সিলেট অঞ্চলে বেড়াতে আসা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ শ্রীমঙ্গলের সাত রঙের চা। বিস্ময়কর ও আকর্ষণীয় এ চায়ের খ্যাতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। এ জেলার পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সাত রঙের চায়ের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বিখ্যাত এ চায়ের স্বাদ নিতে প্রায় সব ভ্রমণকারী ছুটে যান চায়ের উদ্ভাবক রমেশ রাম গৌড়ের নীলকণ্ঠ চা কেবিনে।

পরিচিতিটা ‘সাত রঙের চা’ হলেও এখন স্তর বাড়িয়ে ১০ রঙের পর্যন্ত পাওয়া যায়। সাত রঙের চা বললে মাথায় আসে লাল নীল বেগুনি এমন সাতটি রঙ। আদতে রঙের চেয়ে লেয়ার বা স্তর বলেই অভ্যস্ত প্রস্তুতকারকরা। সাদা, ধূসর, সাধারণ চা, গ্রিন চা, দুধ চা ও কফি রঙের স্তর তৈরি হয়। হালকা ও গাঢ় রঙের বিন্যাসে স্তরগুলো আলাদা করা হয়। এ চায়ের স্বাদের চেয়ে বিভিন্ন স্তরের রঙিন বলয় মানুষের বিস্ময় ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। মৌলভীবাজারের চা-কেন্দ্রিক পর্যটনের শৈল্পিক এ চায়ের ভূমিকা অনন্য।

শ্রীমঙ্গলে রমেশ রাম গৌড়ের দুটি প্রতিষ্ঠান। কালিঘাট সড়কের রামনগর ও বিজিবি ব্যাটালিয়নের ক্যান্টিন। প্রতিষ্ঠানগুলো নীলকণ্ঠ টি কেবিন নামে অধিক পরিচিত। প্রথম ও আদি দোকান রামনগরের নীলকণ্ঠ কেবিন সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের কাছে। বিশেষায়িত এ চায়ের কারিগর রমেশ রাম গৌড়ের সঙ্গে কথা হলে তিনি বর্ণনা করেন ব্যতিক্রম এ পানীয় পণ্যটির উদ্ভাবন ও আজকের অবস্থানে নিয়ে আসার গল্প—

সাত রঙ চা সম্পর্কে মানুষের এক সময় ধারণা ছিল রমেশ রাম গৌড় চা জনগোষ্ঠীর মানুষ। প্রকৃত অর্থে তিনি বাঙালি হিন্দু পরিবারে বড় হয়েছেন ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়। ২০০০ সালের আগে ময়মনসিংহে রমেশদের চায়ের অংশীদারি কারবার ছিল। অপর ব্যবসায়ী সহযোগীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের ফলে দুই দশক আগে মৌলভীবাজারে চলে আসে তার পরিবার। শ্রীমঙ্গল উপজেলার রামনগরের মণিপুরি পাড়ায় ভাড়া বাসায় থেকে চাকরি নেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। টানাটানির সংসারে সচ্ছলতা আনতে চা নিয়েই ব্যতিক্রম কিছু উদ্ভাবনের চিন্তা মাথায় আসে। ছোটকাল থেকেই চায়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠা রমেশ রাম গৌড় চাকরি ছেড়ে শ্রীমঙ্গলের চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পাশে কাকিয়াছড়া চা বাগান এলাকায় একটি টি স্টল খোলেন। চা নিয়ে মগ্ন রমেশ ২০০২ সালে এক গ্লাসে দুই রঙের চা বানিয়ে শোরগোল ফেলে দেন। ধীরে চায়ের স্তর বা লেয়ার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে রমেশ রাম গৌড়ের জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি। সংসারে ফিরে আসে সচ্ছলতা।

সাত রঙ চায়ের স্বাদ নিতে সাধারণ পর্যটকদের পাশাপাশি অনেক বিখ্যাত মানুষও শ্রীমঙ্গল ভ্রমণ করেছেন। ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মৌলভীবাজারে জনসভায় আসেন। ওই সফরে তিনি সাত রঙের চায়ের স্বাদ নিতে শ্রীমঙ্গলে আসেন। ২০১৯ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে মৌলভীবাজার এসেছিলেন ৫৩টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও তাদের পরিবার-পরিজন। ওই সময়ে তাদের অনেকেই রমেশ রাম গৌড়ের চায়ের স্বাদ গ্রহণ করেন। ২০১৭ সালে ঢাকায় নিযুক্ত কাতারের রাষ্ট্রদূত, আহমদ বিন মোহাম্মেদ আল-দিহাইমি মৌলভীবাজার ভ্রমণকালে সাত রঙ চা পান করে উদ্ভাবক রমেশ রাম গৌড়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ৭ হাজার টাকা বকশিশ দেন।

ভরা গ্লাসে বিশেষায়িত এ চা অনেকটা রঙধনুর আকৃতির দেখায়। স্তরে স্তরে তাক লাগানো বাহারি রঙের পাশাপাশি বিভিন্ন স্তরে রয়েছে ভিন্ন স্বাদ। সবচেয়ে ওপরের স্তরটি দারচিনি স্বাদের। দ্বিতীয় স্তরটি লেবু স্বাদের আর তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরে ঘনীভূত দুধের সঙ্গে কালো চায়ের রঙ ক্রমান্বয়ে সাদা হয়ে ওঠে। নিচের স্তরগুলো মিষ্টি, আদা, লবঙ্গের ঝাঁজ আর দারচিনির সঙ্গে গোপন মশলার মিশেল যুক্ত স্বাদে ভরা থাকে। সবচেয়ে নিচের স্তরটি আদা, চিনি, গ্রিন টির মিশেল এবং এটি সবচেয়ে ঘন স্তর। রমেশ রাম গৌড়ের দাবি রংধনুর মতো আলাদা স্তর তৈরির গোপন কৌশল শুধু তিনি জানেন। চায়ের এ গোপন প্রস্তুতপ্রণালি কেউ নকল করতে পারবে না। তিনি কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে গোপন প্রক্রিয়াটি কাউকে বলেননি।

বৈচিত্র্য আর বাহারি রঙের পাশাপাশি এ চায়ের আর্থিক মূল্যও কম নয়। জনপ্রিয় উষ্ণ এ পানীয় প্রতিদিন শতাধিক কাপ বিক্রি হয়ে থাকে। নীলকণ্ঠ টি কেবিনে ১০ লেয়ার চায়ের দাম রাখ হয় ১০৫ টাকা, নয় লেয়ার ৯০ টাকা, আট লেয়ার ৮৫ টাকা এবং ৭ লেয়ার ৭৫ টাকায় বিক্রি হয়। এর নিচে প্রতি স্তর ১০ টাকা মূল্যে অর্থাৎ ছয় স্তর ৬০ টাকা, পাঁচ স্তর ৫০ টাকা এভাবে বিক্রি করা হয়। প্রায় সারা বছরই নীলকণ্ঠ চা কেবিনে ভ্রমণপিপাসুরা ভিড় করেন। তবে বিভিন্ন উৎসব আমেজ বা ছুটি উপলক্ষে ভিড়টা অনেক বড় হয়। এ উদ্ভাবনে পাল্টে দিয়েছে রমেশ রাম গৌড়ের জীবন। দুই দশক আগের সেই সহায়-সম্বলহীন মানুষটি এখন সফল উদ্যোক্তা। নিজের পাশাপাশি ৮ থেকে ১০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে তার প্রতিষ্ঠানে। পাশাপাশি তিনি সাত রঙ চায়ের ম্যাধমে স্থানীয় পর্যটন খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছেন।

 

আহমদ আফরোজ: সাংবাদিক