দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ পোশাক শিল্পের অব্যাহত যাত্রাকে আরো বেগবান করতে ও টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে শিল্পের সক্ষমতা, বর্তমান প্রেক্ষাপট, আগামী দিনের বিশ্ব বাণিজ্য পরিস্থিতি এবং সর্বোপরি সরকারের টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করে টেকসই পোশাক শিল্পের একটি রূপকল্প প্রণয়ন করেছে বিজিএমইএ।
গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিস্ময়কর রূপান্তর ঘটেছে। স্বাধীনতার পর সীমিত সম্পদের মধ্যে থেকেও জাতি হিসেবে আমরা চমকপ্রদ অনেক সাফল্য অর্জন করেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী অবস্থানে আসীন হয়েছে এবং ২০৪১ সাল নাগাদ আমরা একটি উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার রূপকল্প বাস্তবায়নের পথে রয়েছি। অবাক হয়ে বিশ্ব দেখছে বাংলাদেশের মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি। এ শক্তি নিয়ে সব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে আমরা প্রতিদিনই দেশকে গড়ছি। উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি।
‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে একসময় তাচ্ছিল্য করা হলেও নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ অর্জন। গত পাঁচ দশকে যে অর্জনগুলো আমাদের দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি এনে দিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অর্জন হলো প্রথম সারির তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে উঠে আসা। আনন্দের বিষয় হলো পোশাক শিল্পের ৪০ বছরের ইতিহাসে এ প্রথমবারের মতো আমাদের রফতানি আয় সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে ৫০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে আমাদের পোশাক রফতানি হয়েছে ৪২ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের। আর এ অর্থবছরে আমাদের মোট রফতানি আয় হয়েছে ৫২ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলার। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় অর্জন করতে পারা অনেক বড় পাওয়া।
কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ পোশাক রফতানিতে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ। আর ডেনিমে আমরা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সব দেশকে পেছনে ফেলে প্রথম অবস্থানে আছি।
২০২০-২১ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক সহায়তা এবং আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ওপর ভর করে আমরা কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছি, যা আমাদের রফতানি চিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে পোশাক রফতানি ২৭ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা প্রায় ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। আর সে বছরটিতে আমাদের সামগ্রিক রফতানি ৩৮ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে, যেখানে তৈরি পোশাকের অবদান ছিল ৮১ দশমিক ১৬ শতাংশ।
বিশ্বজুড়ে টিকা কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং কভিডের সংক্রমণ কমে আসার ফলে চাহিদা বাড়তে থাকে। এ কারণে ২০২১-২২ অর্থবছর জুড়ে পোশাক রফতানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল। তবে করোনা মহামারী আমাদের শিল্পে একটি গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে গেছে। কারখানাগুলো ডিসকাউন্ট ও বিলম্ব পেমেন্টের চাপে পড়েছে। অনেক ক্রেতা ও ব্র্যান্ড ক্রয়াদেশের বিপরীতে মূল্য পরিশোধ করেনি, দেউলিয়া হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে সম্প্রতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে একদিকে যেমন জ্বালানি তেলসহ খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে ইউরোপসহ বিশ্বের বেশকিছু দেশে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কাও বাড়ছে। ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। তদুপরি বিগত ২০২১-২২ অর্থবছরে আমাদের সামগ্রিক রফতানির পরিমাণ প্রায় ৫২ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে; যেখানে তৈরি পোশাক রফতানি ছিল প্রায় ৪২ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ২০২০-২১-এর তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরে পোশাক রফতানি বেড়েছে প্রায় ১১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ৩৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। তবে এ প্রবৃদ্ধিকে শুধু অর্থের মূল্যমান বা পার্সেন্টে মূল্যায়ন করা সঠিক হবে না। কারণ গত অর্থবছরে আমাদের কাঁচামাল ও উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। অনেক প্রতিবন্ধকতার পরও আমরা আশাবাদী, কারণ আমরা সবসময় সব পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২০ সালে বিশ্ববাজারে আমাদের পোশাকের শেয়ার ছিল ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ, অর্থাৎ আমাদের সামনে সুযোগ অপরিসীম। যদিও ২০২১ সালের পরিসংখ্যানটি এখনো প্রকাশ হয়নি, আশা করছি ২০২১ সালে আমাদের বৈশ্বিক শেয়ার ৭ শতাংশ অতিক্রম করবে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে আমরা আমাদের শেয়ার ১০ শতাংশে নিয়ে যেতে পারব। তবে সবকিছু নির্ভর করছে বিশ্ব অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।





