কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি বা ‘স্যাপ’-এর পর সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশ্বের জন্য বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের সর্বশেষ নীতিকাঠামোর নাম পিআরএসপি। এটি সব ‘দরিদ্র’ দেশের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। বলা হয়েছে, ‘দারিদ্র্য নিরসনে’ অর্থাৎ এ দলিলে বর্ণিত কর্মসূচির প্রতি অঙ্গীকার ঘোষণা না করলে এসব দেশের সরকারকে কোনো সহযোগিতা দেয়া হবে না! এ মন্ত্রের পুরো নাম: ‘পভার্টি রিডাকশন স্ট্র্যাটেজি পেপার’ (পিআরএসপি) বা দারিদ্র্য হ্রাসকরণ কৌশলপত্র। আমি মনে করি, যেসব কাজ এ দলিল নির্দেশ করা হয়েছে, তাতে এর সঠিক নাম হতে পারে। ‘পভার্টি রিপ্রডাকশন স্ট্র্যাটেজি পেপার’ অর্থাৎ ‘দারিদ্র্য পুনরুৎপাদন কৌশলপত্র’। কেন আমি এ ভিন্ন নাম প্রস্তাব করেছি? তার ব্যাখ্যা নিচে দেয়ার চেষ্টা করব।
পিআরএসপি: চিনিতে মোড়ানো নতুন স্যাপ?
২০০২ সালের এপ্রিলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে বাংলাদেশের ইন্টারিম পভার্টি রিডাকশন স্ট্র্যাটেজি পেপার (আইপিআরএসপি) প্রকাশ করা হয়। এর নাম দেয়া হয়: ‘এ ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর ইকোনমিক গ্রোথ অ্যান্ড পভার্টি রিডাকশন’। ‘ন্যাশনাল’ শব্দটি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের হুকুমেই রাখা হয়েছে। এই দলিলে কী থাকবে, থাকতে হবে তা একদিকে যেমন বিশ্বব্যাংকীয় দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন দেশের ‘জাতীয়’ অনুজ ‘বিশেষজ্ঞ’দের ‘বহু’ কষ্টের চিন্তাভাবনার ফলাফল, অন্যদিকে তেমনি এগুলোর ওপর অব্যাহত তদারকির বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশে এ দলিল ‘অংশগ্রহণভিত্তিক’ করার জন্য বৃহত্তম এনজিও-বাণিজ্যিক গ্রুপ ব্র্যাক কাজ করেছে। বিভিন্ন ‘কনসালটেশন’ প্রক্রিয়ায় এটি চূড়ান্ত করা হয় ২০০৪ সালের মার্চ মাসে। ‘পার্টিসিপেশন’ আর ‘কনসালটেশন’ও একটি বাধ্যতামূলক ‘এক্সারসাইজ’। তবে সেজন্য সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা কিংবা এনজিওর সেট করা ‘জনগণ’, ‘প্রোগ্রাম’, বাজেট তৈরি থাকে। ঢাকায় অনেক ব্যয়বহুল ‘কনফারেন্স সেন্টার’ এগুলোকে লক্ষ্য করেই গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের এ দলিলে যা ছিল, তাতে বাংলাদেশের ‘উন্নয়নের’ অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে যেসব কথাবার্তা ছিল, সরকারের যেসব করণীয় কিছু স্পষ্ট কিছু প্রচ্ছন্নভাবে নির্দেশ করা ছিল, সেগুলো বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবি-ইউএসএইড-মার্কিন দূতাবাস-তেল কোম্পানি এবং তাদের সহযোগী ‘জাতীয়’ অনুজ ‘বিশেষজ্ঞ’দের লেখা বলাতে, মন্ত্রিবাহাদুরদের বাণীতে সবসময়ই পাওয়া যায়। সেসব কাজ করে করেই বাংলাদেশ দেশী বিদেশী লুম্পেন-ডাকাতদের করতলগত হয়েছে। সেসব কাজ করে করেই বাংলাদেশে জনগণের জীবন-জীবিকা সার্বক্ষণিক অনিশ্চয়তায় ফেলা হয়েছে, পরিবেশ বিপর্যস্ত করা হয়েছে, অফুরন্ত সম্ভাবনার ক্রমাগত বিনষ্টিতে মানুষ দিশেহারা হয়েছে।
দারিদ্র্য হ্রাসের দলিল না বলে তাই একে অন্য যেকোনো শিরোনামে উপস্থিত করা যেত। যেমন— ‘বাংলাদেশের বিদ্যমান উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রাখার কৌশল’ কিংবা ‘বাংলাদেশে কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে নয়া কৌশল’ কিংবা ‘বাংলাদেশে বিরাষ্ট্রীয়করণ ও সংস্কার কৌশল’ কিংবা ‘বাংলাদেশে দারিদ্র্য সৃষ্টির প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার কৌশল’ কিংবা ‘বাংলাদেশের সাম্রাজ্যবাদ-লুটেরা মালিক-আমলা-রাজনীতিবিদ-বিশেষজ্ঞদের আধিপত্য অব্যাহত রাখার কৌশল’। এ নামগুলোই এই দলিলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বলা যায়, এ প্রকৃত পরিচয় আড়াল করার জন্যই একটা বিপরীত নাম দিয়ে দলিল হাজির করার সাড়ম্বর ব্যয়বহুল চরম প্রতারণামূলক আয়োজন চলেছে বাংলাদেশে এবং তুলনীয় আরো অন্যান্য দেশে। বিভিন্ন দেশে প্রতারণার এ অভিন্নরূপ এবং অভিজ্ঞতার পেছনে ক্রিয়াশীল রয়েছে অভিন্ন স্বার্থ এবং অভিন্ন প্রতিষ্ঠান। খুব নিরীহ ঢঙে বিশ্বব্যাংক দারিদ্র্য হ্রাসকরণ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিয়ে যে নির্দেশাবলি হাজির করেছে, তার বাস্তবায়নই এ বৈশ্বিক ঐক্য বা যোগসূত্র রক্ষা করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
বিশ্বব্যাংক তার ওয়েবসাইটে স্থাপিত পিআরএসপি-সংক্রান্ত দলিলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর উদ্দেশে বলেছে:
১. ‘সাফল্য লাভের জন্য দেশের মালিকানাধীন দারিদ্র্য হ্রাসকরণ কর্মসূচিকে অবশ্যই উন্নয়ন অংশীদারদের সমর্থন পেতে হবে এবং তাদের সহায়তা পাওয়ার জন্য একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে আসতে হবে।
২. সব দাতা এবং বহুমুখী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এ দারিদ্র্য হ্রাসকরণ কর্মসূচির ডিজাইন নির্ধারণে অবদান রাখবে। তাদের নিজ নিজ অংশগ্রহণ নির্দিষ্ট করবে। তার সমর্থনে নিজেদের অঙ্গীকার ঘোষণা করবে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ দেশের কর্তৃপক্ষকে প্রথম থেকেই এতে সব উন্নয়ন অংশীদারকে এর মধ্যে পূর্ণমাত্রায় সম্পৃক্ত রাখতে উৎসাহিত করবে।
৩. এ দারিদ্র্য হ্রাসকরণ কর্মসূচি সামনে রেখে দাতারা সাহায্য অঙ্গীকার ঠিক করবে এবং দেশের নিজস্ব কৌশল অনুযায়ী সরকার ও সিভিল সোসাইটিকে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ জোগান দেবে। এর ফলে বিভিন্ন শর্তের পুনরাবৃত্তি রোধ ও সমন্বয় এবং জাতীয় সীমিত প্রশাসনিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার সহজ হবে।
৪. সবশেষে সব দাতাগোষ্ঠীর বৃহত্তর এবং অধিকতর সমন্বিত অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দিকে তদারকিকে সহায়তা করবে।’
বাংলাদেশে যে দলিল প্রস্তুত করা হয়েছে, সেখানে আছে অলঙ্কার, আছে কথার মারপ্যাঁচ, আছে ধোঁকাবাজি, আছে সারহীন অনেক প্রস্তাবনা। ভালো করে বিশ্লেষণ করলে নানা বাগাড়ম্বরের মধ্যে যে কাজগুলো বাস্তবায়নের জন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ প্রকৃতই আগ্রহী, সেগুলোকে চিহ্নিত করা যায়। এগুলোর মধ্যে আছে:
১. রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি হ্রাস। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বিরাষ্ট্রীয়করণ অথবা বন্ধ করে দেয়া। বিরাষ্ট্রীয়করণ আরো দ্রুততর করা। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, রেলওয়ে, জাহাজ ও টেলিকমিউনিকেশন খাত বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যক্তিমালিকানায় নিয়ে যাওয়া।
২. বিদেশী বিনিয়োগের জন্য অধিকতর আনুকূল্য সৃষ্টি। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিকমিউনিকেশনসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশী বিনিয়োগ সম্প্রসারণে অধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৩. কৃষিতে নতুন বীজ প্রবর্তন, সেচ, সারের ব্যবহার সম্প্রসারণ। কৃষিতে নতুন বীজ প্রবর্তনে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ।
৪. রফতানিমুখী শিল্প বিকাশে গুরুত্ব এবং অধিকতর পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান। বৃহৎ নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রতি মনোযোগ। অশিল্প কর্মসংস্থানকেই সামনে আনা।
৫. শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে এনজিও এবং বেসরকারি দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
৬. করজাল সম্প্রসারণ করা।
৭. প্রচলিত ‘দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি’ সমন্বিত ও শক্তিশালী করা।
এছাড়া আছে সর্বক্ষেত্রে বাজারমুখী আরো সংস্কারকাজ করা। যদিও আশপাশের কয়েকটি দেশের তুলনায় তো বটেই, বিশ্বের বহু প্রান্তস্থ অর্থনীতির তুলনায় বাংলাদেশে উপযুক্ত ‘সংস্কার’ অনেক দ্রুতগতিসম্পন্ন হলেও বারবার সেগুলোকে অধিকতর দ্রুতগতিসম্পন্ন করার জন্য বলা হয়েছে দারিদ্র্য নিরসনের কৌশলপত্রে।
এ প্রতিটি কর্মসূচিই আসলে পুরনো, বাংলাদেশে এগুলো চলছে বহুদিন ধরেই। তাহলে এগুলোর মধ্যে নতুন কী? আর বিশ্বব্যাংক-আইএমএফইবা কেন এ কর্মসূচি নিয়ে এত নাছোড়বান্দা? পুরনোগুলো নিয়ে তার কর্তৃত্ব ও কাজে তো কোনো বাধাবিঘ্ন নেই। তাহলে? বস্তুত ভাংচুর ও অঙ্গীভবন আরো সমন্বিত এবং দ্রুততর করার প্রয়োজনেই এ নতুন দলিল দরকার। কারণ এ‘দেশীয় মালিকানাধীন’ পিআরএসপি এ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে তাদের এজেন্ডার পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে, যার সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাসকরণ বা বিমোচনের সম্পর্ক নেই, একটি ভালো হাতিয়ার প্রদান করছে এবং নিজেদের পুরনো অপরাধকে নতুন মুখোশের আড়ালে ঢেকে রাখার সুযোগ দান করছে। এসব কাজই এত দিন ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি’ বা স্যাপ নামে হয়ে এসেছে। ‘স্যাপ’ নাম বা সংস্কারের আওয়াজ এখন বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ ও বিশ্লেষণের মুখে প্রতারণার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তাই এত দিন স্যাপ নামে যা হতো, তা-ই এখন হবে শ্রুতিমধুর শব্দাবলি দিয়ে মোড়ানো পিআরএসপি নামে। বস্তুত এসব কর্মসূচির সাইনবোর্ড যা-ই থাক, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর বিভিন্ন খাতে কী কী কাজ হবে, তা বিভিন্ন প্রকল্প চুক্তি, সমঝোতা অনুযায়ী অনেক আগে থেকেই ঠিক হয়ে থাকে। সরকার পরিবর্তনে এগুলোর পরিবর্তন হয় না। নিজেদের মধ্যে নানা রকম ঝগড়াঝাঁটি থাকলেও এক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারের মধ্যে শুধু ঐক্য নয়, অধিকতর বাস্তবায়নে প্রতিযোগিতা আছে। এগুলো যে সরকারগুলো বা এ দেশের অনুজ সুবিধাভোগীরা ‘ইচ্ছার’ বিরুদ্ধে করছে তা নয়। এগুলো ‘বড়ভাই’য়ের আশীর্বাদ ও সমর্থনে তাদের স্ফীতি এবং ক্ষমতা সম্প্রসারণে অন্যতম অবলম্বন। ফলাফল কী পেয়েছি আমরা এত দিনে?
বাংলাদেশের তত্কালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান বলেছেন, ‘পিআরএসপি না করলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পয়সা দেবে না। ঋণ দেবে না।’ আবার বলেছেন, ‘এটা আমরা নিজেরা করছি, তাতে কেউ পয়সা না দিলেও নিজেরা এগিয়ে যাব।’ এসব কথাবার্তায় কাজের তেমন ব্যত্যয় হয়নি। আসলে সাইফুর রহমানের কথায় কেউ কৌতুক বোধ করতে পারেন। কিন্তু তিনি নিজেও জানেন, তিনি কোথায় দাঁড়ানো। সাইফুর রহমান এ দলিলটি পাঠ করেননি দেখে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে উপস্থিত অনেক অর্থনীতিবিদ মর্মাহত হয়েছেন বলে এক পত্রিকায় খবর প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু এটাই তো তার ‘র্যাশনাল বিহেভিয়ার’। পিআরএসপি দলিল পাঠ করার যে কোনো অর্থ নেই, তা অর্থমন্ত্রীর চেয়ে ভালো আর কে জানেন? তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে, এ পত্রে যেসব কাজের ইঙ্গিত করা আছে এবং যেসব কাজ এ পত্রের সূত্র ধরে আরো জোর নিয়ে সামনে হাজির হবে, সেগুলো এমনিতেই তিনি ও তাঁরা করছেন। বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতার সূত্রে এসব কাজের ব্যাপারে তাদের অঙ্গীকার অনেক আগে থেকেই দেয়া আছে।
উন্নয়ন নয়, টেকসই দারিদ্র্য
১৯৭২ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত মানুষের সংখ্যা ছিল ৫ কোটি। ২০০২ সালে একই হিসাব অনুযায়ী, বহুবিধ ‘সংস্কার’ ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি’ বাস্তবায়নের পর বাংলাদেশে এ পর্যায়ের মানুষের সংখ্যা ৭ কোটিরও বেশি, স্বাধীনতা লাভকালীন সময়ের জনসংখ্যা। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য জিডিপি বৃদ্ধি করা উচিত এবং দারিদ্র্য বিমোচন খাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো উচিত— এ দুই ধরনের বক্তব্যই আমরা বেশি শুনি। ১৯৮৪-৮৫ থেকে ২০০০-০১ পর্যন্ত সময়কালে স্থির মূল্যে, বাংলাদেশে জিডিপি বেড়েছে শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ। এই একই সময়কালে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে বরাদ্দ বেড়েছে শতকরা প্রায় ৭০০ ভাগ। কিন্তু এই সময়ে দারিদ্র্য অনুপাতের চিত্র কী?
১৯৮৩-৮৪ সালে ক্যালরি গ্রহণভিত্তিক দারিদ্র্য অনুপাত ছিল শতকরা ৬২ দশমিক ৬ ভাগ, ২০০২ সালে এ অনুপাত দাঁড়ায় শতকরা ৫০। প্রায় ১৮ বছরে দারিদ্র্য বিমোচনের হারের অনুপাত বছরপ্রতি শূন্য দশমিক ৭২ ভাগ। মাঝখানে একটু কমলেও পরে আবারো তা বেড়েছে। এ হার ক্রমাগত কমছে না। এর মধ্যে নানা মাত্রার ওঠানামা আছে। যেমন ১৯৯১-৯২তে আমরা দারিদ্র্যসীমার নিচে জনসংখ্যা পাই শতকরা ৪৭ দশমিক ৫। নব্বইয়ের দশকে জিডিপি বেড়েছে প্রায় ৫০ ভাগ, দারিদ্র্য বিমোচন নামে বরাদ্দ এই দশকে বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এ দশকে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এনজিও তত্পরতা, প্রভাব, নিয়ন্ত্রণও বেড়েছে; বাজার মুক্ত হয়েছে, উদার হয়েছে, বিশ্ববাণিজ্যে অংশগ্রহণ বেড়েছে, ক্ষুদ্রঋণের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে এ দশকেই। কিন্তু সরকারি তথ্য বলে, এ দশকেই দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা শতকরা অনুপাতে ৪৭ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে, প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ৫০-এ পৌঁছেছে; এটাকেই বলা হয় দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্য! যার ওপর দারিদ্র্য বাণিজ্য বিশ্বব্যাপী প্রসার লাভ করছে। এভাবেই ‘টেকসই উন্নয়ন’ কথার আড়ালে দারিদ্র্যকে টেকসই করার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত হয়েছে। একই প্রক্রিয়ায় দুর্বৃত্ত অর্থনীতি ও শিল্পধ্বংসী লুম্পেন কোটিপতিদের বিকাশ ও সংহতকরণ হয়েছে।
গণহত্যা ও দারিদ্র্য বিমোচন: বিশ্বব্যাংক
এই পুরো প্রক্রিয়ায় ‘ফ্রেন্ড, ফিলোসফার ও গাইড’ হিসেবে কাজ করেছে বিশ্বব্যাংক এবং তার সঙ্গে আইএমএফ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ আরো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। এসব সংস্থাকে একসঙ্গে বলা হয় ‘দাতা সংস্থা’। ভুল ও প্রতারণামূলক নাম। এদের শক্তি, কর্তৃত্ব এবং কাজ বিশ্বের বৃহৎ বহুজাতিক সংস্থা এবং পুঁজিবাদী কেন্দ্র দেশগুলোর কর্মচারী হিসেবে নির্দিষ্ট। ১৯৭০-এর দশকের প্রথম থেকেই দারিদ্র্য নিয়ে বিশ্বব্যাংকের বিশেষ মনোযোগ দেখা যায়। এরপর থেকে বিশ্বব্যাংক যা কিছু করেছে; সবই করেছে— তাদের ভাষায়, ‘দারিদ্র্য বিমোচন’ সামনে রেখে। তবে ফলাফল আবার তাদের দলিল থেকেই প্রকাশ পায় যে, বিশ্বব্যাপী সম্পদ বৃদ্ধি সত্ত্বেও ঘটেছে একদিকে দারিদ্র্যের বিস্তার, অন্যদিকে বৈষম্য ও বঞ্চনার বৃদ্ধি।
দারিদ্র্য নিয়ে বিশ্বব্যাংকের মনোযোগের সূত্রপাত ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠানের প্রধানের এক বক্তৃতা থেকে। সে সময় এর প্রধান ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব রবার্ট ম্যাকনামারা, যিনি ভিয়েতনাম গণহত্যার সময়ও এ দায়িত্বে ছিলেন। যুদ্ধ-ধ্বংস ও গণহত্যায় জড়িত ব্যক্তি কী করে বিশ্বব্যাংকের মতো বিশ্ব উন্নয়ন সংস্থার প্রধান হলেন, সেটা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন ওঠার কথা থাকলেও সেভাবে ওঠেনি। খেয়াল করলে একই ব্যক্তির এ রকম স্ববিরোধী অবস্থানের মধ্যে কোনো কাকতালীয় কিংবা ব্যতিক্রম কিছু পাওয়াও যাবে না। কারণ বিশ্বব্যাংক যদিও বিশ্বের সব দেশের সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সাধারণভাবে উপস্থিত হয়, কিন্তু এটি সব বিচারেই সাম্রাজ্যবাদী কেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের একটি সম্প্রসারণ। এর জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে, এর প্রধান বাধ্যতামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন অনুমোদিত, আর সর্বোপরি এর সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সিদ্ধান্তের প্রতিধ্বনি।
যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল অ্যাকাউন্ট্যান্ট অফিস মাঝে মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ অনুযায়ী এ নির্ধারিত ভূমিকা ও দক্ষতা নিয়ে তদন্ত করে। ভূমিকা পালনে কোনো ত্রুটি হলে কংগ্রেস ও ট্রেজারি বিভাগ যেকোনোভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে। সাম্প্রতিককালে এর উদাহরণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের দুজন শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদের বিশ্বব্যাংক থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হওয়া। তারা হলেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী জোসেফ স্টিগলিজ, যিনি বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ছিলেন এবং বিশ্বব্যাংকের ‘ভুল সংশোধনের’ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরে রাভি কানবুর, যিনি বিশ্বব্যাংকের দারিদ্র্য-বিষয়ক বিশ্ব রিপোর্টের মূল দায়িত্বে ছিলেন। তাদের এ অবস্থা হয় ট্রেজারি বিভাগের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের সঙ্গে তাদের সংঘাতের কারণে।
তাছাড়া বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় উন্নয়নের যে ধারা, তা আবার যুদ্ধ-ধ্বংস ও গণহত্যার সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। সেজন্য এ ব্যবস্থার গুরু যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন-বিষয়ক বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত বহু ব্যক্তি আদিতে যুদ্ধ বা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত, মার্কিন সিআইএ বা প্রতিরক্ষা বিভাগের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। সেজন্য হিরোশিমা, কোরিয়া, ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে ’৭১-এর বাংলাদেশ হয়ে বর্তমান আফগানিস্তান, ইরাক বা প্যালেস্টাইন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গণহত্যাকারীর এবং বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা গণহত্যা ও ধ্বংসের একান্ত সহযোগীর।
উপরন্তু এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই, যেখানে কোনো দেশে শাসক দুর্নীতিবাজ, নির্যাতক, দেশের সম্পদ লুণ্ঠন ও পাচারে নিয়োজিত; আর সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নেই, নেই বিশ্বব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতা। আবার এ রকম অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে, যেখানে দুর্নীতি, নির্যাতন, লুণ্ঠন আর পাচারের বিরুদ্ধে কোনো সরকার দাঁড়াতে চেষ্টা করছে, আর তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার সব শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এবং বিশ্বব্যাংক তার সব শক্তি নিয়ে তৈরি করছে তার বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা। বস্তুত কোনো দেশে দুর্নীতিবাজদের একটি ভালো ভিত্তি তৈরি না হলে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের পক্ষে কাজ করাই অসম্ভব। কেননা এ প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়নের নামে যেসব প্রকল্প হাজির করে, সেগুলো দুর্নীতির ওপর ভর করে যাত্রা শুরু করে। এবং নতুন দুর্নীতিগ্রস্ত এক গোষ্ঠীর জন্ম দিয়ে শেষ হয় কিংবা চলতে থাকে।
বিশ্বব্যাংকের নতুন-পুরনো শব্দ কিংবা কর্মসূচি
ভিয়েতনাম গণহত্যার সঙ্গে জড়িত বিশ্বব্যাংকের প্রধান ম্যাকনামারা ১৯৭৩ সালে বিশ্বদারিদ্র্য নিয়ে আকুল হয়ে যে বক্তৃতা দেন, তা থেকে এ রকম ধারণা অনেকেই করে থাকতে পারেন যে, বিশ্বব্যাংক বুঝি বদলাল, মনে হয় এখন নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে নেমেছে! কেননা সেই বক্তৃতাতে এই স্বীকৃতি ছিল যে, বিশ্বে সেই সময় পর্যন্ত যে উন্নয়ন কৌশল নেয়া হয়েছে, তাতে দারিদ্র্য পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। বলা দরকার যে, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বিশ্বব্যাপী সাবেক উপনিবেশগুলোকে নতুনভাবে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে অঙ্গীভূত করার কর্মসূচি জোরদার গতিতে চলেছে, আর সেই কর্মসূচির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘সবুজ বিপ্লব’। ‘সবুজ বিপ্লব’ মানে কৃষি খাতে বিষ প্রয়োগ শুরু, ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে হানা দেয়া, খাদ্যের জমি দখল করে রফতানিমুখী পণ্য উৎপাদনে বাধ্য করা। একই সঙ্গে খনিজ সম্পদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহুজাতিক সংস্থার দখল পর্ব এবং এগুলো নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের স্বৈরশাসন ও সামরিক অভিযান।
আর এসব কর্মসূচির সময়ই বলা হয়েছে, সরকার-আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং পোষা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এর বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দারিদ্র্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে, অনুন্নত দেশগুলোর উন্নয়নের এটাই একমাত্র জাদুকরী পথ। কিন্তু এই পথের সঙ্গে দেশে এসেছে অর্থনৈতিক বৈকল্য এবং সামরিক শাসন, নির্যাতন ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্য। এসবের সঙ্গে বরাবর যুক্তরাষ্ট্র ছিল, ছিল বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ। ষাটের দশক শেষ হতে হতে দারিদ্র্য ও বৈষম্য— দুই ক্ষেত্রেই পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তবে এ অবস্থার কারণেই যে বিশ্বব্যাংকের বোধোদয় হয়েছিল তা নয়। বোধোদয় কিংবা আত্মরক্ষামূলক ধরনের অবস্থান ‘পরিবর্তন’-এর পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে দেশে দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ, বিদ্রোহ ও বিপ্লবী আন্দোলনের প্রসার।
দারিদ্র্য নিয়ে বিশ্বব্যাংকের হা-হুতাশ ও তার অর্থায়নে পুষ্ট হয়ে সত্তরের দশকে দারিদ্র্য-বিষয়ক অনেক গবেষণা, গ্রাম-বিষয়ক অনেক পরিকল্পনা-সমীক্ষা হতে থাকে। গ্রাম উন্নয়নই হয়ে দাঁড়ায় তখনকার প্রশাসন আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল স্লোগান। সুনির্দিষ্টভাবে টার্গেট গ্রুপ অ্যাপ্রোচ ও অংশগ্রহণভিত্তিক উন্নয়নকে ধরে এনজিও প্রতিষ্ঠান দাঁড়াতে থাকে সেই সময় থেকেই। পরে এই এনজিও এবং ‘সেফটি নেট’ কর্মসূচি হয়ে দাঁড়ায় বীভৎস বিশ্বব্যবস্থার মোলায়েম হাত, নির্মম চেহারার নমনীয় মুখোশ কিংবা ফাস্ট এইড বক্স! এই বীভৎস ব্যবস্থার বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক বিশ্বব্যাংক আর আইএমএফ আসলে এনজিও ধরনের কর্মসূচিকে যুক্ত করা ছাড়া সত্তরের দশকে তাদের ‘মূল ধারার’ কর্মসূচিতে কিছুমাত্র বদল আনেনি।
তাদের এজেন্ডা সাধারণত বিভিন্ন ঋণের সঙ্গে শর্ত হিসেবে উপস্থিত হতো। তাদের এজেন্ডা বা কর্মসূচির মধ্যে ছিল: (১) বিরাষ্ট্রীয়করণ অর্থাৎ শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় খাত ভেঙে দেয়া (২) আমদানি ও রফতানির শুল্ক-অশুল্ক সব বাধা বা নিয়ন্ত্রণ দূর করা (৩) মুদ্রার অবমূল্যায়ন, (৪) শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব ক্ষেত্রকে অধিক থেকে অধিকতর হারে বাজারমুখী করা (৫) রাষ্ট্রের দায়িত্ব হ্রাস করা (৬) বহুজাতিক সংস্থার বিনিয়োগ লাভজনক করার জন্য নানা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা (৭) খনিজ সম্পদসহ সাধারণ সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় বিশেষভাবে বহুজাতিক সংস্থার কর্তৃত্বে নিয়ে আসা (৮) সম্পদ পাচার সহজতর করা (৯) ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ বাধাগ্রস্ত করা (১০) গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ইত্যাদির মতো পরিষেবা, যা প্রায় সব দেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক জোগান দেয়া হতো, সেগুলোর দাম ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করা।
সত্তরের দশকে প্রথম থেকেই অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আমরা ক্রমে এসব কর্মসূচিকে ‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন’-এর চিন্তা কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে দেখতে পাই। আশির দশকের প্রথম পর্যন্ত এসব কর্মসূচি বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন দিক থেকে আরোপিত হতো। এরপর আরেকটি উন্নয়নের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ; তাদের হাতে থাকে ‘ওয়াশিংটন কনসেনশাস’-এর পতাকা, কর্মসূচির নাম দেয়া হয়— কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি (স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম)। এটা আর কিছুই ছিল না, এত দিনকার উপরে বর্ণিত কর্মসূচিকে একটি একক প্যাকেজের মধ্যে নিয়ে আসা। এ কর্মসূচি নিয়ে আমরা প্রচুর হট্টগোল শুনেছি। আমরা শুনেছি যে, এ কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ঘাটতি সমস্যা দূর হবে, সামষ্টিক স্থিতিশীলতা আসবে, অর্থনীতিতে গতি আসবে, শিল্পায়ন হবে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে, রফতানিতে বহুমুখিতা আসবে, বেসরকারি খাতের উল্লম্ফন বিকাশ হবে।
এ প্রচারণার পাশাপাশি বাস্তব চিত্রের বৈপরীত্য এত বেশি ছিল যে, আশির দশকের শেষ থেকেই দেশে দেশে এ কর্মসূচির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দানা বাঁধতে থাকে। ১৯৯০-৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপ ধসে পড়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্তৃত্ব স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিশ্ব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একক বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে পুঁজিবাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে এ ব্যবস্থার কেন্দ্র রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোরও কর্তৃত্ব এবং খবরদারি বৃদ্ধি পায় অনেক বেশি। কিন্তু একই সময়কালে যখন প্রান্তস্থ দেশগুলো সবল আক্রমণ ও ভাংচুরের মুখে বিপর্যস্ত, তখন এসব প্রতিষ্ঠান ও একক কেন্দ্রের নিশ্চিত কর্তৃত্ব পশ্চিমের দেশগুলোতেই উত্তরোত্তর সমালোচনার মুখে পড়তে থাকে। কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির অভিজ্ঞতার ভয়াবহতা বিভিন্ন দেশে এমন রূপ নেয় যে, ১৯৯৪ সালে এ দুটি প্রতিষ্ঠানের যখন ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে, তখন তাদের উৎসব ম্লান করে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ অনেক বেশি প্রবল হয়ে ওঠে। প্রতিবাদীদের উদ্যোগে গণআদালত গঠিত হয় খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও। ১৯৯৫ সালে গ্যাট চুক্তি ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রতিষ্ঠা বিশ্বক্ষমতার কেন্দ্রকে অনেক সংহত করে। কিন্তু একই সঙ্গে এদের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ও সত্য উন্মোচন করা ক্রমে আরো সংহত রূপ পেতে থাকে।
এ রকম আক্রমণের মুখে ১৯৯৮ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ওলফেনসন যে ভাষণ দেন, তাকে তুলনা করা চলে ১৯৭৩-এর ম্যাকনামারার ভাষণের সঙ্গে। এ ভাষণেও একইভাবে বিশ্বের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে হাহাকার এবং দারিদ্র্য মোকাবেলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নতুনভাবে কর্মসূচি বিন্যাসের তাগিদ দেয়া হয়। তিনি ওই ভাষণে বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বিবরণী ও কৃতিত্ব জাহিরের বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত করে বলেন, ‘যখন সারা গ্রামে আগুন লেগেছে, তখন আর গেরস্থের দিনের হিসাব-নিকাশ দিয়ে কী হবে?’ তিনি স্বীকার করলেন, দারিদ্র্য পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী অধিকতর খারাপ হয়েছে, বৈষম্য বেড়েছে এবং নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে আগের তুলনায় বেশি। বিশ্বব্যাংকের প্রধানের কাছ থেকে এই স্বীকারোক্তি পেতে অনেক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের জন্ম দিতে হয়েছে। তত দিনে ঋণ মওকুফের দাবি উঠেছে মহাঋণগ্রস্ত দেশগুলো থেকে। ঋণ মওকুফকে কেউ কেউ অনুগ্রহ প্রার্থনা হিসেবে উপস্থিত করেন। কিন্তু এখানে অনুগ্রহ, প্রার্থনার কিছু নেই। কেননা ঋণগ্রস্ততা তৈরি হয়েছে ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর জনগণের প্রয়োজনে নয়, ওইসব দেশের লুটেরা এবং আন্তর্জাতিক লুটেরাদের যৌথ কর্মকাণ্ড দ্বারা।
১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভা শেষে তাদের যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, দারিদ্র্য হ্রাস তাদের প্রধান এজেন্ডা এবং দারিদ্র্যপ্রধান দেশগুলোয় দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য সমন্বিত কর্মসূচি ‘সাহায্যের’ মূল ভিত্তি। তাছাড়া ঋণ মওকুফ পেতে গেলেও এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। পিআরএসপির সে-ই শুরু। এবারো সেই পুরনো ভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা— হয়তো এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে এবং হয়তো আসলেই এবার বিশ্বদারিদ্র্য দূর করার কাজে নামবে বিশ্বব্যাংক! বিশ্বদারিদ্র্য নিয়ে বিশ্বব্যাংক থেকে বিশেষ বিশ্ব রিপোর্ট এবং বাজারের বাইরে নানা বিষয় দেখে, ‘না শোনা’ কণ্ঠ শুনে (আনহার্ড ভয়েসেস) তার ওপর বড় বড় রিপোর্ট প্রকাশিত হলো। এসব ক্ষেত্রে একটু নড়চড়ের লক্ষণ সন্দেহ করে বাড়ি দিল মার্কিন প্রশাসন। কয়েক মাসের ব্যবধানে স্টিগলিজ ও কানবুর চাকরি হারালেন।
১৯৯৯ সালের নভেম্বরে সিয়াটলে সূত্রপাত হয়েছিল নতুন অধ্যায়ের। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলন কার্যক্রম হাজার হাজার তরুণ প্রতিবাদীর প্রতিবাদে অচল হয়ে পড়েছিল। এ ঘটনা ছিল বিশ্বব্যাপী এক নতুন অধ্যায়ের সূত্রপাত। কেননা এর পর থেকে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনোটিই আর আরামমতো নিজেদের সভা-সম্মেলন করতে পারেনি। সবসময়ই তাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে বিশাল প্রতিবাদের। প্রতিবাদ এড়াতে গিয়ে জি৭ দেশের শীর্ষ সম্মেলন শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আমির শাসিত দোহায়। কিন্তু কতবার, কত দিন? জনরোষের মুখে আমিরের নিরাপত্তাইবা কে দেবে?
পিআরএসপি তাই একদিকে স্যাপের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখে সবাইকে এটা দেখানোর চেষ্টা যে, এটা ভিন্ন কিছু। অন্যদিকে আগের একই কর্মসূচি এমন এক নামে উপস্থিত করা, যাতে প্রতিবাদের ভাষা দুর্বল হয়। আর ‘দেশীয় মালিকানা’র ওপর জোর দেয়ার প্রধান কারণ এর সব দায়দায়িত্ব দেশীয় অনুজদের কাঁধে স্থানান্তর করা।
কর্মসূচির ধারাবাহিকতা: উৎপাদন খাতের ধস
বাংলাদেশের জন্য প্রণীত অন্তর্বর্তীকালীন পিআরএসপিতে বলা হয়েছে, কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্য শতকরা ৫০ ভাগ হ্রাস করা হবে এবং বলা হয়েছে, এর জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৭-এ উন্নীত করতে হবে এবং তা ১৫ বছর ধরে অব্যাহত থাকতে হবে। আরো বলা হয়েছে, এটি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে আগে অঙ্গীকৃত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলসের আওতায় ‘পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট অন পভার্টি রিডাকশন’-এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। আগেই বলেছি, এ রকম আরো বহু অঙ্গীকার, সমঝোতা আর চুক্তি দ্বারা বাংলাদেশের গন্তব্য বহু আগেই নির্ধারিত।
বাংলাদেশে এত দিন স্যাপের নিট ফলাফল হলো, শিল্প খাতে ধস। শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বৃহৎ বা ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো নয়, অজস্র ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আশি ও নব্বইয়ের দশকে বন্ধ হয়েছে। তার ফলে জিডিপিতে শিল্প খাতে আনুপাতিক অবদান আশির দশকের প্রথম দিকে যা ছিল, নব্বইয়ের দশকের শেষে তার তুলনায় কমে গেছে। স্পষ্টত এ দুই দশকে উন্নয়নের বহু প্রকল্প ও নানা কর্মসূচির ফলাফল হিসেবে শিল্প খাতে নেমেছে ধস। সেজন্য রফতানিমুখী গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংযোজন সত্ত্বেও জিডিপির অনুপাত ও কর্মসংস্থান উভয় দিকেই ক্ষয় দেখা যায়। আশির দশকের শেষে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান ছিল ৭৩ লাখ, নব্বইয়ের দশকের শেষে এসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গার্মেন্ট শ্রমিক যোগ হওয়ার পরও তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ লাখে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে যে, পুরনো কারখানাগুলো একের পর এক আক্রমণে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে শেষ আক্রমণের অপেক্ষায় ধুঁকছে। দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে যখন হাজার হাজার কোটি টাকার উৎসব চলছে বাংলাদেশে, যখন দারিদ্র্য হ্রাসকরণের আরেক তরবারি জনগণের মাথার উপরে, তখন প্রতি বছর বাংলাদেশে শিল্প খাত থেকে শ্রমিক উচ্ছেদ হয়েছে তিন লাখ। প্রতি বছর তিন লাখ শ্রমিক আর তার সঙ্গে পরিবারবর্গকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নিক্ষেপ করে দারিদ্র্য বিমোচনের সমবেত সংগীত দিয়ে তার চিত্কার ঢেকে দেয়া হয়েছে।
তাই বিস্ময়ের কিছু নেই, যখন আমরা দেখি পিআরএসপি দলিলে শিল্প খাতকে প্রান্তিক করে উপস্থাপন করা হয়েছে। অশিল্প খাত, ইনফরমাল খাত, টুকরো টুকরো ভাসমান অনিশ্চিত কাজের খাতগুলোকেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ হিসেবে নির্দেশ করা হয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের চেহারাও তা-ই দাঁড়িয়েছে। বৃহৎ শিল্পের সম্ভাবনার কথা দলিলে উল্লেখও করা হয়নি, কারণ এ নীতি প্রক্রিয়ায়ই বাংলাদেশের বৃহৎ শিল্পগুলো আগেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি কিংবা চট্টগ্রাম স্টিল মিলস ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে এমনই নয়। এসব প্রতিষ্ঠান একটি অর্থনীতিতে শিল্পায়নের ভিত্তি নির্মাণ করে। বিশিল্পায়ন যেখানে পরিকল্পিত নীতি, সেখানে এসব প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার কথা নয়। এসব প্রতিষ্ঠান গেছে যে নীতি প্রক্রিয়ায়, সেই একই প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পগুলোর দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল আদমজী বন্ধ হলো কোনো পর্যালোচনা ছাড়া, লোকসানের দায়দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা ছাড়া। এটাও নিছক কাকতালীয় নয় যে, যখন বাংলাদেশে পাটকল বন্ধ হলো, তখন পশ্চিমবঙ্গে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনটি পাটকল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হলো এবং বাংলাদেশ সরকার ভারতে কাঁচা পাট রফতানি বিষয়ে আলোচনা করে সন্তোষ প্রকাশ করে। বিদেশী বিনিয়োগ পিআরএসপির অন্যতম মনোযোগের জায়গা। তবে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের ফলাফল নিয়ে পর্যালোচনার কোনো আগ্রহ যথারীতি এ রিপোর্টে দেখা যায়নি। কেননা তা বিপজ্জনক। আর এসব কোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মানুষের জন্য তার ফলাফল বিচারের ওপর নির্ভরশীল নয়। নির্ভরশীল যেকোনোভাবে যত দ্রুত সম্ভব বহুজাতিক সংস্থাগুলোর মুনাফা সর্বোচ্চ করার ওপর।
বাংলাদেশে বড় আকারের বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে। প্রথমে কাফকো এবং পরে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতে। এছাড়া টেলিকমিউনিকেশনসহ আরো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আসছে। কাফকোতে বিনিয়োগের পরিণাম আমরা জানি। ভর্তুকি দিয়েও এ প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করা যায়নি, বরং অর্থনীতির অব্যাহত রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তেল-গ্যাসে বিদেশী বিনিয়োগের পরিণাম স্পষ্টত দাঁড়িয়েছে দেশীয় ক্ষমতা ধ্বংস, গ্যাসের অব্যাহত দাম বৃদ্ধি, গ্যাসসম্পদ লুণ্ঠন ও পাচারের বন্দোবস্ত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ ও ঘাটতি বৃদ্ধি; বিদ্যুতে বিদেশী বিনিয়োগের পরিণাম বিদ্যুতের অব্যাহত দাম ও ভর্তুকি বৃদ্ধি। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি তাই এখন একটি নিয়মিত ঘটনা এবং এ চুক্তি অব্যাহত থাকলে সামনে এর আরো বৃদ্ধি আমরা দেখব। পিআরএসপি এগুলোকে আরো কার্যকর করার আহ্বান জানাচ্ছে। অর্থনীতিতে এর প্রত্যক্ষ ফল বোঝা কঠিন নয়। এতে প্রতিটি উৎপাদনশীল খাতের ব্যয় বৃদ্ধি ঘটবে, প্রতিটি উৎপাদিত দ্রব্য প্রতিযোগিতার ক্ষমতা আরেক দফা হারাবে, টিকে থাকা কঠিন হবে অনেকের, দ্রব্যমূল্য বাড়বে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। আরো অনেক মানুষ উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড থেকে ছিটকে পড়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে।
রাষ্ট্রীয় সার্ভিস থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহারকে দারিদ্র্য বিমোচনের পথ হিসেবে নির্দেশ করেছে পিআরএসপি, কিন্তু মুখ ফসকেও একবার বলেনি, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে দেয়া নানা ধরনের ভর্তুকি প্রত্যাহারের কথা কিংবা ব্যাংক ডাকাতদের হাত থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ উদ্ধারের কথা। বরং তাদের কর্মসূচি এগুলোর বৃদ্ধিরই ইঙ্গিতবহ।
অর্থনীতি উন্নয়নের ‘সাহায্য প্রকল্প’: নতুন লক্ষ্য দরিদ্র, নতুন বিপন্ন জনপদ
আন্তর্জাতিক সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রসহ জি৭ভুক্ত দেশগুলো আমাদের সাহায্য করে বলে একটা মিথ তৈরি করা হয়েছে। এ মিথ সবাইকে বিশ্বাস করতে বলে যে, বিশ্বব্যাংক প্রভৃতি সংস্থা ঋণ অনুদান দেয় উন্নয়নের জন্য, আমাদের বেঁচে থাকার জন্য এবং আমাদের দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য। এ ধারণা বদ্ধমূল হয় তথ্য গোপন কিংবা তার জালিয়াতিপূর্ণ উপস্থাপনের কারণে। কিন্তু মোহমুক্তভাবে পুরো বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা যে চিত্র পাই, তা এক ভয়াবহ জালের ও অবাধ ধ্বংসযজ্ঞের।
যেমন ‘বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পে ঋণ নিয়ে ফলাফল দেখি: অবাধ জলপ্রবাহের বেশ পরিণত হয় স্থায়ী জলাবদ্ধতার দেশে এবং বন্যা, নদীভাঙনের আরো স্থায়ী রূপপ্রাপ্তি।
জ্বালানি উন্নয়ন প্রকল্পের ফলাফল: তেল, গ্যাস সম্পদের ওপর বহুজাতিক সংস্থার দখলিস্বত্ব প্রতিষ্ঠা। মত্স্য উন্নয়ন প্রকল্পের ফলাফল: কৃষিজমি ধ্বংস করে চিংড়ি উৎপাদন।
বন উন্নয়ন প্রকল্পের ফলাফল: প্রাকৃতিক বন ধ্বংস ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর গাছের ‘বন’ তৈরি।
কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের ফলাফল: নতুন হাইব্রিড/টারমিনেটর বীজ আগ্রাসনে কৃষিকে নিক্ষেপ করা।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্পের ফলাফল: উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ও তার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মতো বিদেশী বিনিয়োগ ইত্যাদি।
এগুলো নিছক দুর্নীতি নয়, এগুলো পরিকল্পিত ‘উন্নয়ন’ কৌশল। বাংলাদেশের মানুষকে শুধু যার ফল শুধু ভোগ করতে হয় না, এর জন্য আনীত ঋণের দায়ও বহন করতে হয়। এখানে একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হতে পারে।
আদমজী পাটকল বন্ধ হলো গত ৩০ জুন, ২০০২। কিন্তু আদমজী পাটকল বন্ধসহ পাট শিল্প বিনাশ ও শ্রমিকদের বেকার বানানো প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৪ সালে। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকার চুক্তি স্বাক্ষর করে সেদিন একটি প্রকল্প অনুমোদন করে, যার নাম ছিল ‘জুট সেক্টর অ্যাডজাস্টমেন্ট ক্রেডিট’। এ প্রকল্পের আওতায় বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ দেয়া হয়েছে তত্কালীন বাজারদর অনুযায়ী প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গত ৩০ বছরে আদমজী পাটকলে যে লোকসান হয়েছে বলে বলা হয় এর পরিমাণ তার চেয়ে বেশি। পাট খাতের জন্য বিশ্বব্যাংকের দেয়া এতগুলো টাকা ‘সাহায্য’ হিসেবেই মানুষ জেনেছে। কাগজপত্রে দেখানো হয়েছে, এ তহবিল কৃষি ও শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত পাট খাত বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ।
কিন্তু বাস্তবে কি ছিল সেই টাকা-পয়সার গন্তব্য? সেটা কি পাট খাত বিকাশের জন্য? সেটা কি নতুন কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য? নতুন পণ্য নিয়ে গবেষণার জন্য? সেটা কি নতুন বিশ্ববাজার অনুসন্ধানের জন্য? সেটা কি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য? সেটা কি দক্ষতা বৃদ্ধির আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা বিকাশের জন্য? না, এর কোনোটাই নয়। বাংলাদেশের মানুষের নামে, তাদের দায়িত্বে বিশ্বব্যাংক থেকে দেড় হাজার কোটিরও বেশি টাকার এ ঋণ নেয়া হয়েছিল সুনির্দিষ্ট কয়েকটি কাজের জন্য। সেগুলোর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো: (১) ২৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের মধ্যে নয়টি বন্ধ করে দেয়া (২) অবশিষ্ট ২০টির মধ্যে ১৮টি বেসরকারীকরণ করা এবং (৩) ২০ হাজার শ্রমিককে ছাঁটাই করা। তার মানে হলো, বাংলাদেশের মানুষ সুদ দিয়ে ঋণ নিয়েছে মিল প্রতিষ্ঠা করার জন্য নয়, মিল বন্ধ করার জন্য। নতুন কর্মসংস্থানের জন্য নয়, বরং শ্রমিক ছাঁটাই করার জন্য। এ কাজ করার জন্য বাংলাদেশের মানুষের ঋণের বোঝা বাড়ানো হয়েছে— এ কাজ করে। বিশ্বব্যাংক পরিচিত হলো বাংলাদেশের পাট খাতে উন্নয়নের ‘সাহায্যদাতা’ হিসেবে। মিল বন্ধ হবে, ছাঁটাই হবে হাজার হাজার শ্রমিক। কর্মহীন, উদ্বাস্তু ও অধিক ঋণগ্রস্ত করার এ রকম চুক্তি সম্পাদনা করেছে বাংলাদেশেরই সরকার। পরপর বিভিন্ন সরকার তার বাস্তবায়নও করেছে ইমানের সঙ্গে।
এ চুক্তির মধ্য দিয়ে কি তবে পাট খাতে বেসরকারি শিল্প লাভবান হয়েছিল? না, তা-ও নয়। ১৯৯৪ সালের এ ঋণ কর্মসূচি নিয়ে বেসরকারি খাতের কিছু ব্যক্তি, যাদেরকে এ কর্মসূচির সুবিধাভোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, সে রকম কয়েক জন ১৯৯৬ সালের আগস্টে বিশ্বব্যাংক বরাবর পত্র দেন। সেই পত্রে তারা, অর্থাৎ বেসরকারি মালিকরা বলেন, ‘সংস্কার কর্মসূচির জন্য আগের চেয়ে তাদের কারখানাগুলোর অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে।’ তারা বলেছেন, এ কর্মসূচির ফলে (১) বেসরকারি মিলগুলোর কার্যক্ষমতা কমেছে (২) প্রকৃত উৎপাদন ও রফতানি কমেছে (৩) বেসরকারি কারখানার বাজারমূল্যে পতন ঘটেছে (৪) ১১টি বেসরকারি কারখানার উৎপাদনক্ষমতা কমেছে বা (অ)স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
আদমজী পাটকল বন্ধ করে দেয়ার পেছনে প্রধান ও মোক্ষম যুক্তি হলো, এ কারখানা খোলা রাখলে যত ক্ষতি, বন্ধ রাখলে তার থেকে কম ক্ষতি। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে লোকসানের কথা প্রচারে সবার বিশেষ আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখা গেলেও এর কারণ অনুসন্ধানে, এর দায়-দায়িত্ব সুনির্দিষ্টকরণে সরকারের কোনো কমিটি গঠিত হয়নি, বিশ্বব্যাংক ইত্যাদির কোনো প্রকল্প তৈরি হয়নি। বরং এসব লোকসানি প্রতিষ্ঠান যেসব আমলা দ্বারা পরিচালিত হয়েছে, তারাই নানাভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন, কেউ তিরস্কৃত হননি, জবাবদিহিতার সম্মুখীন হননি। যেসব আমলা দক্ষ বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিশ্বব্যাংক প্রভৃতিতে যোগ দেন, তারা তো এদের মধ্যে থেকেই আসেন। আসলে লোকসান কথাটা পুরো খাতকে বসিয়ে দেয়ার যুক্তি হিসেবে মোক্ষম হলেও এগুলোকে লাভজনক করার চেষ্টা তো হয়ইনি, বরং এ ধরনের উদ্যোগ বরাবর বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে লাভজনক অনেক প্রতিষ্ঠানও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দেশীয় উৎপাদনশীল বেসরকারি খাত যে এসবের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে, তা-ও নয়। একই ধরনের নীতি উৎপাদনশীল খাতকেও দাঁড়াতে দেয়নি। পিআরএসপি এ কর্মসূচিগুলোকেই নতুন মোড়কে উপস্থিত করেছে।
বাংলাদেশে যখন দারিদ্র্য হ্রাসকরণ কর্মসূচি নিয়ে বিষম হইচই, ঠিক তখনই বন্ধ করা হলো আদমজী পাটকল। প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক, তার সঙ্গে আরো কয়েক হাজার বিভিন্ন কর্মজীবী এর মধ্য দিয়ে সরাসরি তাদের জীবিকার অবলম্বন থেকে সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিটকে পড়লেন। তাদের পরিণতি কী? পরিণতি আমাদের অপরিচিত নয়; বেকার বাড়বে, সেই কারণে আশ্রয়হীন বাড়বে, পরিবার ভাঙবে, নারী-শিশুর নিরাপত্তাহীনতা বাড়বে অধিক হারে, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া ছাত্রছাত্রী বাড়বে, শিশুশ্রমিক বাড়বে, ভাসমান পতিতা বাড়বে, অপরাধ বাড়বে। এ একটি সিদ্ধান্তের কারণে এক ধাক্কায় লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি দারিদ্র্যসীমার নিচে নিক্ষিপ্ত হবে। এ পাটকলের সঙ্গে বহুভাবে যুক্ত আরো বহু লাখ মানুষ, যারা প্রান্তিক অবস্থানে ছিল, তারাও একই অবস্থার মুখে। দারিদ্র্য সৃষ্টির এ রকম বহু প্রকল্পের সাফল্যের মধ্য দিয়েই বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবি এত দূর এসেছে। শুধু এ দেশ নয়, দেশে দেশে বিশ্বব্যাপী। আর্জেন্টিনা এ ধরনের জালে আরো এক ধাপ এগিয়ে দীর্ঘ মন্দায় ডুবেছে। ভেনিজুয়েলা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে দাঁড়িয়ে থাকতে চেষ্টা করেছে শক্তভাবে। বাংলাদেশের শাসকদের মডেল নাইজেরিয়া, আর্জেন্টিনা।
প্রতারণা যখন ধারাবাহিকতা
যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সন্ত্রাসবিরোধী হিসেবে উপস্থিত করে, যেখানে নাইজেরিয়াসহ বহু দেশে অর্থনীতি বিপর্যস্ত ও পরিবেশ বিপন্ন করে বহুজাতিক তেল কোম্পানি শেল, তারাই টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজেকে তার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে উপস্থিত করে; যেখানে বিশ্বের বহু দেশে অর্থনীতি বিপর্যস্ত করার জন্য দায়ী আরেক বহুজাতিক তেল কোম্পানি ইউনোকল (পরে শেভরন), বাংলাদেশে মাগুরছড়ায় ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদ বিনষ্ট করার দায়িত্ব ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে ব্র্যাককে সঙ্গে নিয়ে কয়েক লাখ টাকার টিকা আর বই উপহার দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন শরিক হিসেবে নিজেকে বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য প্রচারে উপস্থিত করে; সেখানে বিশ্বব্যাংক আইএমএফ সরকারের পক্ষ থেকে দারিদ্র্য পুনরুৎপাদনের যাবতীয় ব্যবস্থাকে দারিদ্র্য হ্রাসকরণ কৌশল হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থিত করাটা পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে খুবই ধারাবাহিক ও ‘যুক্তিযুক্ত’ প্রতারণা!!
পুনশ্চ: পরে সমালোচনার মুখে পিআরএসপি পরিত্যক্ত হয়। কিন্তু তার কর্মসূচি নতুন নতুন নামে অব্যাহত থাকে।
লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়






