বাংলাদেশের সার্বিক চিকিৎসা ও চিকিৎসাসেবার প্রেক্ষাপটে হৃদরোগ ব্যাপারটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশে ইদানীং হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল বা সেবা তৈরি হয়েছে। এনাম মেডিকেল কলেজে সব ধরনের চিকিৎসা আছে, বিশেষ করে হৃদরোগের সব চিকিৎসা এ হাসপাতালে দেয়া হয়।
যখন আমরা বিশেষায়িত হাসপাতালে হৃদরোগের চিকিৎসা দেয়া শুরু করি, তখন থেকেই আমি এর সঙ্গে জড়িত এবং বিভিন্ন হাসপাতালে কাজ করেছি। পর্যায়ক্রমে আমরা বিভিন্ন হৃদরোগের সেবা দিতে শুরু করেছি। আজকে আমাদের দেশে হৃদরোগের চিকিৎসা দেয়ার অনেক ধরনের সুবিধা আছে, বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা দেয়া হয়। সর্বশেষ যে টেকনোলজি এসেছে, অপারেশন না করে ভালভের চিকিৎসা করা এটাও বাংলাদেশে রয়েছে। আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এটা একটা বিরাট বিষয়। সেটা সম্ভব হয়েছে সেই আশির দশক থেকে, নতুন নতুন যেসব হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ তৈরি হয়েছে তাদের ডেডিকেশনের জন্য। শুরুর দিকে আমরা তেমন ফ্যাসিলিটিজ বা বিশেষায়িত কোনো হাসপাতাল পাইনি, এখন পাচ্ছি। যে কারণে আমাদের কর্মপরিধিটা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এনাম মেডিকেল কলেজে হৃদরোগের চিকিৎসা শুরু করার পর আমরা ধীরে ধীরে উন্নত চিকিৎসা ও আধুনিক চিকিৎসা দেয়া শুরু করেছি। আমাদের এখানে ক্যাথল্যাব আছে, সেই ক্যাথল্যাবে উন্নতমানের চিকিৎসা দেয়ার জন্য নতুন যন্ত্রপাতি আছে। হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিউর এগুলোর জন্য হঠাৎ করে রোগী অসুস্থ হয়ে পড়লে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, আমরা সেগুলো দিতে পারি। এখানে হার্ট অ্যাটাকের রোগীর প্রাথমিক বা সবচেয়ে আধুনিক চিকিৎসা যেটা প্রাইমারি পিসিআই বলা হয় অর্থাৎ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে তাৎক্ষণিক ক্যাথল্যাবে নিয়ে গিয়ে যেখানে রক্তনালির ব্লকের কারণে হার্ট অ্যাটাকটা হয়েছে, সেটা খুলে দিয়ে রক্ত চলাচল সচল করা হয়। এটা হৃদরোগের সর্বাধুনিক চিকিৎসা। তবে সেটা সবার ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। এর পেছনে অর্থনৈতিক কারণও আছে সামাজিক কারণও আছে। যারা খরচ বহন করতে পারে তাদের আমরা এ সেবাটা দিতে পারি। বাকিদের আমরা ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা দিই। ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা দেয়ার পরবর্তী পর্যায়ে যেসব চিকিৎসা লাগে সেগুলো আমরা দিয়ে থাকি। এছাড়া জন্মগত হৃদরোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ব্যবস্থা আমাদের আছে। বহির্বিভাগে আমাদের সব ধরনের রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা আছে। ইদানীং আমাদের এখানে নিউক্লিয়ার মেডিসিনও সংযুক্ত করা হয়েছে, যা রোগ বা রোগের মাত্রা নির্ণয়ের অত্যাধুনিক পদ্ধতি। ফলে আমাদের চিকিৎসার সুযোগটা আরো বেড়েছে। বহির্বিভাগের রোগীদের জন্য সাধারণ বুকব্যথা থেকে রক্তচাপ, হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হওয়া, জন্মগত হৃদরোগ নির্ণয়, ভালভের সমস্যা নির্ণয়ের জন্য কার্ডিওগ্রাম, ওটিটি এসবের ব্যবস্থা আছে। যার কারণে আমাদের এখানে রোগ নির্ণয়ের পূর্ণাঙ্গ সেবা দিতে পারি।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে অপারেশনের আগ পর্যন্ত যা যা প্রয়োজন আমরা সবই দিয়ে থাকি, অপারেশনের ক্ষেত্রে আমরা অন্য বিভাগে পাঠিয়ে দিয়ে থাকি। সাভার ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যারা চিকিৎসা নিতে আসেন, তাদের কাছে এ হাসপাতালের গ্রহণযোগ্যতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। আমাদের বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যাও এখন প্রচুর। আমরা মনে করছি, আমাদের সেবাটা তারা পছন্দ করছেন, তাই তারা আসছেন। সে পরিপ্রেক্ষিতে আমরা নতুন নতুন চিকিৎসা ও নতুন নতুন রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।
যেখানে সব ধরনের চিকিৎসা আছে, সেখানে দক্ষ জনবল তৈরির একটা সুযোগ থাকে। আমাদের বিভাগীয় মেডিকেল কলেজগুলোর বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে হৃদরোগের বিভাগ আছে। সেখানে ক্যাথল্যাব বা অন্য আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা রয়েছে। পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণ বা শিক্ষা রয়েছে। টারশিয়ারি লেভেলে আছে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ ইউনিভার্সিটি, তাদের সেখানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হচ্ছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ তৈরি হচ্ছে, সর্বোচ্চ বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি এমডি বা এমএস দেয়া যাচ্ছে। এসব জায়গায় কাজ করার জন্য শুধু ডাক্তার হলে হয় না, টেকনিশিয়ানেরও দরকার হয়। বিশেষায়িত নার্সের সেবার দরকার হয়। তাদের জন্য সরকারি পর্যায়ে যেমন নার্সিং ইনস্টিটিউট হচ্ছে, বেসরকারি পর্যায়েও শুরু হয়েছে। যেমন এনাম নার্সিং কলেজ। আমাদের যে জিনিসগুলোর অভাব ছিল, তা হলো বিশেষায়িত নার্সিং সেবা ও বিশেষায়িত টেকনিশিয়ান। বিশেষায়িত টেকনিশিয়ান ছাড়া আমাদের যেসব যন্ত্রপাতি আছে তা চালানো সম্ভব নয়। তবে সবকিছুর চিকিৎসা দেয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা যে চিকিৎসা দিই, একটা পর্যায়ে গিয়ে সেগুলো কাজ করে না। এগুলোর বাইরে আর কীভাবে রোগীর কষ্ট উপশম করা যেতে পারে, সেগুলো চিন্তা করতে হবে। এসব ক্ষেত্রেও দক্ষ জনবল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যেমন ফিজিক্যাল মেডিসিন, পেলিয়েটিভ কেয়ার ইত্যাদি তৈরি করতে হবে।
অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দীন আহম্মদ, বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ





