২০১৩ সালে নিঃসন্তান দম্পতিদের জন্য কাজ শুরু করেন প্রখ্যাত গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. রোকেয়া বেগম ও অধ্যাপক ডা. মাফরুহা খানম পরাগ। চট্টগ্রামের সার্জিস্কোপ হাসপাতালের ইউনিট দুইয়ে কার্যক্রম শুরু করেন স্বনামধন্য এ চিকিৎসকরা। এ পর্যন্ত সার্জিস্কোপ টেস্টটিউব বেবি সেন্টার টেস্টটিউবের মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার সন্তান জন্মদানে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া আইইউআইয়ের মাধ্যমে ১০ হাজারের বেশি দম্পতিকে সন্তান ধারণের অনন্য সুযোগ করে দিয়েছে।
নিঃসন্তান দম্পতিদের সন্তানের মুখ দেখানোর লক্ষ্যে ২০১৩ সালে যাত্রা করে চট্টগ্রামের সার্জিস্কোপ ফার্টিলিটি সেন্টার। ২০১৩ সালে মার্কেট সার্ভে ও সম্ভাব্যতা পরীক্ষা শেষে যাত্রা শুরু করে সেন্টারটি। প্রথম বছরেই আইভিএফ বা টেস্টটিউব বেবির চিকিৎসাপদ্ধতি শুরু করে এ সেন্টার। ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল হাসপাতালের প্রথম ব্যাচের ও চট্টগ্রামের প্রথম টেস্টটিউব বেবি ‘অর্ণব’র জন্ম হয় এখানে। এরপর ২০১৪ সালের ৯ জুন আরো দুজন টেস্টটিউব বেবির জন্মের মাধ্যমে এ সার্জিস্কোপ ফার্টিলিটি সেন্টার চট্টগ্রামের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
এ সেন্টারে আইভিএফ সফলতার হার প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি। যা এশিয়ার ভালো মানের আইভিএফ সেন্টারের সঙ্গে তুলনীয়। অন্যদিকে আইইউআইয়ের সফলতার হারও বেশ ঈর্ষণীয়। এই টেস্টটিউব বেবি সেন্টারে ইনফার্টিলিটি-বিষয়ক বিভিন্ন সেবা চালু আছে। সেসব সেবার মান ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় বেশ ঈর্ষণীয়। সার্জিস্কোপ ফার্টিলিটি সেন্টার বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের যন্ত্রপাতি দ্বারা সমৃদ্ধ। সেসব যন্ত্রপাতি জাপান, জার্মানি, ডেনমার্ক ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ থেকে আমদানীকৃত। সেন্টারে ব্যবহূত সব মিডিয়া, ডিসপজিবল ওষুধপত্র ও ইনজেক্টেবল আইটেম ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে কিনে এনে এখানে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, চট্টগ্রামে প্রচুর নিঃসন্তান দম্পতি রয়েছে। যারা প্রতি বছর বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছেন। এতে দেশের টাকার অপচয় হচ্ছে। হাতের কাছে সেবা দেয়ার প্রত্যয়ে এখানে টেস্টটিউব বেবির চিকিৎসা শুরু করা হয়। ২০১৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৭০০টির বেশি টেস্টটিউব বেবির জন্ম দেয়া হয়েছে এ সেন্টারের মাধ্যমে। যার মধ্যে গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. রোকেয়া বেগম করেছেন প্রায় ৩০০টির বেশি এবং বাকিগুলোর কাজ সম্পন্ন করেছেন ডা. মাফরুহা খানম পরাগ। এছাড়া আইইউআই প্রয়োগ করে প্রায় ১০ হাজার মানুষের সঠিক চিকিৎসা করা হয়েছে এ সেন্টারের মাধ্যমে।
তারা বলছেন, আমাদের দেশে নিঃসন্তান দম্পতিদের বিশেষ করে মায়েদের সামাজিকভাবে হেয় করা হয়। এখন এক্ষেত্রে কিছুটা সচেতনতা এসেছে। সন্তান না হওয়ার জন্য শুধু নারীরাই দায়ী নয়, অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষরাও দায়ী। সেসব সমস্যা চিহ্নিত করেই আমরা সেবা দিয়ে থাকি। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের এ সেন্টারের উন্নতমানের চিকিৎসাসেবা এবং সফলতার গল্প চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় হাসপাতালটিতে দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসছেন চিকিৎসা প্রার্থীরা।
সার্জিস্কোপের চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক সময় স্বামী কিংবা স্ত্রী—কারোরই প্রজনন কিংবা কোনো শারীরিক সমস্যা না থাকলেও সন্তান জন্ম দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এর কারণ গর্ভধারণের জন্য যে শক্তিশালী শুক্রাণু প্রয়োজন সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ, নারীর সঙ্গে মিলনের পরে শক্তিশালী শুক্রাণুর উপস্থিতি না থাকায় সবকিছু ঠিক থাকার পরও নারীরা সন্তান জন্ম দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কিন্তু সন্তান না হওয়ায় বন্ধ্যা অপবাদ শুনতে হচ্ছে নারীকেই।
ঢাকায় যেখানে টেস্টটিউব বেবির জন্য প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ হয় সেখানে চট্টগ্রামে আড়াই লাখ টাকার মধ্যে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন এ সার্জিস্কোপ টেস্টটিউব বেবি সেন্টার। তাছাড়া আইইউআইয়ের মাধ্যমে মাত্র ১০ হাজার টাকায় নিঃসন্তান দম্পতিরা সন্তান ধারণের সুযোগ পাচ্ছেন। চট্টগ্রামে মাত্র ১ লাখ টাকার মধ্যে টেস্টটিউব বেবি চিকিৎসা সুবিধা দিতে পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে সার্জিস্কোপ টেস্টটিউব বেবি সেন্টারের পক্ষ থেকে। কারণ খরচ যত কমানো সম্ভব হবে তত এ চিকিৎসায় মানুষের আগ্রহ বাড়বে। এদিকে চট্টগ্রামে এ চিকিৎসাসেবা আরো আধুনিকায়ন করতে ট্রেনিং সেন্টার তৈরির মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এ ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে চট্টগ্রামের শহর থেকে শুরু করে গ্রামীণ পর্যায়ে এবং আশপাশের জেলায় চিকিৎসাসেবা ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
সার্জিস্কোপ টেস্টটিউব বেবি সেন্টারের কো-ফাউন্ডার এবং বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মাফরুহা খানম পরাগ বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা প্রতিষ্ঠানটিকে একেবারে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে চাই। এজন্য আমরা একটি ইনস্টিটিউট করার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি একটি ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে আমাদের প্রায় এক যুগের লব্ধ জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে চাই। এরই মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ একাধিক সংস্থা টেস্টটিউবে সন্তান ধারণের কার্যক্রম হাতে নিতে যাচ্ছে। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে ওই সব প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা ও ট্রেনিংয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আমরা এ চিকিৎসাসেবাকে একেবারে গ্রামীণ পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে চাই। গ্রামীণ সমাজে এ টেস্টটিউব বেবি কিংবা আইইউআই বিষয়টি নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা আছে। এজন্য আমরা আমাদের প্রচারণা ও কাজের পরিচিতি সেখানে পৌঁছে দেয়ার কাজ করছি। বন্ধ্যাত্বের চেয়েও নাগরিক বাস্তবতায় আমাদের দেশে আইইউআই অর্থাৎ দুর্বল শুক্রাণুর কারণে সন্তান ধারণ করতে না পারার ঘটনা বাড়ছে। এ বিষয়ে বিশদ গবেষণার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো এগিয়ে এলে সাধারণ মানুষের সংকট আরো লাঘব হবে।
এদিকে সার্জিস্কোপের চিকিৎসক দল বলছেন, টেস্টটিউব বেবি চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে ইনজেকশন। এ চিকিৎসায় ব্যবহূত ইনজেকশন জার্মানিসহ উন্নত বিশ্ব থেকে আমদানি করতে হয়। ভারতের মতো দেশ এসব ইনজেকশন নিজেরাই তৈরি করছে। আমাদের দেশের ওষুধ উৎপাদন শিল্প প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনো এসব ইনজেকশন তৈরি করছে না। দেশে এসব ইনজেকশন তৈরি হলে চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসা সম্ভব হবে।
বর্তমান সময়ে বন্ধ্যাত্বের সব থেকে উন্নত ও সর্বজন স্বীকৃত একটি চিকিৎসাপদ্ধতি হচ্ছে আইভিএফ বা টেস্টটিউব বেবি চিকিৎসাপদ্ধতি। স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেয়া একটি শিশুর প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হয় মায়ের জরায়ুতে। কিন্তু এ চিকিৎসাপদ্ধতিটির মাধ্যমে মানবদেহের বাইরে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর নিষেক ঘটিয়ে তারপর মায়ের জরায়ুতে সংস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশে টেস্টটিউব বেবির সফলতার হার প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ। উন্নত দেশে এ হার ৪০-৪৫ শতাংশ হয়ে থাকে। কিন্তু নারীদের বয়সের সঙ্গে এ হার অনেকটাই সম্পর্কিত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ হার কমতে থাকে। ৪৩ বছর বয়সের পর এই হার একদম কমে যায় বলা যায়। ৪৩ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সের নারীদের ক্ষেত্রে সফলতার হার মাত্র ৫ শতাংশ হয়ে থাকে। ৩৮-৪০ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ২১ শতাংশ, ৩৫-৩৭ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে ৩১ শতাংশ এবং ৩৪ বছর বা তার চেয়ে কম বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে সফলতার সম্ভাবনা ৪০ শতাংশ হয়ে যায়।
দেবব্রত রায়





