বাংলাদেশের ডেনিম শিল্পের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সহজেই অনুমেয়। সব ধরনের সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে আগামী দিনগুলোয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজকে শক্তিশালী করতে উৎপাদকদের আরো বেশি মনোযোগী হতে হবে। বেশি বেশি ট্রেন্ড বিশ্লেষণ, গবেষণা ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার ক্রমাগত বিকাশ, খরচ সাশ্রয় পদ্ধতি ইত্যাদির মাধ্যমে ডেনিম পণ্যকে বৈচিত্র্যময় ও বহুমুখী করা যেতে পারে। উৎপাদনকারী ও সরকার সমন্বিতভাবে এ শিল্পকে সমর্থন করলে এবং ডেনিম শিল্পের বিকাশকে অগ্রধিকার দিলে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগটি আরো উদ্ভাসিত হবে। 

সাম্প্রতিক সময়ে ডেনিম ও এর বৈচিত্র্যময় পণ্যগুলো বাংলাদেশের টেক্সটাইল রফতানিকারকদের ফ্ল্যাগশিপ ও সর্বাধিক আলোচিত আইটেম হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ সংকট ও ২০২০ সালে এর প্রভাব বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পে পড়া সত্ত্বেও সব প্রতিকূলতাকে পরাজিত করে দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউর বাজারে ডেনিম পণ্যের শীর্ষ সরবরাহকারী হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ডেনিমের বহুমুখিতা এর চাহিদাকে আকাশচুম্বী করেছে। এটি সব বয়সী মানুষের কাছে প্রিয়। প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের পরিসর, পণ্যের গুণগত মান বাংলাদেশকে ডেনিমের বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার পেতে সাহায্য করেছে।

ডেনিমের চাহিদা সারা বছর প্রায় একই থাকে। ঋতু বা ট্রেন্ড অনুযায়ী প্রভাবিত হয় না। শীর্ষ ব্র্যান্ড যেমন এইচঅ্যান্ডএম, সিঅ্যান্ডএ, জেসি পেনি, টেসকো, জারা, লি অ্যান্ড ফাং, কে-মার্ট, টাক্কো, জি-স্টার, ইনডিটেক্স, বেস্টসেলার (অনলি অ্যান্ড সন্স, অনলি, জ্যাক অ্যান্ড জোন্স) ইত্যাদি বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে তাদের ডেনিম সংগ্রহ করছে। অনেক স্থানীয় উৎপাদনকারী এখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ অত্যাধুনিক ডিজাইন স্টুডিও তৈরি করেছে। তাদের পণ্যের মূল্য সংযোজন করেছে, যা এ খাতকে উন্নত করতে সাহায্য করবে।

বিশ্ব ডেনিমবাজার পরিস্থিতি ও বাংলাদেশ

বিশ্ব ধীরে ধীরে কভিড-১৯ সংকট কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউতে খুচরা বিক্রয় বেড়েছে। সে চিত্র আমাদের রফতানি বৃদ্ধির তথ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। ইউরোপে প্রতি তিনজনের একজন বাংলাদেশের ডেনিম পণ্য পরেন। প্রতিযোগিতামূলক মূল্যসীমায় মানসম্পন্ন পণ্যের কারণে ইইউভুক্ত দেশগুলোয় ডেনিম সরবরাহে বাংলাদেশ এরই মধ্যে চীনকে ছাড়িয়ে গেছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্যানুসারে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ইইউতে জিন্সের পোশাকের বৃহত্তম রফতানিকারক হয়েছে এবং ১৩১ কোটি ইউরো আয় করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটিইএক্সএ)’ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ২০২১ সালের বাণিজ্য তথ্য প্রকাশ করেছে। তারা জানায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে ৭৯৮ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ডেনিম পোশাক আমদানি করেছে, যা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ আমদানি। বাংলাদেশ আগের বছরের তুলনায় এ বছরে ৪২ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লাভ করেছে। বাংলাদেশের বাজারের অংশীদারত্ব ২০২০ সালের ২০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২১ সালে ২১ দশমিক ৬৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। গত ১০ বছরে (২০১১-২১) বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির পরিমাণ বার্ষিক ৪ দশমিক ৭১ শতাংশ হারে বেড়েছে। অন্যদিকে অন্যান্য দেশ থেকে তাদের আমদানির মূল্য বার্ষিক দশমিক ৪৯ শতাংশ হাড়ে বেড়েছে। 

বাংলাদেশের পর দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মেক্সিকো। যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির বাজারের অংশীদারত্ব ২০২০ সালের ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ১৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ হয়েছে। দেশটি ২০২১ সালে ৬৫ কোটি ৪৮ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের ডেনিম রফতানি করেছে। 

তৃতীয় অবস্থানে আছে ভিয়েতনাম। দেশটির রফতানি ২০২১ সালে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ কোটি ১৪ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ভিয়েতনামের বাজার শেয়ার ২০২১ সালে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে নেমে ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশে এসেছে। উৎপাদন খাতের সক্ষমতা এই সেক্টরের প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে। 

পাকিস্তানের রফতানির পরিমাণ ২০২০ সালে ছিল ৯ শতাং, যা ২০২১ সালের শেষে গিয়ে দাড়াঁয় ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশে। তাদের রফতানির পরিমাণ ৩৮ কোটি ৯৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার। 

চারটি দেশের পর পঞ্চম অবস্থানে আছে চীন। ২০২১ সালে ১৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ বৃদ্ধি নিয়ে ৩৮ কোটি ৭৯ লাখ ১০ হাজার ডলার নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু এর বাজার শেয়ার ২০২০ সালের ১১ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২১ সালে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশে নেমে আসে। 

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) দেশভিত্তিক আরএমজি রফতানির তথ্য প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ৪২০ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করেছে এবং ২০২১ সালের একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রফতানি আয় ছিল ২৯০ কোটি ডলার। 

বাংলাদেশের জন্য সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

ডেনিমের নিত্য চাহিদা বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক বাজারে বিকাশ ও টিকে থাকার বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে। বিশ্বে মোট ডেনিম উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৭০০ কোটি মিটার। ৭০ শতাংশ ডেনিম উৎপাদন হয় এশিয়ায়। চীনা পোশাক প্রস্তুতকারক শিল্প বেসিক ডেনিম উৎপাদন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে পথ দিচ্ছে এবং সহজেই বাংলাদেশ সে চাহিদা পূরণ করতে পারে। মানের ওপর ফোকাস করা, ইন-হাউজ ডিজাইন স্টুডিও তৈরি করা, মূল্য সংযোজন, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলোকে আকৃষ্ট করেছে এবং আমাদের ডেনিমকে তাদের কাছে আরো জনপ্রিয় করেছে। তবে এগুলো ছাড়াও আমাদের টেকসই বিষয়গুলোর ওপর জোর দেয়া উচিত। এছাড়া আমাদের শিল্পে চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে নজর রাখা উচিত। বিশ্বব্যাপী নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই ডেনিম পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ নিয়মিত ডেনিম পণ্য পরিধান করে, ভোক্তা যেকোনো সময়ে গড়ে সাতটি ডেনিম পণ্যের মালিক। যুক্তরাজ্যে প্রতিটি গ্রাহক গড়ে ১৭টি ডেনিম পোশাকের মালিক। বিশ্বব্যাপী বার্ষিক ২১০ কোটি পিস ডেনিম বিক্রি হয়।

আমাদের দেশের ডেনিম প্রস্তুতকারকদের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন প্রথাগত মানসিকতার মধ্যে থাকা, ডেনিম উৎপাদনের আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ না করা, কম দামের প্রস্তাব এবং আলোচনার দক্ষতার অভাব, পণ্যে কম গবেষণা ও উদ্ভাবন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দক্ষতায় কম ফোকাস, শিপমেন্টে বিলম্ব, ৫০ শতাংশ ডেনিম ফ্যাব্রিক আমদানি করা, পণ্যের উন্নয়নে মনোযোগের অভাব এবং প্রচারমূলক কৌশল ইত্যাদি। অল্প সময়ের মধ্যে, বিশ্বব্যাপী খুচরা বিক্রেতা ও ব্র্যান্ডের কাছে নতুন বিনিয়োগ এবং ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য বাংলাদেশ নিজের স্থান তৈরি করে নিয়েছে। যার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজারে নেতৃত্ব নিয়ে ডেনিমের একটি শক্তিশালী প্রস্তুতকারক হিসেবে বাংলাদেশ নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। 

অল্প সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী প্রস্তুতকারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর পেছনে বিশ্বব্যাপী খুচরা বিক্রেতা ও ব্র্যান্ডের কাছে নতুন বিনিয়োগ ও ব্র্যান্ডিং অন্যতম ভূমিকা পালন করেছে। 

বাংলাদেশ ডেনিম পণ্যের পছন্দের সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে থাকবে বলে এই সেক্টরে জড়িত মানুষ ও অর্থনীতিবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন। কারণ দেশটি উৎপাদন ক্ষমতা উন্নত করেছে এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে। এছাড়া স্থানীয় নির্মাতাদের নিজস্ব ওয়াশিং সুবিধা রয়েছে এবং ডিজাইনের জন্য স্টুডিও তৈরি করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ডেনিম বাজারে আমাদের আধিপত্য আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে।

ডেনিম জিন্সের বৈশ্বিক বাজার ২০২২ সালে ৬ হাজার ৪৫০ কোটি ডলার অনুমান করা হয়েছিল এবং বার্ষিক ৪ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বেড়ে তা ২০২৬ সালের মধ্যে ৭ হাজার ৬১০ কোটি ডলার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৪০টি ডেনিম কাপড় তৈরির কারখানা রয়েছে।

২০২১ সাল পর্যন্ত সেক্টরটিতে ১৫০ কোটি ডলার বিনোয়োগ হয়েছে এবং ডেনিম ফ্যাব্রিকের বার্ষিক চাহিদা ৮০ কোটি ইয়ার্ডের বিপরীতে এ খাতের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৪৪ কোটি ৩০ লাখ ইয়ার্ডে দাঁড়িয়েছে।

মূল ইংরেজি থেকে অনুবাদ: ফারিন জাহান সিগমা