১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে হাতে গোনা যে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন তাদের অন্যতম মেজর চিত্ত রঞ্জন দত্ত। যিনি সিআর দত্ত নামেই বেশি পরিচিত। মহান মুক্তিযুদ্ধে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেতাবপ্রাপ্ত বীর উত্তম সিআর দত্ত ৪ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন। তার কমান্ডের সদর দপ্তর ছিল খোয়াই, আর মুক্তিযুদ্ধের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ সেক্টরটি গঠিত হয়েছিল ১২ জুলাই ১৯৭১। সেক্টরটি গঠনের শুরু থেকেই অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন সিআর দত্ত। রণাঙ্গনে শত্রুসেনাকে পরাজিত করে ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীনতার লাল সূর্য।
মেজর জেনারেল (অব.) সিআর দত্ত চলতি বছরের আগস্ট মাসের শেষে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। পরিণত বয়েসেই (৯৩ বছর) সবাইকে ছেড়ে গেছেন যুদ্ধদিনের এ মহানায়ক। তবে তিনি রেখে গেছেন এক সফল ও সমৃদ্ধ কর্মজীবনের উত্তরাধিকার (লিগ্যাসি)। যে উত্তরাধিকার থেকে দেশপ্রেম, সফল সংগঠন ও আন্দোলন করার অনুপ্রেরণা পেতে পারে আগামী প্রজন্ম।
যুদ্ধদিনে কমান্ডার সিআর দত্তকে দেখার সুযোগ হয়নি। যুদ্ধে তার অবদান ও বীরত্বের কথা অনেক ঐতিহাসিক লিখেছেন। যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। কিন্তু এ প্রজন্মের প্রতিনিধি, এ নিবন্ধের লেখকের সামনে সিআর দত্ত ধরা দিয়েছেন একজন সংগঠক হিসেবে। ২০০৭ সালের ২৫ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনে ‘বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী ছিল না, এখনো নেই’ বলে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিলেন আল-বদর নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ। একজন চিহ্নিত মানবতাবিরোধী অপরাধীর মুখে এমন আস্ফাালনে ব্যথিত হয়েছিলেন সিআর দত্ত। উল্লেখ করা যেতে পারে, জামায়াত নেতা মুজাহিদের এ আস্ফাালনের পর পরই ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠে ‘সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম’ নামের একটি সংগঠন। যে সংগঠনটির অত্যন্ত সক্রিয় সদস্য ছিলেন সিআর দত্ত। সংগঠনটির সর্বশেষ কমিটিতে সিআর দত্ত ছিলেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ভাইস চেয়ারম্যান। শেষ বয়সে নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ সংগঠনের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন রণাঙ্গনের এ বীর যোদ্ধা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এ সংগঠন জনমত তৈরিতে বিশেষ কার্যকর ভূমিকা রাখে। যার প্রতিফলন দেখা যায় ২০০৮ সালের নির্বাচনে। পরবর্তী সময়ে মানবতাবিরোধী বিচারের প্রক্রিয়া শুরু ও গতি বৃদ্ধিতে প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করেছে সিআর দত্তের সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম। এছাড়া আরো বেশ কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন সিআর দত্ত।
প্রতিরোধের ইতিহাস
সিআর দত্তের লেখা থেকেই জানা, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ আনুমানিক বেলা দুটোর দিকে কর্নেল রব তার বাসায় ডেকে পাঠালেন তাকে। তিনি সেখানে গিয়ে ছুটিতে থাকা কয়েকজন সেনাসদস্য, আনসার, মুজাহিদ প্রভৃতি বাহিনীর সদস্যদের দেখতে পেলেন। কর্নেল রব তাকে সবার সঙ্গে পরিচয় করানোর পর বললেন, সিলেট দখল করার পরিকল্পনা করেছেন তিনি এবং সিআর দত্তকে এ অভিযানের নেতৃত্ব দিতে হবে। এরপর বিকাল ৫টায় আমার বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল একটি জিপ এবং পাঁচটি বাস ও ট্রাক, তাতে মুক্তিযোদ্ধারা। ‘স্বাধীনতার ডাক এসেছে, আমাকে এখনই যেতে হবে’, স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন তিনি।
সিআর দত্ত, কর্নেল রব ও মানিক চৌধুরী একসঙ্গে গাড়িতে শায়েস্তাগঞ্জের রশিদপুর চা-বাগানের উদ্দেশে রওনা দিলেন। পথে অনেক প্রতিবন্ধকতা। রশিদপুর পৌঁছতে বেজে গেল রাত ১১টা। সে রাতে চা-বাগানেই থাকলেন সবাই।
মুক্তিবাহিনী এবং তাদের অস্ত্রের হিসাব নিলেন ২৮ মার্চ সকালে। দেখা গেল, ছুটিতে আসা সৈনিক, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ—সব মিলিয়ে অস্ত্রধারীর সংখ্যা মাত্র ১৫০ জনের মতো। তাদের সঙ্গে আছে পয়েন্ট ৩০৩ রাইফেল আর দশ রাউন্ড গুলি। কোনো স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নেই। এত অল্প শক্তি নিয়ে সিলেট মুক্ত করা যে প্রায় অসম্ভব তা বুঝেও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হলেন না তারা। স্থানীয় জনগণকে তাদের যা কিছু আছে তা নিয়েই যুদ্ধে যোগ দিতে অনুরোধ করলেন।
৩০ মার্চ খবর মিলল, শত্রু বাহিনী শ্রীমঙ্গল এসে নিরপরাধ জনগণের ওপর অত্যাচার করছে। তাদের প্রতিহত করতে ৩০ মার্চ দিবাগত রাতে শ্রীমঙ্গলের প্রায় দুই মাইল দূরে অবস্থান নিলেন সিআর দত্তসহ অন্যরা। কিন্তু ৩১ মার্চ সকাল ৮টায় শ্রীমঙ্গল শহরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল শ্রীমঙ্গল ছেড়ে মৌলভীবাজারের দিকে চলে গেছে শক্র বাহিনী। সময় নষ্ট না করে মৌলভীবাজারের উদ্দেশে রওনা হলেন তারা। শ্রীমঙ্গল থেকে সাত-আট মাইল দূরে নয়নপুরের কাছে নাগালের মধ্যে পেলাম শত্রসেনাদের। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণে পরাস্ত হলো তারা। এরপর তাদের লক্ষ্য সিলেট আক্রমণ। ফলে রশিদপুর থেকে বেসক্যাম্পটি সরিয়ে আনা হলো মৌলভীবাজারে।
এর মধ্যে সীমান্ত থেকে সঙ্গে যোগ দিয়েছেন ইপিআর সদস্যরাও। সব মিলিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা তখর চার শতাধিক। এ সময় সংবাদ এল পাকিস্তানি সৈন্যরা সিলেট থেকে প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটার দূরে সাদীপুর আর শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর উত্তর পাড়ে অবস্থান নিয়েছে। ৫ এপ্রিল ভোররাতে হলো শেরপুর আক্রমণের পরিকল্পনা।
৪ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে শেরপুরের উভয় দিকে নদীর দক্ষিণ পাড়ে দুই প্লাটুন করে সৈন্য প্রস্তুত রাখা হলো। পরিকল্পনা করা হলো ভোরের আলো ফোটার পরপর সিআর দত্তের নির্দেশে সামনের মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুর দিকে গুলি ছুড়ে তাদের ব্যস্ত রাখবেন। এ সময় দুদিকের মুক্তিযোদ্ধারা নদী পার হয়ে শুরু করবেন সাঁড়াশি আক্রমণ। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে সামনের মুক্তিযোদ্ধারাও নদী পার হয়ে আক্রমণ করবেন শত্রুকে। রাত ১০টার দিকে সবাইকে বুঝিয়ে দেয়া হলো পরিকল্পনা। কিন্তু ভোর পাঁচটায় মুক্তিযোদ্ধদের উপস্থিতি টের পেয়ে গোলাগুলি শুরু করে দিল শত্রুরা। মুুক্তিযোদ্ধারাও দিতে থাকল পাল্টা জবাব। একপর্যায়ে এলাকাবাসীও যোগ দিল। দুপুর ১২টার দিকে ১২ জন সহযোদ্ধার লাশ ফেলে সাদীপুরের দিকে পালিয়ে গেল শত্রুরা। এ যুদ্ধে শহীদ হন তিন মুক্তিযোদ্ধা।
পরদিন মৌলভীবাজার গিয়ে (পরে মেজর জেনারেল ও বীর উত্তম) সফিউল্লাহকে পেলেন সিআর দত্ত। তিনি সেকেন্ড ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিয়ে বিদ্রোহ করেছিলেন। সিলেট আক্রমণের জন্য তাকে কিছু প্রশিক্ষিত সৈন্য দেয়ার অনুরোধ করলেন সিআর দত্ত। তার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ক্যাপ্টেন (পরে মেজর জেনারেল ও বীর উত্তম) আজিজুর রহমানকে এক কোম্পানি সৈন্যসহ তার কাছে পাঠিয়ে দিলেন সফিউল্লাহ।
কেবল সিলেট শহর ছাড়া সম্পূর্ণ সিলেট জেলা সিআর দত্তের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে এল ৭ এপ্রিলের মধ্যে। শত্রুরা সিলেট বিমানবন্দর ও লাক্কাতুরা চা-বাগানের মধ্যে তখন অবরুদ্ধ। এখনই তাদের পুরোপুরি ধ্বংস করার উপযুক্ত সময়। তবে এর জন্য আরো সৈন্য দরকার। কর্নেল রব ও মানিক চৌধুরীর কাছে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্রের জন্য খবর পাঠালেন সিআর দত্ত।
৮ এপ্রিল সকালে সিলেট মুক্ত করার পরিকল্পনা করলেন সিআর দত্ত ও আজিজ। এমন সময় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর লে. কর্নেল লিমাইয়া এলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আসামের শিলচরে যাওয়ার আহ্বান জানালেন। শিলচরে গিয়ে ভারতীয় সাহায্যের ব্যাপারে তাদের সম্মতি লাভ করা হলো। আলাপ-আলোচনায় বেজে গেল রাত ১২টা। রাতেই সিলেটের উদ্দেশে রওনা হয়ে পথে সড়ক দুর্ঘটনায় বুকে ও পায়ে আঘাত পেলেন সিআর দত্ত। কিন্তু আহত অবস্থায়ই সিলেটে এসে সৈন্য পরিচালনা করলেন।
১০ এপ্রিল সারা দিন চলল দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি। শত্রু বিমান আজিজের অবস্থানে উপর্যুপরি বোমাবর্ষণ শুরু করল। ফলে অবস্থান ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ল তার পক্ষে। তিনি অবস্থান ত্যাগ করে বাহিনী নিয়ে মৌলভীবাজারের দিকে চলে গেলেন। লাক্কাতুরার প্রতিরক্ষা অবস্থান ছেড়ে গোলাপগঞ্জে নতুন প্রতিরক্ষা অবস্থান নিলেন সিআর দত্ত। পাকিস্তানিরা এরই মধ্যে সিলেটে নতুন সৈন্য, অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে এসেছে। পরে যুদ্ধ করতে করতে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের করিমগঞ্জে পৌঁছল সিআর দত্তের বাহিনী। এভাবেই শেষ হলো সিলেট এলাকায় সিআর দত্তের প্রতিরোধ যুদ্ধ। এরপর নতুনভাবে সংগঠিত হয়ে ৪ নম্বর সেক্টর কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে আমাদের জন্য নিয়ে আসেন সেই কাঙ্ক্ষিত বিজয়।
পুরানো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, এক বিকালের আড্ডা ও একজন সিআর দত্ত
সময়টা খুব সম্ভবত ২০০৯ সালের ডিসেম্বর ছিল। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বিজয়ের মাসে তাদের সেগুনবাগিচা কার্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করে। এমনই একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন সিআর দত্ত। আর একটি টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক হিসেবে আমি সেই ইভেন্ট কাভার করতে গিয়েছিলাম। বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে শীত সন্ধ্যার ওই পরিবেশ ছিল বেশ মনোরম। এক কাপ চা হাতে অনুমতি নিয়ে বসেছিলাম সিআর দত্তের পাশে। চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে দু-একটা কথা হয়েছিল। দেশের রাজনীতি আর অর্থনীতিতে স্বাধীনতাবিরোধীদের শক্ত অবস্থানে বেশ শঙ্কিত ও বিরক্ত ছিলেন সিআর দত্ত। তার সহজ কথা, তাদের থামাতে হবে, যেকোনো মূল্যে, আর সেটা এখনই। এছাড়া আরো বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলাপ হয়েছিল এই বীর যোদ্ধার সঙ্গে। স্বল্প সময়ের এ আলাপচারিতায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। এত কোমল, নরম আর আন্তরিকতা দিয়ে খুব কম মানুষই কথা বলতে পারেন। সাধারণত এমন দেখা যায় না। সিআর দত্ত ছিলেন সেই রকম ব্যক্তিত্বের মানুষ। কথা খুব বলতেন না, কিন্তু যতটুকু বলতেন আন্তরিকতার সঙ্গে বলতেন, নিষ্ঠার সঙ্গে বলতেন আর বলতেন যতটা সম্ভব কোমল গলায়। সিআর দত্ত চলে গেছেন, কিন্তু কোমল গলার, নিম্ন স্বরের আন্তরিক মানুষটি এখনো আমাকে আচ্ছন্ন করে। হয়তো আমার মতো এখনো আচ্ছন্ন হন তার হাজারো পরিচিতজন।
সিআর দত্তের জন্ম ভারতের শিলংয়ে। তবে তার পৈতৃক বাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট। ১৯৫১ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৭১ যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাকে ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে রংপুরে বদলি করা হয়। পরে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় বিডিআর পুনর্গঠনের। তিনি ছিলেন বাহিনীটির প্রথম মহাপরিচালক। তবে অজ্ঞাত কোনো এক কারণে সিআর দত্তকে এ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। যা নিয়ে তার গভীর মনোবেদনা ছিল।
যাই হোক সিআর দত্ত আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তবে আছে তার কীর্তি। কীর্তিমান এই বীর যোদ্ধার উদ্যম ও কর্মস্পৃহা আগামীতে অন্যের কাছে অনুসরণীয় হয়ে থাকবে। এমনটা কামনা করে সিআর দত্তের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে শেষ করছি। স্যালুট—একাত্তরের বীর যোদ্ধা।
রাহাত মিনহাজ: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়





