বাংলাদেশের চা খাতের প্রাচীন ও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান এমএম ইস্পাহানি। একসময় ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো এ দেশের চা খাতে ব্যবসা শুরু করে। ওই সময় থেকেই ইস্পাহানি এ অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের মধ্যে নিজেদের ধরে রেখে বাংলাদেশের অন্যতম চা উৎপাদক ও বিপণনপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশী চায়ের আইকনিক ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেদের হাজির করেছে ইস্পাহানি।

চা খাতের দেশীয় উদ্যোক্তাদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়া ইস্পাহানির প্রায় ২০০ বছরের পথচলা অতটা মসৃণ ছিল না। বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎকালীন সময়ের সুবিধা প্রদান সত্ত্বেও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দিয়ে ইস্পাহানি চা খাতে টিকে রয়েছে। বিদেশী কোম্পানিগুলো এ দেশে চা উৎপাদনের পর রফতানি করলেও ইস্পাহানি এ দেশেই একটি স্বকীয় চা ব্র্যান্ড তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে দীর্ঘদিন ধরে, যার ফল তারা ভোগ করছে কয়েক দশক ধরে।

শ’ওয়ালেস ইহুদি মালিকানাধীন চা উৎপাদনকারী কোম্পানি। দেশীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে পেরে উঠতে না পেরে ১৯৯৫ সালের দিকে তাদের মালিকানায় ছয়টি বাগান বিক্রি করে চলে যায়। চট্টগ্রামের শিল্পপতি এম মোর্শেদ খানের শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক গ্রুপ চারটি এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল টি কোম্পানি দুটি বাগান কিনে নেয়। বর্তমানে এসব বাগানের চা উৎপাদন আগের চেয়ে বেড়েছে।

স্কটিশ চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জেমস ফিনলে। শতবছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে চা উৎপাদন করেছে বহুজাতিক কোম্পানিটি। কিন্তু নতুন উৎপাদন কৌশলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে ২০০০ সালের দিকে সব বাগান বিক্রি করে দেয় তারা। চট্টগ্রামের পেডরোলো গ্রুপ, ইস্পাহানি গ্রুপ ও ফিনলে গ্রুপ বাগানগুলো কিনে নেয়। বিদেশী মালিকানায় রুগ্ণ থাকলেও দেশীয় বড় গ্রুপের অধীনে এসে দেশের শীর্ষস্থানীয় চা উৎপাদকে পরিণত হয়েছে কনসোলেটেড চা কোম্পানি নামে জেমস ফিনলের বাগানগুলো। ব্রিটিশ কোম্পানি ডানকান ব্রার্দাসের এখনো ১৬টি বাগান রয়েছে বাংলাদেশে। তবে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে উৎপাদন ও চায়ের ওপর আধিপত্য হারিয়েছে কোম্পানিটি।

বহুজাতিক ছাড়াও দেশীয় ব্যবস্থাপনায় চা উৎপাদনে ভালো করছে পেডরোলো গ্রুপ, মোস্তফা গ্রুপ, ম্যাগনোলিয়া, কাদেরপুর টি কোম্পানি, টিকে গ্রুপ, ব্র্যাক চা উৎপাদনে উচ্চপ্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিটি গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ ও আকিজ গ্রুপ বাগান ক্রয়ের মাধ্যমে চা উৎপাদনে বিনিয়োগের পাশাপাশি চা ব্র্যান্ডিংয়ে নেমেছে। মাত্র এক দশক আগে চট্টগ্রামভিত্তিক পেডরোলো গ্রুপ রামগড় ও হালদা ভ্যালি নামের দুটি চা বাগান কিনে উৎপাদনে যায়। বর্তমানে গ্রুপটির মালিকানাধীন দুটি বাগান হেক্টরপ্রতি উৎপাদনে দেশের অন্যান্য বাগানকে ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি দেশের সবচেয়ে ভালো মানের চা উৎপাদনে কয়েক বছর ধরে শীর্ষস্থানে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মধুপুর, সাতগাঁও ও জেমাই বাগানের চা প্রতি বছর নিলামে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রথম পছন্দের চা হিসেবে বিক্রি হয়। দেশের ঐতিহ্যবাহী ইস্পাহানি গ্রুপের চারটি বাগানেই ভালো মানের চা উৎপাদন হয়। প্রতি বছরই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায় গ্রুপটির মির্জাপুর, জেরিন, নেপচুন ও গাজীপুর বাগানের চা।

তবে বিদেশী প্রতিষ্ঠান-বহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের হিসেবে এমএম ইস্পাহানি এ দেশের চা উৎপাদন ও বাজারজাত (ব্র্যান্ডিং) খাতের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম। উৎপাদনের দিক থেকে উত্কর্ষের পাশাপাশি চা ব্র্যান্ডিংয়ে ইস্পাহানি দেশের প্রথম ও প্রধান আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। মির্জাপুরসহ বেশ কয়েকটি টি ব্র্যান্ড সারা দেশের চাপিয়াসু মানুষের প্রথম পছন্দের। এখনো দেশে মোট চাহিদার সিংহভাগ চা বাজারজাত করে ইস্পাহানি। প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের চা ব্লেন্ডিংয়ের জন্য প্রখ্যাত ইস্পাহানি গ্রুপ দেশের এক-তৃতীয়াংশ চা বিপণন করে। তবে দুই দশকেরও কম সময়ে চট্টগ্রামের আবুল খায়ের গ্রুপ চা বিপণনে এসে দ্রুত দ্বিতীয় অবস্থানে চলে এসেছে। পাশাপাশি পারটেক্স গ্রুপের ডেনিশ ও সিমলা চা, মেঘনা গ্রুপের নাম্বার ওয়ান চা, ওরিয়ন গ্রুপের জাফলং চা, সিটি গ্রুপের বেঙ্গল চা, ইউনিলিভারের তাজা, সানোয়ারা গ্রুপের কোয়ালিটি চা, টিকে গ্রুপের পুষ্টি চা, এসিআই এর টেটলি চা, এমএইচ গ্রুপের টুডে চা দেশের চা ব্র্যান্ডিংয়ে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

গোলাম মোর্তজা আলী: সাংবাদিক