নিট ও ওভেন ফ্যাব্রিকের মধ্যে বেশকিছু পার্থক্য রয়েছে। তবে সেটি জানার আগে জানা দরকার নিট ফ্যাব্রিক ও ওভেন ফ্যাব্রিক কী?

যে প্রক্রিয়ায় বিশেষ ধরনের নিডেলের সাহায্যে লুপ তৈরি করে সে লুপগুলোকে বিশেষ নিয়মে পরস্পরের সঙ্গে লম্বালম্বি বা সমান্তরালভাবে সংযোজিত করে কাপড় তৈরি করা হয়, তাকে নিট ফ্যাব্রিক বলে। শার্ট, আন্ডারগার্মেন্টস, পায়জামা, মোজা ইত্যাদি পোশাককে নিট ফ্যাব্রিক হিসেবে ধরা হয়।

নিট ফ্যাব্রিকের কিছুটা বিশেষত্বও আছে, যা দিয়ে বোঝা যায়, সেটা কোন কোন দিক থেকে ওভেন ফ্যাব্রিকের তুলনায় আলাদা। বেশ কয়েকটি লুপের সাহায্যে নিট ফ্যাব্রিক তৈরি করা হয়। এ ফ্যাব্রিক খুব বেশি প্রসারণশীল, তাই সেটা লম্বায় ও প্রস্থে দুই দিকেই প্রসারিত হয়। সেজন্য এ ফ্যাব্রিক দিয়ে জিপার ছাড়া বডি ফিটিং কাপড় তৈরি করা যায়। নিট ফ্যাব্রিকের টেক্সচারও খুব নমনীয় এবং তা কিছুটা অসংগঠিতও। তাই এ ফ্যাব্রিকের কাপড়কে যেকোনো আকার দেয়া যায় এবং সবভাবে প্রসারিত করা যায়। আবার যেহেতু ফ্যাব্রিকটি কিছুটা স্থিতিস্থাপক, তাই কুঁচকে যাওয়ার ভয়ও থাকে না। যদি এসব কাপড়কে হাতে নিয়ে আপনি একটি বলের আকার দেন, পরে সেটা আবার ছেড়ে দেন তাহলে আগে যেমনটা ছিল সেটা আবার অনেকটা তেমনই হয়ে যায়। বেশির ভাগ নিট ফ্যাব্রিকই অনেক বেশি নমনীয়। যদি সেটা খুব শক্ত করেও নিট করা হয়, তবু তা কিছুটা কোমল অনুভূত হবে। নিট ফ্যাব্রিকের খুব বেশি যত্ন দরকার হয় না। সেটা হাতেই ধুতে হবে এমন নয়, মেশিনেও ধোয়া যাবে। এ ধরনের ফ্যাব্রিকে আয়রন করারও দরকার হয় না। তবে এটাও ঠিক যে নিট ফ্যাব্রিক ওভেন ফ্যাব্রিকের মতো টেকসই না। নিট ফ্যাব্রিক পোশাক পরার পরে সেটা প্রসারিত হতে শুরু করতে পারে। আর একটি বড় বিষয় হচ্ছে নিট ফ্যাব্রিকের প্রসারিত হওয়ার সক্ষমতা থাকায় সেটা সেলাই করা কঠিন। সেটা হাতে করা হোক বা মেশিনে।

এবার জেনে নেয়া যাক ওভেন ফ্যাব্রিকের আদ্যোপান্ত। দুই সারি সুতা তাঁতের সাহায্যে পরস্পর সমকোণ বন্ধনীর মাধ্যমে যে কাপড় বা ফ্যাব্রিক তৈরি করে তাকে ওভেন ফ্যাব্রিক বলা হয়। শার্ট, ট্রাউজার, শাড়ি, কম্বল, তোয়ালে, চাদর এগুলো ওভেন ফ্যাব্রিক হিসেবে ধরা হয়।

নিট ফ্যাব্রিকের মতোই আলাদা কিছু বিশেষত্ব আছে ওভেন ফ্যাব্রিকেরও, যা দিয়ে এ কাপড়কে সহজে আলাদা করা যায়। ওভেন ফ্যাব্রিক খুবই সংগঠিত হয়। ফ্যাব্রিকের এ ধরন খুব বেশি প্রসারিত হয় না, এমনকি জোরে টানলেও সেটা বেশ স্থিরই থাকে। তবে গঠনটা এমন হওয়ার কারণে এ কাপড়ে খুব সহজে ভাঁজ পড়ে যায়। তাই এ কাপড় ঠিকঠাক রাখার জন্য ইস্ত্রি করা দরকার পড়ে। ওভেন ফ্যাব্রিক নিট ফেব্রিকের মতো নরম হয় না। তবে এটা ঠিক যে এ ফ্যাব্রিক খুব বেশি টেকসই হয়। তাই অনেকবার ধোয়ার পরও সেটা একই রকম থাকে। ওভেন ফ্যাব্রিক সাধারণত প্রসারিত করা যায় না। এতে এটি খুব সহজে সেলাই করা যায়। তবে এভাবে ফ্যাব্রিকগুলো একত্রে সেলাই করতে অনেকটা সময় প্রয়োজন। ফলাফল হিসেবে ওভেন ফ্যাব্রিকের দাম পড়ে যায় বেশি, তাতে সেটা ফ্যাব্রিক হিসেবে কেনেন বা তৈরি পোশাক।

সাধারণত বাজারে আমরা যেসব পোশাক পাই, তার বেশির ভাগ নিট ফ্যাব্রিক বা ওভেন ফ্যাব্রিক থেকে তৈরি। যে পোশাকগুলো নিট কাপড় থেকে তৈরি, সেগুলো নিট পোশাক হিসেবে পরিচিত এবং যে পোশাকগুলো ওভেন কাপড় থেকে তৈরি, সেগুলো ওভেন পোশাক হিসেবে পরিচিত।

নিচে নিট ও ওভেন ফ্যাব্রিকের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা হলো।

নিডলের সাহায্যে লুপ তৈরি করে এবং একটি লুপ আর একটি লুপের সঙ্গে ইন্টারমেশিং করে নিট কাপড় বোনা হয়। অন্যদিকে, ওভেন দুই সেট সুতার ইন্টারলেসমেন্টের মাধ্যমে তৈরি হয়। অর্থাৎ ওয়ার্প ও ওয়েফট সুতার বন্ধনীর মাধ্যমে এ কাপড় তৈরি করা হয়।

নিট ফ্যাব্রিক বাল্কি ও ইলাস্টিক গুণসম্পন্ন হয়। লুপ স্ট্রাকচারের গঠন বাল্কি হওয়ার ফলে এতে খুব সহজে বাতাস প্রবেশ করতে পারে না। অন্যদিকে, ওভেন বুননকৃত কাপড়ে এসব গুণাগুণ থাকে না।

নিটেড ফ্যাব্রিকে কোনো ভাঁজ পড়ে না। অন্যদিকে, বিশেষ ধরনের সুতা ব্যবহারের ফলে ওভেন ফ্যাব্রিকে ভাঁজ পড়ে।

নিটেড ফ্যাব্রিকগুলো ফাউন্ডেশন ও ফিল্টার ক্লথ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। অন্যদিকে, ওভেন ফ্যাব্রিক ফাউন্ডেশন ও ফিল্টার ক্লথ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

নিটেড ফ্যাব্রিক দিয়ে বডি শেপের পোশাক তৈরি করা যায়। অন্যদিকে, ওভেন ফ্যাব্রিক দিয়ে বডি শেপের পোশাক তৈরি করা যায় না। দুই ধরনের ফ্যাব্রিকের পার্থক্যই এর কারণ।

নিট ফ্যাব্রিকের ক্ষেত্রে সুতায় কোনো মাড় দেয়া হয় না। অন্যদিকে, ওভেনের ক্ষেত্রে টানা সুতায় মাড় দেয়া হয়।

নিটিং মেশিনের উৎপাদনক্ষমতা অনেক বেশি। অন্যদিকে, ওভিংয়ের উৎপাদন ক্ষমতা তুলনামূলক কম।

নিটিং ফ্যাব্রিকের একটি সুবিধা হলো এটি আয়রনিং বা ইস্ত্রি করার প্রয়োজন হয় না বললেই চলে। অন্যদিকে, ওভেন ফ্যাব্রিককে আয়রনিং বা ইস্ত্রি করার প্রয়োজন হয় বেশি বেশি।

আবার ওভেন পোশাকের তুলনায় নিট ফ্যাব্রিকের পোশাকগুলো নরম ও আরামদায়ক হয় অনেক বেশি।

এছাড়া তথ্য বলছে, নিটিং ইন্ডাস্ট্রিতে অপচয় কম। অন্যদিকে, ওভিং ইন্ডাস্ট্রিতে অপচয় বেশি।

নিটিংয়ের উৎপাদন খরচ বেশ কম। অন্যদিকে, ওভিংয়ের উৎপাদন খরচ বেশি।

ওভেন কাপড়ের তুলনায় নিটের পোশাকগুলো আরো প্রসারিত হয়।

ওভেন পোশাকগুলো সাধারণত নিট পণ্যের তুলনায় শক্ত।

নিট ও ওভেন কাপড়ের মধ্যে মূল পার্থক্য তৈরি করে সুতা বা থ্রেড, এটি দিয়েই এ দুই ধরনের ফ্যাব্রিক উৎপাদন করা হয়। তারপর সেখানে ভূমিকা রাখে বুননের কৌশল। নিটিং বা ওভিংয়ের মাধ্যমে যে ফ্যাব্রিক তৈরি তা দিয়ে বানানো হয় বিভিন্ন ঘরানার পোশাক।

লেখক: সাংবাদিক