প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা, দূরদর্শী ও বিচক্ষণ পরিকল্পনা এবং আন্তরিক প্রয়াস আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সুদৃঢ় করেছে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিশ্বের দ্রুততম অগ্রসরমাণ অর্থনীতি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করেছে। দেশের জিডিপির আকার ৪১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়েছে। চলতি বছর জিডিপির আকার ৪৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রাক্কলন করা হয়েছে। কভিড পরিস্থিতির মধ্যেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ অর্জন সক্ষম হয়েছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে।
দেশে মাথাপিছু জাতীয় আয় ২ হাজার ৫৯১ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু করোনা-পরবর্তী চলমান বিরূপ পরিবেশ এবং রাশিয়া ও ইউক্রেন পরিস্থিতিতে এ অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যসহায়ক পরিবেশকে আরো সুদৃঢ় ও জোরদার করতে হবে, যা আমাদের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানকে দৃঢ় করতে ব্যবসায়িক খরচ কমিয়ে আনতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, বন্দরের দক্ষতা, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন, বৈদেশিক সাহায্যের যথাযথ প্রয়োগ, অভ্যন্তরীণ উৎস ও ব্যক্তি খাত থেকে বাড়তি রাজস্ব সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আগামী বাজেট প্রণয়ন ও যথাযথ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ বলে আমরা মনে করি। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা দরকার। এছাড়া গুণগত মান বজায় রেখে বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়েছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। শিল্পের কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাজারে আমরা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছি। ডলারের দাম বাড়ছেই। এতে আমদানির গতি শ্লথ হতে পারে। এর প্রভাবে স্থানীয় কর ও ভ্যাট আদায় কমে যেতে পারে। পণ্যের চাহিদা কমে গেলে আগামীতে কর ও ভ্যাট থেকে সরকারের আয় কমবে। এসব চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে আগামী অর্থবছরের রাজস্ব বাজেট তৈরি করতে হবে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল্য বৃদ্ধি করা হলে কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস আরো বেড়ে যাবে। মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবটি আপাতত স্থগিত করার জন্য আমরা এরই মধ্যে সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছি।
আগামী বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আয়ের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা যা আমরা পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারছি। গত বছর যেখানে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। কোনো অর্থবছরেই রাজস্ব আয়ের টার্গেট অর্জন সম্ভব হয় না। ফলে কর-জিডিপি বাড়ছে না। বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সময়ে শুল্ক-কর আয় বাড়ছে। মূলত কর ব্যবস্থা সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করা দরকার। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে এনবিআরকেই মুখ্য ভূমিকা নিতে হবে।
কর-জিডিপি রেশিও বাড়ানোর নিমিত্তে কর অব্যাহতির সুযোগ প্রত্যাহারের কথা বলা হচ্ছে। এটা করা হলে ব্যবসা বাণিজ্য বিশাল ধাক্কা খাবে। কর-জিডিপি রেশিও বাড়ানোর লক্ষ্যে আমরা সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ধরনের কাজে টিআইএন নম্বর ও কর পরিশোধের প্রমাণ দাখিল বাধ্যতামূলক করা এবং সব উদ্যোক্তার কর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে বিনিয়োগের প্রামাণিক দলিল হিসাবে গণ্য করার প্রস্তাব করেছি। আমরা এরই মধ্যে আমাদের বিস্তারিত বাজেট প্রস্তাবনা সরকারের কাছে তুলে ধরেছি। আয়কর এবং মূসকের আওতা সম্প্রসারণ করে করহার কমিয়ে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ বাড়ানো জরুরি। সুষ্ঠু রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য রাজস্ব বোর্ডের পলিসি ও বাস্তবায়ন উইংকে আলাদা করা প্রয়োজন। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কার্যকর অটোমেশন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন জরুরি। ব্যবসায়িক খরচ, সময় এবং হয়রানি কমাতে শুল্ক মূল্যায়ন, এইচএস কোডের শ্রেণী বিভাগের বিষয়ে স্পষ্ট করণ, আন্ডার ইনভয়েসিং এবং মিস-ডিক্লেয়ারেশন বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি। ব্যবসায়িক খরচ কমানোর স্বার্থে আমদানীকৃত কাঁচামাল, মধ্যবর্তী কাঁচামালসহ যাবতীয় শিল্প উপকরণের ওপর আরোপিত অগ্রিম আয়কর এবং আগাম কর প্রত্যাহার দরকার। বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর আরোপিত কর-হার কমিয়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণের কৌশল নেয়া জরুরি। এছাড়া বিনিয়োগকে প্রাধান্য দেয়া জরুরি।
আয়কর শুধু আয়ের ওপরই নির্ধারিত হওয়া উচিত। লেনদেন, বিক্রয় বা প্রাপ্তির ওপর আয়কর আরোপিত রহিত করা জরুরি। জীবনযাত্রার ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় এনে ব্যক্তি শ্রেণীর আয়করের সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৪ লাখ টাকায় নির্ধারণ এবং ন্যূনতম করের পরিমাণ পুনর্বিন্যাস করার প্রস্তাব করছি। কোম্পানি করদাতাদের করহার ৩০ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করার জন্য আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। নিম্ন আয়ের এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যবহার্য পণ্য, সাধারণ পণ্য পরিবহন, নিত্যপ্রয়োজনীয় অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবা, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শিল্পের কাঁচামাল/উপকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রি-সাইক্লিং, টেন্ডারবহির্ভূত সরাসরি পণ্য মেরামত বা সার্ভিসিং খাত ইত্যাদি ক্ষেত্রে মূসক ও সম্পূরক শুল্ক অব্যাহতি দেয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। চট্টগ্রাম বন্দরসহ সব বন্দর ও স্থল বন্দরের সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। সে সঙ্গে বে-টার্মিনাল ও ডিপ সি পোর্টের কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের অনুরোধ জানাচ্ছি।
সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি নিরসনে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সে সঙ্গে কৃষি খাতের ভর্তুকি যাতে সরাসরি ও সঠিক সময়ে কৃষকের কাছে পৌঁছে সে বিষয়ে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। দেশের উত্তরাঞ্চলসহ প্রত্যন্ত ও অনুন্নত অঞ্চলে বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন উৎসাহিত করতে বিশেষ রেয়াতি সুযোগ-সুবিধা দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। পাশাপাশি শিল্প প্লটের অপর্যাপ্ততা দূর করার জন্য বিসিকসহ অন্য রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের অব্যবহূত জমি ব্যবহারের বিষয়ে বিশেষ দিকনির্দেশনা থাকা জরুরি।






