আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতের প্রত্যাশা ও পরিবর্তনের নানা বিষয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে আলাপ করেছেন এসিআই এগ্রিবিজনেসেসের প্রেসিডেন্ট ড. ফা হ আনসারী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইদ শাহীন

বাজেটে কোন বিষয়টিতে গুরুত্ব বেশি দেয়া দরকার বলে মনে করছেন?

আমাদের দেশের প্রধান শস্য ধান। ইদানীংকালে ধান ছাড়াও অনান্য শস্যের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী সারের দাম ছাড়াও অনান্য কৃষি উপকরণের দাম উর্ধ্বমূখী। শ্রমিক সংকট বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে কৃষকের ধান কাটার খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে কৃষকের ধান আবাদের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। সামনের দিনে কৃষকের উৎপাদন খরচ স্বাভাবিক রাখতে হলে অবশ্যই সারের ও অনান্য কৃষি উপকরণের দাম আগের মতোই রাখতে হবে। কৃষক যেন আগের দামেই সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ পেতে পারেন তার নিশ্চয়তা আগামী বাজেটে থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় ভর্তুকি দিতে কোনো ধরনের কার্পণ্য করা যাবে না। এছাড়া কৃষি খাতে প্রথাগত বাজেট প্রদান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। গবেষনা, উদ্ভাবন, বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন, পোস্ট হারভেস্ট লস কমিয়ে আনা এবং কৃষিতে বেসরকারি খাতকে আরো সম্পৃক্ত করতে বাজেটে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বরাদ্দ থাকতে হবে। বাজেটের মাধ্যমে কৃষকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করলে খাদ্যনিরাপত্তা বেশ নাজুক হতে পারে। তাই বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কৃষি বাজেটে বরাদ্দ সংবেদনশীল হতে হবে।

কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ পর্যাপ্ত মনে করছেন কি?

কয়েক দশক ধরে দেশের কৃষি খাতের উৎপাদন বাড়ানোয় বেশ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। এতে উৎপাদন বেড়েছে। উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ঠিক রাখতে গবেষণায় বাজেট বাড়াতে হবে। সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে সম্পৃৃক্ত করতে হবে। বেসরকারি খাত বীজ উৎপাদন থেকে শুরু করে নানা প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বিপণন করছে। আগামী বাজেটে সরকারি ও বেসরকারি কৃষি খাতের জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের জন্য গবেষণায় সুদবিহীন নতুন একটি ফান্ড গঠন করা যেতে পারে। এ ফান্ডের মাধ্যমে বেসরকারিভাবে কৃষি গবেষণা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই ঋণ পেতে পারে। এসব অর্থ এককালীন দেয়া যেতে পারে। গবেষণার বরাদ্দ শুধু শস্য খাতভিত্তিক হলেই হবে না। অন্যান্য উপখাত, বিশেষ করে মত্স্য, প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাতে এসব গবেষণার অর্থ বরাদ্দ রাখার প্রয়োজন রয়েছে। সামনের দিনের প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলায় সমন্বিতভাবে গবেষণা ছাড়া পরিস্থিতি মোকাবেলা কঠিন হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতকে গবেষণায় আনার বড় ধরনের সুযোগ রয়েছে।

কৃষি খাতের বাজেট বহুমুখী করার কোনো ধরনের সুযোগ রয়েছে?

গত কয়েক বছরে দেশের সার্বিক শস্য খাতের উৎপাদন বেড়েছে। তবে উৎপাদন বাড়াতে যতটা নজর দেয়া হয়েছে ততটা নজর সরবরাহ চেইনে দেয়া হয়নি। বিশেষ করে পোস্ট-হারভেস্ট লস, ভ্যালু চেইন এমনকি রিটেইল সেন্টারগুলো উন্নত করায় খুব বেশি জোর দেয়া হয়নি। ফলে কৃষকের পণ্য বিপণন প্রক্রিয়া প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকের পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে অপচয় ও নষ্ট হচ্ছে। ফলে আগামী বাজেটে দেশের কৃষি খাতের বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রমের পরিকল্পনা এবং বরাদ্দ থাকতে হবে। যে হারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও শ্রমিক সংকট দেখা দিচ্ছে তাতে শস্য কাটা, মাড়াই ও অন্যান্য কাজে যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ফসলের নিবিড়তা ও ফলন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়সহ ফসল কর্তনজনিত ক্ষতি অনেকাংশে কম হয়। প্রত্যেকটি যন্ত্রেরই স্বতন্ত্র সুবিধা রয়েছে, যার ব্যবহার কৃষকের বর্তমান প্রচলিত সনাতন পদ্ধতির চেয়ে অধিক লাভজনক। সে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে শস্য খাতে হাওর অঞ্চলে ৭০ শতাংশ এবং সমতল অঞ্চলে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। যন্ত্রের ব্যবহারের আরো নতুন নতুন ক্ষেত্র রয়েছে, সেগুলোয় এখনো প্রবেশ করতে পারিনি। শস্যের সব ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণের জন্য বাজেটে আরো বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। এছাড়া কৃষি এখন তরুণ-তরুণী উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে সম্প্রসারণ হচ্ছে। দেশের তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা তৈরি করতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। কৃষি উদ্যোক্তা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দেশের লাখ লাখ তরুণকে কৃষি খাতে আনা সম্ভব। যান্ত্রিকীকরণকে আরো ব্যাপক ও সহজীকরণ করতে হবে।

কৃষিপণ্যের দাম কমলে ভোক্তা খুশি হয়, কিন্তু কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। বাজেটে কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থ কীভাবে সমন্বয় করা সম্ভব?

কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করেই ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, অনেক ক্ষেত্রে কৃষকও ভোক্তা। এ দুটি শ্রেণীর মধ্যে ভারসাম্য আনতে হলে কৃষক পর্যায়ে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে হবে। এজন্য যন্ত্রের ব্যবহার যেমন বাড়াতে হবে তেমনি কৃষককে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ করে তুলতে হবে। কৃষিজ উপকরণের দাম সহনীয় রাখতে পর্যাপ্ত ভর্তুকির ব্যবস্থা রাখতে হবে। উৎপাদন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বিপণন ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পোস্ট-হারভেষ্ট ক্ষতি কমানোসহ এ খাতের নানা দিকে উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ কিংবা বিপণনের ক্ষেত্রে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি দিতে হবে। কৃষি কার্যক্রমের অন্যান্য ক্ষেত্র, বিশেষ করে সার প্রয়োগ, চারা রোপণ ও বপন, কর্তন, পোস্ট-হারভেস্ট লস ও পোস্ট-হারভেস্ট প্রসেসিং এবং গুদামজাতের ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এটি করতে পারলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে। আর দেশে কম খরচে উৎপাদন করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমে আসবে। ফলে দেশে কম দামে পর্যাপ্ত শস্য সরবরাহ করা গেলে সহনীয় পর্যায়ে ভোক্তার কাছে কৃষিপণ্য পৌঁছানো সম্ভব হবে। আবার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটছে। তাদের চাহিদা মেটাতে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য শিল্পের নজর বাড়াতে হবে। এতে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ই লাভবান হবেন।

কৃষি খাতের উন্নয়নে অরো কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?

দেশে বাণিজ্যিকভাবে সবজি উৎপাদনে যান্ত্রিকীকরণ প্রচলন হলে কম খরচে উৎপাদনের পাশাপাশি মানও নিশ্চিত করা যাবে। ভুট্টায় যান্ত্রিকীকরণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভুট্টার সেচ ও লাগানো থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াকরণ পর্যন্ত যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ব্যয় কমাতে পারি। মাছের প্রক্রিয়াকরণেও যান্ত্রিকীরণের সুযোগ আছে। হ্যাচারিগুলোও এখন অনেকটাই ম্যাকানাইজড। গবাদিপশুতে যান্ত্রিকীকরণ খুব প্রাথমিক ধাপে আছে। বিশেষ করে মিল্কিংয়ের জন্য যান্ত্রিকীকরণ খুবই দরকার। দুধ পরিবহনেও যান্ত্রিকীকরণের সুযোগ রয়েছে। পোস্ট-হারভেস্ট লস কমিয়ে আনার জন্য উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিভিন্ন শস্যের যে অপচয় হচ্ছে সেটি রোধ করতে হলে প্রযুক্তি যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণের বিকল্প নেই।