কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও শ্রমিক সংকট মোকাবেলায় অন্যতম হাতিয়ার কৃষিযন্ত্র। সার্বিক কৃষি খাতের অন্যতম এ উপখাতটিতে শুল্ক বৈষম্য, যন্ত্র কেনায় ঋণ না পাওয়াসহ নীতিগত বেশকিছু বাধা রয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটের কৃষি যান্ত্রিকীকরণ খাতে প্রতিবন্ধকতা ও প্রত্যাশার নানা বিষয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে আলাপ করেছেন দ্য মেটাল প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সাদিদ জামিল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইদ শাহীন

কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ কোন পর্যায়ে রয়েছে?

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটাতে শস্যের উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়েছে। কৃষি শ্রমিকরা ক্রমবর্ধমান হারে শিল্প, পরিবহন, নির্মাণ ও অন্যান্য খাতে স্থানান্তর হচ্ছেন। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে শ্রমিক সংকট। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ীও কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা কমে আসবে। তাই আধুনিক ও বাণিজ্যিক কৃষির প্রয়োজনে দেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ অপরিহার্য। চাষাবাদ ও সেচ কার্যে যন্ত্রের ব্যবহার প্রায় ৯৫ শতাংশ হলেও কৃষির অন্যান্য ক্ষেত্র যেমন সিডিলিং, ট্রান্সপ্লান্টিং, হারভেস্টিং ইত্যাদি কাজে যন্ত্রের ব্যবহার ৫ শতাংশেরও কম। অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি কম। অন্যদিকে দেশের বেশকিছু জেলায় শ্রমিক সংকট তীব্র হচ্ছে। পাশাপাশি হাওর অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আগাম বন্যা দেখা দিচ্ছে। এতে সারা দেশেই কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। দেশে কৃষি শ্রমিক সংকটের কারণে উন্নত প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছেন মাঝারি ও বড় কৃষকরা। আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো গেলে ফসলের উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়বে, তেমনি শ্রমিক সংকট কাঠিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষিতের হার বাড়লেও সনাতন পদ্ধতির কৃষিকাজে এ প্রজন্মের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এরূপ প্রেক্ষাপটে আগামী দিনের শিক্ষিত যুবকদের কৃষিকাজে সম্পৃক্তকরণে দেশে যান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তনের কোনো বিকল্প নেই। আর যান্ত্রিকীকরণ এখন অনেক অর্থের প্রয়োজন। সেটি মেটাতে গেলে অবশ্যই দেশের বিরাজমান আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আনতে নতুন নতুন কৌশলও নিতে হবে।

কৃষকের কাছে কৃষিযন্ত্র পৌঁছতে উদ্বেগের বিষয়টি কোনটি?

কৃষিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্র প্রায় সম্পূর্ণটাই আমদানিনির্ভর একটি ব্যবসা। নব্বইয়ের দশকের আগে ট্রাক্টর আমদানিতে উচ্চহারে শুল্ক আরোপিত ছিল। তবে ১৯৮৮ সালে বন্যার পরে ট্রাক্টরের ওপর ডিউটি শুল্ক কমিয়ে ৫-৬ শতাংশ ও পাওয়ার টিলারে শুল্ক উঠিয়ে দেয়া হয়। ফলে ট্রাক্টরের মূল্যে সহনীয় পর্যায়ে আসে। গত কয়েক বছর আগেও ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারে ভর্তুকি দিয়েছে। পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর বর্তমানে প্রয়োজনের কাছাকাছি চলে গিয়েছে। এজন্য সরকার ভর্তুকি দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তবে কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও রাইস ট্রান্সপ্লান্টসহ বেশকিছু কৃষিযন্ত্রপাতিতে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। এসব যন্ত্র কিনতে হাওর অঞ্চলের জন্য ৭০ শতাংশ ও অন্যান্য অঞ্চলের জন্য ৫০ শতাংশ ভর্তুকি পাচ্ছেন কৃষক। ভর্তুকি দেয়া এসব যন্ত্র আমদানিতে শুল্ক ছাড় রয়েছে। তবে এআইটি ও অ্যাডভান্স ট্রেড ভ্যাট রয়েছে। ফলে এ বিষয়গুলো যন্ত্রের দামের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এছাড়া যন্ত্র বিক্রির ওপর ভ্যাট রয়েছে। ফলে একটি যন্ত্র আমদানিতে দুবার ভ্যাট দিতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এর ওপর বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে টাকার বিপরীতে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান। এতে এখন প্রায় ১০ শতাংশ বেশি দামে যন্ত্র আমদানি করতে হচ্ছে। এরই মধ্যে ফ্রেইট চার্জ বেড়েছে। অগে যেখানে প্রতি কন্টেইনারে ভাড়া ৩ হাজার ডলার ছিল, সেটি এখন বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ। কৃষিযন্ত্র বেশি দাম হলে আবার কৃষকরা কিনতে নিরুৎসাহিত হবেন। ফলে দামের যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে শুল্ক কাঠামোয় পরিবর্তন ও ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?

সব ধরনের কোম্পানির জন্য ঢালাওভাবে করপোরেট ট্যাক্স আরোপ যৌক্তিক নয়। এখন কৃষি খাতের অন্যতম উপখাত যন্ত্র আমদানিতে কোম্পানিগুলোকে ৩০ শতাংশ করপোরেট ট্যাক্স দিতে হয়। অথচ মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে কিছু ক্ষেত্রে এ হার ৩-৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। যন্ত্র আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একবারেই এ হারে ট্যাক্স আরোপের সুপারিশ করছি না। কিন্তু এটি অবশ্যই ১০-১৫ শতাংশের মধ্যে আনা প্রয়োজন। এছাড়া পর্যায়ক্রমে সেটি অন্যান্য খাতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করা প্রয়োজন। তা না হলে বৈষম্যমূলক করপোরেট ট্যাক্স আরোপ দেশের আধুনিক কৃষি ও যান্ত্রিকীকরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করবে। কৃষিযন্ত্র আমদানি শুল্ক ব্যবস্থা অবশ্যই কৃষকের সামর্থ্যের মধ্যে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যদিকে স্পেয়ারপার্টস আমদানির ওপর ভ্যাট আমাদের বেশ ভোগাচ্ছে।

যন্ত্র কেনায় অর্থায়ন বাধা দূর করতে ব্যাংক খাত কতটুকু সহায়ক ভূমিকা নিচ্ছে?

দেশের কৃষি এখন বাণিজ্যিকভাবে অগ্রগামী ও উদ্যোক্তামুখী। কয়েক দশক ধরেই এ খাতের উন্নয়নে ব্যাংকের ভূমিকা আছে। তবে এটিকে আরো পরিবর্ধন করার সুযোগ রয়েছে। ব্যাংকাররা এখনো ধারণা করেন কৃষকরা শুধু ৫-১০ হাজার টাকার ঋণ পেলেই হয়ে যাবে। অথচ দেশের অনেক কৃষকের ১০-১৫ লাখ টাকার ঋণ নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে ভারী যন্ত্র কেনার ক্ষেত্রে। কিন্তু কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে এখন ব্যাংকগুলোর ভূমিকা খুবই দুঃখজনক। ট্রাক্টর, কম্বাইন হারভেস্টার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, রিপারের মতো যন্ত্রপাতির জন্য কৃষক এখনো সরাসরি ব্যাংকঋণ পায় না। কৃষকদের সরাসরি ব্যাংকঋণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান যদি কৃষকদের ঋণ সুবিধা দিতে এগিয়ে আসে, তাহলে বাংলাদেশে কৃষির আধুনিকায়ন দ্রুত হবে। ফলে দেশের দারিদ্র্য কমে আসবে।