গত ৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২০ অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সম্মানিত আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে এ ক্রোড়পত্র
মামুন
রশীদ
ম্যানেজিং পার্টনার পিডব্লিউসি বাংলাদেশ
কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকই এখন আর সুদহার নির্ধারণ করে দেয় না। সুদহার নির্ধারিত হয় বাজারের চাহিদা, জোগান তথা তারল্য পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে। দেশে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নিজেদের রেফারেন্স রেট বা ব্যাংক রেটের মাধ্যমে মুদ্রাবাজারের তারল্য ও ভারসাম্য নিশ্চিত করে। কেনিয়ার ক্ষমতাসীন সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আপত্তি সত্ত্বেও সংসদে আইন পাস করে সুদহার নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করেছিল। কিন্তু সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০১৯ সালের মে মাসে কেনিয়ার অভিজ্ঞতা বিষয়ে একটি কার্যপত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যায়, সুদহার নিয়ন্ত্রণের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঋণ এক বছরেই ১০ শতাংশ কমে আসে এবং তার বিপরীতে বড় শিল্প খাতগুলো বেশি ঋণ পায়। ফলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে ছোট ব্যাংকগুলো। তাদের এক বছরে ৫ শতাংশ ঋণ কমে আসে। বেসরকারি খাত থেকে সরে গিয়ে সরকারি খাতে বেশি ঋণ দেয়া শুরু হয়। এক বছরেই সরকারি খাতে ঋণ বেড়ে যায় ২৫ শতাংশ। বেসরকারি ঋণ কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মূলত কৃষি, ট্রেডিং বা বাণিজ্য এবং আর্থিক সেবা খাত। ব্যাংকগুলো আয় বাড়াতে নানা ধরনের ফি এবং সরকারকে ঋণ দেয়ার ওপর নির্ভর হয়ে পড়ে। ফলে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। ব্যাংকগুলোর মুনাফা ব্যাপক হারে কমে যায়, লোক ছাঁটাই হয়। বেসরকারি খাতে ঋণ কমে যাওয়ায় মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধির হারও প্রায় দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে যায়। সুদহার বাজারভিত্তিক করার অর্থ হলো, এর ওঠানামা ঠিক হবে বাজারের চাহিদা ও জোগানের ওপর। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটা হার নির্ধারণ করে দিলে বাজারে কোনো প্রতিযোগিতা তৈরি হয় না। এ থেকে বের হতেই মূলত বাজারের সুদহার ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। ব্যাংকিং খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পেতে হলে আমাদের নয়-ছয়ের বাইরে গিয়ে বৃহৎ সংস্কারের ওপর মনোনিবেশ করতে হবে।
মাসরুর
আরেফিন
এমডি ও সিইও, সিটি ব্যাংক লি.
একজন ব্যাংকার ও বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি বলছি যে সরকার আমাদের অনেক দিয়েছে। এনজিওগুলো তাদের কাজ করতে পারছে, কারণ সরকার নীতি সহায়তা দিয়েছে। আমাদের রফতানির পরিমাণ ৪১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হয়েছে। আমাদের আমদানি ৬০ বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় ১ হজার ১০০ ডলার থেকে ২ হাজার ডলার হয়েছে। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি কিন্তু আমি আমার চোখের সামনেই বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখছি। বাংলাদেশ এখন দরিদ্রতা থেকে অনেক মুক্ত। বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় জনগোষ্ঠী, যারা ডিজিটালি সম্পৃক্ত। অর্থাৎ ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা করে। রফতানি খাতের জন্য এটা অনেক বড় ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কম মূল্যের শ্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুটো জায়গা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা পালন করে—অভিবাসন ও পোশাক শিল্প। এর বাইরে নতুন সেক্টর কী হতে পারে, তা নিয়ে ভাবতে হবে। কীভাবে রফতানি বৃদ্ধি করা যায়, কীভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করা যায়। এসএমই সেক্টর ভয়ংকর ভয়ের মধ্যে আছে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সেক্টরের ব্যাংকগুলো কীভাবে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেবে। নয়-ছয় সুদহার নিয়ে অনেক হইচই হচ্ছে। কিন্তু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে। একই খাতে দুই থেকে তিন ধরনের নিয়ম রয়েছে। ব্যাংকের ক্ষেত্রে এক রকম, পোস্ট অফিসের ক্ষেত্রে অন্য রকম, আবার সঞ্চয়পত্রের জন্য ভিন্ন। আমি মনে করি, এটা সমস্যা। ব্যাংকাররা যদি কম মূল্যে তহবিল পান, তাদের তো ৯ শতাংশ সুদ দিতে অসুবিধা নেই। লাইফস্টাইল লোনেও বিষয়টি বিবেচ্য। অল্প কিছু বিষয় রয়েছে, এগুলো সমাধান করা গেলে তা ইতিবাচক হতো। আমাদের দক্ষতার লেবেল বিদেশী ব্যাংকগুলোর তুলনায় অনেক কম। প্রথমত, আমরা উল্টাপাল্টা ঋণ দিই। দ্বিতীয়ত, আমাদের অপারেটিং কস্ট অনেক বেশি। ডিজিটালের কোনো সাপোর্ট না নিয়ে মানুষ দিয়ে ভরে ফেলি। কর্মীদের প্রশিক্ষণও ঠিকমতো দিই না। ব্যাংকগুলোকে দক্ষতার মাত্রা বাড়াতে হবে। সর্বোপরি এখানে লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকতে হবে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো একটি অসমান মাঠের মধ্যে খেলতে নামছে। গত ছয় মাসে দেশে আগের চেয়ে জাতীয় সঞ্চয় বেড়েছে। কিন্তু অলস সঞ্চয় বাড়লে ক্ষতি। আমরা এক্ষেত্রে দুটো বিষয় চাই। এক. সঠিক মূল্যে আমরা যেন তহবিল সংগ্রহ করতে পারি। দুই. বাধ্য হয়েও আমরা যেন এখন জনমুখী ব্যাংক হই। একটা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আড়াই লাখ কোটি টাকা লেপ-তোশকের নিচে আছে। এ টাকা অর্থনীতির মূল স্রোতে আসছে না। সাধারণ মানুষের কাছে লোভনীয় প্রডাক্ট নিয়ে হাজির হলে তবেই এসব অর্থ ব্যাংকিং খাতে আসত। আমাদেরই ব্যর্থতা এতগুলো টাকা সিস্টেমের বাইরে। সাধারণ মানুষ যেন ব্যাংকে ঢুকতে ভয় না পায়। এজন্য ব্যাংকগুলোকে জনমুখী হতে হবে।
জায়েদ বখত
চেয়ারম্যান, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড
আমার মনে হয়, আর্থিক খাতে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত সুদের প্রভাব নিয়ে। কেনিয়ায় নিয়ন্ত্রিত সুদহার করতে গিয়ে ব্যাংকিং খাত প্রায় ধ্বংসের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। দেশটির অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে নীতি সংস্কার করা হয়। আমার মনে হয়, সম্ভাব্য অভিঘাত বোঝার জন্য বাংলাদেশে আমাদের চোখের সামনেই সে উদাহরণটা রয়েছে। কারণ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো দেড় বছর ধরে এক অংকের সুদহার বাস্তবায়ন করে চলেছে। এটি তারা করছে খুবই একটা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো এক অংকের সুদহার বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়। তার এক মাস আগে বেসরকারি ব্যাংকগুলো একই ঘোষণা দেয়। এর পরের ইতিহাস সবার জানা। দেড় বছর ধরে সামান্য কিছু ব্যত্যয় ছাড়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো এক অংকের সুদে ঋণ দিচ্ছে। যদিও এ ধরনের বাস্তবায়ন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে খুব একটা দেখা
যায়নি। দেড় বছর ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে এ ধরনের অসম প্রতিযোগিতা বিরাজ করেছে।
অনেকে বলবেন, আপনারা সরকারি ডিপোজিটের সুবিধা পান। কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। অগ্রণী ব্যাংকের ৮০ শতাংশ ডিপোজিটই আসে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে এবং গত কয়েক বছরে সরকারি ডিপোজিট বাড়েনি, বরং কমেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো আমানতের খুব ছোট একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তার পরও বছর শেষে আমাদের নিট মুনাফা বেড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এপ্রিলের ১ তারিখের পরে সবাই যখন ৯ শতাংশ সুদহার বাস্তবায়ন করবে তখন আমানতের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে। আমি মনে করি, এটা নির্ভর করবে একজন সঞ্চয়কারীর কাছে কী কী পথ খোলা আছে তার ওপর। বাংলাদেশের অর্থনীতির বাস্তবতা যদি আমি চিন্তা করি তাহলে প্রথমে খরচের পরিমাণ বাড়িয়ে সঞ্চয় কমানো বা ব্যাংকিং খাত থেকে সঞ্চয় রিয়েল এস্টেট ইত্যাদিতে নিয়ে যাওয়া—এগুলোর তীব্রতা নির্ভর করে ব্যাংক থেকে কতটা ঋণ পাওয়া যায় তার ওপর। এসব প্রয়োজনের জন্য ব্যাংকঋণ যদি খুব সহজলভ্য হয়ে যায়, যেমনটি হয়েছিল ২০১০-১১ সালের দিকে, তাহলে যে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, তেমনটিই হতে পারে। ২০১১ সাল থেকে ব্যাংকিং খাত যে শিক্ষা নিয়েছে, তাতে কনজাম্পশন লোনের ব্যাপারে অনেক সচেতন থাকবে। আমার মনে হয় না, পুঁজিবাজার ব্যাংকিং খাতের বড় কোনো প্রতিযোগী। এটা একটা প্রশাসনিক সমস্যা। সুদহার বাড়িয়ে বা কমিয়ে নয়, আমি মনে করি, প্রশাসনিকভাবে এর সমাধান করতে হবে। এ পর্যায়ে বলব, সুদহার ৯ শতাংশ করার ফলে সবাই যে বিরূপ সম্ভাব্য অভিঘাতের কথা বলছেন, সেগুলোর ব্যাপারে আমরা সচেতন থাকব। কিন্তু আমি এ মুহূর্তে প্যানিক হওয়ার মতো কোনো কারণ দেখি না।
জাহিদ
হোসেন
সাবেক লিড ইকোনমিস্ট বিশ্বব্যাংক, বাংলাদেশ
সরকার ৯ শতাংশ সুদহার নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। এ নিয়ে অনেক ধরনের বিতর্ক আমরা করেছি। এখন আলোচনার প্রসঙ্গগুলো কী হতে পারে। আমরা শুধু যদি একটা নীতিনির্ধারণ-পরবর্তী প্রভাব নিয়ে চিন্তা করি যে ৯ শতাংশ সুদহার নির্ধারণ ছাড়া সরকার যদি আর কিছু না করে, তবে আর্থিক খাতে কী ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। কিছু অর্থনীতিবিদ আশঙ্কা করছেন, এতে কিছু অনিচ্ছাকৃত পরিণতির সম্মুখীন হতে পারি। আমার মনে হয়, এক্ষেত্রে আমরা আসলে কী জানি না, সেটা জানতে হবে। আমাদের জানার মধ্যে রয়েছে, যদি ৯ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করা ছাড়া কোনো নীতি সহায়তা না আসে, তাহলে ক্রেডিট রেশনিংয়ের সমস্যা সৃষ্টি হবে। এটা কীভাবে হবে তা কিন্তু অজানা। এটা বিভিন্নভাবেই হতে পারে। কারা ক্রেডিটটা পাবেন এবং কারা পাবেন না, তাদের পাশাপাশি আমাদের তত্ত্বাবধায়ক কর্তৃপক্ষের ওপর এটা নির্ভর করবে। আমাদের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ সমস্যাটা মোকাবেলা করার জন্য কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে তা অজানা। এছাড়া ৯ শতাংশ সুদহার ব্যাংকারদের লাভের ওপর এক ধরনের আঘাত হানবে। এটি মোকাবেলার জন্য ব্যাংকগুলো কীভাবে কাজ করবে তা কিন্তু এখনো অজানা।
ব্যাংকগুলো এর খরচ কমানো, পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সৃজনশীল হিসাব-নিকাশ (ক্রিয়েটিভ অ্যাকাউন্টিং) হতে পারে। আমি মনে করি, ডিপোজিট রেট কমতে বাধ্য। কারণ সুদহার কমলে ডিপোজিট রেট কমবে। আর ডিপোজিট রেট কমলে ব্যাংকের ডিপোজিটের ওপর কী প্রভাব পড়বে তা কিন্তু আমরা এখন জানি না।
আমরা যেমন দেখেছি, ২০১৯ সালে বিক্রি প্রক্রিয়ায় কিছুটা স্বচ্ছতা আসায় সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ধস নেমেছে। এ অর্থের একটি অংশ ব্যাংকে আমানত হিসেবে এসেছে, যা আমানতের হার বাড়িয়েছে। আবার রেমিট্যান্সেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আমাদের এ বিষয়গুলোও বিবেচনায় আনতে হবে। সুদহার বৃদ্ধি করলে ব্যাংক আমানতের ওপর প্রভাব আসতে পারে, এ প্রভাবগুলো কী ধরনের হবে, আমানতকারীরা তাদের অর্থ কোথায় রাখবেন এবং এতে কী ধরনের ছায়া ব্যাংকিংয়ের আবির্ভাব হতে পারে—এগুলো অনুমান করা এখন কঠিন।
আর্থিক স্থিতিশীলতায় একটি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ আমরা যে চিপ ক্রেডিট দিচ্ছি, চিপ ক্রেডিটের ফলে যারা ঋণ গ্রহণ করেন, তাদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায়, আচরণে একটা পরিবর্তন হতে পারে। এটা আমরা নৈতিক বিপত্তি বলে থাকি। এটি কী ধরনের ভূমিকা রাখবে তা এখন অনুমান করাটা অসম্ভব। তবে নীতিনির্ধারকদের এটা চিন্তার মধ্যে রাখতে হবে।
সুদহার কার্যকর হওয়ার পর কী ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে বলব অন্য নীতিগুলো এর সঙ্গে সমন্বয়ক কিনা, আমাদের এটাও ভাবতে হবে। সরকারের ঘাটতি বেড়ে গেছে। ব্যাংক থেকে প্রচুর অর্থ ধার করা হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের বিক্রয় বৃদ্ধি কিন্তু একমাত্র ব্যাখ্যা নয়। ঘাটতির পরিমাণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া রিস্ক ফ্রি রেট যেমন ট্রেজারি বিল ও বন্ড রেট অনেক বেড়ে গেছে, ৭ থেকে ৮ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে; যা সুদহার কমানোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এতে ফিসকাল প্রেসার বাড়বে, কমবে না।
আমরা স্বীকার করি বা না করি, নভেল করোনাভাইরাস আসার আগেই অর্থনীতিতে একটা মন্দা ভাব ছিল। আমরা দেখেছি, নভেল করোনাভাইরাস আসার আগেই দেশের আমদানি-রফতানিসহ মৌলিক সব সূচক নিম্নগামী ছিল।
তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কর্মীরা চাকরি হারাচ্ছেন। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ পলিসি সাপোর্টের জন্য দাবি করছে। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ১০ হাজার কোটি টাকা নীতি সহায়তা চেয়েছে। এর আগে শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্টরা ১০ হাজার কোটি টাকা চেয়েছেন। এই ১০ হাজার কোটি টাকা একটা পলিসি ডিমান্ডের সাপোর্ট হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।
এখন নভেল করোনাভাইরাসের ফলে প্রভাবটা আরো পড়বে। যদি প্রকোপটা বেশি মাত্রায় হয় তাহলে প্রভাব আরো বাড়বে। অর্থনীতির চাপ বাড়বে, রাজস্ব প্রবৃদ্ধির চাপ বাড়বে। আমরা যদি ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদহারে টাকা ধার করতে থাকি তাহলে সুদহার বৃদ্ধির নীতির সঙ্গে এটি মিলবে না। এর সঙ্গে আরো কিছু নীতি আমরা গ্রহণ করেছি, যেটা ব্যাংকের তারল্য বাড়াতে সহায়ক নয়। যেমন রাষ্ট্রায়ত্ত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অতিরিক্ত তহবিল স্থানান্তরের নীতি পাস করেছি। এতে তারল্যের ওপর একটা চাপ আসবে। হয়তো এটার প্রভাব স্থায়ী হবে না, কারণ সরকার যখন টাকাটা খরচ করা শুরু করবে তখন ওই টাকাগুলো আবার সিস্টেমে ফিরে আসবে, কিন্তু পলিসি প্যারামিটারে তো একটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। সার্বিকভাবে আমরা বলতে পারি, অর্থনীতির যে সংকট আমাদের তৈরি হয়েছে, সেটা কমছে না।
খাজা শাহরিয়ার
ব্যবস্থাপনা পরিচালক লংকাবাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেড
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ঘটনায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ সংকট শুধু আমাদের দেশেই নয়, অন্যান্য দেশেও রয়েছে। সংকট থেকে বের হয়ে আসতে আলাদা পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। এর পরেও অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভালো করছে। আশার কথা হচ্ছে, আমাদের সরকার এসব বিষয়ে উন্নতির জন্য কাজ করছে। আশা করি, অল্প কিছুদিনের মধ্যে ব্যাংক খাতের সব সমস্যা কেটে যাবে। বিশেষ করে আমাদের দেশে যেসব ডিপোজিট করা হয়, সেগুলো অনেকটাই স্বল্প সময়ের জন্য। ব্রিটেনে যেসব ডিপোজিট হয়, এগুলো অনেক দীর্ঘমেয়াদি। এই জায়গায় আমাদের উন্নতি করতে হবে। আমাদের ব্যাংকগুলোর আয়ের তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি হচ্ছে। যে কারণে আয়-ব্যয়ের সমন্বয় করা যাচ্ছে না। আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। এখানে অনেক বিনিয়োগ করতে হবে। ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে অ্যাপের মাধ্যমে নিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে বিকাশ অনেক ভালো করছে। কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে অন্য ব্যাংকগুলোয়। এ বিষয় নিয়ে আরো ভালোভাবে কাজ করতে হবে। এছাড়া আমাদের ব্যাংকিং খাতে যে অর্জন, তা ধরে রাখার জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনাকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। শুধু এসএমই মেলা করে প্রান্তিক গ্রামীণ মানুষের উন্নতি করা সম্ভব হবে না, যদি সহজ শর্তে ঋণ দেয়া সম্ভব না হয়। আর্থিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং প্রবৃদ্ধির উন্নতি করতে হলে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু শহরের মানুষের কথা চিন্তা না করে প্রান্তিক গ্রামের মানুষের উন্নতির বিষয় মাথায় রেখে এখন থেকে কাজ করতে হবে।
আহসান
এইচ মনসুর
চেয়ারম্যান, ব্র্যাক ব্যাংক
নির্বাহী পরিচালক, পিআরআই
সুদহার নয়-ছয় নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, এটা যদি আমরা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করতে পারি, তাহলে ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা অকার্যকর হয়ে পড়বে। এতে ব্যাংকের গলাকাটা অবস্থা সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা বর্তমানে খুবই অপ্রতুল অবস্থায় রয়েছে। ব্যবসায় টাকা খাটালে উন্নতির চেয়ে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এ অবস্থায় ব্যাংকিং খাত সংস্কার ছাড়া আমাদের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব নয়। যদি ঘোষণা দিয়ে সবকিছু পরিবর্তন সম্ভব হতো তাহলে বাজার ব্যবস্থার কোনো প্রয়োজন হতো না। ঘোষণা দিয়েই সবকিছু পরিবর্তন করা যায় না। সরকার যে নয়-ছয় সুদের নীতি নির্ধারণ করেছে, এটার বাংলা অর্থ আমরা এখানে ব্যবহার করতে চাইছি না। এটার নামে আমরা ভেলকিবাজি দেখতে চাই না। ব্র্যাক ব্যাংকের মোট ঋণের ৫০ শতাংশই এসএমই। আমি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ৯ শতাংশ সুদে আমরা এসএমই ঋণ দিতে পারব কিনা? এর উত্তর হলো, সম্ভব নয়। বিদ্যমান এসএমই গ্রাহকদের নতুন ঋণ না দিলে পুরো ৫০ শতাংশ অর্থই খেলাপি হয়ে যাবে।
সুদহার চাপিয়ে দিলে ব্যাংকগুলো উইন্ডোরেসিং করে বাংলাদেশ ব্যাংককে মিথ্যা তথ্য দেবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ভাবতে হবে, তারা সেটিই চায় কিনা? সরকারি ব্যাংকের সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকের তুলনা চলে না। দুই ধারার ব্যাংক একই গতিতে চললে সরকারকে ফারমার্স ব্যাংকের মতো বেসরকারি অন্য ব্যাংকগুলোকেও টেনে তুলতে হবে। ভ্যাট আইনের কবলে পড়ে এসএমই খাত বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে। এখন সুদহার চাপিয়ে দিয়ে এসএমই খাতকে ঋণ দেয়া বন্ধ করে দিলে, ভবিষ্যতে এসএমই মেলা করে কোনো লাভ হবে না। এসএমইদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমার হিসাবে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ২৩-২৪ শতাংশ। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সুদহার বেঁধে দিতে হবে না। এমনিতেই ঋণের সুদ কমবে। সুদহারকে বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর ছেড়ে দিতে হবে। ডিক্টেটরশিপ চাপিয়ে দিয়ে সুদহার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড
দেশের অর্থনীতির অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে ব্যাংকিং খাতের প্রবৃদ্ধি হয়নি। ব্যাংকিং খাতকে ঠিক করতে হলে সুশাসনের উন্নতি করতে হবে। খেলাপি ঋণ অবশ্যই কমাতে হবে। এজন্য প্রয়োজন শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থা। কিন্তু আমরা সেটি দেখছি না। উল্টো ঋণখেলাপিরা রাষ্ট্রের নীতি প্রণয়নের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছেন।
২০১৯ সালে আমরা ৫১ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছি। যেখানে ২০১৮ সালে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার কোটি টাকা। এর মাধ্যমে ডিসেম্বর শেষে হয়তো খেলাপি ঋণ কিছুটা কমেছে। তার পরও খেলাপির হার ৯ শতাংশ। যদিও নেপালের মতো একটি ছোট অর্থনীতির দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ২ শতাংশ। আস্থার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বেসরকারি ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা টাকা তুলে নিচ্ছেন। ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ কয়েকটি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স অ্যাক্ট নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা আমানত তুলে নিচ্ছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন
সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
ব্যাংকের মূল কাজ অর্থনৈতিক মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখা। দিনভর অর্থনীতির অনেক দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অল্প সুদের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি এসেছে। মাস তিনেক আগে বণিক বার্তা ‘ব্যাংকঋণের সাতকাহন’ নামে একটি লেখা ছাপিয়েছে। সে লেখা থেকেই আমি আজ কথা বলব। একদিকে লাখ লাখ ক্ষুদ্র আমানতকারীর কাছ থেকে ব্যাংকে আমানত আসছে, অন্যদিকে দক্ষ ও যোগ্য উদ্যোক্তারা ঋণের জন্য ব্যাংকে যাচ্ছেন। এখন ব্যাংকের কাজ হলো, চাহিদা ও জোগানের মধ্যে যথোপযুক্ত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখা। বাংলাদেশ শ্রমপ্রধান দেশ। একই সঙ্গে মূলধন অভাবের দেশ। এ দেশে মূলধনের দাম বেশি হওয়ার কথা। এগুলো বইয়ের কথা। যদি আমি সঞ্চয়কারীদের স্বার্থে সুদহার বেশি ধরি, তাহলে চাহিদা কমে যাবে। আর সুদহার কমিয়ে দিলে আমানতকারীরা নিরুত্সাহিত হবেন। এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক কথা। সুদহার কমানো বা বাড়ানোর বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের উদাহরণ টানেন সাবেক এ গভর্নর। ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়া অত্যন্ত হতভাগা একটি দেশ ছিল। এ অঞ্চলের সব দেশের তুলনায় দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খারাপ। ওই সময় তারা অর্থনৈতিক সংস্কারের একটি কর্মসূচি নিয়েছিল। তাদের ঋণের সুদহার ছিল ৭-৮ শতাংশ। রাতারাতি সুদহার ২৩ শতাংশ করে দিল। এতে লাভ হলো দ্রুততার সঙ্গে, সঞ্চয় বেড়ে গেল। একই সঙ্গে সবচেয়ে দক্ষ ও যোগ্য উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেন। শুধু তারাই ঋণ নিলেন, যারা ২৩ শতাংশ সুদ পরিশোধ করেও মুনাফা করতে পেরেছেন। অন্যদিকে জাপান ২০ বছর ধরে ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট ধরে রেখেছে। সুদহার ধরে রেখেছিল শূন্য শতাংশ। ওই ২০ বছরে দেশটি কোনো প্রবৃদ্ধি করেনি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এসে এসব নীতিতে পরিবর্তন এনেছেন। সুদহার বাড়িয়েছেন। এতে তাদের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বিদায়ী বছরে ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। সামাজিক রূপান্তর এত চমত্কার। পাকিস্তানের মাহবুবুল হক কিংবা ভারতের অমর্ত্য সেন বলেছেন, সামাজিক রূপান্তরে বাংলাদেশের অর্জন হূদয় উষ্ণকর। একদিকে এ অগ্রগতি হচ্ছে, অন্যদিকে আমরা বলছি সুশাসনের তীব্র অভাব। একই সঙ্গে ইজ অব ডুয়িং বিজনেস একেবারে খারাপ। এ দুই বিষয় সংগতিপূর্ণ নয়। হয় এটি ভুল, নয় অন্যটি ভুল। এটি আমার হিসাবে মেলে না। আশি ও নব্বইয়ের দশকে ব্যাংক করার জন্য ২০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের প্রয়োজন হতো। বাধ্যতামূলকভাবে সেটি হতে হতো সাদা টাকা। নব্বইয়ের দশকের পরও এটি নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু এখন ব্যাংক অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে এটি মানা হয় কিনা, আমি জানি না। বিনিয়োগ ও জিডিপি অনুপাত এখন ৩২-এ আছে, এটি দিয়ে যদি সাড়ে ৮ বা ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করতে হয়, তাহলে অবশ্যই আয়কর (ইনক্রিমেন্টাল ক্যাপিটাল আউটপুট রেশিও) কমাতে হবে। কিন্তু এটি কমার কোনো লক্ষণ নেই। ২০ বছর আগে এটি ৪ ছিল, এখন ৪ দশমিক ৩। ৩২ শতাংশ বিনিয়োগ দিয়ে যদি আয়কর ৪ দশমিক ৪ হয়, তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি তো ৭ শতাংশও হয় না। অথচ ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হিসাব বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে বিশ্বসমাজ। প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির মূল্যায়নই এর কারণ। পৃথিবীর কয়টি দেশে আছে স্বল্পমেয়াদি আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দেয়ার নীতি। উত্তর হলো, কোনো দেশেই নেই। অথচ আন্তর্জাতিক মুরুব্বিদের ভুল পরামর্শে ১৯৯৩ সালে সব তফসিলি ব্যাংককে দীর্ঘমেয়াদের ঋণ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এতে যে দেশের কত ক্ষতি হয়েছে। আমরা এখন নয়-ছয়ের মধ্যে আছি। বৃহৎ প্রবৃদ্ধির স্বার্থে বাজার অর্থনীতি অপরিহার্য। তবে সরকার যদি কমান্ড ইকোনমিতে সুদহার নির্ধারণ করে দেয়, তাহলে সেটি কতখানি সফল হবে তা নিয়ে আমার মনে বড় প্রশ্ন আছে। আশির দশক থেকে ধীরে ধীরে বাজার অর্থনীতি উন্মুক্ত হয়েছে। এখন অবমুক্ত পাখিকে খাঁচার ভেতরে বন্দি করলে অর্থনীতির ফল শুভ হবে কিনা, তা আমি জানি না। তবে আমি সন্দিহান।
ফজলে কবির
গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
সরকারের নির্দেশনা সত্ত্বেও ব্যাংকঋণের সুদহার বেঁধে দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় দুই বছর সময় নিয়েছে। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে তত্কালীন অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, আগস্টের ১ তারিখ থেকে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ হবে। কিন্তু আমরা ঋণের সুদহার বেঁধে দেয়ার জন্য ২০২০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি। ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার বেঁধে দেয়ার প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে গত মাসে। আর ৯ শতাংশ সুদের ব্যাংকঋণের নির্দেশনা কার্যকর হবে ১ এপ্রিল থেকে। এ নির্দেশনা কার্যকর হলে সাময়িকভাবে কিছু সমস্যা হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্যই ব্যাংকঋণের সুদহার এক অংকে নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৮ সালের জুনে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১৯ সালের জুনে তা ১৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৯ শতাংশে নেমেছে। এটি আমরা চাইছি না। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিকে উত্সাহিত করতেই আমরা এডি রেশিও কমিয়ে ছিলাম।
আমাদের আমানতের গড় সুদহার এখনো ৫ শতাংশের কম আছে। একইভাবে ঋণের সুদহারের গড়ও ৯ দশমিক ৬৬ শতাংশে সীমাবদ্ধ। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে কোনো তারল্য সংকট নেই। এখন ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত তারল্য আছে। তবে এটি সব ব্যাংকের কাছে সমানভাবে নেই। এর মধ্যে ৪২ হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কাছে রয়েছে। ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ব্যাংকগুলোকে এসএমই ও রিটেইল খাতে ঋণ দিতে হবে। মানসম্পন্ন ঋণ দিয়েই ব্যবসা করতে হবে, দিন শেষে মুনাফাও করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক দুর্বল হয়ে গেছে বলে একজন অভিযোগ করেছেন। তবে আমি জানি না, বর্তমানের চেয়ে কবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরো শক্তিশালী ছিল। কেননা আমি ২০০৮ সাল থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ২০১৭ সালের অক্টোবরে একটি নতুন ব্যাংক লাইসেন্সের জন্য প্রস্তুত ছিল। সরকার থেকে সে বিষয়ে পরামর্শও ছিল। কিন্তু সে ব্যাংকটির চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে আমরা দুই বছরের বেশি সময় নিয়েছি। আমরা নিশ্চিত করতে চেয়েছি, মূলধনের শতভাগ অর্থই যেন সাদা টাকা হয়।
ব্যাংকিং খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির ৮৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বাকি অংশ পুঁজিবাজার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের। সম্প্রতি আমরা ব্যাংকঋণের সুদহারের বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন দিয়েছি। সেটি নিয়ে আজকের অনুষ্ঠানে অনেকেই কথা বলেছেন। সুদহার বেঁধে দেয়া নিয়ে কেনিয়ার উদাহরণ দেয়া হয়েছে। যদিও কেনিয়ার অর্থনীতির ধরন ও প্রকৃতি আমাদের দেশের তুলনায় ভিন্ন। কেনিয়ার জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অংশগ্রহণ ৯ শতাংশ, বাংলাদেশে এটি ৩১ শতাংশের বেশি। কেনিয়ার জিডিপিতে কৃষি খাতের ভূমিকা ৫২ শতাংশ, বাংলাদেশে তা ১৩ শতাংশ। কেনিয়ার জিডিপিতে সরকারি ঋণের অংশ ৫৮ শতাংশ, বাংলাদেশে তা ২৯ শতাংশের আশপাশে। বাংলাদেশের জিডিপিতে বিদেশী ঋণ ১৩ শতাংশ।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৯ (চ) ধারার ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের সুদহার নির্ধারণ করে দিতে পারে। ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধনের সময় বিশ্বব্যাংকসহ কোনো পক্ষই এ ধারার বিরোধিতা করেনি। ২০১৫ সালে ঋণের সুদহার বেড়ে গেলে কৃষিঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ বেঁধে দেয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে নির্ধারিত হারে কৃষিতে ঋণ বিতরণ না করতে পারলে ঋণের সে অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক কেটে রাখার বিধানও দিয়েছে। প্রি-শিপমেন্ট রফতানির ক্ষেত্রে ঋণের সুদহারও ৭ শতাংশ ২০১৬ সালের আগে নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল।
খেলাপি ঋণ নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এ নিয়ে অনেক কথা বলেছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার পেছনে ঋণের উচ্চ সুদহারও যে দায়ী, তার স্বীকৃতি দিলে এ বিষয়ে মতামত অন্য রকম হতো। আমাদের দেশে সামগ্রিকভাবে কোনো পেনশন স্কিম নেই। এজন্য সঞ্চয়পত্র চালু করা হয়েছিল। এখানে ব্যাংকের চেয়ে বেশি সুদ পাওয়া যায়। কিন্তু সঞ্চয়পত্রের অপব্যবহার হচ্ছিল। যাদের লক্ষ্য করে সঞ্চয়পত্র চালু করা হয়েছে, তাদের কাছ থেকে বেরিয়ে তা করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও বিত্তশালীদের কাছে চলে গিয়েছিল। এজন্য সঞ্চয়পত্রকে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে যে নয়টি ব্যাংক অনুমোদন দেয়া হয়েছিল, তার মধ্যে একটি ব্যাংক ব্যর্থ হতে যাচ্ছিল। কিন্তু সেটিকে বাঁচানো হয়েছে। কেন সে ব্যাংকটিকে বেইলআউট করা হয়েছে, তা নিয়ে আহসান এইচ মনসুর প্রশ্ন তুলেছেন। ব্যাংকিং খাত নিয়ে সরকারের দায়িত্ব অনেক। একটি ব্যাংক ব্যর্থ হলে দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রতি আমানতকারীদের অনাস্থা তৈরি হবে কিনা, সেটিও সরকারকে ভাবতে হয়। সুশাসনের অভাব সর্বক্ষেত্রে। এটি ব্যাংকিং খাতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি নিশ্চিত করার জন্য আমরা কাজ করছি।
শ্রুতলিখন: রুহিনা ফেরদৌস





