পৃথিবীর সব দেশেই হোম লোন বা গৃহ ঋণের মাধ্যমে বাড়িঘর হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো হোম লোনের ব্যবস্থা সেভাবে প্রসার হয়নি। আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, হোম লোনের প্রসার করতে হলে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য আসন্ন বাজেটে হোম লোনের জন্য একটা বিশেষ তহবিল গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
নগরায়ণের প্রভাব হিসেবে মূলত আশির দশকের পর থেকেই ঢাকামুখী জনস্রোত দেখা দেয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ আরেকটু ভালো থাকার প্রত্যাশায় রাজধানীতে পাড়ি জমাতে শুরু করেন। নতুন এ জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটাতে সে সময় গড়ে উঠতে শুরু করে অ্যাপার্টমেন্টভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থা। মূলত ৯০-এর দশকে আবাসন নিয়ে বেসরকারি খাতের সক্রিয়তা বাড়তে শুরু করে। শুরু হয় ফ্ল্যাট কেনা-বেচার সংস্কৃতি।
সে সময় দেশের আবাসন খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে এ খাতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় রিহ্যাব। যারা খাতটিতে শৃঙ্খলা নিয়ে আসে। ৯০ দশক-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির পরিবর্তিত ধারার সূচনালগ্নে দেশের নির্মাণ খাতে তেজি ভাব দেখা যায়। নতুন নতুন শিল্প স্থাপন, করপোরেট অফিস, আবাসনসহ অন্যান্য খাতে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণের ফলে সে সময় এ খাতে রমরমা অবস্থা ছিল। ফলে সবাই বিভিন্ন ধরনের ফ্ল্যাট তৈরির প্রকল্প হাতে নেয়।
২০০৯ সালের পর দেশে আবাসন খাতের চাহিদা বাড়তে থাকায় নতুন নতুন ডেভেলপার এ খাতে ব্যবসা শুরু করেন। তবে সে বছর আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধের ঘোষণায় কিছুটা চাপে পড়ে এ খাত। ২০১০ সালের পরই মূলত এ খাত মন্দার কবলে পড়ে। সে সময় আবাসন খাতকে টেনে তুলতে সরকারের পক্ষ থেকে বেশকিছু নীতিসহায়তা দেয়া হয়। সরকারের নানা পদক্ষেপের ফলে ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী হয়ে ওঠে মানুষ। ফলে শুরু হয় ফ্ল্যাট তৈরির হিড়িক। এক পর্যায়ে ২০১২ সালের মধ্যে বিক্রয়যোগ্য ফ্ল্যাটের সংখ্যা চাহিদাকে ছাড়িয়ে যায়।
২০২০ সালে নভেল করোনাভাইরাসজনিত মহামারী চলাকালে মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল আবাসন খাত। সে সময়ও ফ্ল্যাট বিক্রিতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। সংশ্লিষ্টরা এজন্য সরকারের নেয়া বিভিন্ন নীতিসহায়তার কথাই বলেছেন। যেমন ফ্ল্যাট কিনলে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ, নিবন্ধন ব্যয় কমানো, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য কম সুদে গৃহঋণ নেয়ার সুযোগসহ নানা কারণে চাঙ্গা হয়েছে ফ্ল্যাটের বাজার। আবার দীর্ঘসময় ধরে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকাকেও ফ্ল্যাট কেনার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির কারণ হিসেবে বিবেচনা করছেন ব্যবসায়ীরা। সব মিলিয়ে ২০২০ সালের শেষদিকে মহামারীর ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে আবাসন খাত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহামারীর পর বিশ্ববাজারে ক্রমেই বাড়ছে কাঁচামালের দাম। বিশেষ করে সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে রড, ইট, সিমেন্ট, বৈদ্যুতিক তারসহ আবাসন খাতের মূল সামগ্রীর দাম। ফলে বেড়েছে ভবন নির্মাণ ব্যয়ও। দাম বেড়ে যাওয়ায় শেষ মুহূর্তে ক্রেতার কাছে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে আবাসন কোম্পানিগুলোকে। কারণ আগে থেকে নির্ধারণ করে রাখা ফ্ল্যাটের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। ফলে লোকসানেই অনেক গ্রাহককে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সংকট তৈরি হয়েছে যেসব সামগ্রী বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় সেগুলোর ক্ষেত্রে। কারণ সেক্ষেত্রে পণ্যের বাড়তি দামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন খরচও।
তবে এখন যা দাম রয়েছে তা ভবিষ্যতে আরো বাড়তে পারে যদি ২০১৬-৩৫ সালের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের করা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) বাস্তবায়ন হয়। রিহ্যাব মনে করে, এটি বাস্তবায়িত হলে ভবনের আয়তন কমবে কমপক্ষে ৩৩-৫৩ শতাংশ। অন্যদিকে ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে অন্তত ৫০ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই এটা ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা। ফলে হুমকির মুখে পড়বে আবাসন খাত। শুধু তা-ই নয়, এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিরামিক, টাইলস, বৈদ্যুতিক তার খাক, রড, সিমেন্ট, পাথর, বালি, রঙসহ ২৬৯টি লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রিজও ক্ষতির মুখে পড়বে।
এসব খাত রক্ষায় জনবান্ধব নীতিসহায়তা প্রণয়ন ও বরাদ্দ দেয়াসহ খাতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের এক আলোচনায় উঠে আসে এ খাতে তহবিল সংকট ও সময়োপযোগী সরকারি নীতিসহায়তা না পাওয়ার প্রসঙ্গটি। প্রতিবেশী দেশ ভারত আবাসন খাতকে তৃতীয় খাত হিসেবে বিবেচনা করলেও বাংলাদেশে এ খাতে বাজেটে বরাদ্দ খুবই কম। খাত হিসেবে এর অবস্থান ১৪তম। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতেও সরকারের প্রতি সুপারিশ উঠে আসে।
২০২০-২১ অর্থবছরে আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈধ করা হয়েছে সাড়ে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ। চলতি অর্থবছরেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় আসছে বাজেটে নির্মাণসামগ্রীর শুল্ক কমানোর দাবি উঠেছে। পাশাপাশি কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থার মাধ্যমে আবাসন খাতকে সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে আনা যায়, সে সম্পর্কে নির্দেশনার প্রত্যাশাও করা হচ্ছে।
বেশ লম্বা একটা সময় ধরে আবাসন খাত জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রেখে চলেছে। বিশেষ করে শেষ ৩০ বছর ধরে এ খাতে কর্মসংস্থান তো হচ্ছেই, পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীসহ অন্যান্য শিল্প খাতের বিকাশেও খাতটির ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৯ সালের জরিপ বলছে, দেশের মোট অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান প্রায় ৮ শতাংশ। বিশেষ করে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী বাড়ির স্বপ্ন না দেখলেও, মাথা গোঁজার জন্য অন্তত একটি ফ্ল্যাটের স্বপ্ন দেখে থাকেন। সে কারণেই বড় হচ্ছে আবাসন খাত, বাড়ছে চাহিদা।
যেহেতু রাজধানীতে মানুষের চাপ সবচেয়ে বেশি, তাই তা সামাল দিতে বাড়াতে হয়েছে ঢাকার কলেবর। এখন নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুরসহ ঢাকাসংলগ্ন এলাকাগুলোতেও নির্মিত হচ্ছে ছোট-বড় নানা আকারের আবাসিক এলাকা, নতুন নতুন নাম দিয়ে তৈরি হচ্ছে ছোট শহরের আদলে আবাসিক এলাকা। পাশাপাশি বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতেও এখন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আবাসন খাতের সঙ্গে সঙ্গে বড় হচ্ছে নির্মাণসামগ্রীর বাজারও। মার্বেল পাথর, নানা ধরনের টাইলস, উন্নতমানের রঙ, কংক্রিট ব্লক ইত্যাদির চাহিদা বাড়ছে। ভবনগুলোর জন্য সোলার সিস্টেম, সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, লিফট ইত্যাদির বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে।






