এম. শাহ আলম
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশী চা সংসদ, ঢাকা
বাংলাদেশের চা খাত একসময় স্বর্ণালী সময় পার করে এসেছে। মাঝে কিছু সমস্যা ও সংকট পেরিয়ে বর্তমানে দেশের বাগানগুলো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বিশ্বের প্রথম সারির চা উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে কি?
হ্যাঁ, বাংলাদেশে বর্তমানে চা উৎপাদন ও গুণগত মান উভয় ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর দেশের চা উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭২ সালে দেশের মোট চা উৎপাদন ছিল ২৩.৪৮ মিলিয়ন কেজি, যা ২০১৯ সালে রেকর্ড পরিমাণ ৯৬.০৭ মিলিয়ন কেজিতে উন্নীত হয়েছে এবং আবহাওয়া খারাপ থাকার কারণে ২০২০ সালে ৮৬.৩৯ মিলিয়ন কেজি চা উত্পন্ন হয়েছে। এই হিসাবে গত ৫০ বৎসর দেশের মোট চা উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ৩০০%। বাংলাদেশের চা শিল্প এখন আন্তর্জাতিক মানের চা উৎপাদন করছে যা দেশ ও বিদেশে সমাদৃত হচ্ছে।
অব্যশই বিশ্বের প্রথম সারির চা উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে বাংলাদেশের অনেক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এর জন্য নিম্নবর্ণিত সরকার ও চা উৎপাদনকারীদের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন:
চা বাগানসমূহে প্রায় ৯,৫০০ হেক্টর জমিতে পুরনো ও অলাভজনক চা গাছ রয়েছে। এই সব চা এলাকা উৎপাটন করে পুনরাবাদ করতে হবে।
চা বাগানের অভ্যন্তীণ রাস্তা ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, ড্যাম-রিজার্ভার ও কৃত্রিম জল সেচ সহযোগিতা দিয়ে খরা ও শুকনা মৌসুমে চা গাছকে বাঁচিয়ে রেখে চা উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা রাখা যেতে পারে।
চা উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকার কর্তৃক পরিচালিত ‘বাংলাদেশ টি রিসার্চ ইনস্টিটিউট’কে আরো সক্রিয় ও গতিশীল করতে হবে। নতুন নতুন উন্নত মানের চায়ের জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে ফলন আরো বাড়ানো যেতে পারে।
চা শ্রমিক ও কর্মচারীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন ও চা প্রক্রিয়াকরণে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
এছাড়া সরকার/বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১২ বৎসর মেয়াদি ৯৬,৭৩৫.৭০ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে ‘উন্নয়নের পথনকশা বাংলাদেশ চা শিল্প’ অনুমোদন দিয়েছে। এটা বাস্তবায়িত হলে চা শিল্পে প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হবে। এতে ২০২৫ সালে চা উৎপাদন বেড়ে দাঁড়াবে ১৪০ মিলিয়ন কেজিতে।
কৃষিপণ্যের ন্যায় স্বল্প সুদে চা উন্নয়ন ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বাগান মালিকরা উৎপাদনের ক্ষেত্রে এখনো কোন কোন সমস্যা মোকাবেলা করেন। সরকারের কাছে কোন ধরনের সহযোগিতা আশা করেন?
চা বাগান মালিকরা বর্তমানে চা উৎপাদনের ক্ষেত্রে নানাবিধ সমস্যা মোকাবেলা করেন, যা নিম্নরূপ:
চা এলাকা উৎপাটন করে পুনরাবাদ করতে হলে ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। কৃষিপণ্যের ন্যায় স্বল্প সুদে ও দীর্ঘমেয়াদি এ অর্থ সরকার হতে ঋণ পাওয়া গেলে আরো ২০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন করা সম্ভব।
শ্রমিক গৃহনির্মাণ করতে সরকার কর্তৃক কৃষিপণ্যের ন্যায় স্বল্প সুদে ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ঋণ মঞ্জুর করা ছাড়া চা শিল্পের একার পক্ষে তা করা সম্ভব হবে না।
বাগানের সরকারি প্রাইমারি বিদ্যালয়গুলোকে পর্যায়ক্রমে সরকারীকরণ করা প্রয়োজন।
নিম্নমানের চা আমদানি নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন।
এছাড়া বর্তমানে কভিড-১৯ মহামারী প্রার্দুভাবের কারণে উদূ্ভত পরিস্থিতি উত্তরণে এবং চা শিল্পকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব থেকে সুরক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত আর্থিক প্রণোদনা প্রয়োজন।
দেশের উত্তরাঞ্চলের ক্ষুদ্রায়তন চা চাষের বিকাশ ঘটছে। দেশের মূলধারার চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও চা সংসদ বিষয়টিকে কীভাবে দেখে?
সম্প্রতি দেশের উত্তরাঞ্চলের সমতল ভূমিতে চা চাষ শুরু হয়েছে। উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার সমতল ভূমিতে চা চাষের সফলতা এসেছে। পানি জমে না এমন উঁচু ও সমতল ভূমিতে দেশের অন্যান্য স্থানেও চা চাষ করা যেতে পারে। দেশের চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও চা সংসদ বিষয়টিকে সফল ও সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখে। কারণ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে অন্যান্য খাতসমূহের সাথে চা শিল্পেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশের চা উৎপাদন ও উৎপাদন বাড়াতে প্রতিবন্ধকতা কী কী?
চা উৎপাদন বাড়াতে নিম্নবর্ণিত প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা প্রয়োজন:
১। অধিক ফলনশীল নতুন নতুন ক্লোন চা চারা ও উন্নত বীজ উদ্ভাবন করা, ২। আবাদযোগ্য ভূমিকে উৎপাদনে নিয়ে আসা, ৩। অলাভজনক চা গাছ পুনঃরোপণ করা, ২। নতুন উৎপাদন কৌশল ও প্রণালি উদ্ভাবন করা, ৫। চা কারখানা আধুনিকীকরণ করা, ৬। সহজ শর্তে ও কম সুদে উন্নয়ন ও ওয়ার্কিং ঋণের ব্যবস্থা করা, ৭। কৃষি ব্যাংক ছাড়াও অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে চা শিল্পকে আর্থিক সুবিধা প্রদান, ৭। অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধি (যোগাযোগ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিবহন), ৮। বর্তমান উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা ও নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা, যার ফলে চা উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, ৯। বিদ্যমান বৈদেশিক বাজার সম্প্রসারণ ও নতুন বাজার সৃষ্টি, ১০। চা শিল্প কৃষিভিত্তিক শিল্প বলে শস্যঋণ ও ট্যাক্স সুবিধা প্রদান, ১১। উপযুক্ত ট্রেনিং ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, ১২। রফতানি বৃদ্ধিতে প্রণোদনা দেয়া, ১৩। চা শিল্পকে স্পেশালাইজড শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা এবং ১৪। সরকারি ব্যয়ে বাগানে স্বাস্থ্য ও প্রাথমিক শিক্ষা সুবিধা প্রদানের সরকারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা।
আধুনিক চা বাগান ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হতে বাগান মালিকরা কতটুকু বিনিয়োগ করছেন?
চা বাগান মালিকরা বিনিয়োগে আগ্রহী, কিন্তু চা শিল্পকে লাভজনক করা আবশ্যক। চায়ের ভালো মূল্য পাওয়া গেলে ও লাভজনক হলে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। দেশে গুণগত মানসম্পন্ন চা উৎপাদনের যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা বিদ্যমান। বাংলাদেশের চা শিল্পকে উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পর বিদেশে রফতানি করা সম্ভব। দেশের চা শিল্পকে টেকসই করার জন্য চা উৎপাদন ও শ্রমিক কল্যাণ খাতে স্বল্প সুদে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ঋণ মঞ্জুর ও বিতরণ করা দরকার। বিনিয়োগ পরিবেশ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ চা বোর্ড ও সরকারের হালনাগাদ পলিসিগত বিনিয়োগবান্ধব সহায়তা কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করে চা শিল্পকে টেকসই উন্নয়নের দিকে ধাবিত করবে।
করোনাকালে দেশের চা বাগানগুলো বড় ধরনের সংকটের মধ্যে পড়েছে। এ সংকট উত্তরণের সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে বাগান মালিকদের ভূমিকা কী?
বাংলাদেশের চা শিল্পের ওপর কভিড-১৯ মহামারীর নৈতিবাচক প্রভাবসমূহ নিম্নরূপ:
ক। চায়ের চাহিদা হ্রাস: চায়ের মোট চাহিদা ও এর অভ্যন্তরীণ ভোগের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। ফলে চাহিদা কমেছে ৬০% এবং নিলামে চায়ের বাজার মূল্য অত্যন্ত নিম্নমুখী অনেক চা অবিক্রীত রয়ে যাচ্ছে।
খ। নিলামে চায়ের দরপতন: ২০২০ সালে অতি দ্রুত চায়ের দরপতন শুরু হয়েছে বহুলাংশে। বর্তমানে চা উৎপাদনকারীরা গড় উৎপাদন খরচের চেয়ে ৩০.০০ টাকা কমে সর্বনিম্ন মূল্যে চা বিক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে। ২০১৯ সালে চায়ের কেজি প্রতি উৎপাদন খরচ (সিওপি) ছিল ২০০.০০ টাকা, কিন্তু ২০২০ সালে নিলামে চায়ের কেজিপ্রতি গড় মূল্য হচ্ছে ১৭০.০০ টাকা।
গ। রাজস্ব ঘাটতি ও নগদ প্রবাহ: রাজস্ব ঘাটতি ও নগদ প্রবাহে (cash flow) অপ্রতুলতা এবং ব্যাংক কর্তৃক অপর্যাপ্ত অর্থায়ন ও মূলধনের অভাবে চা শিল্প কঠিন সমস্যায় নিপতিত হয়েছে। অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ চা অবিক্রীত থাকার কারণে গুদামজাতেও গুনতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ আর এতে চায়ের গুণগত মান রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত চা কোম্পানিগুলো উৎপাদন অব্যাহত রাখা ও মজুরি পরিশোধ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে এবং কোনো ছাঁটাই এবং রিট্রেনমেন্ট ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তবে চায়ের দাম কমে যাওয়ায় এবং চা অবিক্রীত থাকায় চা কোম্পানিগুলোর নগদ প্রবাহ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং চলতি মূলধনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যদি নগদ প্রবাহ এবং চলতি মূলধন নিশ্চিত করা না যায় সেক্ষেত্রে খুব নিকট ভবিষ্যতে বিরূপ পরিণতি প্রত্যাশিত। এছাড়া চা কোম্পানিগুলো কভিড-১৯ শুরুর পর থেকে শ্রমিকদের প্রতি কেজি ২.০০ টাকা ভর্তুকি মূল্যে রেশন সরবরাহ ও অন্যান্য সব সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রেখেছেন। কভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নানা উপকরণ মাস্ক, হাত ধোয়ার জন্য সাবান, সতর্কতামূলক লিফলেট প্রভৃতি শ্রমিকদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।
দেশের চায়ের দুটি নিলাম বাজার রয়েছে। শ্রীমঙ্গলের নতুন নিলাম কেন্দ্রটির মাধ্যমে চা বিপণন কতটুকু এগিয়েছে?
বর্তমানে দেশে দুটি চা নিলাম কেন্দ্র রয়েছে। আগে দেশে উৎপাদিত শতভাগ চা চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রের মাধ্যমে বিপণন করা হতো। ২০১৯ সালে শ্রীমঙ্গলে দ্বিতীয় চা নিলাম কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওই নিলাম কেন্দ্রের মাধ্যমে স্থানীয় চা উৎপাদনকারীরা তাদের উৎপাদনের একটি অংশ ওই নিলাম কেন্দ্রের মাধ্যমে বিপণন করা হচ্ছে। এতে চা বিপণন কিছুটা এগিয়েছে। বাংলাদেশীয় চা সংসদ এটাকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। এতে চা বিপণন আরো বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশী চায়ের বাজার প্রতিষ্ঠিত করতে কী করতে হবে। ভালো মানের চা উৎপাদনে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে কী পরিমাণ এগিয়েছে?
বর্তমানে বাংলাদেশে নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির কারণে বাৎসরিক অভ্যন্তরীণ ভোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে উৎপাদিত চা দ্বারা অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করার পর তেমন উদ্বৃত্ত চা না থাকায় রফতানি হ্রাস পাচ্ছে। এক হিসাবে ১৯৭৩ সালে দেশে অভ্যন্তরীণ ভোগের পরিমাণ ছিল ৮.৯৩ মিলিয়ন কেজি, বর্তমানে দেশের বাৎসরিক অভ্যন্তরীণ ভোগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৪.০০ মিলিয়ন কেজি এবং মাথাপিছু ভোগ ৪২০ গ্রাম। ফলে দেশে উৎপাদিত রফতানিযোগ্য লভ্য চায়ের অভাবে রফতানি ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। রফতানি বাড়ানোর জন্য এই মুহূর্তে টেকসইভাবে দেশের চা উৎপাদন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
চা খাতকে এগিয়ে নিতে সার্বিকভাবে কোন কোন উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে?
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় চা শিল্পকে চা উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এ শিল্পের লক্ষ্য অর্জনে চা উৎপাদন বৃদ্ধি, গুণগত মানোন্নয়ন, চা শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধাদি প্রদান, পরিবেশ ও আবহাওয়া পরিবর্তনে আমাদের করণীয় নির্ণয়, কৃষিপণ্যের মতো স্বল্প সুদে চা ঋণের ব্যবস্থাকরণ ও বিটিআরআইয়ের মাধ্যমে চা গবেষণা উন্নয়ন, তথ্য ও প্রযুক্তিগত উত্কর্ষ সাধন করতে হবে।
(সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুজিত সাহা)





