দেশের জ্বালানি খাতের ক্রম অগ্রসরমাণ উন্নতিতে ভূমিকা রাখছে বাপেক্স। সম্প্রতি সিলেটে একটি গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান হয়েছে। গ্যাস অনুসন্ধানে বর্তমানে বাপেক্স ঠিক কী ধরনের কাজ করছে?

গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে আমাদের চারটা রিগ আছে। আমরা চারটা রিগের প্রতিটির ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বছরব্যাপী পরিকল্পনা করেছি। কোন রিগ কোথায় যাবে, কখন যাবে, সম্পূর্ণ একটা রিগ শিডিউল বানিয়েছি। সেটার আলোকে আমরা বাপেক্সের কাজ করব, সিলেট গ্যাসফিল্ডের কাজও করব এবং বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ডের কাজও করব। আমাদের রিগ যেন একদিনও বসে না থাকে সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমরা অনুসন্ধান কূপ খনন করছি। আমরা উৎপাদন কূপ খনন করছি। যে কূপগুলো শুষ্ক হয়ে গেছে বা যেগুলোতে গ্যাস কমে গেছে সেগুলোতে আমরা খনন করছি। আমরা রিগের সর্বোচ্চ ব্যবহার করছি এখন।

আমরা জানি, বাপেক্স কাজ করে দেশের স্থলভাগে। এ পর্যন্ত বাপেক্স সমুদ্রভাগে কাজ করেনি। বাপেক্সের সক্ষমতা নিয়ে নানান সময়ে কথা ওঠে। বাপেক্সের যে সক্ষমতা রয়েছে সেটার প্রমাণ দিয়েছে এরই মধ্যে। সমুদ্রভাগে কাজ করার কোনো পরিকল্পনা বাপেক্সের আছে কি?

প্রথমত সমুদ্রভাগটা পেট্রোবাংলার আওতাধীন পিএসসি পরিদপ্তরের অধীনে। বাপেক্স ল্যান্ডে যেখানে কাজ করে সেখানে ঋণ ফেস এরিয়া বলে কিছু ব্লকে বিভক্ত। সাত নম্বর ব্লক, নয় নম্বর ব্লক এমন। ওই ব্লকগুলো বাপেক্সের নামে বরাদ্দকৃত না। এগুলো পেট্রোবাংলার আওতাধীন। ব্লক আমাদের দিলে ইনশা আল্লাহ আমরা কাজ করব। টেকনোলজি ল্যান্ড এবং অফশোরে একই। আমাদের অনেক অভিজ্ঞ ভূতত্ত্ববিদ, ভূপদার্থবিদ, ড্রিলিং ও পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার আছে। শুধু একটাই পার্থক্য ল্যান্ড ড্রিলিং রিগ আছে। অফশোরে জ্যাকাপের জন্য ফ্লোটিং রিগ লাগে। সেটা এ মুহূর্তে নেই। বাংলাদেশ সেভাবে ইনক্লুড করেনি।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাপেক্স এককভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কী ধরনের ইন্সট্রুমেন্ট দরকার বা আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা সে বিষয়ে কী বলবেন?

২০০৯ সালের পূর্ব পর্যন্ত খনন করার মতো বাপেক্সের উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো রিগই ছিল না। কারণ ১৯৮১ ও ১৯৮৪ সালে একটা করে যথাক্রমে ফ্রান্স ও আমেরিকা থেকে রিগ কেনা হয়েছিল। এ দুটো রিগই এত বছর ধরে চলেছে। এরপর আর কোনো ইন্সট্রুমেন্ট বা সহায়ক যন্ত্রপাতি সরকার কেনেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালে যথাক্রমে বিজয় ১০, বিজয় ১১ ও বিজয় ১২ নামে তিনটা রিগ কেনা হয়। ২০১৮ সালে ওয়ার্ক ওভার করার উপযোগী বিজয় ১৮ রিগ কেনা হয়েছে। সর্বশেষ বিজয় ১২ রিগ কেনা হয়েছে, সেটাও ১২ বছর হয়ে গেল। আর সম্প্রতি আমাদের যে স্তরগুলোতে তিন হাজার, চার হাজার মিটার লেয়ারে গ্যাস আছে যেমন তিতাস, শাহবাজপুরে, এ লেয়ারের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে দিন দিন গ্যাস কমে আসছে। এখন আমাদের গভীরে যাওয়ার সময় এসেছে। পাঁচ থেকে সাত হাজার মিটার গভীরতায় খনন করতে হবে। সেজন্য আমরা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীকে বলেছি গভীর কূপ খননের একটা রিগ কিনে দিতে হবে। বর্তমানে এক হাজার, দেড় হাজার ও দুই হাজার হর্স পাওয়ারের রিগ রয়েছে। গভীরে যেতে হলে আমাদের ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার হর্স পাওয়ারের রিগ লাগবে। আপনি আমাদের সক্ষমতার কথা বলেছেন। গভীরে যাওয়ার এই রিগ কিনে দিলে আমরা সাত হাজার মিটার পর্যন্ত গভীরে যেতে পারব বলে আশা করি। সে অনুযায়ী আমাদের কর্মীদের ট্রেনিং দিলে সাত হাজার মিটার পর্যন্ত নির্বিঘ্নে কাজ করে যেতে পারব। আমরা ডাটা অ্যাকুইজিশন করি, প্রসেসিং করি, ইন্টারপ্রিটেশন করি। সবগুলোরই থ্রি ডি মডেলিং সফটওয়্যার রয়েছে। এ সফটওয়্যার, কিছু প্রসেসিং যন্ত্রপাতি কিনে দিলে আমরা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারব।

গত ১০ বছরে জ্বালানি খাতে যথাযথ বিনিয়োগ হয়নি। সেখানে বাপেক্সের কথাও আসে, সক্ষমতা কাজে লাগানো যায়নি। অথবা কাজে লাগানো হয়নি। যদি বিনিয়োগ হতে থাকে বা না হলে কতটুকু দরকার?

অ্যাকচুয়ালি তেল গ্যাসে সক্ষম হতে হলে প্রথম কাজ অনুসন্ধান করা, কূপ খনন করা। যত বেশি অনুসন্ধান করা যাবে তত বেশি গ্যাস আবিষ্কার করা যাবে। অনুসন্ধান যদি লিমিটেশন হয় যেমন দুইটা অনুসন্ধান করলে একটা সাকসেস হয়। বাংলাদেশে এভারেজে থ্রি ইজ টু ওয়ান সাকসেস হয়। ইন্টারন্যাশনালি সেভেন বাই এইট ইজ টু সাকসেস হয়। আমেরিকা, কানাডায় ওনারা ১০টা কূপ খনন করে একটা পেলেও সাকসেস হয়। তো সেভাবে আমাদের আরো বেশি অনুসন্ধান কূপ খনন করতে হবে। অনুসন্ধান কূপ খনন করার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বিনিয়োগের দিক থেকে ১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি হলে আমরা একটা অনুসন্ধান কূপ খনন করতে পারি। অনুসন্ধান কূপের খনন একটু বেশি হলে সেক্ষেত্রে ১২০ বা ১৩০ কোটি হলে সাকসেস হওয়া যায়। ডেভেলপমেন্ট কূপগুলো সব ৮০ থেকে ১০০ কোটি।

সে ক্ষেত্রে বছরে কতটি কূপ খনন করার সক্ষমতা বাপেক্সের রয়েছে?

বাপেক্সের ৩ হাজার বা ৪ হাজার মিটার গভীর কূপ খনন করার তিনটা রিগ আছে। সব রেডি থাকলে টাকাপয়সা দিলে এক বছরে একটা রিগ দিয়ে কমপক্ষে তিনটা কূপ খনন করা যায়। সেক্ষেত্রে এক বছরে তিনটা রিগ দিয়ে সাত থেকে নয়টা কূপ খনন করতে পারি। সেটার জন্য ডিপিপি, ভূমি অধিগ্রহণ পাস করে দিলে আমরা একটা কূপ খনন করব, পাশে আরেকটা সাইট ডেভেলপ করব। মাল আনব। যেদিন মাল আসবে সঙ্গে সঙ্গে ড্রিলিং শুরু করব। প্রোপার অনুসন্ধানে টাকা বরাদ্দ করলে অতিদ্রুত কাজ আরম্ভ করতে পারব আমাদের রিগ দিয়েই।

ভোলায় আমাদের প্রমাণিত গ্যাসের মজুদ প্রায় দেড় টিসি। গত এক দশকে গ্যাসের এ মজুদ সেখানে আবিষ্কার হয়েছে। নতুন করে সেখানে কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা, থাকলে কী ধরনের সেটা?

এটা এখন সময়ের দাবি। এর আগে সরকার একবার পরিকল্পনা নিয়েছে যে ভোলার গ্যাসটা ল্যান্ডে আনার। একবার ফিজিবিলিটি স্টাডি করছে ভোলা টু ফেনী ইকোনমিক জোন। এখন আবার বিকল্প করছে ভোলা টু বরিশাল। ভোলায় ১৯৯৪ সাল থেকে ২০০৪ পর্যন্ত কাজ হয়েছে। দুইটা গ্যাসক্ষেত্র—একটা ভোলায় আর একটা শাহবাজপুরে। শাহবাজপুর ১, ২, ৩, ৪ ও শাহবাজপুর ইস্ট পাঁচটা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে। তো পাঁচটা গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ওঠানো সম্ভব। আগে ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ওঠানোর প্লান ছিল। সম্প্রতি করোনার শুরুতে ৬০ মিলিয়নের একটা প্রসেস প্ল্যানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কানাডিয়ান কোম্পানি ফাইভ ব্লুজ সেখানে কাজ করছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এ প্রসেস প্ল্যানটা কমিশনিং হয়ে যাবে। এ দুটো মিলে ১৩০ মিলিয়নসহ ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেয়ার সক্ষমতা আমাদের তৈরি হয়েছে। এটা গেল শাহবাজপুরে। আর ভোলায় ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট দেয়ার মতো একটা কূপ রেডি আছে। এটা প্রসেস প্ল্যান নেই, সেজন্য সরবরাহের জন্য একটু অপেক্ষায় আছি। এর মধ্যে আরো তিনটা কূপ খনন করার পরিকল্পনা নিয়েছি। শাহবাজপুরের টগবি এবং ভোলায় দুইটা (২ নম্বর কূপ ও ইলিশা)। এ তিনটা থেকে প্রতি ২০ মিলিয়ন ঘনফুট করে মোট ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট করে বাড়বে।

এ গ্যাসটা কি প্রাথমিকভাবে ভোলায় দেয়ার পরিকল্পনা আছে?

এ মুহূর্তে ভোলায় ১৩০ থেতে ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আছে। ভোলায় সর্বোচ্চ ৫০-৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কনজিউম করে। তার বেশি ক্যাপাসিটি নেই। পাশাপাশি আরো গ্যাস পাওয়া গেলে সেখানে কূপ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভোলার চরফ্যাশনে থ্রি ডি ক্লোজ গ্রিড করার চিন্তা করছি। ভোলার পূর্ব পাশে হিজলা মুলাদিতে আমরা টু ডি ক্লোজ গ্রিড করার পরিকল্পনা করছি। পাশের এলাকা ব্লক সেভেন ও নাইন সুন্দরবন ছাড়া বরগুনা, পটুয়াখালী অঞ্চলে ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটার সার্ভে করার পরিকল্পনা নিয়েছি। এর পাশাপাশি গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুরে গ্যাস অনুসন্ধান করছি। সর্বশেষ ২৮তম গ্যাসক্ষেত্র সিলেটের জকিগঞ্জে আমরা এক্সক্লুসিভ থ্রি ডি সার্ভে করছি।