বর্তমান প্রবন্ধের উত্থাপিত শিরোনামে গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ঋণ ও বিত্তহীন— এ ধারণাগুলো আলাদা আলাদাভাবে লিখিত হয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, এগুলো পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। আসলে এগুলো একই সমীকরণের অংশ এবং সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে এগুলোই বৃহত্তর একটি রাজনীতি-অর্থনীতির অংশ। আমরা যদি এগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার চেষ্টাও করি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এগুলোকে একত্র করে একটি বক্তব্য আমাদের সামনে তুলে নিয়ে আসতে হবে। প্রবন্ধে যেসব উত্থাপিত ধারণা আমাদের সামনে এসেছে, সেগুলোর কোনো কোনোটির বিস্তৃত সংজ্ঞার প্রয়োজন এবং এগুলোকে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজনও রয়েছে। কারণ এর কোনো কোনোটি সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমাণে আশঙ্কা ও অস্বচ্ছতা রয়ে গেছে। উপস্থাপনের দিক থেকে অর্থাৎ বিন্যাসের দিক থেকে মোটামুটিভাবে যেসব ধারণা দেয়া হয়েছে, সেগুলো আলাদা আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করব এবং সে পরিপ্রেক্ষিতেই গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা পর্যায়ক্রমে বর্ণনা করার চেষ্টা করব। প্রবন্ধের দ্বিতীয় অংশে এসব ধারণার আন্তঃসম্পর্ক এবং তাদের মিথস্ক্রিয়ার ফলে আজ যে পরিস্থিতি বিরাজমান, তা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হবে। প্রবন্ধের শেষ ও তৃতীয় অংশে ভবিষ্যতে আমরা কোন পথে যাব, কোন পথে যেতে হবে, সে সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করব।
প্রথমে গণতন্ত্র নিয়ে আমরা শুরু করি। কাকে আমরা গণতন্ত্র বলব? গণতন্ত্র কি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপার মাত্র? গণতন্ত্র কি শুধু সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত কিছু নীতিমালা? নিশ্চয়ই তা নয়। গণতন্ত্র একটি অবিরাম চর্চার ব্যাপার এবং সে চর্চা ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, গোষ্ঠী জীবন, সমাজ জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রয়োজন। আমাদের ব্যক্তিজীবনে যদি গণতন্ত্রচর্চা না থাকে এবং পরিবার ও গোষ্ঠী জীবনে গণতন্ত্র চর্চা না থাকে, তাহলে কখনই রাষ্ট্রীয় জীবনে গণতন্ত্রের চর্চা হতে পারে না। এ প্রশ্ন বোধহয় আমাদের প্রত্যেকেরই করা উচিত যে, আমরা ব্যক্তিজীবনে কতখানি গণতন্ত্রী। আমরা যতখানি বলতে চাই, অন্যের কথা কি ততখানি শুনতে চাই? পারিবারিক জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজের সিদ্ধান্ত যতখানি চাপিয়ে দিতে চাই, সেক্ষেত্রে পরিবারের অন্য সদস্যের যে মনোভাব, ধ্যান-ধারণা সেটাকে কি আমি সম্মান করি? গোষ্ঠী জীবনে আমি কতখানি গণতন্ত্রের চর্চা করি? যে রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রের কথা বলে, সে দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা কতখানি হয়?
সুতরাং আমরা যদি এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হই, তা হলে দেখতে পাব যে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা চর্চার একটা অভাব আমাদের প্রতিটি স্তরে রয়ে গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে গণতন্ত্রের একটি সংজ্ঞা আমার কাছে খুব ভালো মনে হয়। সেটি হচ্ছে: গণতন্ত্রের জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করাই হচ্ছে গণতন্ত্র। এটি একটি শিল্প, এটি একটি বিজ্ঞান নয়। এ শিল্পের চর্চা প্রয়োজন। এটাকে চর্চা না করলে গণতন্ত্র আপনাআপনিভাবে আসবে না।
দ্বিতীয়ত. গণতন্ত্রের দুটি মাত্রিকতা আছে। একটি হচ্ছে রাজনৈতিক গণতন্ত্র, অন্যটি হলো অর্থনৈতিক গণতন্ত্র। আমরা প্রায় সবসময় রাজনৈতিক গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলি। আমরা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা হওয়ার কথা বলি। কিন্তু গণতন্ত্রের যে অর্থনৈতিক মাত্রিকতা আছে, সেটা সম্পর্কে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কাকে আমরা অর্থনৈতিক গণতন্ত্র বলব? যে ব্যবস্থার মধ্যে একজন মানুষের সম্পদে, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে, অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়, সেটিই অর্থনৈতিক গণতন্ত্র। অতএব দেশের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বিরাজ করলেই সেখানে সম্পদে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে, পরিকল্পনায় যদি সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা না যায়, তা হলে অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে না এবং সাধারণ মানুষের জন্য গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে কোনো সুফল বয়ে আনবে না।
গণতন্ত্রের জন্য কী প্রয়োজন? গণতন্ত্রের জন্য প্রথমত প্রয়োজন চর্চার, দ্বিতীয়ত সহিষ্ণুতার। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পরস্পরের মতের প্রতি যদি শ্রদ্ধাবোধ ও সহিষ্ণুতা না থাকে, সেখানে গণতন্ত্র আসতে পারে না। একটি কথা আমার প্রায়ই মনে হয়— সে বিখ্যাত কথাটি হচ্ছে, আমি আমার নিজের মত প্রকাশ করার জন্য সবসময় প্রয়াসী হব। কিন্তু তুমি যাতে তোমার মত প্রকাশ করতে পারো, তার জন্য আমি জীবন উৎসর্গ করতে পারি। এ রকম একটি পরিবেশ গণতন্ত্রের জন্য কাম্য। আমরা যদি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা দেখি, তা হলে দেখব, এখানে খুব স্বল্প সময় ছাড়া গণতন্ত্রের সত্যিকার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ছিল না। আমরা কতগুলো মূল্যবোধ নিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছি। সে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছি। কিন্তু তারপর আমরা দেখেছি স্বাধীনতা-উত্তর কয়েকটি বছর পার হয়ে যাওয়ার পরই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আমাদের ব্যক্তিজীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। হত্যার রাজনীতি দিয়ে যখন আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তখন থেকেই আমরা গণতন্ত্রকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছি। যখন একটি দেশে দলছুটের রাজনীতি শুরু হয়ে যায়, যখন আমরা এটা মনে করি যে, রাজনীতিকে অত্যন্ত কষ্টকর ও কঠিন করে দেয়া হবে, সেই প্রেক্ষাপটে সেখানে গণতন্ত্র টিকতে পারে না। যদি রাজনীতিকে সবার জন্য সহজ করে দেয়া যায় এবং রাজনীতিতে সবার প্রবেশাধিকার ও সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সেখানে গণতন্ত্র একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা সত্তরের দশকের পর থেকেই দেখেছি, বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসন নানা রূপ নিয়ে আমাদের রাজনীতিতে এসেছে এবং আসার পরপরই গণতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পর সে গণতন্ত্র পেছনে হারিয়ে গেছে। সত্যিকার অর্থে, স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রথম ২০ বছরের বেশির ভাগ সময় বিভিন্ন রকমের স্বৈরাচারের মাঝখান দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রবাহিত হয়েছে। মাত্র একজন স্বৈরাচারী শাসক রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন থাকলেই স্বৈরাচার থাকে না। স্বৈরাচার একটি ব্যাধির মতো এবং এটি একটি মূল্যবোধের ব্যাপার। যদি সে মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা বিরাজমান থাকে, তাহলে সেটাকে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা বলা যেতে পারে। গত ২০ বছরে আমরা বাংলাদেশে সে রকম একটা ব্যবস্থা দেখেছি। আমরা গণতন্ত্রকে কুক্ষিগত দেখেছি একটা মোর্চার হাতে এবং সরকার আমলাতন্ত্র, সামরিক বাহিনী ও একটি নব্য ধনিকশ্রেণী মিলে মোটামুটিভাবে এই মোর্চাটি তৈরি করেছিল। সব গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, রাষ্ট্রক্ষমতা, রাষ্ট্র কাঠামোর চাবিকাঠি এই মোর্চার হাতে ছিল এবং সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। অতএব, স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রথম ২০ বছরের অভিজ্ঞতায় আমরা রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সবচেয়ে যে ক্ষতিটি করেছি, সেটি হচ্ছে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের মূল্যবোধকে আমরা নষ্ট করে দিয়েছি। এতে আমরা গণতন্ত্রকে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারিনি। আর একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছাড়া গণতন্ত্র কখনই বেঁচে থাকতে পারে না।
এবার যদি অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের দিকে আসি, তাহলে আমরা এ কথা বলতে পারব যে, আমরা সম্পদে, সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা গ্রহণে কখনই সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করিনি। নিজেদের স্বার্থেই তা করিনি। আমরা ঢাকাকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা গ্রহণ ও সম্পদ প্রবাহের ব্যবস্থা করেছি। কারণ পুরো জিনিসটির ওপর আমরা ঢাকাকেন্দ্রিক একটি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। অতএব বিকেন্দ্রীয়করণের নামে আমরা সমস্যাকে বিকেন্দ্রীভূত করেছি অনেক বেশি এই রাজধানী শহরে। আমরা যদি অর্থনৈতিক গণতন্ত্রে অর্থাৎ সম্পদে মানুষের প্রবেশাধিকারের কথা বলি, যদি কিছু উপাত্তের দিকে আমরা তাকাই, তা হলে দেখতে পাব, ১৯৮১ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত যেসব জিনিস গরিব মানুষের উপকারে আসতে পারে, দরিদ্র গোষ্ঠীর উপকারে আসতে পারে, সেগুলোর পেছনে কত সরকারি ব্যয় হয়েছে। আমরা যে মানবসম্পদ উন্নয়নের কথা বলি, এর মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ ইত্যাদি রয়েছে। এ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যই ১৯৮১ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সরকারি ব্যয়ের মাত্র ১৫ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছে। আমরা বলে থাকি যে, কৃষি ও পানিসম্পদের উন্নয়ন করা হলে সেখান থেকে দরিদ্র মানুষ লাভবান হতে পারে। কিন্তু এর পেছনে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মাত্র ৩ শতাংশ সরকারি ব্যয় হয়েছে। আমরা ভর্তুকি কমানোর জন্য যথেষ্ট চেঁচামেচি করি এবং দাতা গোষ্ঠীগুলোও এ ব্যাপারে চেঁচামেচি করে। কিন্তু এই ভর্তুকির অংশ কাদের কাছে যায়? ১৯৮১ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মোট যে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে, তার ৫ দশমিক ২ শতাংশ সাধারণ গরিব মানুষের কাছে গেছে। অতএব সম্পদ ও সেখানে সাধারণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কতখানি অংশগ্রহণ আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি? আর একটু ভিন্নতর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাক। আমরা তিন ধরনের দরিদ্রের শ্রেণীবিন্যাস যদি করি, তাহলে মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকার কম যারা আয় করেন, তাদেরকে চরম দরিদ্র এবং ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে যাদের মাসিক আয়, তারা হচ্ছেন দরিদ্র এবং ২ হাজার টাকার ওপরে যাদের মাসিক আয়, তারা দরিদ্র নন। এ শ্রেণীবিন্যাসের ভিত্তিতে মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকারি ব্যয়ের দিকে যদি আমরা তাকাই, তাহলে দেখা যায়, চরম দরিদ্রের জন্য খরচ করা হয়েছে ১৬৩ টাকা, দরিদ্রের জন্য খরচ করা হয়েছে ১৯০ টাকা এবং যারা দরিদ্র নয়, তাদের জন্য খরচ করা হয়েছে ৭৮২ টাকা। মানবসম্পদ উন্নয়নে চরম দরিদ্রের জন্য যেখানে ১৬৩ টাকা খরচ করা হচ্ছে, সেখানে তার ৭ গুণ বেশি খরচ করা হচ্ছে, যারা দরিদ্র নয় তাদের পেছনে। আমরা যদি ভর্তুকির কথা বলি, তাহলে চরম দরিদ্রের জন্য যেখানে ভর্তুকি ব্যয় হচ্ছে ৫৪ টাকা, সেখানে যারা দরিদ্র নয়, তাদের পেছনে ব্যয় হচ্ছে ১২৫ টাকা। আমরা যদি কৃষি ও পানিসম্পদ উন্নয়নে সরকারি ব্যয়ের হিসাব করি, তাহলে চরম দরিদ্রের পেছনে যেখানে ৩৮ টাকা খরচ করা হয়েছে, সেখানে যারা দরিদ্র নয়, তাদের পেছনে খরচ করা হয়েছে ১০০ টাকার মতো। অতএব এটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। কিন্তু এটি নির্দেশ করে একটি প্রবণতা, যে প্রবণতার মধ্যে সম্পদে দরিদ্রগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ কতখানি, সেটা আমরা বুঝতে পারি। গত ২০ বছরে অর্থনৈতিক গণতন্ত্র এ ধারায় প্রবাহিত হয়েছে এবং এ ধারার মধ্যে আমরা কখনই আমাদের যে চরম দরিদ্রগোষ্ঠী আছে, তাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে, সম্পদে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে তার অধিকারকে নিশ্চিত করতে পারিনি।
উন্নয়নের কথায় আসা যাক। কাকে উন্নয়ন বলব? উন্নয়নের কতগুলো অর্থনৈতিক সংজ্ঞা আমাদের সামনে বিভিন্ন রকমে, বিভিন্নভাবে এসেছে। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষ উন্নয়নকে খুব সাধারণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে পারি। আমি মনে করি, উন্নয়ন হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া, যে প্রক্রিয়ায় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানো যাবে, উন্নয়ন হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া, যে প্রক্রিয়ায় মানব বা মানুষের উন্নয়ন করা যাবে এবং শেষত উন্নয়ন হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া, যে প্রক্রিয়ায় একটি সমাজে একটি গোষ্ঠীর মধ্যে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে অর্থাৎ পরস্পর পরস্পরকে শানিত করবে। শানিত করবে বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে, শানিত করবে চিন্তার দিক থেকে, শানিত করবে অর্থনৈতিক যেসব সুযোগ আছে, সেই সুযোগে প্রবেশাধিকার পাওয়ার দিক থেকে। এটি হচ্ছে উন্নয়নের আসল সংজ্ঞা। এ শানিতকরণ প্রক্রিয়ায় আমরা সত্যিকার অর্থে কতগুলো বিশিষ্ট শ্রেণী পরস্পর পরস্পরের পিঠ চাপড়েছি, পরস্পর পরস্পরকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। আসলে সেখানে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে সাধারণ মানুষের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা যদি বলি, তাহলে প্রথমে যে কথাটি বলতে হবে, সেটি হচ্ছে, গত ২০ বছরে আমরা অর্থনৈতিক মূল্যবোধকে নষ্ট করে দিয়েছি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন কতগুলো মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং সেই মূল্যবোধগুলো রাজনৈতিক মূল্যবোধের মতোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই অর্থনৈতিক মূল্যবোধ হচ্ছে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, একটা জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা এবং সেখানে মানুষের জন্য, জনগণের জন্য সুখী অর্থনৈতিক জীবন নিশ্চিত করা।
আমরা জানি, গত ২০ বছরের ইতিহাসে এ মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা আমরা সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করেছি। সংবিধান যেমন একটি জাতির জন্য অত্যন্ত মূল্যবান দলিল, তেমনিভাবে একটি পরিকল্পনা গ্রন্থ কিংবা সরকারি আয়-ব্যয়ের যে হিসাব দেয়া হয়, সেটিও জাতির জন্য মূল্যবান একটি অর্থনৈতিক দলিল এবং তাকে লঙ্ঘন করার অধিকার কারো নেই। কিন্তু বারবার বছরের প্রথমে যে ধরনের সরকারি আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়েছি, তাকে সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করে ব্যক্তিবিশেষের মাধ্যমে নানাভাবে যত্রতত্র টাকা বিলিয়ে দিয়ে বছরের শেষে দেখেছি যে, পুরোপুরিভাবে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা আমরা নষ্ট করে দিয়েছি। এর জন্য কারো কাছে জবাবদিহি করিনি। কেননা সেখানে জবাবদিহির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এখানে যে কথাটি বলা প্রয়োজন তাহলো জবাবদিহি শুধু একটি স্তরে থাকবে, তা নয়। জবাবদিহি প্রশাসন ও সমাজের প্রতিটি স্তরে থাকতে হবে। একজন মানুষকে প্রথমেই জবাবদিহি করতে হয় তার নিজের কাছে অর্থাৎ মানুষ হিসেবে আমার যা করণীয়, পেশাজীবী হিসেবে আমার যা করণীয়, সেটি কি আমি করেছি? একটি দিনে আমার যা করণীয়, সেটি আমি করেছি কিনা— এই জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা যদি ব্যক্তিজীবনে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে এটি সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনের সর্বক্ষেত্রেই নষ্ট হয়ে যাবে। আমরা অর্থনৈতিক মূল্যবোধগুলো ধ্বংস করে দিয়েছি। ধ্বংস করে দেয়ার কারণে পুরো অর্থনীতিকে বেশির ভাগ সময়ে তাত্ক্ষণিকভাবে আমরা চালনা করেছি। এর কোনো দিকদর্শন আমরা দিতে পারিনি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আজকে স্বাধীনতার ২০ বছর পরে এসেও বাংলাদেশে অর্থনীতিতে দিকদর্শন খোঁজার চেষ্টা চলছে। আমরা যখনই সেটা করেছি, যতটা আবেগতাড়িত হয়ে করেছি, ততটা বিবেকচালিত হয়ে করিনি। আমরা সত্তরের দশকে যখন বিরাষ্ট্রীয়করণ করেছি, তখন যতটা মূল্যায়নের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয়করণ বা পরবর্তী সময়ে বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রয়োজন ছিল, তা করিনি। আজকে আমরা যখন সব অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করে দেয়া হবে বলছি, যে জাতীয় বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের ভিত্তিতে বলা উচিত, সে জাতীয় বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন আমরা করছি না।
ফলে যে অর্থনৈতিক ধারা-প্রবণতা আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেটি কয়েকটি গোষ্ঠী ও কয়েকটি শ্রেণীর জন্য, কিন্তু মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি যাকে বলছি, তা নিশ্চিত করতে পারছি না। যদি আমরা শুদ্ধ অর্থনৈতিক বিচারে আসি, তাহলে অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন কি হয়েছে? আমরা যদি খাতের দিকে দৃষ্টি ফেরাই, তাহলে দেখব, জাতীয় আয় কৃষি খাতে যে অবদান রেখেছে, সেটি ক্রমান্বয়ে কমে এসেছে। কিন্তু সে কমে আসা অবদানকে শিল্প পূরণ করেনি। সেটিকে পূরণ করেছে সেবামূলক খাত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সেবামূলক খাত আজকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জাতীয় আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ অবদান রাখছে। এটি কি শক্তিশালী একটি অর্থনীতির সূচক, নাকি অর্থনীতির দুর্বলতাকেই বেশি প্রকাশ করছে। আমি অন্তত এ মতবাদে বিশ্বাসী যে, সেবামূলক খাতের প্রসার আসলে অর্থনৈতিক শক্তিশালিতার চেয়ে অর্থনৈতিক দুর্বলতাকেই অনেক বেশি প্রকাশ করছে। সেবামূলক খাত কেন এত বেশি প্রসারিত হয়েছে? এর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, গ্রামীণ যে অর্থনীতি, সেটি ক্ষয়িষ্ণু ও স্থবির এবং এ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ক্ষয়িষ্ণু ও স্থবির হওয়ার কারণে সে অর্থনীতিতে যে লোকের বাস, তাদেরকে আর গ্রামের অর্থনীতি ধরে রাখতে পারছে না। কর্মে নিয়োজকের ক্ষেত্রে, আয়ের ক্ষেত্রে, উৎপাদনের ক্ষেত্রে ধরে রাখতে পারছে না। এজন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণেই সেখান থেকে লোকজন ক্রমে নাগরিক অর্থনীতির দিকে, শহরের অর্থনীতির দিকে ধাবমান হচ্ছে। আজকে ঢাকা শহরে সেবামূলক খাতে আপনার চারপাশে যাদেরকে দেখছেন, তারা আসলে গ্রামীণ লোক। গ্রামীণ অর্থনীতি তাদের ধরে রাখতে পারেনি বলেই তারা শহরে এসেছে। অতএব এটিও অর্থনীতির একটি অন্তর্নিহিত দুর্বলতা। দ্বিতীয়ত. সেবামূলক খাতের আয় বৃদ্ধির অর্থ এই নয় যে, উৎপাদনের ভিত্তি প্রসারিত হচ্ছে।
আমি যদি একটি জিনিস উৎপাদন করে সেটি চারজনের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে বিক্রি করি, তাহলে ১ টাকা করে ৫ টাকা আয় হবে সত্যি, কিন্তু জিনিস একটি। অর্থাৎ আপনার আয় বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু উৎপাদনের ভিত্তি প্রসারিত হচ্ছে না। অতএব যে কাঠামোগত পরিবর্তন আমরা দেখেছি, সেই কাঠামোগত পরিবর্তন কতখানি অর্থনীতির শক্তিশালিতাকে প্রমাণ করে, সেটি কিন্তু বিবেচ্য বিষয়। আমরা যদি কর্ম-নিয়োজনের দিকে দৃষ্টি ফেরাই, তাহলে দেখব, প্রতি বছর এক মিলিয়নের মতো লোক আমাদের শ্রমশক্তিতে যোগ দিচ্ছে। কিন্তু তাদের মধ্যে আমরা কতজনকে কর্মে নিয়োজন করতে পারছি? এক মিলিয়ন অর্থাৎ ১০ লাখ লোকের মধ্যে আমরা কি পাঁচ লাখ কিংবা সাড়ে সাত লাখ লোককে কর্মে নিয়োজন করতে পারছি? এবং যদি না পেরে থাকি, তাহলে প্রতি বছর বেকার মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে যে ভূমিকা, সে সম্পর্কে আমরা এখনো কোনো স্বচ্ছ ধারণায় আসতে পারিনি। আমরা সরকারি খাতকে অনবরত নানাভাবে সমালোচনা করে যাচ্ছি। কিন্তু যে কারণে আমরা বিরাষ্ট্রীয়করণ করছি, বেসরকারি খাত কিন্তু সেই একই কারণে আমাদের সামনে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা বারবার বলছি যে, সরকারি খাতকে বিরাষ্ট্রীয়করণ করছি, কারণ এগুলোর পেছনে প্রচুর ভর্তুকির দরকার হয়। কিন্তু বিরাষ্ট্রীয়করণের পর যখন আমার কাছে বা সরকারের কাছে ভর্তুকির জন্য আসে, তখন পুরো পরিপ্রেক্ষিতটিকে আমার মনে হয় বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। আমরা পল্লী উন্নয়নের কথা বলছি। কিন্তু এই ২০ বছরে পল্লী উন্নয়নের জন্য যে ধরনের পরিকল্পনা, যে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং আমরা সেখানে যেসব বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছি, সেগুলোর দিকে যদি তাকাই, তাহলে দেখব, ওগুলো আসলে জরুরিভিত্তিক ত্রাণ ব্যবস্থা ছাড়া কিছু নয়। কাজের বিনিময়ে খাদ্য, দুস্থ গোষ্ঠীর উন্নয়ন— এসবকে আমাদের পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির ভিত্তি হিসেবে আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু এ ব্যবস্থাগুলো আসলে ত্রাণ ব্যবস্থা এবং জরুরিভিত্তিক ব্যবস্থা। এগুলো সাময়িকভাবে কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে, সাময়িকভাবে দারিদ্র্যকে একটি স্তরে ঠেকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু এগুলো কখনই পল্লী অঞ্চলের উন্নয়নের গতিময়তা সৃষ্টি করতে পারে না। আমাদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকেন্দ্রীকরণের নামে প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকৃত করেছি এবং যখন উপজেলা পদ্ধতি সৃষ্টি করা হয়েছিল, তখন একটা কথা বলা হয়েছিল, এগুলো শুধু প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের কেন্দ্র হিসেবেই কাজ করবে না, সত্যিকার অর্থে প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমরা দেখতে পেয়েছি, এগুলো রাজনৈতিক বিভিন্ন সমীকরণের, রাজনৈতিক বিভিন্ন সুবিধা আদায়ের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। এখানে সত্যিকার অর্থে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। এ স্থানীয় পর্যায়ের সরকার যতখানি রাজনৈতিক কারণে ব্যবহূত হয়েছে, ততখানি অর্থনৈতিক কারণে ব্যবহূত হয়নি। এর মাধ্যমে যে আমরা স্থানীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি সহযোগী শ্রেণী গড়ে তুলতে পেরেছি, যারা ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রশ্নে, সম্পদ ভাগাভাগির প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এক ধরনের আঁতাতের মধ্যে চলে এসেছে।
উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যেসব স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোর ভূমিকা নিয়ে যদি আমরা কথা বলতে চাই, তাহলে প্রথমে যে কথাটি বলা প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে, সব স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানকে একই মাত্রায়, একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা উচিত নয়। এ স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শ্রেণীবিন্যাস আছে। এক ধরনের শ্রেণীবিন্যাস আমরা সবসময় করি— এটি দেশী না বিদেশী, জাতীয় না আঞ্চলিক। কিন্তু এসব শ্রেণীবিন্যাস ছাড়াও নীতির দিক থেকে, দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে, কর্ম পরিচালনার দিক থেকে এক ধরনের শ্রেণীবিন্যাস রয়েছে।
এটা বোধহয় প্রথমত একটা সাধারণ মন্তব্য হিসেবেই করা যেতে পারে, যে কারণে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের গ্রামের অর্থনীতিতে কাজ শুরু করেছিল, তার একটি বিশেষ ক্ষেত্রে কিন্তু সেগুলো সফলতা অর্জন করতে পারেনি। সত্তরের দশকে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে আমরা কেন দেখতে চেষ্টা করেছিলাম? কারণ স্থানীয় পর্যায়ের সরকার ও আমলাতন্ত্রের যে ধাপ রয়েছে, সেই ধাপের মাধ্যমে সম্পদ এবং বিভিন্ন রকমের নীতিমালাকে দারিদ্র্যের মধ্যে দরিদ্রতমকে আমরা পৌঁছে দিতে পারছিলাম না। এ কারণে মনে হয়েছিল, এ স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো একটি বিকল্প পন্থা, যার মাধ্যমে ওই দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতমের কাছে আমরা পৌঁছতে পারব। কিন্তু নব্বইয়ের শেষে এসে আমরা দেখেছি, এ স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও এক ধরনের আমলাতন্ত্র গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও এক ধরনের কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এতে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামাঞ্চলে কাজ করছে ঠিকই, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দরিদ্রের মধ্যে যারা দরিদ্রতম, তারা এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ডের বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাদেরকে কেউই ছুঁতে পারছে না। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ডের এটি একটি চরম ব্যর্থতা।
দ্বিতীয় যে কথাটি বলা প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো কোন ধরনের কাজে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করে? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাবে, সেগুলো হচ্ছে আত্মতোষণমূলক কাজ ও কম উৎপাদনশীল কাজ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আত্মতোষণমূলক কাজকে ত্বরান্বিত করে, তাকে প্রসারিত করে আমরা পুরো সমাজকেই একটি অত্যন্ত নিম্নস্তরের ভারসাম্য ফাঁদের মধ্যে রেখে দেব? সেখানে উন্নয়নের গতিময়তা সৃষ্টি হবে না? আমরা যদি এখনো ঢেঁকি প্রকল্পকে ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করি, তাহলে দিনের শেষে একজন নারী সেই দেড় সের চালই পাবেন এবং পরের দিন তিনি যদি কাজ না করতে পারেন, তাহলে তাকে উপোস করতে হবে। কারণ এটা আমাদের মাথার মধ্যে রাখতে হবে যে, আজকে ধানকলের সঙ্গে ঢেঁকি আর প্রতিযোগিতা করে পারছে না। সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আত্মতোষণমূলক কাজকে উৎসাহিত করব, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা পুরো ব্যবস্থার মধ্যেই কিন্তু উন্নয়নের গতিময়তা সৃষ্টি করতে পারব না। তৃতীয় কথা হচ্ছে, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয়ের প্রয়োজন আছে। এটা বোধহয় একটু ভালো করেই বলা প্রয়োজন। আমার মনে হয়, আজকের দিনে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান বহু ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলের মতোই কাজ করে। স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামাঞ্চলে গিয়ে আগে থেকে গঠিত যেসব গোষ্ঠী আছে, সেগুলোকে ধরার চেষ্টা করে। এতে এক ধরনের রাজনীতি গড়ে উঠেছে। গ্রামাঞ্চলের মানুষও একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানকে আরেকটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কাজে লাগায়। স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে থেকে কাজ না করে প্রথমেই গিয়ে চেষ্টা করে আগে তৈরি করা কোনো গোষ্ঠী আছে কিনা; যেগুলোকে নিজের দলে টেনে তারা তাদের কাজ শুরু করতে পারে। এর ফল হয়েছে যে, কতগুলো বিশেষ গোষ্ঠী একাধিক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সাহায্য পাচ্ছে। এর বাইরে যারা আছে, তারা কিন্তু কারো কাছ থেকেই সাহায্য পাচ্ছে না। এর পরের কথা হচ্ছে, আজ বাংলাদেশে যেসব স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, সেগুলোর আমরা নিশ্চিতভাবে সমালোচনা করতে পারি, কিন্তু সেগুলোকে আমরা পাশ কাটিয়ে যেতে বা উপেক্ষা করতে পারব না। এগুলোকে উপেক্ষা করতে পারব না এ কারণেই যে, এসব প্রতিষ্ঠান সংখ্যার দিক থেকে, কার্যপ্রণালির দিক থেকে এবং তাদের কার্যের বিস্তৃতির দিক থেকে এত বেশি বড় হয়ে গেছে, আজকে উন্নয়নের অংশীদার হিসেবেই হোক, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের একটি একক হিসেবেই হোক, তাকে মেনে নিতেই হবে। আমরা যদি শুধু ১৯৯০-৯১ সালের দিকে তাকাই, তা হলে দেখব, আমাদের স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি ব্যুরো রয়েছে। তার সঙ্গে নিবন্ধকৃত হয়েছে মোট ১০৬টি বিদেশী স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। এবং ৪২১টি বাংলাদেশী স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, যেগুলো বিদেশী পয়সার ওপর নির্ভরশীল। মোট ৫২৭টি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। এ তো গেল কেবল নিবন্ধকৃত স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। আমরা যদি সত্যিকার বাস্তব অবস্থার দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যাবে, এ দেশে পাঁচ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান কাজ করে। শুধু পল্লীসম্পদ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ১৯৯০-৯১ সালে ৫২৭টি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের হাতে যে অর্থ ছিল, তার পরিমাণ হচ্ছে ৬০০ কোটি টাকা। ৫২৭টি নিবন্ধকৃত স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের জন্য মানব উন্নয়ন এবং পল্লী অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, অথচ সরকারের যে ১০টি মন্ত্রণালয় এসব বিষয়ে কাজ করে, সেগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ৪০০ কোটি টাকা। অতএব গড়ে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের হাতে ছিল মাত্র ৪০ কোটি টাকা।
সুতরাং সেই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের যে ব্যুরো, তার কাছ থেকে প্রাপ্ত হিসাব থেকে বোঝা যাচ্ছে, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বা আমাদের গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কত বেশি বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। এ অবস্থায় আমরা তাদের সমালোচনা করতে পারব, কিন্তু তাদের উপেক্ষা করতে পারব না। বর্তমান অবস্থায় তাদের ভূমিকার পূর্ণ মূল্যায়ন প্রয়োজন এবং একটি বিষয় বারবার আলোচনায় উঠে এসেছে, পল্লী অঞ্চলের উন্নয়নে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির জন্য আমাদের সরকার ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক ধরনের পরিপূরক সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় কিনা এবং সে পরিপূরক সম্পর্কের প্রকৃতি কেমন হবে, মাত্রিকতা কী রকমের হবে, বিষয়গুলোকে আমার মনে হয়, আবার পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সেইভাবে এ দেশের অর্থনীতিতে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা চিহ্নিত হওয়া দরকার।
এরপর আসি ঋণের প্রশ্নে। এটি অত্যন্ত বহুল আলোচিত একটি বিষয়। বৈদেশিক সাহায্যের সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্ক কী, এটি কিন্তু কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়। তত্ত্বের মাধ্যমে, তাত্ত্বিক একটি কাঠামোর মাধ্যমে এ বিষয়কে ইতিবাচকও দেখানো যাবে, এটিকে নেতিবাচকও দেখানো যাবে। এমন তত্ত্ব দাঁড় করানো যাবে, এমন কাঠামো দাঁড় করানো যাবে, যেখান থেকে দেখা যাবে, বৈদেশিক সাহায্য এবং উন্নয়ন হচ্ছে পরস্পরের পরিপূরক। আবার এমন একটি তাত্ত্বিক কাঠামো গড়ে তোলা যাবে। যেখানে দেখা যাবে, বৈদেশিক সাহায্য উন্নয়নের মাধ্যমে নেতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। আসলে পুরো ব্যাপারটা হচ্ছে একটি বাস্তবতার ব্যাপার। বাস্তবে আসলে কী হচ্ছে? সেখানে আমরা কিন্তু সব জায়গায়, সব দেশে এক একটা ইতিবাচক ভূমিকা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের কাছে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং, সিঙ্গাপুরের উদাহরণ তুলে ধরা হয়; কিন্তু যে জাতীয় পরিস্থিতিতে তারা বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণ করেছে এবং যে জাতীয় বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোর মধ্যে তারা কাজ করেছে, সে জাতীয় পরিস্থিতি বর্তমানে বিরাজ করছে কিনা, এটা বিবেচ্য বিষয়। এবং তা যদি বিরাজ না করে, তাহলে তারা যেভাবে উন্নয়ন কাঠামো বা উন্নয়নের পথে অগ্রসর হয়েছে, আজকের তৃতীয় বিশ্ব সে জাতীয় উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারবে না। বৈদেশিক সাহায্য ক্রমান্বয়ে আমরা গত ২০ বছরে কেন গ্রহণ করেছি, তার বহুবিধ কারণ আছে। অর্থনৈতিক কারণ, শুদ্ধ অর্থনৈতিক কারণ দেখানো যেতে পারে, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মধ্যে একটি পার্থক্য থাকার কারণে, রফতানি ও আমদানির মধ্যে একটি পার্থক্য থাকার কারণে আমরা বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু কথাটা কি সম্পূর্ণভাবে সত্যি? এটি সম্পূর্ণভাবে সত্যি নয়। এটি হয়তো আংশিক সত্য। আমাদের বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণ করার আরো অনেক কারণ ছিল। গত ২০ বছরে অর্থনীতিতে যেহেতু রাষ্ট্র ক্ষমতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা একটি বিশেষ শ্রেণীর কাছে চলে গিয়েছিল এবং সে শ্রেণীটির ভোগের যে প্রবণতা, সেটি সম্পূর্ণভাবে পাশ্চাত্য দেশের ভোগের প্রবণতার মধ্যে ছিল। অতএব তাদের ভোগ চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের ক্রমান্বয়ে বেশি এবং বেশি সম্পদের প্রয়োজন হয়েছে। সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সহযোগী শ্রেণীকে দলে রাখার জন্য ক্রমান্বয়ে বেশি এবং বেশি সম্পদের প্রয়োজন হয়েছে। এ সম্পদ এসেছে মূলত বৈদেশিক সাহায্য থেকে।
কেন সরকার এ অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি থেকে সম্পদ আহরণের চেষ্টা করেনি? অনেক সময় বলা হয়, আমাদের আসলে সম্পদ আহরণ করার মতো অবস্থাই নেই। এটি কিন্তু ঠিক নয়। আমাদের দেশের অভ্যন্তরেও সম্পদ আহরণের যতখানি ব্যবস্থা আছে, তার পুরোপুরি বা কাম্য ব্যবহার সরকার করেনি। কারণ হচ্ছে এই যে, জাতীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ মাধ্যম থেকে সম্পদ আহরণ করতে হলে সেগুলোর জন্য কতগুলো সংস্কার প্রয়োজন। সেসব সংস্কার প্রয়োজনীয় কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে সেগুলো জনপ্রিয় নয়। অতএব সরকার সবসময় রাজনৈতিক দিক থেকে অজনপ্রিয় কিন্তু প্রয়োজনীয় এ জাতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করে বৈদেশিক সাহায্যের সোজা সরল পথকে সবসময় বেছে নিয়েছে। এতে ক্রমান্বয়ে পরনির্ভরতা পৌনঃপুনিকভাবে আমাদের বেড়ে গেছে এবং এই পরনির্ভরতার একটি ব্যাপ্তি যদি আমরা জানতে চাই, তাহলে আমরা বলতে পারি, ’৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে জুন ’৯১ পর্যন্ত বাংলাদেশ মোট ২২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার সাহায্য পেয়েছে। এর মধ্যে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ছিল খাদ্য সাহায্য, ১০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার প্রকল্প সাহায্য এবং ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার অন্যান্য সাহায্য। এর মধ্যে মনে রাখতে হবে, ৪৮ শতাংশ হচ্ছে অনুদান এবং ২২ শতাংশ হচ্ছে ঋণ। বিভিন্ন উৎস থেকে আমরা সাহায্য পেয়েছি। আমরা বহুপক্ষীয় দাতাগোষ্ঠীর কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছি। দ্বিপক্ষীয় দাতাগোষ্ঠীর কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছি। অন্যান্য উৎস থেকেও আমরা সাহায্য পেয়েছি। এখন এই যে সাহায্য আমরা পেয়েছি, তার প্রভাবের দুটি মাত্রিকতা সম্পর্কে আমরা আলোচনা করতে চাই। একটি মাত্রিকতা হচ্ছে, এ সাহায্যের ফলাফল কী? এতে কারা লাভবান হয়েছে? এ সাহায্যের ব্যবহার আমরা কীভাবে করেছি? একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ ডলার সাহায্যের ৬৯ শতাংশ চলে গেছে বিদেশ থেকে জিনিসপত্র এবং যন্ত্রাংশ, বিভিন্ন খুচরা জিনিসপত্র আমদানি করার জন্য। ৬ ডলার চলে গেছে বিদেশী বিশেষজ্ঞ ও ঠিকাদারদের পেছনে। অতএব ৭৫ ডলার চলে গেলে। বাকি ১০ ডলার গেছে স্থানীয় ঠিকাদারদের জন্য। ৩ ডলার গেছে স্থানীয় আমলাদের উেকাচে। ১ থেকে ২ ডলার চলে গেছে আমার মতো স্থানীয় বিশেষজ্ঞ নিয়োগের জন্য। অতএব সব মিলিয়ে ১০০ ডলারের মধ্যে ৯০ ডলারই যাদের কাছে চলে গেছে, তারা কিন্তু ওই সাহায্যের সুফল ভোগকারী লক্ষ্য গোষ্ঠী নয়। অতএব বৈদেশিক সাহায্য আমার জন্য এবং কতগুলো গোষ্ঠীর জন্য সুফল বয়ে এনেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারেনি। এটি গেল একটি মাত্রিকতা। দ্বিতীয় মাত্রিকতা হচ্ছে, এই বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণের ফলে আমরা এক ধরনের অবস্থানে পৌঁছে গেছি, যেখানে বৈদেশিক ঋণ ক্রমাগতভাবে আমাদের তাড়া করে যাচ্ছে। এ তাড়া এবং এ বৈদেশিক ঋণের কতগুলো ব্যাপার সম্পর্কে আমাদের জানা দরকার। ৩০ জুন ১৯৯০ পর্যন্ত আমাদের পরিশোধতব্য ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার। এর মানে হচ্ছে আমাদের বৈদেশিক ঋণ আমাদের জাতীয় আয়ের ৫১ শতাংশ।
অন্যদিক থেকে বিচার করলে আমাদের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৯৬ ডলারের মতো, যেখানে আমাদের মাথাপিছু আয় ১৭০ ডলার। আমরা প্রত্যেক বিদেশের কাছে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ টাকার মতো ঋণগ্রস্ত। ১৯৭৩-৭৪ সালে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে আমাদের যেত ১৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার, এখন যাচ্ছে ৬৬৭ মিলিয়ন ডলার। গত দেড় দশকে বার্ষিক বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে আমাদের টাকা ব্যয়ের পরিমাণ ৬ গুণের বেশি বেড়েছে, অথচ এ সময় আমাদের প্রকৃত জাতীয় আয় দ্বিগুণ হয়নি। ১৯৭৩-৭৪ সালে রফতানির ৪ দশমিক ৭ শতাংশ বৈদেশিক ঋণের পেছনে আমরা ব্যয় করতাম, আজকে সেখানে ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় করছি। ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে আমাদের ৫ হাজার ৯৮৩ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। অন্যভাবে বলতে গেলে, প্রত্যেক ১ টাকার বৈদেশিক ঋণের জন্য আমাদের ২০ পয়সা সুদ দিত হয়েছে। এসবের চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা একটা বিরাট দায় সৃষ্টি করে যাচ্ছি। এ দায় থেকে তারা কিছুতেই মুক্ত হতে পারবে না।
শেষ কথা হচ্ছে, বৈদেশিক ঋণকে আমি শুধু অর্থায়নের দিক থেকে দেখি না। বৈদেশিক ঋণ আমাদের রাজস্ব বাজেটের অথবা আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ৯০ শতাংশ কিংবা ৯৫ শতাংশ। আজকের দিনে এটি কিন্তু বড় কথা নয়। আজকে আমাদের পরনির্ভরতার ব্যাপ্তি এই অর্থায়নকে ছাড়িয়ে চলে গেছে। আজকে আমরা এমন একটা অবস্থায় পৌঁছেছি, যেখানে আমরা দাতাগোষ্ঠীর সঙ্গে কী ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করব, সেই আলোচ্যসূচিও আমরা নির্ধারণ করতে পারছি না। সেটিও দাতাগোষ্ঠী নির্ধারণ করে দিচ্ছে। আজকে আমাদের অর্থনীতির এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে দাতাগোষ্ঠী হস্তক্ষেপ করছে না। ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আমরা দেখেছি, বিভিন্ন খাতে দাতাগোষ্ঠী তাদের মূল্যবান সৎ উপদেশ রাখতে চেষ্টা করেছে। সেই উপদেশ যে সবসময় আমাদের জন্য ভালো, তা কিন্তু নয়। আমি মনে করি পরনির্ভরতার এটি একটি চূড়ান্ত রূপ। যেখানে আমরা আমাদের বাড়ির কাজ করে দাতাগোষ্ঠীর কাছে যেতে পারছি না, যেখানে তারা একটি সংখ্যা বললে আমরা তার বিপক্ষে বা বিরুদ্ধে আরেকটি সংখ্যা বলতে পারছি না, যেটুকু বাড়ির কাজ আমাদের হয়েছে এবং এ প্রসঙ্গে আমি এ বছরের প্রথমদিকে পড়া ২৯টি টাস্ক ফোর্সের যে প্রতিবেদন, তার উল্লেখ করতে চাই। যেটুকু বাড়ির কাজ আমাদের সামনে আছে, তারও ব্যবহার কিন্তু আমরা করছি না। এতে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাই কিন্তু দাতাগোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে। আমাদের যে সমস্যা, সেটা আমরা চিহ্নিত করে তা সময়মতো সমাধানের জন্য ব্রতী না হওয়ায়ই কিন্তু এ পুরো ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে। এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
শেষ বিষয়টিকে আমরা বিত্তহীনতা বলে চিহ্নিত করেছি। ইংরেজিতে বলা হয়েছে Dispossessed। বাংলায় বলা হয়েছে বিত্তহীনতা। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি Dispossessed শব্দটির ব্যাখ্যা যত বিস্তৃততর, বিত্তহীনতা তার ঠিক সঠিক বাংলা নয়। Dispossessed-এর একটি বিস্তৃততর প্রেক্ষাপট আছে। আমরা প্রত্যেকেই কিছু না কিছু ধারণ করে আছি। আমরা আয় উৎপাদনকারী একটি শক্তি ধারণ করে আছি। আমরা কিছু ঐতিহ্য ধারণ করে আছি। আমরা কিছু বিশ্বাস ধারণ করে আছি এবং আমরা প্রত্যেক যে যা কিছুকে ধারণ করে আছি, সেটাই হচ্ছে আমার ধর্ম। সীমিত অর্থে আমার একটি ধর্ম-বিশ্বাস থাকতে পারে, কিন্তু আসলে আমি যেটা ধারণ করে আছি, তাই আমার ধর্ম। Dispossessed-এর বিস্তৃততর ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমার এ ধারণকৃত জিনিসগুলো যখন আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়, তখন আমি Dispossessed। সুতরাং সেটি শুধু বিত্তহীনতা নয়, সেই অর্থে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি লোক গত ২০ বছরের প্রক্রিয়ায় Dispossessed। আমি Dispossessed বা আমরা Dispossessed। কারণ আমরা মূল্যবোধকে হারিয়েছি। স্বাধীনতার যে মূল্যবোধ নিয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছিল— ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং অন্যান্য যে মূল্যবোধ, সেগুলোকে আমরা বিসর্জন দিয়েছি। অতএব বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ সেই অর্থে Dispossessed। তারা এটা হারিয়েছে। আমরা আমাদের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের সনাতন মূল্যবোধ, গ্রামের মানুষের যে বিশ্বাস, সেটা থেকে তাকে স্থানচ্যুত করেছি। সেই অর্থে সে Dispossessed।
আমরা অনেক সন্ত্রাস, সংঘাত, সংঘর্ষ, সহিংসতা এবং অসহিষ্ণুতাকে আমাদের মূল্যবোধের অংশ করে নিয়েছি। সেই হিসেবে যে সুন্দর মূল্যবোধগুলো আমরা নষ্ট করেছি, সে অর্থে আমরা Dispossessed। অতএব আমার ধর্ম, আমার ধারণ করা বিষয়সমূহ থেকে যখন আমাকে স্থানচ্যুত করা হয়, সেটা হচ্ছে Dispossession-এর চূড়ান্ত রূপ। সেই অর্থে আমরা Dispossessed। বিত্তহীনতা তার একটি সামান্য অংশ মাত্র। সেই সীমিত অর্থেও যদি বিত্তহীনতার কথা বলি, তাকে আমরা দারিদ্র্যের সঙ্গে একত্রে আলোচনা করতে পারি। এ অর্থে আজকে দারিদ্র্যের সংজ্ঞা কী? দারিদ্র্যের ওপরে কী জাতীয় গবেষণা হচ্ছে? কতসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যের নিচে বাস করে? দারিদ্র্যসীমার সংজ্ঞার এদিক-ওদিকের জন্য কত ভুল-ভ্রান্তি হচ্ছে? আমার মনে হয় এগুলো এক অর্থে বাতুলতা মাত্র। দারিদ্র্য কী, সেটা বোঝার জন্য আপনার চারপাশে যা ঘটছে, গ্রামাঞ্চলে যা ঘটছে, বস্তি এলাকায় যা ঘটছে, সেটাই যথেষ্ট। ক্ষুিপপাসায় মা তার শিশুকে বিক্রি করে দেয় কিংবা স্বামী তার স্ত্রীকে। এরপর দারিদ্র্য বোঝার জন্য কোনো সংজ্ঞা বা কোনো সূচক কিংবা কোনো রকম সংজ্ঞার আর মনে হয় প্রয়োজন পড়ে না। আমরা যারা শাসক, যারা রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করি, তারা বিত্তহীনতাকে কাজে লাগিয়েছি। আমরা এটিকে রাজনীতিকীকরণের মাধ্যমে, স্লোগানের মাধ্যমে আমাদের স্বার্থে কাজে লাগিয়েছি। অতএব আমি মনে করি, অর্থসামাজিক পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে যে বৃহত্তর বিত্তহীনতা গত ২০ বছরে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের মাধ্যমে, আমাদের বুদ্ধির অবক্ষয়ের মাধ্যমে, আমাদের বিশ্বাসের অবক্ষয়ের মাধ্যমে চলে এসেছে, তাকে প্রেক্ষিতে রেখে দারিদ্র্য ও বিত্তহীনতাকে আমাদের দেখা প্রয়োজন।
এরপর খুব সংক্ষিপ্তভাবে আমি যা আলোচনা করতে চাই, সেটি হচ্ছে, আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করলাম, সেগুলো আসলে পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। গণতন্ত্রের সঙ্গে উন্নয়ন ও বিত্তহীনতার সম্পর্ক আছে। উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র অপরিহার্য। অনেকেই এ কথা বলেন, এটা ঠিক নয়। কেননা গণতন্ত্র যেখানে নেই, সেখানেও তো উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু প্রথমেই আমরা ধরে নিয়েছি, উন্নয়ন বলতে আমরা শুধু মাথাপিছু আয় বোঝাচ্ছি না। উন্নয়ন বলতে একটি প্রক্রিয়ার কথা বলছি। যেখানে সব মানুষের ন্যূনতম চাহিদা মেটানো যাবে, যেখানে মানবসম্পদ উন্নীত হবে, যেখানে অর্থনৈতিক মূল্যবোধ জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকবে, যেখানে পরস্পর পরস্পরকে শানিত করবে। এটির জন্য গণতন্ত্র প্রয়োজন, তা না হলে অন্য জাতীয় যে উন্নয়ন, আয়ের উন্নয়ন, প্রাচুর্য— এটি বিভিন্ন দেশে হয়েছে, কিন্তু সেসব দেশের ব্যক্তি, কর্তাব্যক্তিরা পরবর্তীকালে নিজেরা ক্ষমা চেয়েছেন, নির্জন নিবাসে চলে গিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘আমরা প্রায়শ্চিত্ত করব।’ কারণ সেখানে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়নি। তেমনিভাবে বিত্তহীনতার সঙ্গেও গণতন্ত্রের একটা সম্পর্ক আছে। যদি অর্থনৈতিক গণতন্ত্রকে আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, রাজনৈতিক গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তাহলে যে বিত্তহীনতার কথা, সব হারানোর যে কথা আমরা বললাম, সেটাকে আবার পুনরুদ্ধার করতে পারব। উন্নয়নের সঙ্গে ঋণ ও বিত্তহীনতার সম্পর্ক আছে। আমাদের ঋণ ও বিত্তহীনতার মধ্যে সম্পর্ক আছে। যেটা আমাদের প্রয়োজন তা হচ্ছে, এ সম্পর্কের নানান মাত্রিকতা আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। এ পুরো প্রক্রিয়ায় বর্তমানে আমরা কী অবস্থায় পৌঁছেছি! আমরা বর্তমানে যে অবস্থায় পৌঁছেছি, তাতে বলা যায়, গণতন্ত্র অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে। গণতন্ত্রকে নিয়ে সবাই আমরা চিন্তাভাবনা করছি। কিন্তু গণতন্ত্র টলটলায়মান অবস্থাতেই আছে। কারণ গণতন্ত্রকে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো রূপ দেয়ার চেষ্টা করছি না। গণতন্ত্র মুখের কথাই থেকে যাচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে না। আমরা স্বৈরশাসনকে অপসারিত করেছি, কিন্তু আমরা কি এটা বলতে পারব, আমরা স্বৈরাচারকে অপসারণ করেছি? আমরা কি এটা বলতে পারব, আমাদের ব্যক্তিজীবনে, রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে স্বৈরাচার সম্পূর্ণভাবে অপসারিত হয়েছে? সেই প্রশ্নটি আমার মনে হয় দেখতে হবে।
অর্থনৈতিক গণতন্ত্রকে কি নিশ্চিত করা গেছে? সবার সম্পদে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে কি আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি? বোধহয় পারিনি। আমরা কি সম্পূর্ণভাবে জবাবদিহিমূলক একটা ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে পেরেছি? তাও বোধহয় পারিনি। উন্নয়নের পথে আমরা কি কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পেরেছি? আমার মনে হয়, কোনো দিকনির্দেশনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেই। তাত্ক্ষণিকভাবে কতগুলো ব্যবস্থার মাধ্যমে এ দেশ চলছে। আমরা বলেছি, উন্মুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করব, বাজার অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করব এবং সরকারের যে ভূমিকা, তা শূন্য পর্যায়ে নিয়ে আসব। কিন্তু বাজার অর্থনীতি বলতে বা উন্মুক্ত অর্থনীতি বলতে কী বোঝায়, কারো কাছে তা স্পষ্ট নয়। এ বাজার অর্থনীতি প্রশ্নে আমি দুটি কথা বলতে চাই। একটি কল্যাণের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, অন্যটি দক্ষতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। কল্যাণের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা প্রত্যেকেই জানি, এ সমাজে যথেষ্ট রকমের শ্রেণী-বৈষম্য আছে। এখন এ শ্রেণী-বৈষম্যপূর্ণ সমাজে আমরা যদি সব মানুষকে আজকে বাজার অর্থনীতির দিকে ঠেলে দিই, তাহলে সব মানুষের কল্যাণকে কি আমরা নিশ্চিত করতে পারব? আজকে বাজার অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র শিল্প কি বৃহৎ শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে? দরিদ্রগোষ্ঠী কি ধনিকগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে? যদি না পারে, তাহলে বাজার অর্থনীতিতে আমরা কল্যাণ কি করে নিশ্চিত করব? দ্বিতীয়ত. দক্ষতার দিক থেকে যদি বলি, তাহলে বাজার অর্থনীতি করার ফলে আমাদের দক্ষতা তখনই বৃদ্ধি পাবে, যখন বাজার অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা যাবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সেই প্রতিযোগিতাকে নিশ্চিত করার ব্যবস্থা আমরা দেখতে পাচ্ছি কিনা?
আজকে যদি সরকারি খাতের বদলে বেসরকারি খাত একচেটিয়া সে জায়গা দখল করে নেয়, তাহলে সরকারি খাতে বেসরকারীকরণ করা হলো মাত্র, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা হলো না। প্রতিযোগিতা যদি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে দক্ষ অর্থনীতি আমরা গড়ে তুলতে পারব না। অতএব পটভূমির পরিপ্রেক্ষিতে আজকের পুরো আলোচনাটি প্রবাহিত হওয়া প্রয়োজন। গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ঋণ, বিত্তহীনতা এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক আজকে আলোচিত হয়ে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। শেষ যে কথাটি আমি বলতে চাই, তা হচ্ছে, আমরা এক অর্থে সৌভাগ্যবান। যেকোনো জাতির জন্য দুবার সুযোগ কিন্তু আসে না। বাংলাদেশের জন্য তার অবস্থার পরিবর্তনের দ্বিতীয় সুযোগ আমরা ১৯৯০তে লাভ করেছি। আজকে এ সুযোগ যদি আমরা হেলায় নষ্ট করি, তাহলে আগামী প্রজন্ম এবং আগামী দিন কখনই আমাদের ক্ষমা করবে না।
[১৯৯৬ সালে ‘সাহিত্য প্রকাশ’ থেকে প্রকাশিত সেলিম জাহান রচিত ‘অর্থনীতির কড়চা’ বই থেকে পুনঃমুদ্রণ]
লেখক: অর্থনীতিবিদ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের পরিচালক






