১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ ক্ষমতা গ্রহণের পর ২৬ নভেম্বর ইয়াহিয়া খান যত শিগগির সম্ভব প্রাপ্তবয়স্কদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দেন। ইয়াহিয়া খানের মতে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজ হবে দেশকে একটি ব্যবহারযোগ্য শাসনতন্ত্র দেয়া এবং যেসব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা জনমনকে আলোড়িত করেছে, তার একটি সমাধান বের করা। সেদিক থেকে ইয়াহিয়া খানের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ঘোষণা ছিল প্রথমবারের মতো বাঙালিদের এক ব্যক্তি এক ভোটের ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে ন্যায্য অংশ প্রদানের প্রতিশ্রুতি, যা পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক বৈপ্লবিক ঘটনা। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য অর্থাৎ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন ব্যবস্থাপনার আওতায় কিছু পদক্ষেপ নেন।

ইয়াহিয়া খানের পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা পাকিস্তানের জনগণ সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করে। জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে ইয়াহিয়া খান অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে নির্বাচন কীভাবে এবং কখন হবে, সে সম্পর্কেও একটি ধারণা দেন। সে অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর দেশে জাতীয় পরিষদের এবং ২২ অক্টোবর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।  কিন্তু সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানের কিছু এলাকায় প্রবল বন্যা হয়। বন্যার জন্য ভোটারদের ভোটদানে অসুবিধার কথা উল্লেখ করে কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচন পেছানোর দাবি জানায়। ইয়াহিয়া খান প্রথম দিকে এতে সাড়া না দিলেও পরবর্তী সময়ে জনগণের ভোটদানের কথা বিবেচনা করেন। তিনি ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের এবং ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ নির্দিষ্ট করেন। ১২ নভেম্বর পূর্ব বাংলার উপকূল অঞ্চল প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেসব এলাকায় ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি তারিখ নির্দিষ্ট করা হয়।

গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন জরুরি প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি কীভাবে একটি সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা যায়, তার সামগ্রিক অবস্থা তত্ত্বাবধান করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচন অনুুষ্ঠানের জন্য প্রথমেই একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করেন। ১৯৬৯ সালের ২ জুলাই পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের একজন বাঙালি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বে একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। জি ডব্লিউ চৌধুরীর মতে, আব্দুস সাত্তার একটি অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাধীন। কোনো পর্যায়েই নির্বাচন কমিশন চাপের সম্মুখীন হয়নি এবং এমনকি কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি কীভাবে কাজ পরিচালনা করতে হবে। বিচারপতি সাত্তার আন্তরিকভাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে একটি রাজনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন। ইয়াহিয়া খান তাকে সব রকমের সৌজন্য ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন, কোনো কোনো সময় বিচারপতি সাত্তারকে মন্ত্রিসভার যেসব বৈঠকে নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হতো, সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হতো। তার মতামত এবং সুপারিশের প্রতি সবসময়ই অগ্রাধিকার ও মনোযোগ দেয়া হতো।

নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব দেয়া হয় কীভাবে একটি সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচন করা যায়, তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের। সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনসাধারণের প্রতিনিধি নির্বাচনের উদ্দেশ্যে ভোটার তালিকা প্রণয়নের জন্য প্রেসিডেন্ট একটি নির্দেশ জারি করেন, যা ১৯৬৯ সালের ভোটার তালিকা নির্দেশ নামে অভিহিত। এ নির্দেশ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া স্টাফ ও রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের নিয়োগ এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। এ নির্দেশে বলা হয়েছিল, প্রণীত ভোটার তালিকার বৈষম্য কিংবা সে অনুযায়ী কোনো বিবরণী বা কার্যক্রমের আইনানুগ দিক সম্পর্কে আদালতে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার উপযুক্ত যেকোনো নাম ভোটার তালিকাভুক্ত করার ক্ষমতা দেয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক কাজ ছিল একটি সর্বজনীন ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা। পাশাপাশি তার দায়িত্ব ছিল নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ। নির্বাচন কমিশন সাফল্যের সঙ্গে এ কাজ সমাপ্ত করেছিল। নির্বাচন কমিশনের সর্বপ্রথম সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল যে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের জন্য আইয়ুবীয় পদ্ধতির অধীনে যে ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল, তা গ্রহণ করা হবে কিনা। কেননা ওই ভোটার তালিকার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল আইয়ুবের নির্বাচন পদ্ধতি ছিল পরোক্ষ। ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল মৌলিক গণতন্ত্রীদের নির্বাচনের উদ্দেশ্যে; প্রাদেশিক কিংবা কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্যদের নির্বাচনের জন্য নয়। এমনকি আইয়ুব খানের অধীনে যে নির্বাচন কমিশন ছিল, তার নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন না। নির্বাচন কমিশনার একজন কাযনির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন, এমনকি তিনি কয়েক বছর আইয়ুব খানের সচিব ছিলেন। স্বাভাবিকভাবে এ কমিশনের কাজ জনগণ কর্তৃক গৃহীত হয়নি। এসব বিষয় ধর্তব্যের মধ্যে নিয়ে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার নতুন ভোটার তালিকা প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী সাড়ে ১১ কোটি লোক অধ্যুষিত দেশে ভোটার তালিকা প্রণয়ন অবশ্য খুব সহজ কাজ ছিল না। কেননা জনসংখ্যার অধিকাংশ ছিল অশিক্ষিত এবং সুদূর গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত। যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই খারাপ। প্রেসিডেন্ট নতুন ভোটার তালিকা প্রণয়ন বিধি জারি করেন, যাতে যথাযথভাবে ও জনগণের সন্তুষ্টি অনুযায়ী ভোটার তালিকা করা যায়।

নির্বাচনী ভোটার তালিকার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নির্বাচনী এলাকার সীমা নির্ধারণ। নির্বাচনী কমিশনারের এক বিবৃতিতে নির্বাচনী সীমানা সম্পর্কে বলা হয় যে গ্রামাঞ্চলে একেএকটি গ্রামকে নির্বাচনী এলাকা এবং শহরাঞ্চলে একটি ওয়ার্ড বা মহল্লাকে নির্বাচনী এলাকা হিসেবে গণ্য করা হবে। প্রধান নির্বাচনী কমিশনার বিচারপতি আব্দুস সাত্তার শপথ নেয়ার পর পরই ঘোষণা দিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা তৈরি করা ছাড়াও নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করবে। এ লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ আদেশ জারি করেন। নির্বাচনী সীমানা নির্দেশকরণের জন্য বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে চেয়ারম্যান ও পাকিস্তানের দুই অংশের হাইকোর্টের একজন করে বিচারপতি নিয়ে একটি কমিশন গঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনী এলাকার ব্যাপারে আপত্তি ও পরামর্শ কমিশন গ্রহণ করে ১৯৭০ সালের ১১ মে থেকে ২২ মে পর্যন্ত। কমিশন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ৫৮টি নির্বাচনী এলাকা এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৯৬টি নির্বাচনী এলাকায় ভাগ করে। পশ্চিম পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ৩৯টি এবং চারটি প্রদেশকে ৮৯টি প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনী এলাকায় বিভক্ত করে। নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ শেষে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনী এলাকার চূড়ান্ত তালিকা ১৯৭০ সালের ৫ জুন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচনী এলাকার তালিকা ১৯৭০ সালের ২৫ জুন প্রকাশ করা হয়। সরকার ১৯৬১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’ অনুযায়ী জাতীয় পরিষদের আসন সংখ্যা নির্ধারণের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। প্রায় চার লাখ লোকের সমন্বয়ে একেকটি নির্বাচনী এলাকা গঠিত হয়।

নির্বাচন কমিশন ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকা থেকে একজন করে সদস্য নির্বাচনের জন্য ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইশতেহার জারি করে। ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচনের ব্যাপারেও একই রকম ইশতেহার জারি করা হয়। প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ১০ জুলাই জারীকৃত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ (নির্বাচন) অর্ডিন্যান্স ১৯৭০ অনুযায়ী এ ইশতেহার জারি করা হয়। তফসিল অনুযায়ী ১৫ অক্টোবর মনোনয়নপত্র দাখিল, ১৭ অক্টোবর বাছাই ও ২৪ অক্টোবর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন ধার্য করা হয়। প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের জন্য ১৯ অক্টোবর মনোনয়নপত্র দাখিল, ২১ অক্টোবর বাছাই ও ২৮ অক্টোবর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তফসিলে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে দেশের উভয় অঞ্চলে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণের সময় নির্ধারণ করা হয়। নির্বাচন কমিশনারের সূত্র থেকে জানা যায়, দেশের আসন্ন নির্বাচনে ৬ কোটি ৬৫ লাখ ভোটার অংশগ্রহণ করবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন বাবদ আনুমানিক ব্যয়ের হিসাব প্রায় ৫ কোটি টাকা হবে বলে জানায়।

সারা দেশে ৫০০ রিটার্নিং অফিসার, ১ হাজার ৪০০ সহকারী রিটার্নিং অফিসার, প্রায় ৩০ হাজার প্রিসাইডিং অফিসার ও প্রায় তিন লাখ পোলিং অফিসার নির্বাচনের সময় কাজ করার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়। নির্বাচনে তিন লাখ ব্যালট বাক্স ব্যবহার করা হয়। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মোট ১৩ কোটি ৫৬ লাখ ব্যালট পেপার ছাপানো হয়। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর ব্যালট পেপার ছাপা শুরু হয়।  পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগের প্রধান আতাউর রহমান খানের নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত এবং ভাসানী ন্যাপ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলেও ব্যালট পেপারে তাদের নাম ছিল।

ভোট গ্রহণের দিন ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট প্রদান করতে পারে, সেদিকেও নির্বাচন কমিশনের সতর্ক দৃষ্টি ছিল। নির্বাচনকালীন শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ১৪ হাজার ৪৯৫টি নির্বাচন কেন্দ্রে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার আনসার সদস্য মোতায়েন করার তথ্য সরকারি হ্যান্ড আউটের মাধ্যমে জানানো হয়। প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় পূর্ণ শান্তি বজায় রাখার জন্য ভোট গ্রহণের দিন সেনাবাহিনী সদস্যদের মোতায়েনের সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়। সেনাবাহিনীর কাজ ছিল রাস্তায় টহল দেয়া এবং নির্বাচনের আগে বা নির্বাচনের সময় যাতে কোনো ধরনের বেআইনি কার্যকলাপ অনুষ্ঠিত না হয় এবং নির্বাচন যাতে সুশৃঙ্খলভাবে হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখা।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার জানায়, নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসাররা ভোটকেন্দ্র থেকে পাওয়া নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল সংবাদমাধ্যমগুলোকে সরবরাহ করবে। তবে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে পাওয়া ফলাফল বিন্যাসের পর সরকারিভাবে ফলাফল প্রকাশ করা হবে। নির্বাচনী ফলাফল কীভাবে প্রকাশ করা হবে তা নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়ে জানায়, দেশব্যাপী নির্বাচন কেন্দ্রগুলোর প্রিসাইডিং অফিসাররা নিজেদের নির্বাচনী এলাকায় প্রাপ্ত ভোট গণনা করে রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠাতেন। প্রধানত মহকুমা ও জেলা সদর দপ্তরে অবস্থিত এসব রিটার্নিং অফিসার পাকিস্তান বেতারসহ অন্যান্য সংবাদ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে ওই ফলাফল প্রেরণ করে। রিটার্নিং অফিসাররা প্রাদেশিক নির্বাচনী কমিশনারের কাছে ফলাফল জানাতেন। প্রাদেশিক কেন্দ্রগুলোর চূড়ান্ত ফলাফল টেলিভিশনসহ অন্যান্য সংবাদ প্রচারকারী মাধ্যমের কাছে পাঠানো হয়। প্রাদেশিক নির্বাচনী কমিশনের কাছে রিটার্নিং অফিসারদের এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচনী কমিশনের কাছে প্রাদেশিক নির্বাচনী কমিশনের ফলাফল পাঠানোর সুবিধার জন্য টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ বিভাগ তার যোগাযোগ স্থাপন করে। বেতার, টেলিভিশন ও অন্যান্য প্রচারমাধ্যম কর্তৃক এসব ফলাফলকে ভোট গণনার অস্থায়ী ও বেসরকারি ফলাফল হিসেবে প্রচার করা হয়। প্রত্যেকটি নির্বাচনী এলাকার সব ভোটকেন্দ্রের ফলাফল একত্র করার পর নির্বাচনী এলাকার ফলাফল সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আব্দুস সাত্তার সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করে ছয়টি মূলনীতিবিশিষ্ট আচরণবিধি প্রণয়ন করেন। এ ছয়টি আচরণবিধি ছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি প্রচারের কাজে মসজিদকে ব্যবহার না করার জন্যও প্রধান নির্বাচন কমিশনার উল্লেখ করেন। 

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আব্দুস সাত্তার মন্তব্য করেন, সর্বজনীন ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর পাকিস্তান বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক লোক ভোট দেয়ার ফলে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র নির্ধারণ এবং যে রাজনৈতিক অবস্থার অধীনে শাসিত হবে, সে সম্পর্কে নিজেদের মনোভাব জানানোর জন্য জনসাধারণ উদগ্রীব। জনসাধারণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন এবং কোনো শক্তিই তাদের ইচ্ছানুযায়ী অধিকার প্রয়োগের ব্যাপারে নিবৃত্ত করতে পারবে না।

পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে একটি সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার আওতায় নির্বাচনের জন্য নতুন ভোটার তালিকা থেকে শুরু করে নির্বাচনী তফসিল পর্যন্ত সব কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেন। ভোটার তালিকা প্রণয়নে নির্বাচন কমিশন এবং সীমা নির্দেশকরণ কমিশনের নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণের কাজ দেশে স্বাগত জানানো হয়। কোনো বড় রাজনৈতিক দল কিংবা কোনো পত্রপত্রিকায় বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বে গঠিত দুটি কমিশনের সদিচ্ছার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ প্রকাশ করেনি। প্রত্যেক ব্যক্তি দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল।

 

মোশারফ হোসেন: লেখক ও গবেষক