জলে চা দানা বা গুঁড়ো সেদ্ধ করে কাপে চুমুক দিয়ে পান করে তৃপ্ত হয় মানুষ। কিন্তু এ চা উৎপাদনে নানা ধাপ ও পরিক্রমা রয়েছে। বাগান থেকে তিনটি কুঁড়ি উত্তোলনের পর সাত-আট ধাপে প্রক্রিয়াজাত করে চা উৎপাদন হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান বাগানে চা উৎপাদন করেই বিপণন কিংবা মজুদ করতে পারে না।

বাগানে উৎপাদিত চায়ের দৈনিকভিত্তিক তথ্য লিপিবদ্ধ করে সেটি চা বোর্ডকে অবহিত করতে হয়। এরপর সেগুলো পাঠিয়ে দেয়া হয় বিভিন্ন ওয়্যারহাউজে। বাগানগুলো প্রতিটি গ্রেডের চা ছোট ছোট বায়ুরোধী প্যাকেটে মুড়িয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয় দেশের বিভিন্ন টি ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠানের কাছে। ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠান চায়ের ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এসব চা পাঠিয়ে দেয় স্যাম্পল হিসাবে। কয়েকদিন ধরে এসব চা টেস্ট করে ঠিক কোন কোন বাগানের চা কিনবে সেটি নির্ধারণ করেন ক্রেতারা।

এরপর সাপ্তাহিক নিলামে ক্যাটালগে থাকা নির্দিষ্ট ওই চার শিডিউল আসলে পাল্টাপাল্টি ডাক/দর হেঁকে চা কিনে নেয়। নিলামে চা ক্রয়ের পর ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠানের কাছে চায়ের মূল্য পরিশোধ করে, সরকারি ১৬ শতাংশ শুল্ককর (১৫ ভ্যাট, ১ শতাংশ এআইটি) পরিশোধ করা হয়। ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ডিও লেটার নিয়ে নির্ধারিত ওয়্যারহাউজে গিয়ে চা সংগ্রহ করে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এরপর কয়েক জাতের চা ব্লেন্ডিং করে গ্রেড তৈরি করা হয়। এ চা মোড়কজাতের পর সারা দেশে পাইকারি ও খুচরা বাজারের মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তার কাছে পৌঁছে বিভিন্ন বাগানের ক্লোনিং করা চা। বাগান মালিক চা বিক্রি বাবদ প্রতি কেজি ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠানকে বিক্রীত মূল্যের ১ শতাংশ ও বাংলাদেশ চা বোর্ডকে ১ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করে।

আপনার পান করা চায়ের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে একজন টি টেস্টার। অর্থাৎ বিক্রির জন্য প্রস্তাব করা চায়ের মধ্যে কোন চা সবচেয়ে ভালো, কোন চায়ের দাম সর্বোচ্চ কত হতে পারে সেটি নির্ধারণ করে একজন টি টেস্টার। এ পদে চাকরি করা ব্যক্তি প্রতিদিন শত শত কাপ চা চেখে দেখেন। খুবই সূক্ষ্ম কাজটি দেশের চা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন চা বিপণন, উৎপাদন ও ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বেতনে টি টেস্টার নিয়োগ দেয়। একজন টি টেস্টার চায়ের যথাযথ মর্যাদা দিতে জানেন এবং প্রতিষ্ঠানকে লাভের মুখ দেখাতে পারেন।

দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টি টেস্টিংয়ের কোনো কোর্স না থাকলেও বাংলাদেশ চা বোর্ডের অধীনে নেয়া কিছু কোর্সে টি টেস্টিং সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। এছাড়া অধিকাংশ টি টেস্টারই কাজ করতে করতেই এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টি টেস্টিং একটি জনপ্রিয় ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় চা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে উচ্চবেতনে চাকরি করছেন টি টেস্টাররা।

 

শাহরিয়ার ইউনুস: সাংবাদিক