বিদেশে ক্যান্সারের ওষুধ রফতানিকারক প্রথম বাংলাদেশী ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বিকন ফার্মাসিউটিক্যাল। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩০০ জেনেরিকের ওষুধ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০টি জেনেরিকের ক্যান্সারের ওষুধ রয়েছে। আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ওষুধ শিল্পে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এবাদুল করিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ
দেশের ওষুধ
শিল্পের প্রবৃদ্ধিতে আসন্ন বাজেটে সহায়ক নীতি
কী হতে
পারে?
যে ইন্ডাস্ট্রির
কথাই বলি
না কেন
সেখানে সরকারের
একটা প্রচ্ছন্ন
সমর্থন দরকার।
গার্মেন্ট সেক্টর
আজ দ্বিতীয়
বৃহত্তম রফতানিকারক
হিসেবে আত্মপ্রকাশ
করেছে। এখানে
একদম শুরু
থেকে তাদের
সাপোর্ট দেয়া
হয়েছে, এখনো
হচ্ছে। এখানে
প্রণোদনা দেয়া
হয়েছে। ২
শতাংশ সুদে
ঋণ দেয়া
হচ্ছে। আমরা
এটা ইতিবাচক
দৃষ্টিতেই দেখি।
একটা সময়ে
বাংলাদেশে ফার্মাসিউটিক্যাল
পণ্য মাত্র
১৫-২০
শতাংশ স্থানীয়ভাবে
তৈরি হতো।
এর মধ্যে
মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির
অংশ ছিল।
এখন কিছু
ভ্যাকসিন ও
বায়োটেকনোলজির নতুন
কিছু প্রডাক্ট
ছাড়া সবই
দেশে তৈরি
হয়। এটা
পুরোপুরিভাবে প্রযুক্তিনির্ভর
একটি ইন্ডাস্ট্রি।
চাইলেই শুরু
করা যায়
না। সেখানে
সরকারি সহায়তা
প্রয়োজন।
দেশ থেকে
ওষুধের রফতানি বাড়ছে। এটা
অব্যাহত রাখতে
হলে বাজেটে কোন ধরনের
নীতি সহায়তা প্রয়োজন বলে
মনে করেন?
আমার মনে
হয়, রফতানিকারক
কোম্পানিগুলোকে ইনসেনটিভের
আওতায় আনা
উচিত। মানে
যারা ওষুধ
বানায় না
কিন্তু রফতানি
করে। নানামুখী
রফতানির সঙ্গে
যারা জড়িত,
তাদের নানা
রকম পারদর্শিতা
আছে। এখানে
কিন্তু তাদেরও
লাভ প্রয়োজন।
সে বিষয়টা
নিশ্চিত করতে
হবে। যেমন
গার্মেন্ট সেক্টরে
এটা দেয়া
হয়। ওষুধ
শিল্পে না
দেয়াটা দুর্ভাগ্যজনক।
আমদানীকৃত কাঁচামালের কারণে অনেক
সময় ওষুধের দাম বেড়ে
যায়। এ
সীমাবদ্ধতা দূর
করতে আসন্ন
বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
আমাদের অ্যান্টি
ক্যান্সার প্রডাক্টে
শুল্ক সুবিধা
দেয়া হচ্ছে।
এখানে নতুন
নতুন প্রডাক্ট
এলে আমরা
প্রস্তাব দিয়ে
থাকি। কার্ডিয়াক
প্রডাক্টের ক্ষেত্রেও
কিছু সুবিধা
দেয়ার কথা
রয়েছে। তবে
এপিআই সেক্টরকে
এগিয়ে নিতে
সরকারের নীতিমালা
দরকার। গার্মেন্টে
যেমন রফতানির
জন্য কম
সুদে ঋণ
দিচ্ছে, আমাদেরও
এমন কিছু
প্রয়োজন। ফরমুলেশনই
হোক আর
এপিআই হোক,
কোনোটাই কিন্তু
ফার্মায় পাঁচ-সাত
বছরের আগে
কোনো প্রতিষ্ঠান
ব্রেক ইভেনে
আসতে পারেনি।
লম্বা সময়
একটা স্ট্রাগল
করতে হয়।
এ সময়টায়
একটা ন্যূনতম
সহযোগিতা যেন
থাকে। তাহলে
ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়িয়ে
যাবে। এগুলো
বাজেট থেকেই
করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক
থেকে যেহেতু
এটা আসবে,
মানে এটা
সরকারেরই টাকা।
কোনো কমার্শিয়াল
ব্যাংক তো
১-২
শতাংশ সুদে
ঋণ সুবিধা
দেবে না।
বাংলাদেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন হওয়ার
পরেও কিছু
ওষুধ আমদানি করা হয়,
যা নীতিবিরোধী। এক্ষেত্রে বাজেট
কোনো ভূমিকা রাখতে পারে
কিনা?
ওষুধ আমদানির
ক্ষেত্রে সেগুলো
অ্যাপ্রুভ করাতে
হয়। সেখান
থেকেই বন্ধ
করা যায়।
শুল্ক বসানোর
তো প্রয়োজন
নেই। আমদানির
অনুমতি না
দিলেই হয়।
বাংলাদেশে চাহিদার ৯৮ শতাংশ
ওষুধই নিজেদের উৎপাদিত। বাকি
২ শতাংশ
আমদানি করতে
হয়। কেন
শতভাগ আত্মনির্ভরশীল হতে পারছি
না?
মূলত ভ্যাকসিন
ও ইমিউনোথেরাপি
বা এ
ধরনের লেটেস্ট
জটিল মলিকিউলগুলোর
অনেকগুলো কপি
এখনো তৈরি
হয়নি। আর
আমাদের নিজস্ব
খুব উন্নত
গবেষণাগার নেই।
থাকলে সেটা
করা যেত।
চীন বা
ভারত কপি
করতে পারে
না। কিন্তু
২০৩২ সাল
পর্যন্ত আমাদের
কোনো পেটেন্টের
বাধ্যবাধকতা নেই।
২০২৬ সালের
মধ্যে মধ্যম
আয়ের দেশে
পরিণত হলে
তারপর হয়তো
পরিস্থিতি বদলাবে।
তবে ধরে
নেয়া যায়,
২০৩২ সাল
পর্যন্ত আমরা
সুবিধাটা পাচ্ছি।
তবে এর
পরের পরিস্থিতির
জন্য ভাবতে
হবে। আর
নতুন নতুন
প্রডাক্ট তো
আসবেই। এটা
বায়োটেকনোলজির যুগ।
কিন্তু এখানে
আমাদের গবেষণা
নেই। পেটেন্ট
তো রিসার্চ
ছাড়া সম্ভব
না। ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের
ক্ষেত্রে সহায়তা
দরকার। আমার
মনে হয়,
২৫ বছর
ধরে এপিআই
পার্কের কথা
শুনছি। কিন্তু
সেটা দেখছি
না।
কী ধরনের
সুবিধা তাহলে
প্রয়োজন?
জায়গা দরকার।
অর্থাৎ জমি।
এছাড়া ইউটিলিটি
সাপোর্টও পুরোপুরি
আসেনি। যেটা
অনেক আগেই
আসার কথা।
মেধাস্বত্ব আমরা
এখনো তৈরি
করতে পারিনি। এক্ষেত্রে ওষুধ
খাতে যারা
বিনিয়োগ করবে
তাদের পূর্বপ্রস্তুতি কী হওয়া
উচিত?
পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে
আমাদের আরঅ্যান্ডডি
(গবেষণা ও
উন্নয়ন) শক্তিশালী
করা দরকার।
ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে এখনই
নেমে পড়া
দরকার। এটা
ব্যাপকভাবে করা
দরকার। এখানেও
প্রটেকশন প্রয়োজন।
কারণ মূল্যের
দিক থেকে
চীনের সঙ্গে
আমরা এখনই
পেরে উঠব
না। কিছুদিন
সহায়তা না
দিলে আমাদের
পক্ষে প্রতিযোগিতা
করা সম্ভব
হবে না।
কিছু ওষুধের দাম সরকার
নির্ধারণ করে
দিলেও সিংহভাগ ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে। এতে
ভোক্তাদের ভেতরে
অসন্তোষ দেখা
যায়। বিষয়টি আপনারা কীভাবে দেখছেন?
ভোক্তা বলেন
বা যারা
মূল্য নিয়ে
বেশি চিন্তাভাবনা
করেন, তারা
না বুঝেই
এসব কথা
বলছেন। কেননা
ফার্মাসিউটিক্যালের প্রডাক্ট
কস্টিংয়ের একটা
নীতিমালা আছে।
ফার্মার ক্ষেত্রে
কাঁচামালের তুলনায়
ফ্যাক্টরি স্ট্যান্ডার্ড
ভূমিকা রাখে।
আমার ইউটিলিটির
একটা খরচ
আছে। কারখানার
পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে
রাখতে এক
ধরনের খরচ
হয়। যেমন
আমাকে কমপ্রেসড
এয়ার নিতে
হয়। এটার
কোয়ালিটি যদি
ফার্মাসিটিক্যাল গ্রেডের
না হয়
তাহলে নেয়া
যাবে না।
তারপর এ
রুমটা পরিষ্কার
মনে হলেও
এখানে নানা
পার্টিকেল আছে।
এ রকম
পরিবেশে তো
ওষুধ তৈরি
করা যাবে
না। এনভায়রনমেন্ট
কন্ট্রোল করতে
হবে। টেম্পারেচার
কন্ট্রোল করতে
হবে। এগুলোর
জন্য প্রতিনিয়ত
খরচ করতে
হয়। সাধারণত
কোনো করাখানায়
সেটা খাদ্য
হোক বা
টেক্সটাইল, সেখানে
যতক্ষণ কারখানা
বা প্রডাকশন
চলে ততক্ষণ
বাতি জ্বলে
বা এয়ারকন্ডিশন
চলে কিন্তু
ফার্মায় প্রডাকশন
চলুক বা
না চলুক,
সেটা মেইনটেইন
করতে হয়।
যদি না
করা হয়
তাহলে আবার
নতুন করে
শুরু করতে
হয়। এমনকি
পরীক্ষা করে
দেখতে হয়
যে সব
নিয়ন্ত্রণে আছে
কিনা। প্রায়
এক সপ্তাহের
মতো সময়
লাগে। এ
খরচটা কিন্তু
ধরা হয়
না। কাঁচামাল
আর শ্রমিক
খরচ দিয়েই
ওষুধের দাম
অনুমান করে
নেয়া হয়।
আবার এটাও
বলে রাখা
ভালো, এমন
কিছু প্রতিষ্ঠানও
আছে, যারা
কোনো রকম
নীতিমালা না
মেনে বা
এমন প্রয়োজনীয়
পরিবেশে ওষুধ
তৈরি করে
না। কিন্তু
তারাও একই
দাম রাখে।
তাদের নীতিমালা
মানার বালাই
নেই। আর
আমাদের যদি
ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিকভাবে
ওষুধ রফতানিতে
এগোতে হয়
তাহলে আন্তর্জাতিক
স্বীকৃতিটুকু অর্জন
করতে হবে।
সেখানে এ
স্ট্যান্ডার্ড মেনে
চলাটা গুরুত্বপূর্ণ।
এ আস্থাটুকু
না থাকলে
সেটা পাওয়া
যাবে না।
এখানে কোনো
কম্প্রোমাইজ করা
যাবে না।
ওষুধ শিল্প
বাংলাদেশে পরিপূর্ণ শিল্প হতে
এখনো কী
বাকি আছে?
অনেক কিছুই
বাকি। এপিআই
বাকি। আরঅ্যান্ডডি
নেই। বেসিকটাই
এখনো তৈরি
হয়নি।
ওষুধ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কেন নেই?
এখানে যে
বিনিয়োগ প্রয়োজন,
সেটা করার
মতো আর্থিক
সক্ষমতা অনেকেরই
নেই। এখানে
অনেক বিজ্ঞানীকে
রাখতে হবে।
হতে পারে
বছরের পর
বছর সেখান
থেকে নতুন
কিছু আসবে
না। গবেষণার
নীতিই এটা।
ভাগ্য ভালো
হলে এক
মাসে দুটো
প্রডাক্ট আসতে
পারে। এটা
ভাগ্যের ব্যাপার।
দক্ষ জনশক্তি
হলেই রাতারাতি
বানিয়ে ফেলবে
এমন না।
পেটেন্ট পেতে
হলে অত্যন্ত
প্রতিভাবান কর্মী
লাগবে। স্বাভাবিকভাবেই
তাদের সম্মানীটাও
সেভাবে দিতে
হবে। আমাদের
অনেক মেধাবী
ছেলেমেয়ে আছে,
যারা আমেরিকা-ইউরোপে
কাজ করে।
তাদের আনতে
হলে বা
বাইরের দেশ
থেকে কাউকে
আনতে হলে
সে রকম
সুযোগ, সম্মানী
তো দিতে
হবে।
ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে করণীয়
কী বলে
মনে করেন?
যারা ভেজাল ওষুধ বানায় তারা তো দুষ্কৃতকারী। সরকার যেটা করছে সেটা তো করছে। এসব প্রতিষ্ঠান তো ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দাঁড়ানোর জন্য আসেনি। তারা যেটুকু হাতের কাছে লাভ পাবে, সেটা নিয়েই তুষ্ট থাকবে। তবে হ্যাঁ, কিছু কাজ করা যায়। ফার্মেসিগুলোর ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। বৈধ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যদি সে ওষুধ নেয় তাহলে এটা কমানো সম্ভব।





