প্রাচ্যের ড্যান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল ব্রিটিশ আমল থেকেই। হাজার বছরের ব্যবসার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। দেশের অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ অবদান অতীতে ছিল, বর্তমানেও রয়েছে।

মসলিন কাপড় উৎপাদনের কারণে দুনিয়াজুড়ে নাম ছড়িয়ে পড়েছিল নারায়ণগঞ্জের। একসময় পাটের ব্যবসার আধিপত্য ছিল নারায়ণগঞ্জে। যে কারণে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজী জুট মিল গড়ে উঠেছিল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে। পাটের ব্যবসার গৌরব ম্লান হতে শুরু করলে নারায়ণগঞ্জে  যাত্রা শুরু করে হোসিয়ারি শিল্প। এ হোসিয়ারি শিল্প থেকেই আজ মসলিন ও পাটের শহরে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করছে নিটওয়্যার শিল্প। ওই সময়ের কয়েকজন ব্যবসায়ীর কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ় মনোবল ও অসীম সাহসের কারণে হোসিয়ারি শিল্প থেকেই বিদেশে পণ্য রফতানি শুরু হয় ১৯৬৭ সালে।

নারায়ণগঞ্জে পাটের ব্যবসার দাপুটে পথচলার সময় নারায়ণগঞ্জে যাত্রা করে হোসিয়ারি ব্যবসা। ১৯২১ সালে নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে উদ্যোক্তা সতীশ চন্দ্র পাল চারটি হ্যান্ডরিবন মেশিন দিয়ে গড়ে তোলেন প্রথম হোসিয়ারি কারখানা। কালের আবর্তে সেই হোসিয়ারি কারখানা ছড়িয়ে পড়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের নয়ামাটি, উকিলপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে হোসিয়ারি শিল্পের ১০ হাজারের বেশি শোরুম এবং ২৫ হাজারের বেশি কারখানা আছে। এসব হোসিয়ারি শিল্পে লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। শতবছর পর সেই হোসিয়ারি শিল্পের বিস্তৃত রূপ আজ নিটওয়্যার শিল্প। নারায়ণগঞ্জ থেকেই ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। নিটওয়্যার ও ওভেন (শার্ট-প্যান্ট) মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জে গড়ে ওঠা তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় আট লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করেন। ৬৮৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের নারায়ণগঞ্জ জেলার জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ লাখে। শীতলক্ষ্যা নদীর স্বচ্ছ জল আর আবহাওয়ার কারণেই বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিল মসলিন কাপড়। কথিত আছে, মিসরের ফারাওদের মমিতে নারায়ণগঞ্জে তৈরি মসলিন ব্যবহৃত হতো। কালের বিবর্তনে শীতলক্ষ্যার তীরের সেই মসলিন হারিয়েছে। একসময়ের প্রাচ্যের ড্যান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জের পাট শিল্প এখন ম্লান হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে। তবে বিশ্ববাজার থেকে হারিয়ে যায়নি নারায়ণগঞ্জের নাম। দাপটের সঙ্গেই সে নাম ধরে রেখেছে তৈরি পোশাক শিল্প। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে নিটওয়্যার শিল্প প্রায় ২৫ দশমিক ৭৩৮ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে, যার সিংহভাগের জোগান দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌নিটওয়্যার শিল্পের যাত্রা শুরু নারায়ণগঞ্জে। এ জেলায়ই নিট শিল্পের অর্ধেকের বেশি কারখানা। নিটওয়্যার (টি-শার্ট, সোয়েটার) ও ওভেন মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জে অন্তত সাড়ে ছয়শ তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে।’

শুরুর কথা

১৯২১ সালে নারায়ণগঞ্জে হোসিয়ারি শিল্পের যাত্রা হলেও তার অনেক আগেই পাবনা অঞ্চলে হোসিয়ারি শিল্প বিখ্যাত ছিল। তবে শীতলক্ষ্যার পাড়ে হোসিয়ারির গোড়াপত্তনের পর থেকে পাবনার তুলনায় নারায়ণগঞ্জে দ্রুততম সময়ের মধ্যে হোসিয়ারি শিল্পের বিকাশ ও বিস্তার ঘটে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পণ্য পরিবহনে সুবিধা এবং পণ্য তৈরিতে দক্ষ কারিগর পাওয়ায় দ্রুত প্রসার লাভ করে হোসিয়ারি শিল্প।

১৯৬০ সাল থেকে তৎকালীন লেবার হোসিয়ারি, বর্তমানে মিনার টেক্সটাইলের স্বত্বাধিকারী জারজিস হোসেন এবং হালিম হোসিয়ারি যৌথভাবে বিদেশে হোসিয়ারি পণ্য রফতানির চেষ্টা করতে থাকে। ১৯৬৭ সালে নিট শিল্পের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লিবিয়ায় দুটি হোসিয়ারি যৌথভাবে টি-শার্ট রফতানি করে। বাবার হাত ধরে দেশের প্রথম তৈরি পোশাক রফতানির স্মৃতি এখনো মনে করতে পারেন জারজিস হোসেনের ছেলে বিকেএমইএর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মঞ্জুরুল হক।

তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌রফতানির কাগজ তৈরি করতে গিয়ে মিনারটেক্সের নাম খাতা-কলমে হোমটেক্স পাকিস্তান লিমিটেড করা হয়েছিল। প্রথমবার প্রায় পাঁচ হাজার সাদা টি-শার্ট রফতানি হয়েছিল। বলা চলে, এর মধ্য দিয়েই নিট শিল্পের বিদেশযাত্রা শুরু।’

মঞ্জুরুল হক জানান, তার পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের আগে পর্যন্ত আমেরিকার প্রতিষ্ঠান স্টাইল ম্যানসের কাছে প্রায় পাঁচ লাখ টি-শার্ট রফতানি করেন নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। এ সময় জারজিস হোসেনের সহায়তায় তার তিন বন্ধু মসলিন হোসিয়ারির আবদুল মজিদ, শান হোসিয়ারির আবু তালেব ও আবেদ আলীর মনোয়ারা টেক্সটাইল হালিম হোসিয়ারি স্টাইল ম্যানসের জন্য টি-শার্ট তৈরি শুরু করে।

মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৯ সালে মঞ্জুরুল হকের হাত ধরেই স্বাধীন বাংলাদেশ আবার নিট পণ্য রফতানি শুরু করে। শুরুর সেই গল্প জানান মঞ্জুরুল। ‘মুক্তিযুদ্ধের পর হোসিয়ারি শিল্পের অবস্থা তখন নিবুনিবু। ১৯৭৮ সালে বাবা নির্দেশ দেন বিদেশী ক্রেতা খুঁজতে। বিদেশী ক্রেতা পেতে হলে বিদেশী নাগরিকদের আনাগোনা আছে এমন জায়গা প্রয়োজন। ভেবেচিন্তে একদিন এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলাম পূর্বাণী হোটেল ও সোনারগাঁও হোটেলে।‌ সোনারগাঁও হোটেলে একজন স্টাফের সঙ্গে কথা বলে আমাদের তৈরি গেঞ্জি তাকে গিফট করি। পরে আস্তে আস্তে তার সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠলে তাকে জানাই আমরা হোটেল লবিতে বসে সময় কাটাব। ওই স্টাফ আমাদের সুযোগ করে দেয়। আর পূর্বাণী হোটেলের ম্যানেজার ছিল আমার ভগ্নিপতি। সেই সুবাদে পূর্বাণী হোটেলে লবি বা লাউঞ্জে বসে নিজেরাই ক্রেতা-বিক্রেতা সেজে জোরে জোরে কথা বলি আর টি-শার্ট নেড়েচেড়ে দেখি। যদি কোনো বিদেশী ক্রেতা তা দেখে এগিয়ে আসেন, এ আশায়। এমনিভাবে বেশ কিছুদিন চলার পর একদিন ফ্রান্সের এক নাগরিক আমাদের টি-শার্ট নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। শুরুতেই তিনি পাঁচ লাখ টি-শার্ট চান আমাদের কাছে। ছোট কারখানায় এত টি-শার্ট কীভাবে তৈরি করব, তা ভাবতে ভাবতেই নারায়ণগঞ্জে এসে বাবাকে জানাই। বাবা তার বন্ধুদের ডেকে আবারো পুরনো হোসিয়ারিতেই টি-শার্ট বানানো শুরু করেন। লেবার হোসিয়ারি, মনোয়ার হোসিয়ারি, সান হোসিয়ারি, রোকেয়া হোসিয়ারি, মোসলেম হোসিয়ারি মিলে গেঞ্জি উৎপাদন করে। ১৯৭৯ সালে ফ্রান্স দিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের রফতানি শুরু।’ এ সময় থেকে কারখানার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা অনুযায়ী তৈরি পোশাক শিল্পে প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগতে থাকে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘‌সেই সময় ব্যাংক সুবিধা না থাকার কারণে বিদেশী বায়াররা টিসিবির মাধ্যমে অর্ডার করত। টিসিবির কর্মকর্তারা আমাদের কাজের মনিটরিং করত এবং এক বা দেড় শতাংশ সার্ভিস চার্জ নিত। এভাবে আস্তে আস্তে ব্যাংকিং সুবিধা বাড়ালে টিসিবির মাধ্যমে অর্ডার দেয়া বন্ধ হয়ে যায়।’

হোসিয়ারি কারখানায় সুতা থেকে থানকাপড় বুননের যন্ত্রকে বডি মেশিন বলা হতো। শুরুতে বডি মেশিনে উৎপাদিত কাপড়ের তৈরি টি-শার্ট বিদেশে রফতানি শুরু হয়। জারজিস হোসেনের দেখানো পথে পরবর্তী সময়ে কনক হোসিয়ারি, নেভি হোসিয়ারিসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠান নিটপণ্য রফতানি শুরু করে। নারায়ণগঞ্জে বিকশিত হতে থাকে রফতানিমুখী নিটওয়্যার শিল্প। পুরনো বডি মেশিনগুলোর জায়গায় স্থান করে নেয় জাপান, তাইওয়ান, জার্মানি থেকে আমদানি করা আধুনিক মেশিন ও যন্ত্রপাতি। পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুরে ছড়িয়ে যাওয়া নিট শিল্প বর্তমানে দেশের মোট জাতীয় রফতানি আয়ের প্রায় ৪২ ভাগ জোগান দিচ্ছে।

যাত্রা করার পর শীতলক্ষ্যা তীরের নারায়ণগঞ্জেও তার ঢেউ এসে লাগে। সত্তরের দশকের শেষে এসএ খায়ের শহরের মাসদাইরে গড়ে তোলেন রফতানিমুখী ফোর ব্রাদার্স লিমিটেড নামের একটি কারখানা। শুরুতে শতাধিক নারী শ্রমিক কাজ করতেন কারখানাটিতে। একই সময়ে শহরের আশপাশের এলাকাগুলোয় গড়ে ওঠে সোনারগাঁ গার্মেন্টস, মারিয়া গার্মেন্টস, ক্যাপিটেল গার্মেন্টস। ওভেন দিয়ে স্বাধীনতার পর নারায়ণগঞ্জে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত নিট শিল্পই রাজত্ব গড়ে তুলেছে শীতলক্ষ্যাপারের শহরে।

এর কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলেন, শীতলক্ষ্যা নদীর স্বচ্ছ পানিতে হোসিয়ারি কাপড়ের ধোলাই ভালো হতো। এছাড়া শ্রমিক ও সুতার সহজলভ্যতা, পরিবহন সুবিধাসহ নানা কারণে নারায়ণগঞ্জে হোসিয়ারি শিল্পের বিকাশ ঘটে। পরবর্তী সময়ে এ হোসিয়ারি শিল্পের শ্রমিকরাই নিটওয়্যার শিল্পের কারিগর হিসেবে কাজ শুরু করেন। এছাড়া নিট পণ্যের ডাইংয়ের জন্য শীতলক্ষ্যার পানি ছিল উৎকৃষ্ট। একদিকে হোসিয়ারি থেকে পাওয়া সুবিধা, অন্যদিকে ডাইংয়ের জন্য শীতলক্ষ্যার উৎকৃষ্ট পানি। দুইয়ে মিলে নারায়ণগঞ্জে দ্রুতই বিকশিত হতে থাকে নিটওয়্যার শিল্পের। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের তৈরি পোশাক শিল্পের ৯৫ ভাগই নিটওয়্যার কারখানা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, মোটা দাগে নারায়ণগঞ্জ থেকে নিটওয়্যার পণ্য রফতানি শুরু হয় আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। ওই সময় মিনার টেক্সটাইল, সান গার্মেন্টস, এনার গার্মেন্টসসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিদেশে টি-শার্ট রফতানি করে। পরবর্তী সময়ে আরো অনেক কারখানা রফতানি শুরু করে। শুরুর দিকে অনেক ব্যবসায়ী এক বা দুই ফ্লোর নিয়ে গার্মেন্টস চালু করেন। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের সুবিধা নিয়ে প্রতিষ্ঠান বড় করতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘‌নারায়ণগঞ্জে নিটওয়্যার শিল্পের প্রসার লাভে অনেক যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ শিল্পের জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।’ মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘‌নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা বিজিএমইএর সদস্যপদ নিয়ে বিদেশে নিট পণ্য রফতানি করতে থাকে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেল বিজিএমইএ থেকে আমরা যে ধরনের সার্ভিস সুবিধা আশা করছি সে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছিল না নিট শিল্প। যে কারণে একসময় এসে এনার গার্মেন্টের মালিক মোকলেসুর রহমান নারায়ণগঞ্জে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করলেন নিজেদের মতো করে সংগঠন তৈরি করার। যাতে করে আমাদের সমস্যা আমরাই সমাধান করতে পারি। পরে নারায়ণগঞ্জে এসে নিট শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ১৯৯৭ সালে বিকেএমইএ জন্মলাভ করে। বিকেএমইএর মাধ্যমে এখন নারায়ণগঞ্জসহ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারী প্রতিটি কারখানা নানা সেবা গ্রহণ করছে।’ হাতেম আরো বলেন, ‘‌বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে কথা বলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে আমাদের বাণিজ্য প্রসার লাভে সুযোগ সৃষ্টি করে দেন। ‌প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সেক্টরের ব্যবসায়ীদের সমস্যার খোঁজ রাখেন এবং কোনো সমস্যা সৃষ্টি হলে তা সমাধানে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। যে কারণে বাংলাদেশে নিটওয়্যার শিল্পের শক্ত গোড়াপত্তন হয়েছে।’ তিনি দাবি করেন, সরকার অনেক ভালো ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার লোভ-লালসার কারণে অনেক উদ্যোগের অপমৃত্যু ঘটে মাঝপথে।

আছে নানাবিধ সংকট

দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও ভালো নেই নারায়ণগঞ্জের তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা। করোনা মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পর পরই নতুন ধাক্কা হয়ে আসে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। বৈষয়িক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলার সংকট এবং বিদেশী বায়ারদের অর্ডার কমে যাওয়াসহ নানা কারণে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে এ সেক্টরের ব্যবসায়ীদের।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, প্রতিনিয়তই ক্রয়াদেশ হারানোর অনিশ্চয়তায় আছেন তারা। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে সুতার দাম অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এ সময় ব্যবসায় টিকে থাকার জন্য অনেক কারখানাই ক্ষতি মেনে নিয়ে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। তার ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি।

বিকেএমইএর সহসভাপতি ও ফতুল্লা অ্যাপারেলসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘‌গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের কারখানায় উৎপাদন অনেক হ্রাস পেয়েছে। সঠিক মাত্রায় গ্যাস পাচ্ছি না। কিন্তু তার মধ্যে সরকার কয়েক মাস আগে গ্যাসের দাম শতভাগ বৃদ্ধি করেছে। আগে গ্যাসের সংকট ছিল কিন্তু বর্তমানে গ্যাসের চাপ নেই। কিন্তু বাতাস আছে। মিটার ঘুরছে। আমাকে বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘‌আগে একটি কারখানা যে গ্যাস বিল পরিশোধ করত বর্তমানে সেই কারখানাকে দ্বিগুণ বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। কিন্তু বিল পরিশোধ করে গ্যাস পাচ্ছি না। ফলে প্রতিটি শিল্প-কারখানাকে লোকসান গুনতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘‌সরকার গ্যাসের যে মূল্য বৃদ্ধি করেছে আমরা সেই বিল পরিশোধ করছি। এখন সরকারের কর্তব্য হচ্ছে আমাদের উৎপাদন ঠিক রাখতে নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ করা।’

এছাড়া নারায়ণগঞ্জে নিটওয়্যারের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র বিসিক শিল্পনগরীর ভগ্নদশা, জলাবদ্ধতাসহ শিল্পসহায়ক অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় ভুগছেন ব্যবসায়ীরা। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ও বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘‌ফতুল্লা বিসিক শিল্পনগরী থেকে সরকার কোটি কোটি টাকা আদায় করে। কিন্তু সেই অনুপাতে বিসিকের উন্নয়ন হচ্ছে ধীরগতিতে। বিসিকে শতভাগ রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। প্রায় তিন লাখের মতো শ্রমিক কাজ করে। কিন্তু সামান্য বৃষ্টি হলে পুরো বিসিক তলিয়ে যায় পানির নিচে। শ্রমিক-কর্মচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’ তিনি দাবি করেন, সরকারি কোষাগারে নারায়ণগঞ্জ বিসিক যে রাজস্ব প্রদান করে সেই অনুপাতে যত দ্রুত সম্ভব রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করে এ অঞ্চলে কর্মরত শ্রমিক-মালিকদের দুর্ভোগ লাঘবে কাজ করবে সরকার।

লেখক: সাংবাদিক