দেশের সিরামিক খাতের সমস্যা, সম্ভাবনা ও আসন্ন বাজেটে দেশে এ খাতের উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেন  ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এমএ জব্বার

দেশের সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি পণ্য উৎপাদনে কতটা স্বয়ংসম্পূর্ণ?

সিরামিক শিল্প বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খাতগুলোর একটি। সিরামিক পণ্যের স্থানীয় চাহিদা ক্রমে বাড়ছে। দেশীয় সিরামিক কোম্পানিগুলো শুধু স্থানীয় চাহিদার ৮৫ শতাংশ পূরণ করে না; বরং রফতানি বাজারের একটি বড় অংশও পরিবেশন করছে। আগামী পাঁচ বছরে তৃতীয় বৃহত্তম খাত হওয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে এটি। স্থানীয় টাইলস কোম্পানিগুলোর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে ২০০ মিলিয়ন বর্গমিটার। ডিবিএল সিরামিকস লিমিটেড সব ধরনের বিল্ডিং ও বিভিন্ন স্থাপত্যের চাহিদা মেটাতে মার্জিত ও প্রিমিয়াম মানের সিরামিক টাইলস আনার অটল প্রতিশ্রুতি নিয়ে ২০১৭ সাল থেকে কার্যক্রম শুরু করে। সৃজনশীলতা ও অনন্য ডিজাইনের জন্য পরিচিত ডিবিএল সিরামিকস উদ্ভাবন ও এক্সক্লুসিভিটিতে টেকসই বিনিয়োগের মাধ্যমে সফল। ডিবিএল সিরামিকস সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় কারখানা এবং উৎপাদন সুবিধা নিশ্চিত করে। পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া ও উদ্ভাবন উভয় ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্তরের নির্ভুলতা অনুসরণ করে। এরই মধ্যে ডিবিএল সিরামিকস সিরামিক শিল্পে একটি অন্যতম অবস্থানে আছে। শুরুতে নতুন নতুন টাইলস নিয়ে আসার যে লক্ষ্য ছিল, তা এখনো অব্যাহত আছে। প্রতিনিয়ত আমাদের প্রিমিয়াম ও গুণগত মানের টাইলস আসছে মার্কেটে।

ডিবিএলসহ বড় বড় করপোরেট এখন সিরামিক খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ খাতে বিনিয়োগের বর্তমান পরিবেশ কেমন?

সিরামিক খাতে বর্তমানে দেশী-বিদেশী অনেক কোম্পানি ব্যবসা করছে। নতুন বিনিয়োগও আসছে। এ খাতে যা বিনিয়োগ হচ্ছে তা আমাদের টাইলস ইন্ডাস্ট্রির জন্য যথাযথ বলে আমরা মনে করি। দেশীয় সিরামিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের ৮০ শতাংশের বেশি চাহিদা পূরণ করছে। আর তাই এ খাতে আরো বিনিয়োগের মাধ্যমে আমরা দেশীয় চাহিদা পূরণ করে আন্তর্জাতিক বাজারেও রফতানির পরিমাণ বাড়াতে পারি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে একটি শক্ত ও আস্থাশীল অবস্থান গড়ে তুলতে আমাদের যুগোপযোগী এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল দরকার।

সিরামিক পণ্যের রফতানি সম্ভাবনা কেমন?

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সিরামিক সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে উদ্যোক্তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এরই মধ্যে এ খাতে দেশী-বিদেশী প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৭০টি সিরামিক (টেবিলওয়্যার, টাইলস ও স্যানিটারি ওয়্যার) শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে এ খাতে প্রত্যক্ষভাবে ৫২ হাজার ও পরোক্ষভাবে পাঁচ লাখের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োজিত। ফলে সিরামিক পণ্য রফতানি করে দেশের জন্য বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সিরামিক পণ্য যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, সুইডেনসহ ৫০টিরও বেশি দেশে রফতানি করা হচ্ছে।

বিসিএমইএ থেকে কাঁচামাল ও উপকরণের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?

আমাদের অ্যাসোসিয়েশন থেকে যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এ ইন্ডাস্ট্রির জন্য অতিজরুরি। আমরা আশা করি, বিসিএমইএর প্রস্তাবগুলো অতিগুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করা হবে। সিরামিক সেক্টর এখন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প। ১৯৮০-এর দশকে সিরামিক পণ্যের স্থানীয় চাহিদার ৯০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হতো। কিন্তু স্থানীয় কোম্পানিগুলো এখন মোট চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ সরবরাহ করে। এক্ষেত্রে আমরা মনে করি, কাঁচামাল ও উপকরণের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব যথেষ্ট যুক্তিসংগত। যদি স্থানীয় সিরামিক পণ্যের ওপর আরোপিত সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা হয় তাহলে দাম কমে যাবে এবং ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। তবে সিরামিক পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা না গেলেও কমানো জরুরি।

দেশীয় সিরামিক শিল্প খাতের সুরক্ষায় বাজেটে কী নির্দেশনা আশা করছেন?

দেশীয় সিরামিক শিল্প খাতের সুরক্ষা ও অর্থনীতিতে এর দৃঢ় অবস্থান গড়ে তোলার জন্য সরকারের সম্পূরক শুল্ক নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে। কেননা টাইলস এখন আর বিলাসপণ্য নয়; বরং স্থাপত্য নির্মাণের জন্য একটি অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। তাই আমরা আশাবাদী যে সিরামিক খাতে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার কিংবা হ্রাস করার জন্য সরকার যথোপযোগী নীতিমালা বাস্তবায়ন করবে।

সিরামিক পণ্য আমদানিতে আন্ডার ইনভয়েসিংজনিত কারণে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটছে। দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতায় এর প্রভাব কী? এ পরিস্থিতি প্রতিরোধে করণীয় কী?

যদি এমন কিছু ঘটে, তবে সেটা দুঃখজনক। এতে দেশের অর্থনীতিতে ও সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রথমত, এ রকম ঘটনা ঘটে থাকলে সরকার শুল্ক আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশীয় উৎপাদিত সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি এরই মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে চাপের মুখে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি খরচ তিন-চার গুণ বেড়ে যাওয়া, সর্বোপরি রড-সিমেন্টের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় নির্মাণ প্রকল্পের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। ফলে সিরামিক টাইলসের চাহিদাও দিন দিন কমে যাচ্ছে।

বর্তমানে আপনাদের ডিসপ্লে সেন্টারগুলো থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?

বর্তমানে ডিবিএল সিরামিকসের পাঁচটি এক্সক্লুসিভ ডিসপ্লে সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার নাসির ট্রেড সেন্টার ও বারিধারায় দুটি অবস্থিত। বাকি তিনটি সিলেট, বরিশাল ও রংপুরে। অত্যন্ত আধুনিকতার সঙ্গে ও ইউরোপীয় ডিজাইনে পরিকল্পনা করে এসব ডিসপ্লে সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। শিগগিরই আমরা চট্টগ্রামে আরো একটি এক্সক্লুসিভ সেন্টার চালু করতে যাচ্ছি।

ডিবিএল সিরামিকসের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

দেশে সিরামিক টাইলস শিল্পের ব্যাপ্তিকাল খুব একটা বেশি দিনের নয়। এমনকি এক দশক আগেও আমাদের নির্ভর করতে হতো আমদানি করা টাইলসের ওপর। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করতে আমরা দেশেই আন্তর্জাতিক মানের টাইলস উৎপাদন শুরু করেছি।