গত দুই দশকে ২০০১-২২ পর্যন্ত বাংলাদেশে কার্ডিওলজি ও কার্ডিয়াক সার্জারিতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ও সাফল্য এসেছে। এ উন্নয়ন, সাফল্য ও মানুষের আস্থা অর্জনের পেছনে আমাদের কার্ডিওলজিস্ট ও কার্ডিয়াক সার্জন, সাপোর্টিভ নার্স, টেকনিশিয়ান, হাসপাতাল, ম্যানেজমেন্ট, সরকারি-বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে এ সফলতা এসেছে। আমরা যখন কার্ডিয়াক সার্জারিতে পড়াশোনা করার সিদ্ধান্ত নিই, তখন একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট। এখানেই কার্ডিয়াক সার্জারিতে এমএস করানো হতো। পরবর্তী সময়ে সেখানে ট্রেনিং নিয়ে এবং দেশ-বিদেশে ট্রেনিং নিয়ে আমরা পরে কার্ডিয়াক সার্জারি শুরু করি। প্রথমদিকে কার্ডিয়াক সার্জারিতে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না। পরে এ দেশের ডাক্তাররা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিং নেয়ার চেষ্টা করেন। যার যার মেধা-মনন ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় কার্ডিয়াক সার্জারিতে সফলতা নিয়ে আসছেন। হাতেগোনা কিছু সার্জন আছে যারা জনগণের আস্থা অর্জন করছেন এবং সবাই আমরা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নামিদামি অভিজ্ঞ সার্জনের সঙ্গে কাজ করেছি। আমাদের শ্রম-মেধা ও জনগণের প্রতি আমাদের যে কমিটমেন্ট তা যোগ করে এসব এনেছি। কার্ডিয়াক সার্জারি প্রথমদিকে ততটা স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না। এ দেশের ডাক্তাররা ভারত ও সিঙ্গাপুরের সার্জনদের কাছে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। আরো ইউরোপিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করেছেন। পরে শিকদার মেডিকেলে কাজ করার পর ২০০৪ সালে ল্যাবএইডে শিফট করলাম আমি। এখান থেকে আসার পর ল্যাবএইডে শুরু থেকে যে বাইপাস সার্জারি, পরবর্তী সময়ে বিটিং হাট বাইপাস সার্জারি, টোটাল আর্টারি বাইপাস সার্জারি, এভাবেই আমার বাইপাস সার্জারি স্ট্যান্ডার্ড হয়ে গেছে। বুকের আর্টারিতে বাইপাস করলে বাইপাস কোনোদিন বন্ধ হবে না। এটা একটা ভ্যাকসিন দেয়ার মতো। এসব সার্জারির ক্ষেত্রে আমাদের পার্মানেন্ট আউটকামের কথা চিন্তা করা উচিত। রোগী যেন একই রোগে ঘুরে না বেড়ায়। যেমন রোগী রিং লাগাল ২-৩টা। এটা যদি আবার ব্লক হয়, সেক্ষেত্রে আবার এনজিওগ্রাম করে, তাহলে আবার বাইপাস করানো। যেগুলোয় বাইপাস সার্জারি স্ট্যান্ডার্ড, ডায়াবেটিক পেশেন্ট, হাইপারট্যান্সি পেশেন্ট, সেগুলোর ক্ষেত্রে আমাকে চিন্তা করতে হবে, একবার চিকিৎসাই যেন পার্মানেন্ট হয়। সেটার জন্য দীর্ঘমেয়াদি যেন ভালো থাকে তার জন্য টোটাল আর্টেল বাইপাস সার্জারি, বিটিং হার্ট সার্জারিতে বেশি টাইম লাগে না, কারণ হয়তো এক প্যাকেট ব্লাড স্ট্যান্ড বাই রাখি। অল্প সময়ে দুই আড়াই ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায়। এই যে কার্ডিয়াক সার্জারিকে সাধারণ সার্জারিতে রূপান্তর করা, এটা হলো আমার আর আমার টিমের একটা অবদান। বাংলাদেশে বিটিং হার্ট সার্জারির পেছনে আমার অনেক অবদান। পাশাপাশি হার্ট সার্জারির পর হার্টের পর্দা ফেটে গেছে বা ড্যামেজ হয়ে গেছে, সেগুলো রিপেয়ার করা বা ভালভ রিপেয়ার করা, সব মিলেয় অন্যান্য যে জন্মগত সমস্যার সমাধান এখন দেশেই সম্ভব। এগুলো আমাদের ডাক্তারদের অ্যাচিভমেন্ট ও সন্তুষ্টির জায়গা। আমি বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষের কাছে বার্তা দিতে চাই, কার্ডিয়াক সার্জারি এবং কার্ডিয়াক মেডিসিনে আমরা যেন বাইরের দেশে না যাই এবং বাংলাদেশে অনেক আস্থার সহকারে আপনারা এ কার্ডিয়াক ট্রিটমেন্ট নিতে পারবেন।

যদি পার্শ্ববর্তী উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে বাংলাদেশে কিছুটা সেফটি মার্জিন আনতে পেরেছি। সেফটির দিক থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ বাংলাদেশ কভার করতে পারে, কিন্তু আরো টপ লেভেলে ফাইন টিউনিং, আরো কমপ্লিকেটেড ডিফারেন্ট কেস যদি আমরা সব সেন্টারে করতে চাই, তাহলে সেন্টারগুলোয় আরো অনেক ইনভেস্ট করতে হবে। ইনভেস্ট, ইনস্ট্রুমেন্টাল, ইকিউমেন্টাল, ম্যানপাওয়ার, ট্রেনিং একসঙ্গে বিদেশের সঙ্গে আমাদের একটা কানেকশন দরকার। বিদেশের দক্ষ সার্জনদের আনতে হবে দেশে। সেক্ষেত্রে যে খরচ হয় তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বহন করতে হবে। আমাদের মেশিনারিজের অভাব রয়েছে, পাশাপাশি দক্ষ জনবলেরও অভাব। আমাদের দেশের ছেলেরা সবাই মেধাবী। ভারতীয় বা বাংলাদেশী ডাক্তারদের মধ্যে কোনো পার্থক্য পাবেন না। শুধু আমাদের ট্রেনিংয়ের অভাব এবং দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগের অভাব। আমাদের একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে হবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে একসঙ্গে সব ডাক্তার কাজ করেন। উন্নত দেশগুলোতে মাল্টিন্যাশনাল সেন্টার আছে, কিন্তু আমাদের দেশে কোনো মাল্টিন্যাশনাল সেন্টার নেই। ভবিষ্যতে এধরনের সেন্টার হলে হৃৎরোগ চিকিৎসায় আমূল পরিবর্তন আসবে।

ডা. লুৎফর রহমান, চিফ কার্ডিয়াক সার্জন