গত ৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২০ অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সম্মানিত আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে এ ক্রোড়পত্র
দেওয়ান
হানিফ মাহমুদ
সম্পাদক, বণিক বার্তা
প্রথমেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। স্মরণ করছি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টে নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হওয়া বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যসহ জাতীয় চার নেতাকে। একই সঙ্গে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে আত্মোত্সর্গকারী শহীদদের। চলতি বছরটি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা উদযাপন করছি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী। আগামী বছর বাংলাদেশের অর্থনীতির ৫০ বছর পূর্ণ হবে। এ মাহেন্দ্রক্ষণ সামনে রেখে আজকের এ আয়োজন ‘অর্থনৈতিক সম্মেলন-২০২০’। আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি, লক্ষ্য আরো বড়। বাংলাদেশ উচ্চহারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। সরকার বিপুল বিনিয়োগ করছে অবকাঠামো নির্মাণে। মোটা দাগে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনেক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। জিডিপিতে কৃষির অবদান কমে এলেও তা ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দিয়ে যাচ্ছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে বিশ্ববাসী। লক্ষ্য এখন টেকসই উন্নয়ন অভীস্ট অর্জন। তার পরও বেশকিছু চ্যালেঞ্জ আমাদের রয়েছে; যার মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, স্থবির বেসরকারি বিনিয়োগকে গতিশীল করা, রফতানি আয় এক পণ্যনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে বৈচিত্র্য আনা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। আয় ও সম্পদের বৈষম্য বৃদ্ধি আরেকটি বড় চিন্তার বিষয়। দেশের অর্থনীতির গতি আরো বাড়াতে এবং একে টেকসই রূপ দিতে সম্পদের অপচয় রোধ এবং মানসম্পন্ন ব্যবহারের দিকে আরো দৃষ্টি দেয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। আজকের দিনব্যাপী আয়োজনে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিপথ বিশ্লেষণের পাশাপাশি ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হবে। প্রথম অধিবেশনে আমরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দ্বিতীয় অধিবেশনে আর্থিক খাত নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আলোচনা শুনব। আশা করছি, এখান থেকে ভবিষ্যতের অর্থনীতির একটি দিকনির্দেশনা মিলবে। দুইটি অধিবেশনের প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথিসহ আলোচক এবং দর্শকশ্রোতদের আজকের আয়োজনে স্বাগত জানাচ্ছি।
রেহমান
সোবহান
চেয়ারপারসন, সিপিডি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
বাংলাদেশের উন্নয়নে আমাদের প্রায় অর্ধশত শতাব্দী যাত্রার জন্য আমরা সত্যিই গর্বিত। এটি আমাদের সার্বিক চমকপ্রদ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দৃশ্যমান। কৃষি খাতে বৈচিত্র্য দৃশ্যমান। শিল্প খাতের অগ্রগতিও আশাব্যঞ্জক। অবকাঠামোতে ভালো রকমের উন্নতি হয়েছে। আরো তাত্পর্যপূর্ণভাবে উন্নয়ন ঘটেছে মানুষের জীবনমানে ও মানব উন্নয়ন সূচকে। প্রকৃতপক্ষে অধ্যাপক অমর্ত্য সেন পর্যায়ক্রমিকভাবে বলেছেন যে নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রত্যাশিত গড় আয়ু প্রভৃতি সূচকে আমরা আসলে ভারতকে ছাড়িয়ে গেছি। সামষ্টিক অর্থনৈতিক নৈপুণ্যের দিক থেকে পাকিস্তানকেও ছাড়িয়ে গেছি আমরা। মূলত তত্কালীন পাকিস্তানের দুই অর্থনীতির মধ্যে বিপুল বৈষম্য দ্বারা তাড়িত হয়ে আমাদের পুরো মুক্তি-স্বাধীনতা আন্দোলন আবর্তিত হয়েছিল এবং অবশেষে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। ৫০ বছর পর এখন আমরা প্রকৃতপক্ষে মাথাপিছু আয় ও সম্পদ সঞ্চয়ন, প্রজনন হারে নিয়ন্ত্রণসহ আরো অনেক সূচকে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছি। পাকিস্তান আমলে আমাদের বাস্তবতা ছিল জনমিতিক হিসাবে জনসংখ্যায় বেশি হলেও সার্বিক উন্নয়ন থেকে কম সুফল পেয়েছি। আজকে পাকিস্তানের জনসংখ্যা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু মাথাপিছু আয়ে তারা আমাদের চেয়ে কম।
আমরা এ পর্যন্ত যা অর্জন করেছি তা স্বীকার করে আমাদের এখন এগিয়ে যেতে হবে। তবে এতে আত্মপ্রসাদে ভুগলে চলবে না। বরং আমরা ভবিষ্যতে যা অর্জন করতে পারব, তার জন্য প্রস্তুতি নেয়াই হবে অধিকতর ফলপ্রসূ। বৈশ্বিক সংকটে অর্থায়ন বিষয়ের ওপর একজন বিখ্যাত লেখক আছেন। তিনি হলেন রৌবিনি। তিনি ‘ব্ল্যাক সোয়ান’
নামে একটি বই লিখেছেন। যেখানেই যান আপনারা বেশির ভাগ হোয়াইট সোয়ান দেখবেন। ব্ল্যাক
সোয়ান দেখা খুবই বিরল ঘটনা। এ ধরনের ঘটনার কোনো সুনিশ্চিত অনুমানযোগ্যতা নেই। রৌবিনি দেখিয়েছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট পর্যালোচনার যৌক্তিক ব্যাখ্যা সবসময়ই খুব কার্যকর (প্রডাক্টিভ) না-ও হতে পারে। সংকট অনেক সময় ব্ল্যাক সোয়ানের (বিরল ঘটনা) কারণেও হতে পারে। বর্তমানে সম্ভবত আমরা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখছি নভেল করোনাভাইরাসের মতো ব্ল্যাক সোয়ান। এটা এরই মধ্যে বৈশ্বিক মহামারীতে পরিণত হয়েছে। জানি না এটি আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে। তবে এ থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হলো, এমনকি অর্থনীতিতে সবকিছু ভালো চললেও র্যানডম শক আসতে পারে।
ভিয়েতনামের কথা বলাই যায়। দেশটি গত কয়েক বছরে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় অনেক এগিয়েছে। ভিয়েতনাম কীভাবে এগিয়েছে, সেটি হুবহু অনুকরণ করার আমাদের দরকার নেই। আমাদের অনেক ইতিবাচক দিক আছে। আমরা একটি প্রথম প্রজন্মের ডাইনামিক উদ্যমী উদ্যোক্তাশ্রেণী পেয়েছি। তারা তাদের উদ্যোক্তা সক্ষমতায় কর্মজীবী নারী ও শ্রমজীবীদের কাজের সংস্থান করেছেন, যারা প্রকৃতপক্ষে গ্রাম থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তারা আরো উদ্যোক্তা, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা তৈরি করছেন; যারা অনেক ক্ষেত্রে গ্রাম থেকে উঠে আসছেন। তাদের নিম্ন উত্পাদনশীলতাকে বৈশ্বিক প্রতিযোগীদের সমপর্যায়ে উন্নীত করেছেন। আমাদের প্রবাসী শ্রমিকরা বিপুল প্রতিযোগিতার সামর্থ্য দেখাচ্ছেন। একইভাবে আমরা আমাদের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের রেজিলিয়েন্স দেখাতে পেরেছি। কৃষকরা ফসল উত্পাদন আগের চেয়ে লক্ষণীয় মাত্রায় বাড়িয়েছেন। এ খাতে বহুমুখিতা এনেছেন। গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে এসএমইর সংযোগ বিদ্যমান। তারাও উল্লেখযোগ্য সৃজনশীলতা প্রদর্শন করেছে। ক্ষুদ্রঋণ খাতে আমাদের
নারীরা গ্রেট রিসিভিয়ারের ভূমিকা পালন করেছেন। এসব কথা বলার মাধ্যমে আমি যাতে জোর দিতে চাইছি তা হলো, যেহেতু সুযোগ সীমিত, সেহেতু কোন কোন খাতে আমাদের শক্তি বাড়াতে হবে, সেটি চিহ্নিত করতে হবে; যাতে আমরা আমাদের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারি। আমি দ্রুত এর কয়েকটি উল্লেখ করতে চাই এবং শেষ করতে চাই যে আমরা কোথায় কোথায় বঙ্গবন্ধুর ভিশন থেকে বিচ্যুত হয়েছি। সেখানে আসলে আমরা কী করতে পারি। প্রথমটি হলো, আমাদের আর্থিক খাতকে শৃঙ্খলায় আনতে হবে। এটি সম্পর্কে অনেক কিছু বলা হয়েছে। এখন শুধু কাজ করা দরকার। এটিকে শৃঙ্খলায় আনা গেলে তা শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দ্বিতীয়টি হলো, আইনের শাসন ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা-আচরণ। আমাদের সবার জন্য বিশ্বাসযোগ্য সমান ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
আ হ
ম মুস্তফা
কামাল, এমপি
মন্ত্রী, অর্থ মন্ত্রণালয়
পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা যেভাবে সাজাতে হয়, সেভাবেই আমি কাজটি করে যাচ্ছি। এখন সেভিংস ইনস্ট্রুমেন্ট নিয়ে কথা এসেছে। সেগুলো বালিশের নিচে টাকা রাখার মতো। সেগুলোর গুণক প্রভাব (মাল্টিফ্লাইয়ার ইফেক্ট) নেই। সেগুলো মূলধারার অর্থনীতিতে আসে না। সেগুলোকে কীভাবে নিয়ে আসা যায়, সেই কাজটি আমরা করেছি সিস্টেমের মাধ্যমে। জোরপূর্বক কিছু করতে চাইনি। সেভিংস ইনস্ট্রুমেন্টগুলো ছিল এ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য। এ দেশের পেনশনারদের জন্য। এখন আমরা দেখেছি এটা বিভিন্নভাবে ডিস্টরশন হচ্ছে। যাদের জন্য এ স্কিম করা হয়েছে, তারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। অন্যরা কোটি কোটি টাকার সেভিংস ইনস্ট্রুমেন্ট কেনা শুরু করল। এটি আমরা চাইনি। সেজন্য ব্যাংকিং খাতের সেভিংস ইনস্টু্রমেন্ট আমরা পুরোটাই অটোমেশন করতে পেরেছি। এখন আমরা জানি, কারা সেভিংস ইনস্ট্রুমেন্টগুলোর মালিক। তারা চাইলেও সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। এটা খুব ভালো লিমিট। এতে ভালো সুদ পাওয়া যাবে। আর কিছুদিন পর আমরা পোস্টাল সেভিংস অটোমেশন সম্পন্ন করতে পারব। সেখানেও বাড়ানো ছাড়া কিছুই কমানো হয়নি।
অনেকেই পুঁজিবাজার নিয়ে কথা বলেছেন। পুঁজিবাজার বিষয়ে আমার করণীয় খুব স্পষ্ট। পুঁজিবাজার উঠবে-নামবে—এটা নিয়ে আমি কাজ করি না। আমার কাজ হলো এ দেশের অর্থনীতিকে বেগবান করা, শক্তিশালী করা। সামষ্টিক অর্থনীতিকে একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এর প্রতিফলন পড়বে পুঁজিবাজারে। আমার কাজটি হলো সামষ্টিক অর্থনীতির গতিধারা শক্তিশালী রাখা এবং এর হাত ধরে সব অর্জন আমরা করতে পারব।
কিছু কথা উঠে আসে। অনেকে বলেন, দেশে ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। উন্নয়ন হচ্ছে। সবই ভালো। কিন্তু তা কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি। এখানে কোনো কর্মসংস্থান হচ্ছে না। যদি কর্মসংস্থানই না হয় তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কীভাবে হচ্ছে? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর কর্মসংস্থান হাত ধরে চলে। সুতরাং সেটি বুঝতে হবে। কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করা হচ্ছে। সেখানে আড়াই কোটি লোকের কর্মসংস্থান হবে। সেটি হতে কিছু সময় লাগবে।
আলোচনায় উঠে এসেছে ব্যাংকিং খাত ঠিক করতে হবে। এখন সেটি ঠিক নেই। খেলাপি ঋণ বেশি। খেলাপি ঋণ কেন বেশি হবে না? কারণ সুদহার বেশি। তাহলে কীভাবে শিল্পায়ন হবে। শিল্প-কারখানা করার জন্য মৌলিক যে সেবা প্রয়োজন, সেটি হলো ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া। এর সঙ্গে সুদহারের সম্পর্ক আছে। সুদহার ২৫-২৮ শতাংশ হলে সে দেশে কোনোভাবে শিল্পায়ন হবে না, হতে পারে না। ভিয়েতনামের কথা অনেকে বলেন। সেখানে সুদহার কত? সেটি কখনো ৬ শতাংশের বেশি নয়। এ জায়গায় আমাদের হাত দিতে হবে। এখন আমরা সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনছি। সেটা সারা জীবনের জন্য নয়। যখন স্থিতিশীলতা আসবে তখন বাজারশক্তিই সবকিছু করবে, তখন জোর করে কিছু করতে হবে না। আমি সুদহার নামিয়ে আনতে চাই। আমি চাই দেশে শিল্পায়ন হোক। শিল্পায়ন ছাড়া আমাদের বেরোনোর কোনো পথ নেই।
আরেকটি কথা উঠে এসেছে, জিডিপি অনুপাতে কর-রাজস্ব খুবই কম। আমাদের ট্যাক্স টু জিডিপি রেশিও ৯-১০ শতাংশ। আসলে সংখ্যাটা এটি নয়। এটি ১৫ শতাংশের ওপরে। আমরা পাওয়ার সেক্টরে, বড় বড় অবকাঠামোয় বিপুলসংখ্যক যন্ত্রপাতি কিনছি। এসব বড় প্রকল্প থেকে আমরা শুল্ক সংগ্রহ করলে, অব্যাহতি না দিলে তা আমাদের রাজস্ব হতো। সেখানে তো আমরা শুল্ক অব্যাহতি দিচ্ছি, যাতে আমরা শিল্পায়নের গতি বাড়াতে পারি। আমরা দেখতে চাই, প্রকৃত অর্থে কতটা রাজস্ব পাই আর কতটা কর অব্যাহতি দেয়া হয়। কর ছাড় দিই আসলে প্রান্তিক মানুষদের। যত সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী রয়েছে, সেখানে কোনো কর আদায় করা হয় না। সে কাজগুলো না করলে আমরা পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে কীভাবে অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসতে পারব। কিছু সময়ের জন্য এটিও আমাদের সহ্য করতে হবে।
আমরা এখন একটি রূপান্তরকাল পার করছি। আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। সারা বিশ্বেও একই অবস্থা। এটি স্বীকার করতেই হবে। তার পরও আমি বিশ্বাস করি, আমরা এগিয়ে যেতে পারব। ১৯৯৭ সালের এশীয় সংকট এবং ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট যেভাবে মোকাবেলা করেছি, এবারো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সবকিছু মোকাবেলা করব। করোনাসংকট তাড়াতাড়ি শেষ হবে বলে আশা করি।
সালেহউদ্দিন
আহমেদ
অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
আজকে বাংলাদেশ যে পর্যায়ে এসেছে, তা অত্যন্ত সন্তোষজনক একটা পর্যায়। আমাদের প্রবৃদ্ধি ৬-৭ শতাংশের বলয় থেকে বেরিয়ে এসেছে। নিঃসন্দেহে এটি ইতিবাচক। প্রবাসী আয়প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী। বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি বাড়ছে। মূল্যস্ফীতিও সহনীয়। দুটি নির্দেশক ভালো। আমরা উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণের প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করেছি, আবার নিম্নমধ্যম আয়ের দেশেও পৌঁছেছি। নির্দেশকগুলো অবশ্যই ভালো। কিন্তু ৪৯ বছর লেগেছে। এটা একটা দুঃখের ব্যাপার। এখন আর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা যাবে না। দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে হবে। এটিই আমার মতে সবচেয়ে মূল চ্যালেঞ্জ।
এতটা অর্জনের পথে যে আমরা হাঁটতে পেরেছি, তাতে বেশি অবদান হলো আমাদের সাধারণ মানুষের। তাদের কর্মপ্রেরণা ও উদ্যোগ। আমি অনেক সময় বলি, সরকার আইন-শৃঙ্খলা ঠিক রাখুক। ব্যক্তি খাত ও সাধারণ মানুষ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কৃষকরা আজকে খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা নিশ্চিত করেছেন। এজন্য তাদের ধন্যবাদ প্রাপ্য।
চ্যালেঞ্জগুলো উল্লেখ করা যাক। একটি হলো, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কম। এটি বাড়াতে হবে। ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৯-১০ শতাংশ থাকলে সেটি বোধ হয় মঙ্গলজনক কিছু নয়। বলা হচ্ছে, সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনা হবে। শুধু সুদহার কমালেই কিন্তু হবে না। সুদহারের সঙ্গে অন্য প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে। আমার এক বিদেশী ব্যবসায়ী বন্ধুর সঙ্গে ভিয়েতনামে দেখা হয়েছিল। আমি বললাম, বাংলাদেশে না গিয়ে তুমি এখানে কেন? সে বলেছিল, বাংলাদেশে প্রতিটি চেয়ারই টাকা চায়। তাহলে সেখানে আমি ব্যবসা কীভাবে করব? ভিয়েতনামে দুর্নীতির বিচার হয়, দায়ীদের শাস্তি হয়। আমাদের এখানে দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালনের সংস্কৃতি নেই। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ব্যাংকিং খাত।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করব তা হলো, উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণ। শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম আর রাজশাহীকেন্দ্রিক উন্নয়ন করলে হবে না, সারা দেশে উন্নয়ন করতে হবে। ঋণ বেশির ভাগ পান চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকার ব্যবসায়ীরা। অন্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক কম ঋণ পান। উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল—রাজনৈতিক স্বাধিকার আর অর্থনৈতিক মুক্তি। তার আকাঙ্ক্ষা ছিল সমতাভিত্তিক ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন। সঙ্গে রাজনৈতিক স্বাধিকার। দুটোই সমানতালে চলতে হবে।
এখন বিশ্বে একটা স্থবিরতা এসেছে। এটা মোকাবেলা করতে হবে। শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বহিঃস্থ চ্যালেঞ্জও আছে। আর্থিক প্রবাহ কমে যাবে। আবার এদিকে নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাব আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেন বেরিয়ে গিয়ে আরো ঝামেলা সৃষ্টি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে জিএসপি কমিয়ে দেবে আরএমজি সেক্টরে। যারা রফতানি করে তাদের জন্য বিষয়গুলো সহজ নয়, কঠিন। এগুলো অবশ্য মোকাবেলা করা যাবে।
আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। এখানে দক্ষতার অভাব এবং দুর্নীতি বিদ্যমান। ভালো ও সাহসী লোককে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে না। তাদের সামনে না আনা গেলে পরিবর্তন আসবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কথাই ধরা যাক। বাংলাদেশ ব্যাংকের যথেষ্ট স্বায়ত্তশাসন রয়েছে। তাদের নীতিগত বিষয়ে কিছুটা শক্ত হতে হবে। অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ক্ষেত্রে রাজনৈতিক গাইডলাইন থাকতে পারে, কিন্তু কাকে ঋণ দেবে না-দেবে, কাকে কোথায় বসানো হবে, সেটি ঠিক করে দেয়া এবং নয়ছয় ঠিক করা দেয়াও মনে হয় প্র্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্ত নয়। ব্যান্ড করে দেয়া যেত ৯-১৩ শতাংশ পর্যন্ত। মার্কেট ইকোনমিতে নয়ছয় কাজ করবে না। তার মানে আমরা পিছিয়ে গেছি। আশির দশকে চলে গেছি। জোর করে আদেশ-নির্দেশ বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। এটা লক্ষ করা দরকার।
আমাদের আরেকটি দুর্বলতা হলো, দক্ষ লোকের অভাব। সরকারি টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল করতে হবে। আবার সরকারের দিকে তাকিয়ে তাকলেও হবে না। ব্যক্তি খাতকেও এগিয়ে আসতে পারে। শুধু সরকার করবে, আপনারা কিছু করবেন না, শুধু দক্ষ লোক চাইবেন, তা হতে পারে না। নিজেদের কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ব্যক্তি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে।
এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম
অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পেছনে রফতানি একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত আমাদের রফতানির হার হলো মাইনাস ৫ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাত্ রফতানিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি। এখানেও বাজার বহুমুখীকরণের প্রয়োজন রয়েছে। পণ্য বৈচিত্র্যকরণের প্রয়োজন আছে। কারণ আমাদের রফতানির প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে পোশাক শিল্প থেকে। পণ্য বৈচিত্র্যকরণের ক্ষেত্রে নীতিগত কী পরিবর্তন আনা জরুরি, আমার মনে হয় তাতে নীতিনির্ধারকদের বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।
যেকোনো দেশের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিনিয়োগ একটি বড় ভূমিকা পালন করে। সেক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ প্রায় এক দশক ধরে জিডিপির আনুপাতিক হার হিসাবে ২২-২৩ শতাংশে স্থবির হয়ে আছে। সাম্প্রতিক চিত্র আরেকটু মনে হয় বিষাদ। ইজ অব ডুয়িং সূচকে আমাদের অবস্থান বেশ কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সেটি নিশ্চয়ই সুখবর। তবে এ সুখবরের পেছনে একটা অন্ধকার চিত্রও আছে। সেটি হলো, ১৭৬ থেকে আমরা ১৬৮ অবস্থানে গিয়েছি। অর্থাত্ ইজ অব ডুয়িং সূচকে বিশ্বের ১৬৭টি দেশের অবস্থান আমাদের ওপরে। গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটরেও আমরা তলানিতে আছি। এসব বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।
খেলাপি ঋণের বিপুলতার বাস্তবতার মধ্যে নয়ছয় সুদহার বাস্তবায়ন নিয়ে কিছুটা বিতর্কের অবকাশ আছে। ৯ শতাংশ যদি ঋণদান হার হয় তাহলে স্প্রেড হার বাংলাদেশের ইতিহাসে সাড়ে ৪ শতাংশের নিচে ছিল বলে আমার জানা নেই। সাড়ে ৪ শতাংশ থেকে স্প্রেড ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা খুব একটা সহজসাধ্য হবে না ব্যাংকগুলোর পক্ষে। এটি প্রথম কথা। দ্বিতীয়ত, আমানত হার ৬ শতাংশও যদি দেয়া হয় তাহলে তা মূল্যস্ফীতি কভার করবে না। তার ওপর রয়েছে আমানতের ১৫ শতাংশ আয়কর ও আবগারি শুল্ক। সব মিলিয়ে আমানতকারী ব্যাংকে অর্থ রাখলে তিনি অর্থ হারাবেন। তার নেট গেইন তো কিছুই হবে না, বরং নেট লস হবে। ফলে ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাবে এবং এরই মধ্যে এটি হচ্ছে। ব্যাংক আমানত না পেলে ঋণও দিতে পারবে না। এমনিতেই ব্যক্তি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি অনেকদিন ধরে কমে এসেছে। গত ডিসেম্বরে তা দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২ শতাংশে, সেটি বোধহয় গত ১০-১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এদিকে আমাদের পুঁজিবাজারের করুণদশা বিরাজমান। আমাদের দেশে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের অর্থায়নটা হয় ব্যাংকিং খাত থেকে। মূলধন বাজারে দুরবস্থা। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ব্যক্তি খাতে ঋণ যাচ্ছে না। তাহলে দেশে বিনিয়োগ কীভাবে বাড়বে? বিনিয়োগ না বাড়লে উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য বিষয় যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন প্রভৃতি ব্যাহত হতে বাধ্য।
আরেকটি বিষয় হলো, শিক্ষা খাত, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদীয়মান নতুন প্রযুক্তি অভিযোজনের ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। আর বৈশ্বিক চিত্র থেকে আমাদের বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এর মধ্যে এলডিসি ক্যাটাগরিতে উত্তরণ। ফলে বিশ্ববাজারে আমাদের শুল্কমুক্ত বা কোটামুক্ত প্রবেশগম্যতা চলে যাবে ২০২৭ সালের মধ্যে। অফিশিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্সের শর্ত আরো কঠোর হবে। অর্থাত্ উচ্চতর সুদ দিতে হবে, অথচ ম্যাচিউরিটি পিরিয়ড হবে কম। বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে হবে এলডিসিতে উত্তরণ হলে। সাম্প্রতিক সময়ের নভেল করোনাভাইরাসের মহামারী বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত করছে বলা হচ্ছে। ফলে সার্বিক বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্য দৃশ্যপটে একটা প্রতিকূল পরিবর্তন আসবে। এটিও আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কাজেই আমি মনে করি, নিশ্চয়ই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের বেশকিছু অর্জন আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও মেঘের ছায়া একই সঙ্গে বিরাজমান। সেই মেঘ যাতে সরাতে পারি, সেজন্য সরকার ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি।
হোসেন
জিল্লুর রহমান
চেয়ারম্যান, ব্র্যাক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
বাংলাদেশকে নিয়ে যেসব আলোচনা হয়, সেখানে দেখা যায় একটি লং ভিউ নেয়ার প্রবণতা আছে। ৫০ বছর আগে কী ছিলাম, এখন কোথায় আছি। কিন্তু এখন থেকে এগোনোর পথে কেবল লং ভিউর মধ্যে যদি আমরা আবদ্ধ থাকি, তাহলে নিয়ার-টার্ম ভিউ এবং চ্যালেঞ্জগুলো আসলে ভালোভাবে ফুটে ওঠে না। দারিদ্র্য কমেছে, কৃষির অগ্রগতি হয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে—এগুলো সবই লং ভিউর বৈশিষ্ট্য। নিয়ার-টার্ম চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা করাটা এখন খুবই জরুরি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু বিষয় তুলে ধরছি। একটি হলো, বাংলাদেশের সামনে বিশেষ করে কৌশলগত চিন্তায় আমাদের দুর্বলতা আছে কিনা বা নজর দেয়ার প্রয়োজন আছে কিনা। এখনো আমাদের প্রবৃদ্ধির চালক তৈরি পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্স। এ দুটোই মূল চালক। বাংলাদেশ যে পর্যায়ে এসেছে, সেখানে অন্যতম আলোচনার বিষয় হওয়া দরকার প্রবৃদ্ধির নতুন চালকগুলো কী হবে। কোথায় সেই নতুন চালকগুলো আছে। কারণ কম-বেশি একটা সময়ের মধ্যে বর্তমান চালকগুলোর কার্যকারিতা চলে আসবে। নতুন চালক কী হবে সেটি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা আছে এবং কিছু প্রকল্পও নেয়া হয়েছে। কিন্তু সেই উদ্যোগ এখনো নতুন প্রবৃদ্ধি চালক তৈরি করতে পারেনি।
দ্বিতীয় আরেকটি বিষয়, বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে সম্পদের স্বল্পতা আছে, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো, আমরা একটি অদক্ষ ব্যয়ের সিনড্রোমের মধ্যে আছি। প্রচুর ব্যয় হচ্ছে, বাজেটের কলেবর বাড়ছে, উন্নয়ন প্রকল্প বাড়ছে, কিন্তু ব্যয় কার্যকারিতার দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এর একটি সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের প্রবৃদ্ধির মানের ওপর। ব্যয় অদক্ষতা এটি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত সমস্যা। এক্সপেন্ডিচার ইনইফিশিয়েন্সি একটা সুন্দর শব্দ। কিন্তু এর পেছনে অনেকগুলো বিষয় লুকিয়ে আছে। একটি হলো অদক্ষতা, একটি হলো দুর্নীতি, একটি হলো অপচয়, একটি হলো দীর্ঘসূত্রতা। সবগুলোই এক্সপেন্ডিচার ইনইফিশিয়েন্সিতে ভূমিকা রাখছে। প্রকল্পের ছড়াছড়ি হচ্ছে, কিন্তু সুদক্ষ-কার্যকর প্রকল্প সামনে নিয়ে আসাটা অত্যন্ত জরুরি। কারণ আমাদের সম্পদ স্বল্প, এজন্য এটাকে আরো কার্যকরভাবে ব্যবহার করে প্রবৃদ্ধির মাত্রা বাড়াতে হবে।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ যে পর্যায়ে এসেছে, সেখানে দেখা যাবে আরএমজি ও রেমিট্যান্স দুটোরই সেলিং পয়েন্ট হলো স্বল্প ব্যয়ের শ্রম। যে মধ্যম আয়ের বাংলাদেশে যেতে চাইছি, সেখানে স্বল্প ব্যয়ের শ্রম দিয়ে মানসম্পন্ন মধ্যম আয়ের অর্থনীতি তৈরি করা যাবে না। বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ হলো, লো কস্ট লেবার ইকোনমি থেকে হাই প্রডাক্টিভ ইকোনমিতে উত্তরণ ঘটানো। হাই প্রডাক্টিভ ইকোনমিতে যেতে হলে দুটি খাত খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত। এ খাতে প্রচুর খরচ হচ্ছে, কিন্তু মানসম্পন্ন শিক্ষা ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছি না। এক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি আছে। এমন নয় যে সময় দিলেই এটি ঠিক হয়ে যাবে। এটি আসলে একটি কাঠামোগত সমস্যা। মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে কৌশলগত চিন্তা পরিষ্কার করা না গেলে লো কস্ট ইকোনমি নিয়ে আমরা যতটা এগোতে পারছি, তাতেই আমাদের আটকে থাকতে হবে। বেশি দূর যেতে পারব না।
বাংলাদেশের তিনটি মূল সম্পদ আছে। এক. অন্ট্রাপ্রেনিউয়াল স্পিরিট। আমাদের উদ্যমী মানসিকতা। এটি অন্যতম বড় সম্পদ। অশিক্ষিত কৃষকই কিন্তু আমাদের কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করেছেন। কারণ অন্ট্রাপ্রেনিউয়াল স্পিরিট ছিল। আরএমজি উঠেছে, রেমিট্যান্স বেড়েছে এর কারণে। দ্বিতীয়ত, আমাদের আকাঙ্ক্ষা। অনেক দেশ আছে দারিদ্র্য নিয়ে পড়ে আছে। তকদিরের লিখন, কোনো পরিবর্তন হবে না—এভাবে চিন্তা করে। আমাদের সমাজে আকাঙ্ক্ষা-উদ্দীপনা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের কারণে হোক, সময়ের বিবর্তনে হোক অ্যাসপিরেশনাল সোসাইটি, এটিও কিন্তু একটি অন্যতম সম্পদ। শত ধরনের সমস্যা থাকলেও কেউ বসে থাকতে রাজি নয়। কোনো না কোনোভাবে এগোনোর চেষ্টা করে যাবে। কারণ অ্যাসপিরেশন আছে। এটিও বড় শক্তি। তৃতীয় একটি সম্পদ আছে। তা হলো সলিউশন মাইন্ডসেট। নিজেরা মিলে সমাধানগুলো বের করার একটি চেষ্টা করা হচ্ছে। এই তিনটিই হলো আমাদের মূল সম্পদ। আজকে এই সম্মেলনে যে কৌশলগত প্রশ্ন করা দরকার তা হলো, এই তিনটি সম্পদকে আমাদের রাজনীতিতে, নীতিনির্ধারণী মহল লালন করছে কিনা, তাদের সহায়তা করছে কিনা, তাদের ক্ষেত্রগুলো সম্প্রসারিত করছে কিনা—এটিই হলো মূল বিষয়।
সালমান এফ রহমান, এমপি
প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা
জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে যখন বলতেন, আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ এ পর্যায়ে চলে যাবে, কেউ কিন্তু বিশ্বাস করত না। সবাই বলত এটি সম্ভব নয়। ২০০৮ সালে আমাদের বাজেটের আকার ছিল ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আর গত বাজেটের আকার ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। এটি তো এমনি এমনি হয়নি। এখানে সুনিশ্চিতভাবে সরকারের অবদান আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্ব আছে। তিনি যদি সেভাবে নেতৃত্ব না দিতেন তাহলে যতই আমাদের অন্ট্রাপ্রেনিউয়াল স্পিরিট থাকুক না কেন এ উন্নতি সম্ভব হতো না। আমাদের অন্ট্রাপ্রেনিউয়াল স্পিরিট সব সময়ই ছিল। প্রতিটি ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকে এ ধরনের প্রবৃদ্ধি ২০০৯ সালের আগে কিন্তু কোনো দিনই হয়নি। ক্ষমতায় এসে তিনি উপলব্ধি করলেন অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে প্রথমে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে জ্বালানিতে। বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধান না হলে আমরা কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির পথে যেতে পারব না। আজকে এনার্জি সমস্যার সমাধান হওয়ায় দেশ বেশি প্রবৃদ্ধি হারের দিকে যাত্রা করছে। সবারই জানা প্রতিটি খাতেই এনার্জি লাগে। তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন।
সঞ্চয় হার নিয়ে কথা উঠেছে। এখনো বাংলাদেশে সঞ্চয় হার ৩০ শতাংশ। যেখানে ভারতে সঞ্চয় হার ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ। আমাদের সঞ্চয় হার অনেক বেশি, বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতার এটি একটি কারণ। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি শক্তিশালী। আলোচনায় একজন বলেছেন, আন্ডার দ্য ম্যাট্রেস টাকা আছে। আমি এটি বিশ্বাস করি না। আরেকটি বিষয় সবসময়ই বলা হচ্ছে এবং আমার কাছে বিস্ময় লাগে যে প্রবৃদ্ধি অসম-বৈষম্যমূলক। আমার কথা হলো, যে দেশেই প্রবৃদ্ধি হবে, সেখানে অসমতা-বৈষম্য থাকবে। অসমতা আসলে প্রবৃদ্ধির অন্যতম ফাংশন। অসমতা ছাড়া প্রবৃদ্ধি অসম্ভব নয়। কিন্তু দেখতে হবে নিম্ন পর্যায়ে অসমতা প্রশমন হচ্ছে কি হচ্ছে না। সবাই স্বীকার করছেন, দারিদ্র্যের হার কমে আসছে। তবে আমি আরো এক ধাপ এগোতে চাই।
আমাদের অবশ্যই চ্যালেঞ্জ আছে। সেগুলো অ্যাড্রেস করছি এবং সমাধান করছি। আমাদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো, জিডিপির আনুপাতিক হারে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো। অর্থমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ কিছু পণ্যে আমদানি পর্যায়ে আমরা যেসব শুল্ক বা কর অব্যাহতি দিয়েছি, সেগুলোকে যদি কর আহরণ হিসেবে ধরে নিই তাহলে ট্যাক্স টু জিডিপি রেশিও আরো বাড়বে। কিন্তু যে কর অব্যাহতিগুলো দিয়েছি, সেটিও আবার প্রয়োজন। কর অব্যাহতি না দিলে আমরা বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারতাম না।
করের ক্ষেত্রে একটি বিষয় দেখা যাচ্ছে, করজালে যারা ঢুকে গেছে, তাদের ওপর বেশি কর ধার্য করা হচ্ছে। যারা করজালের বাইরে আছে, তাদের কর নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ, অধিক লোককে করজালের আওতায় আনা। অটোমেশন করলে এটি সম্ভব। অর্থমন্ত্রী এটা নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করছেন। সরকারি পর্যায়ে অটোমেশনের জন্য কাজ হচ্ছে। আমি মনে করি, অটোমেশনের ক্ষেত্রে এনবিআর যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে এর সুফল আমরা পাব এবং ভবিষ্যতে কর আহরণ আরো বাড়বে।
ইজ অব ডুয়িং বিজনেসের কথা উঠে এসেছে। এ সূচকে আমাদের উন্নতি হয়েছে। র্যাংকিং শুধু উন্নতি করেনি, বিশ্বের ২০ টপ রিফরমার দেশের মধ্যেও রয়েছি। কিন্তু এটি যথেষ্ট নয়। ১৬৮তম অবস্থান নিঃসন্দেহে খুব একটা ভালো খবর নয়। এ নিয়ে আমরা অনেক কাজ করেছি।
শ্রুতলিখন: হুমায়ুন কবির





