানুষের গড় আয় জাতীয় গড় থেকে কম। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে তাই ২৬ শতাংশ কম, সমতলের ক্ষেত্রে ৪১ শতাংশ কম। সমতলের দুই-ততীয়াংশ আদিবাসী মানুষ কার্যত ভূমিহীন। পার্বত্য আদিবাসী মানুষের ভূমি অধিকার বলে তেমন কিছুই নেই। বনভূমি-কৃষি জমি-জলাভূমির নির্বিচার অধিগ্রহণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এমনিতেই আদিবাসী মানুষের জীবন ও জীবিকা সংকটাপন্ন, যা করোনাকালে বহু গুণিতক বেড়েছে।

কর্মহীনতা, মজুরিস্বল্পতা, উৎপাদিত পণ্যের মূল্য না পাওয়া, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা—এসব আদিবাসী মানুষের দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে তীব্রতর করেছে। দারিদ্র্যের হার ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। কাজেই তাদের জীবনমান উন্নয়নে বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার ও জাতীয় বাজেট: ভূমি সংস্কার হলো ক্ষুদ্রার্থের কৃষি সংস্কারের অনুষঙ্গ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে ১৯৭০-এর শুরুর দিকে কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার অপরিহার্য উন্নয়ন কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতো। ১৯৭২ সালে আজকের ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রথম নামকরণ করা হয়েছিল ‘ভূমি প্রশাসন এবং ভূমি সংস্কার মন্ত্রণালয়’। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে পরিকল্পিতভাবেই হত্যা করা হয়, যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারসহ গণমুখী-বহুমুখী কৃষকের যৌথ উদ্যোগের সমবায় ধারণা নিশ্চিহ্ন করা। আশির দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের নামের সঙ্গে ‘ভূমি সংস্কার’ শব্দ যুগল ছিল। ১৯৮৭ সালের ১ মার্চ ‘ভূমি সংস্কার শব্দ ঝেড়ে ফেলে মন্ত্রণালয় বর্তমান নাম ধারণ করে। নামের এ বিলুপ্তির মর্মার্থ হলো—উন্নয়নের নীতি-কৌশল হিসেবেই ভূমি সংস্কারকে চির নির্বাসনে দেয়া। নব্বইয়ের দশকের নব্য উদারবাদী নীতি কাঠামো/মতাদর্শে কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার বিষয়টি অ্যান্টি পাবলিক পলিসিতে রূপান্তরিত হয়। এ অবস্থায় যেসব মুক্তবাজারের বাজার অর্থনীতিবিদ আর সামাজিক বিজ্ঞানী এতদিন উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের অনস্বীকার্যতা স্বীকার করতেন, তারা ভোল পাল্টে বলা শুরু করলেন, ‘পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে এখন কৃষি ও কৃষক ভাবনা অবান্তর’, ‘সময়ের দাম আছে—এসব নিয়ে সময় নষ্ট করে লাভ নেই’, ‘ব্যবসা করো—মুক্ত বাজার খুলে দাও’, ‘ব্যক্তি খাত আর মুক্ত বাণিজ্য সব রোগের মহৌষধ’। তারা বলা শুরু করলেন, ‘হ্যান্ডস নট ল্যান্ড’।

কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার জরুরি—যেমন বৈষম্য হ্রাসসহ গণমানুষের জীবন সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য, তেমনি পশ্চাত্মুখী আর্থসামাজিক প্রবণতা থেকে বেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ‘সোনার বাংলা’ বিনির্মাণে। আসন্ন বাজেটে এজন্য লক্ষণীয় বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

পারিবারিক কৃষির জন্য সুপারিশ: এক. পারিবারিক কৃষিকে স্বীকৃতি দিতে হবে। আর স্বীকৃতির বাস্তবায়নে যথাযথ বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে; দুই. বাজেটে পারিবারিক কৃষির সঙ্গে জড়িত প্রান্তিক কৃষক এবং বর্গাচাষীদের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে; তিন. প্রান্তিক কৃষকের জন্য ভর্তুকি মূল্যে প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণে বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে এবং সঠিকভাবে বাধাহীন প্রাপ্তির ব্যবস্থা করতে হবে; চার. প্রান্তিক ও খুদে কৃষকদের বিনা সুদে অথবা সহজ শর্তে স্বল্প সুদে কৃষিঋণ প্রদানের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে; পাঁচ. যেকোনো দুর্যোগে ফসলের ক্ষতি হলে কৃষককে দ্রুত এবং সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য বরাদ্দ রাখা জরুরি; ছয়. কৃষকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বীমা—আবাসন, শস্য, গবাদিপশু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বীমা চালুর জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। সাত. কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে; আট. কভিড-১৯-এর অপরিমেয় ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে কৃষি ব্যবস্থা উজ্জীবিত করতে সরকারকে মধ্যস্বত্বভোগীদের পরিত্যাগ করে প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ফসল ক্রয় করতে হবে।

করোনা সংকট এবং সম্ভাব্য খাদ্য সংকটের কথা মাথায় রেখে সরকারি শস্য ক্রয়ের পরিমাণ এখনকার তুলনায় কমপক্ষে তিনগুণ বৃদ্ধি করা জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারি গুদামের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সরকারি নতুন গুদাম নির্মাণ এবং একই সঙ্গে বেসরকারি গুদাম ভাড়ায় নিতে হবে; নয়. আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ পারিবারিক শস্য কৃষি খানার সদস্যদের জন্য মোট উন্নয়ন বরাদ্দ হওয়া উচিত অন্তত ১ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা (যা প্রস্তাব অপেক্ষমাণ মোট উন্নয়ন বরাদ্দের ৭৫%)।

গ্রামীণ নারীর জন্য সুপারিশ: এক. যেসব প্রান্তিক গ্রামীণ ভূমিহীন, খামারি, কুটির শিল্প এবং ক্ষুদ্র অকৃষি কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত নারী কভিড-১৯ সংকটের শিকার হয়ে দুরবস্থায় রয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে। দুই. নারী কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন ও স্বীকৃতি এবং তাদের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করতে হবে। তিন. কৃষি ক্ষেত্রে গৃহীত প্রকল্পগুলোয় নারীর জন্য সুনির্দিষ্ট কোটা রাখতে হবে। চার. গ্রামীণ নারী যাতে খামার ও খামারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের জন্য দ্রুত এবং ঝামেলাহীনভাবে ঋণ পেতে পারেন, তার জন্য পৃথক বাজেটীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। পাঁচ. নারী-কৃষক ও নারী কৃষি শ্রমিকদের উৎপাদিত পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিপণনের জন্য জয়িতা নামের বিপণন কেন্দ্রের মতো প্রকল্প বেশি করে নিতে হবে। ছয়. বাজেটে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা/ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট ও কর মওকুফের ব্যবস্থা করতে হবে এবং নবায়ন ফি কমাতে হবে। সাত. সব নারী-কৃষকের জন্য কৃষি বীমা এবং সব প্রান্তিক গ্রামীণ নারীর জন্য স্বাস্থ্য বীমার জন্য বাজেটে যথেষ্ট বরাদ্দ রাখতে হবে। আট. আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ৫ কোটি ৩০ লাখ গ্রামীণ নারীর জন্য মোট উন্নয়ন বরাদ্দ হওয়া উচিত অন্তত ১ লাখ ৫১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা (যা প্রস্তাব-অপেক্ষমাণ মোট উন্নয়ন বরাদ্দের ৬৪ শতাংশ)।

আদিবাসী নারীর জন্য সুপারিশ: এক. আদিবাসী মানুষের গোষ্ঠী সংখ্যা এবং তাদের জনসংখ্যা নিয়ে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। আসন্ন আদমশুমারিতে আদিবাসী মানুষের গোষ্ঠীভিত্তিক সঠিক জন-গণনা নিশ্চিত করতে বাজেটে বরাদ্দ দিতে হবে। দুই. আদিবাসী মানুষের জন্য বাজেটে সংশ্লিষ্ট সব খাত-উপখাতভিত্তিক লাইন আইটেমসহ বরাদ্দ প্রদান করতে হবে; ‘পার্বত্য’ ও ‘সমতল’ এলাকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য খাত-উপখাতভিত্তিক যুক্তিসংগত বরাদ্দ দিতে হবে। তিন. আদিবাসী শিশুদের নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় পাঠ্যবই, উপকরণ, হোস্টেলসহ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ সম্পর্কে বাজেটে যথেষ্ট পরিমাণে বরাদ্দ রাখতে হবে। চার. আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে আদিবাসী মানুষের জন্য যৌক্তিক উন্নয়ন বরাদ্দ হওয়া উচিত ১২ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা (যা প্রস্তাব অপেক্ষমাণ উন্নয়ন বরাদ্দের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ)।

কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার সুপারিশ : এক. কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার সংশ্লিষ্ট সব বৃহৎ বর্গের খাত-উপখাতকে বাজেটে ভিন্ন লাইন আইটেম হিসেবে বরাদ্দসহ দেখাতে হবে; দুই. কৃষি-ভূমি-জলা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যাবলি তদারক করতে মনিটরিং সেল গঠন এবং তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে; তিন. আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরে কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার সংশ্লিষ্ট বাজেট হওয়া উচিত ন্যূনতম ১৬ হাজার কোটি টাকা।

অন্যান্য সুপারিশ : এক. করোনাকালীন দুর্যোগ বিবেচনায় স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ যৌক্তিক পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে;

দুই. করোনা সংকট মোকাবেলায় শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে খাতটিকে ঢেলে সাজানোর সুযোগ কাজে লাগাতে হবে; তিন. প্রকৃত মত্স্যজীবীদের জলমহাল ইজারা নিতে লিজের টাকার পরিমাণ কমাতে হবে;

চার. প্রকৃত মত্স্যজীবীদের বিনা সুদে বা সহজ শর্তে স্বল্প সুদে ব্যাংকঋণ প্রদানে বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে; পাঁচ. বাজেটের লাইন আইটেম নির্ধারণ, বরাদ্দ প্রদান, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণে সক্রিয় জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সংস্কার এবং তা বাস্তবায়নে বরাদ্দ দিতে হবে।

স্বাভাবিক সময়ের বাজেটেও দেখা গেছে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি ন্যায্য বরাদ্দ দেয়া হয় না। মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রভাব-প্রতিপত্তি কম এবং তাদের অধিকার আদায়ের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ, এ কারণেই গত ৫০ বছরে ঘোষিত বাজেটগুলোয় তাদের জন্য ন্যায্য বরাদ্দ রাখা হয়নি।

 


ড. নাজনীন আহমেদ

সিনিয়র রিসার্চ ফেলো

বিআইডিএস

প্রতিটি খাতে কোন ধরনের কর্মসূচি নেয়া দরকার, আমার মনে হয়, সেটি অনেক জরুরি। কারণ মোট উন্নয়ন বাজেটের ৬৪ শতাংশ গ্রামীণ নারীর জন্য দিতে হবে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কোথায় দিতে হবে, কোন কর্মসূচিতে, কিসের জন্য। সেটি চিহ্নিত করা জরুরি। আমি যেহেতু শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে কাজ করি, সেহেতু ২০১৮ সালে একটি কাজে দক্ষিণাঞ্চলে কৃষিতে নারীর অবস্থা সরেজমিনে বেশ অনেক দিন দেখে এসেছি। সেখানে নতুন ধরনের অনেক কৃষি হচ্ছে। সূর্যমুখীর চাষ হচ্ছে, ভুট্টার চাষ হচ্ছে, সেগুলোয় নারীরা অংশ নিচ্ছেন। সেখানে গিয়ে দেখেছি সাপ্লাই চেইনে বাজারের তথ্যের জন্য নারীরা পুরুষ সদস্যদের ওপর নির্ভর করেন। একটা সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা আছে, বীজ-সার এসব যদি বাজার থেকে কিনতে হয়, তাহলে সেখানে নারীরা অংশগ্রহণ করেন না। সেখানে কিন্তু নারীকে জোর করে অর্থ বরাদ্দ দিলে লাভ হবে না; বরং সেখানে নারীর পণ্যগুলো নিয়ে যেতে হবে। দেখা যাচ্ছে, কাছাকাছি বাজার হলেও অনেক ক্ষেত্রে নারীরা  সেখানে যুক্ত হচ্ছেন না। যদিও বীজটা সংরক্ষণ করছেন কিন্তু নারী। অথচ সেই বীজটা বিক্রির প্রশ্ন এলেই যুক্ত হচ্ছেন পুরুষ সদস্যরা। সেই জায়গা থেকে পরিমাণের চেয়ে কোন কর্মসূচিতে, কোথায় বরাদ্দ দেয়া হবে, তা জানাটা প্রথমত গুরুত্বপূর্ণ। আরো উপায় আছে, যেখানে প্রান্তিক কৃষককে আরো দক্ষভাবে বাজারে সুযোগ দিতে পারি। আরেকটি বিষয়, গ্রামীণ নারীকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে। শুধু কৃষি খাতের নারী নন, অকৃষি খাতের নারীকেও যুক্ত করতে হবে। বরাদ্দের চেয়ে বেশি দরকার গ্রামীণ নারীর দক্ষতা উন্নয়নে উদ্যোগ হাতে নেয়া। যুব উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নে অনেক নারী অংশ নিতে চান না। কারণ তার প্রশিক্ষক হচ্ছে একজন পুরুষ। এখানে টাকার চেয়ে পলিসি জরুরি। বাজেট বরাদ্দ নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কোন কর্মসূচির জন্য বাজেট বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে, তা আরো গুরুত্বপূর্ণ। এটা পারিবারিক কৃষি, গ্রামীণ নারী, আদিবাসী ও ভূমি-জলা সংস্কার সব ক্ষেত্রে সত্য। আগামী বাজেটে চাইব কভিডের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কৃষকদের যে প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছিল, তা যেন তাদের কাছে পৌঁছে। একই সঙ্গে এসএমই ফাউন্ডেশন, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, পিকেএসএফ, এনজিও ব্যুরোসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নের ক্ষেত্রে কভিডের পরিপ্রেক্ষিতে যেন নারীর প্রাধান্য থাকে, সেটি নিশ্চিত করা। সন্দেহ নেই, প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের জন্য বাজেটে বরাদ্দ বাড়ালে তারা অনেক লাভবান হবেন। আমরা দেখেছি, কৃষকরা সবসময় অবহেলিত থাকেন। বাজেটে কৃষকদের উন্নয়নে বরাদ্দ দেয়া হলে তাদের জীবনমানে পরিবর্তন আসার পাশাপাশি দেশও অনেক বেশি লাভবান হবে।


 

ড. সানজিদা আক্তার

সহযোগী অধ্যাপক

উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এখন আমাদের দেশে গ্রোথ এবং ডেভেলপমেন্ট এ প্রবণতা বেশি দেখতে পাই। শুধু অর্থনৈতিকভাবেই ওইদিকে যাচ্ছি তা কিন্তু নয়, কেন যেন আমার কাছে মনে হয়, আমরা সামাজিক, সাংস্কৃতিক দিক থেকেও গ্রোথ ডেভেলপমেন্টের দিকে বেশি নজর দিচ্ছি। অর্থনৈতিক দিক থেকে আমরা একটা উচ্চতর অসম অবস্থায় থাকতে পারি, এ রকম একটি প্রবণতা অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আচরণের মধ্যে দেখতে পাই। তার একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব আসলে পড়ছে নারীর ওপরে। কয়েক বছর ধরেই কৃষক হিসেবে, কৃষি শ্রমিক হিসেবে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে চলেছে। এর পেছনে অবশ্য নানা কারণও রয়েছে। যেমন নয়া উদারবাদী অর্থনীতিতে আমরা যখন ‘হ্যান্ডস নট ল্যান্ড’—এ পলিসিতে যাচ্ছি, তখন আসলে পুরুষরা বড় মাত্রায় বাজার অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে। সেজন্য অনেকটা বাধ্য হয়েও নারীরা বেশি মাত্রায় যুক্ত হয়ে পড়ছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে দেখা যায়, পারিবারিক বা বাণিজ্যিক কৃষিতে নারীদের অংশগ্রহণ যেভাবে বাড়ছে, ঠিক সেভাবে কিন্তু কৃষি ব্যবস্থা বা কৃষি পরিবেশ নারীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। কেননা তার প্রভাব বাজেটে অর্থ বরাদ্দ, জমি মালিকানায় পরিবর্তন, ঋণের অভিগম্যতা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, কৃষিসংক্রান্ত সুবিধাগুলো পাওয়া, প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রাপ্তি প্রভৃতি ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই না। বরং আমার কাছে মনে হয়, যদিও নারীর অংশগ্রহণটা বাড়ছে কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে পুরো কৃষি কাঠামো এখনো পুরুষতান্ত্রিক রয়ে গেছে। ফলে কৃষক হিসেবে আমরা যখন কাউকে চিন্তা করি তখন পুরুষের কথাই আমাদের মাথায় আসে। যেজন্য নীতিতে দেখা যায়, কৃষক হিসেবে শব্দটি থাকলেও যারা সেবা প্রদান করেন, তারা বলছেন যে আমরা কৃষকদের জন্য সেবা প্রদান করি, এখানে নারী-পুরুষ যে-ই হোন না কেন সেবা পাবেন। কিন্তু আমাদের কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতাগুলোর কারণে শুধু কৃষক এ পরিচয়ে নারী আসলে সেবাগুলো নিতে পারেন না। সেজন্য বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি নারী কৃষকদের জন্য আলাদা করে বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন।

গবেষণায় বারবারই উঠে আসে, নারীর জন্য যা-ই বরাদ্দ দেয়া হোক না কেন, তা তার কাছে পৌঁছায় না। সরকারি সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরকার একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাণ কৃষিপণ্য নারী কৃষকদের কাছ থেকে কিনতে পারে। তাদের পণ্য বিপণনের জন্য জয়িতার মতো আলাদা উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। তাহলে মনে হয় প্রান্তিকের মধ্যেও নারীর অবস্থা যে প্রান্তিক, সেখান থেকে খানিকটা উত্তরণ ঘটবে।


রানী য়েন য়েন 

মানবাধিকারকর্মী

উপদেষ্টা, চাকমা সার্কেল

রাঙ্গামাটি

আদিবাসীরা প্রান্তিকতার শিকার। তার মধ্যে আদিবাসী নারীরা আরো বেশি প্রান্তিক। প্রান্তিকতার যে বহু মাত্রা আছে, তা-ও আমরা জানি। গত দুই দশকে এ নিয়ে প্রচুর কথা হয়েছে। এ কথাগুলো চলমান রাখা জরুরি। সাধারণ-স্বাভাবিক সময়ে তো অবশ্যই। বিশেষ করে করোনা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আরো গুরুত্ব দিয়ে এ কথাগুলো বলা দরকার। কারণ মহামারীর মধ্যে আমরা দেখেছি যে যারা দরিদ্র তারা আরো দরিদ্রতর হয়েছে। আর যারা দারিদ্র্যসীমার ওপরে ছিলেন, তারা দরিদ্র হয়েছে। করোনার প্রভাবে আসলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি লিঙ্গ সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট যদি প্রণয়ন করা যায়, তাহলে সেটি প্রান্তিকতা নিরসনে অনেক বড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অধ্যাপক বারকাতের উপস্থাপনায় উঠে এসেছে খুদে কৃষক, পারিবারিক কৃষক ও গার্হস্থ্য কৃষকের কথা। কৃষিতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে নারীদের শ্রম ও অংশগ্রহণের এখনো স্বীকৃতি নেই। যদিও ২০১১ সালের জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিতে অঙ্গীকার করা হয়েছে যে জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর কৃষিশ্রমের স্বীকৃতি প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করা হবে। বিভিন্ন আদিবাসী জাতির দিকে তাকালে দেখা যায়, নারীরা কোনো না কোনোভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। সমতলের আদিবাসী যাদের অধিকাংশই ভূমিহীন, সেখানেও নারীরা কৃষিতে শ্রম দেন। পাহাড়ি আদিবাসীদের মধ্যে নারীরাও কৃষক। পুরুষরা এককভাবে ফসল ফলান না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়েও নারীরা বেশি শ্রম দেন। কিন্তু আদিবাসী নারী কৃষক বা শ্রমজীবী আদিবাসী নারীদের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে বাজেটে কখনো বরাদ্দ থাকে না। যদিও নারী উন্নয়ন নীতিতে মোটা দাগে প্রান্তিক ও আদিবাসী নারীদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এর বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। এ করোনাকালে কৃষিকাজে সম্পৃক্ত কম-বেশি সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে আদিবাসী নারীরা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সত্যি বলতে, আদিবাসী নারীরা কতটা বঞ্চিত, তা কল্পনাকেও হার মানায়। আমরা চাই নারীবান্ধব, কৃষিবান্ধব একটি বাজেট হোক।


সঞ্জীব দ্রং

সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম

প্রতি বছরই আমাদের জাতীয় বাজেটের পরিধি বাড়ছে। একদিন হয়তো ১০ লাখ কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যাবে আমাদের বাজেট। কিন্তু এ ক্রমবর্ধমান বাজেটের কোনো প্রতিফলন আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দূরে থাক, দরিদ্র সাধারণ বাঙালি জনগোষ্ঠীর জীবনেও পড়েনি। এবারের বাজেটে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ও তা যথাযথভাবে ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। আমি এর সঙ্গে একমত। পাশাপাশি এ টাকা কীভাবে ব্যয় হয়, তার জন্য একটা কমিশন গঠন বা মনিটরিং ম্যাকানিজম রাখা জরুরি। গত বছর মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল সমতলের আদিবাসীদের জন্য। গরু দেয়া হয়েছিল। গরু রাখার জন্য ফ্লোর ঢালাই করতে আড়াইশ করে ইট দেয়া হয়েছিল। গরু সরাসরি কিনে দেয়া হয়েছিল। যে ক্রয় প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। মানে বরাদ্দ রাখা হলো কিন্তু বরাদ্দের কোনো প্রক্রিয়ায় এ মানুষগুলোকে সুযোগই দেয়া হলো না। এটা দুঃখজনক। আমি মনে করি, এগুলো দেখার জন্য ভারতের মতো একটি জাতীয় আদিবাসী কমিশন গঠন করা যেতে পারে।

করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত কমপক্ষে এক লাখ আদিবাসী নারীকে প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন এবং তা সুনির্দিষ্ট করে বলে দিতে হবে। যেমন সরকার ৫০ লাখ পরিবারকে আড়াই হাজার করে টাকা দিয়েছে। এই ৫০ লাখের মধ্যে বলে দেয়া হোক তিন লাখ হবে আদিবাসী। এই করোনাকালে কমপক্ষে ২০ হাজার আদিবাসী নারীকে ছয় মাস থেকে এক বছরের জন্য খণ্ডকালীন চাকরি দেয়া হোক, যাতে তাদের পরিবার করোনাকালে অন্তত বাঁচতে পারে। বাজেট যতই বাড়ুক না কেন, সুনির্দিষ্ট করে আদিবাসী, প্রান্তিক মানুষের জন্য যেন বরাদ্দ রাখা হয়।


রাশেদ খান মেনন এমপি

সভাপতি, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

বাজেট প্রণয়নের বিষয়টি সবার জানা। একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে বাজেট প্রণয়ন করা হয়। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে কিছু থোক এনভেলাপ দিয়ে দেয়া হয়। তারা তাদের নিজস্ব বাজেট ঠিক করে।  সেখানে অগ্রাধিকারের বিষয়টি বড়ভাবে সামনে আসে না। গতানুগতিকভাবেই আসে। এবারের বাজেটও এর চেয়ে ব্যতিক্রম নয়। তবে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অন্ততপক্ষে একটা কাজ করেছিলেন। আর সেটি হলো, বাজেট প্রণয়নের আগে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে তিনি কথা বলতেন। এক্ষেত্রে তিনি বিশেষত সংসদের বিভিন্ন স্থায়ী কমিটির সভাপতিদের ডাকতেন, কথা বলতেন এবং আলোচনা করতেন। কিন্তু কভিড বা অন্য কোনো কারণে হোক স্থায়ী কমিটির সঙ্গে কিংবা সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলাদাভাবে, বিশেষ করে সরকারি হিসাব কমিটিসহ কারো সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে বলে আমার অন্তত জানা নেই। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে আমি অন্তত কোনো আমন্ত্রণ পাইনি। সুতরাং বাজেটটা কী হতে যাচ্ছে, সেটি আমার কাছে একটা প্রহেলিকা। একেবারে অবশ্য প্রহেলিকাও নয়। সবসময় একই বিষয় আমাদের সামনে হাজির হয়। শুধু হয়তো কিছু সংখ্যাগত পরিবর্তন হয়, জোরারোপ করার ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন হয়।

করোনাকালের দ্বিতীয় বাজেট হিসেবে ধারণা করেছিলাম, এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বেশি বরাদ্দ রাখা হবে। কিন্তু গণমাধ্যম থেকে জানতে পারলাম, গত বছরের চেয়ে স্বাস্থ্য খাতে বেশি বরাদ্দ দেয়া হবে না। এর কারণ হলো, চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তার পুরোটা খরচ হয়নি। এর মধ্যে গবেষণা খাতেই ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যার একটি পয়সাও খরচ হয়নি। এটিই বাস্তবতা। এবারে ৬ লাখ কোটি টাকার উপরের যে বাজেট আসবে, তার কত অংশ বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। সংশোধিত বাজেটের ক্ষেত্রেও আমরা দেখছি তা ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, আলোচনার সুযোগ আসলে কতখানি আছে। এখানে আমি কথা বলার অনেক সময় পেয়েছি কিন্তু সংসদে কথা বলার জন্য স্পিকার পর্যাপ্ত সময় দেন না। ২০ মিনিটের মধ্যেই কথা শেষ না করলে মাইক বন্ধ করে দেয়া হয়। আমাদের বাজেট আলোচনা শুধু বাজেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে থাকে রাজনীতি ও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ।

বাজেট যারা প্রণয়ন করেন, তাদের মাথায় নিজস্ব স্বার্থবুদ্ধিতা কাজ করে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের পর থেকে বণিক বা ব্যবসায়ীদের কথা মাথায় রেখে বাজেট প্রণয়ন হয়ে আসছে। কৃষক বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তো দূরের কথা, মাঝারি ব্যবসায়ীরাও করোনাকালের প্রণোদনা পাননি। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন বাজেটে গ্রামীণ নারী, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং কৃষি সংস্কারে বরাদ্দ বেশির বিষয়টি গুরুত্ব পাবে—এমন কথা আমি দিতে পারছি না। তবে সংসদে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চিত হওয়ার কথা আমি তুলে ধরব


শামসুল হুদা

নির্বাহী পরিচালক

এএলআরডি

আজকের আলোচনা অনেক প্রাণবন্ত হয়েছে। এটিকে বলা যেতে পারে একটি বহুমাত্রিক প্রেজেন্টেশন। এতে বাজেটের নানা উপেক্ষিত দিক তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো, বাজেট সম্পর্কে সাধারণ মানুষ যেন স্বচ্ছ ধারণা পায়। আমরা চেয়েছি গ্রামীণ নারী, আদিবাসী, পারিবারিক কৃষি, ভূমি সংস্কারের বিষয়গুলো বাজেটে ফোকাসড হোক। প্রেজেন্টেশনে তা এসেছে, প্যানেল আলোচনায়ও এর নানা দিক উঠে এসেছে। বর্তমানে আমাদের দেশে বাজেটকে সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য করে রাখা হয়েছে। এ প্রথা আমরা ভেঙে দিতে চাই। আমরা শুধু বাজেট বরাদ্দকে ফোকাস করার চেষ্টা করি না, এর প্রণয়ন প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, তদারকি, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করি। অনেকেই ভাববেন আমরা অরণ্যে রোদন করছি, অবাস্তব কিছু কল্পনা করছি। কিন্তু এও আমরা বিশ্বাস করি, এটি একদিন বাস্তব হবে। বঞ্চনা ও বৈষম্যের জায়গাগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলো কীভাবে প্রতিকার করা যায়, তার উপায় সন্ধান করা  যেমন একটা লক্ষ্য, তেমনি পুরো বিষয়টিকে মানুষের সামনে তুলে আনাও আরেকটি লক্ষ্য। অর্থাৎ বাজেট ডিসকোর্সকে জনগণের ভেতরে নিয়ে যাওয়া। আমরা মনে করি, বাজেট প্রণয়নের অন্তত ছয় মাস আগে থেকে আলোচনা হওয়া উচিত, একেবারে তৃণমূল থেকে আলোচনা হওয়া উচিত। এটা একেবারে অবাস্তব বিষয় নয়। ভারতে অনেক রাজ্যে একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে আলোচনা হয়। ভারতে পারলে আমরা কেন পারব না? আমাদের প্রত্যাশা হলো, এ আলোচনাটাকে আরো বিস্তৃত করা। বাজেট এক বছরের ব্যাপার। কিন্তু বাজেট হলো যেকোনো সরকারের উন্নয়ন দর্শন, অর্থনীতির নীতির প্রতিফলন। সাধারণ মানুষ বাজেটের বরাদ্দ, ব্যয় ও ব্যয়ের খাত সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখবে—এমন স্বপ্নই আমরা লালন করি।

শ্রুতলিখন : হুমায়ুন কবির