পৃথিবীতে যত মৃত্যু ঘটে তাদের মেজর অংশই হয় কার্ডিওভাসকুলারের কারণে। কার্ডিওভাসকুলার বলতে হার্ট ডিজিজ, হাইপারটেনশন, স্ট্রোক এগুলোকে একত্রে বলা হয়। ১০০ জনের মধ্যে হিসাব করলে তার মধ্যে মেজরিটি হচ্ছে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজজনিত মৃত্যু। এটি একটি সারা পৃথিবীর সমস্যা। একইভাবে এটি বাংলাদেশের জন্যও মেজর সমস্যা। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষেত্রে মানুষের যে জেনেটিকস, যে জীবনযাত্রা, যে খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি বহুমুখী কারণে আমাদের কার্ডিওভাসকুলার বা অন্যান্য যে রোগ পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার চেয়ে প্রকোপ অনেক বেশি। আমাদের হার্টের যে রক্তনালি আছে, আমাদের ব্রেইনের যে রক্তনালি আছে তা পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার বিশেষত্ব থেকে ভিন্ন। এটার কারণ অনেক। সেগুলোর জন্য অনেক গবেষণার দরকার। একসময় বাংলাদেশে কার্ডিওভাসকুলার রোগের চিকিৎসা প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। স্বাধীনতার পরে প্রথম যখন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট যখন তৈরি হয়, তখন এটি একটি বোঝা ছিল।

ক্রমান্বয়ে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। এবং সারা দেশে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজের চিকিৎসার বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। ২০০০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে কার্ডিওভাসকুলার রোগের প্যাটার্ন অন্য রকম ছিল, তখন বাতজ্বরজনিত ভালবিউলার ডিজিজের প্রকোপ বেশি ছিল। কিন্তু বাতজ্বর নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধের ফলে ধীরে ধীরে বাতজ্বরজনিত ভালবিউলার যে সমস্যা বা হৃদরোগের যে সমস্যা সেটা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। বাতজ্বরজনিত যে হৃদরোগের সমস্যা সেটা অনেকাংশে এখন কমে আসছে। কিন্তু রক্তনালিজনিত বা হার্টে যে ব্লকজনিত সমস্যা, সেটা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। একসময় হার্টের ব্লক বা হৃদরোগজনিত চিকিৎসা বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, কিন্তু ২০০০ বা তার পরবর্তী সময় থেকে চিকিৎসার ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। একসময় হৃদরোগে ব্লক হওয়া মাত্রই বিদেশ যাত্রা এবং বিদেশে গিয়ে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হওয়া। সেটা আর্থিক, পারিবারিক, মানসিক নানা ধরনের সমস্যা হতো। এখন শুধু  রাজধানী নয়, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শহরে হৃদরোগের আধুনিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।


এখন বিশেষ করে বাংলাদেশে প্রাইভেট সেক্টর এগিয়ে আসায় এ হৃদরোগ চিকিৎসার বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে। একসময় বাংলাদেশে কার্ডিয়াক সার্জারি বা ওপেন হার্ট সার্জারির কথা চিন্তাই করা যেত না। এখন এটি অত্যন্ত বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি বিশ্বমানের চিকিৎসায় পরিবর্তন হচ্ছে। সংখ্যা ও গুণ বিচারে এটি এখন একটি বিশ্বমানের পর্যায়ে। অন্যান্য রোগের বা ডিসিপ্লেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ হয়তো অনেকখানি পিছিয়ে। বিশেষ করে ক্যান্সার চিকিৎসায়। কিন্তু হৃদরোগের ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি অনেক উন্নত পর্যায়ে আছে এ দেশ। কিন্তু তাও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। সেগুলো হলো জনসচেতনতার অভাব। এখনো মানুষ হার্টের রোগ হলে ঘরে বসে থাকে, গ্যাসের চিকিৎসা করে, ভুল চিকিৎসা করে, ভুল জায়গায় যায়, যার কারণে রোগের যে ভোগান্তি বা হৃদরোগের জটিলতার এখনো সম্মুখীন হচ্ছে।

এখানে মিডিয়াসহ অন্যান্য সব মাধ্যমের সাংবাদিকদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। মানুষকে সচেতন করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। এখন যেকোনো সময় মানুষের বুকে ব্যথা হয়, শ্বাসকষ্ট হয় সেটি যে হার্টের ব্যথা নয়, তা আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে। তাই আপনাকে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ বা আশপাশে জরুরি বিভাগ থাকলে সেখানে গিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিশ্চিত হতে হবে আপনার হৃদরোগের সমস্যা আছে কিনা। এটা আসলে সচেতনতার একটা অভাব। আরেকটা হলো ইনফ্রাস্ট্রাকচার। বিশাল জনসংখ্যার দেশে শুধু প্রাইভেট সেক্টর এটাকে সামাল দিতে পারবে না। এখানে সরকারি পর্যায়ের যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আছে, সেটাকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশের জেলা পর্যায়ে হৃদরোগের ওপর বিশেষায়িত হাসপাতাল করা প্রয়োজন। এটা করার ক্ষেত্রে কোনো ইনফ্রাস্ট্রাকচার বানালে চলবে না, দক্ষ শ্রমশক্তি বা জনবল দরকার। সেখানে সবাই প্রশিক্ষিত হতে হবে। সেখানে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক থাকা লাগবে, দক্ষ নার্স থাকা লাগবে। এছাড়া অন্যান্য প্যারামেডিক যারা আছে তাদেরও প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। যদি জনসংখ্যা, ইনফ্রাস্ট্রাকচার আর সচেতনতা তিনটির সমন্বয় করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশে হৃদরোগের চিকিৎসা তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

ডা. মাহবুবুর রহমান, সিনিয়র কনসালট্যান্ট, কার্ডিওলজি