আমরা দুজনেই পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলাম। উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। মাস্টার্স করার পর শিক্ষকতা করেছেন। আমিও সেখানে শিক্ষকতা করেছি। তিনিও সিভিল সার্ভিসে গেছেন, আমিও। উনি সিভিল সার্ভিসে আমার তুলনায় পাঁচ বছরের সিনিয়র। সরকারের বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন। মানুষ হিসেবে নম্র ও ভদ্র। পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হলেন। তখন ওনাকে যেকোনো কারণে যখনই ফোন করতাম সময় দিতেন। অর্থনীতি ও নীতি সম্পর্কে যোগাযোগ করলেও সময় পেতাম তার কাছে। এমনকি একটা প্রস্তাব এনেছিলাম ওনার সামনে, তিনি সেটা কার্যকর করেছিলেন। কোনো প্রকার অহমিকাহীন অত্যন্ত জ্ঞানী ও গুণী মানুষ। যদিও উনি খুব একটা প্রকাশ করেন না।  

অর্থনৈতিক বিষয়াবলি নিয়ে তার পরিষ্কার ধারণা আছে। যেকোনো বিষয়ে তার মতামত ছিল সবসময় ভারসাম্যপূর্ণ। যখন দেখতেন নীতি ঠিক হচ্ছে না, তিনি তার সমালোচনা করতেন। আবার যখন দেখতেন কোনো সুযোগ রয়েছে দেশের অর্থনীতির জন্য, সেক্ষেত্রেও তিনি সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। তার সঙ্গে গভীর পরিচয় হয় বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে। আমরা দুজনেই বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করি। পিএইচডি শেষ করে তিনি খুব সম্ভবত ১৯৮০ সালে বের হন। সেখানে আমি করি ১৯৮৪ সালে। উনি একটা বিষয় নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। সেটা হলো টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিকে রফতানিমুখী করা নিয়ে গবেষণা করেন। গবেষণা করে থিসিস রিপোর্ট হয়। শেষ ধাপে একই ধারায় রিসার্চ করে এগোলাম আমি। রফতানির পলিসি কী হতে পারে, কী করা উচিত এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনা কোথায়, সেটা তুলে ধরলাম। গার্মেন্টস যে আমাদের প্রধান রফতানি হবে, এটা আমরা বুঝতে পারিনি। আমাদের তুলা ছিল না। পাকিস্তান কিংবা ভারতের মতো ছিল না টেক্সটাইল খাত। কিন্তু দেখা গেল আমরা পাকিস্তান ও ভারতকে ছাপিয়ে গেলাম। যা-ই হোক সে রিসার্চের শেষ ধাপে আমি ছিলাম। 

বেশ কিছুদিন আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছিলাম। দেশে ফিরে তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হলো বাণিজ্য নীতি নিয়ে। কিছুদিন পরেই উনি চলে গেলেন এসক্যাপে। প্রথমে ছিলেন ব্যাংককে পরে নিউইয়র্কে ওনার ট্রান্সফার হলো। নিউইয়র্কে থাকার পরেই উনি অবসর গ্রহণ করলেন। তারপর দেশে এসে প্রায়ই কমেন্টারি করেন মিডিয়ায়। হয়তো বয়সের কারণে এখন একটু কম হচ্ছে। কিন্তু তারপরও অর্থনীতি নিয়ে তিনি মতামত দেন। 

আমি মনে করি, আমাদের দেশের অর্থনীতিবিদদের নিয়ে তালিকা করলে প্রথম পাঁচজনের একজন হবেন উনি। সামষ্টিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য নীতির ওপর তার ভালো দখল আছে। কেবল দুই বছর তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন সরকারে। সামষ্টিক অর্থনীতি, বাণিজ্য নীতির সংস্কার এবং বাজেটের ক্ষেত্রে সাফল্যের প্রমাণ দিয়েছেন। বেশকিছু সংস্কার হয়েছিল সে সময়। এখন তো ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে পড়াচ্ছেন। নিঃসন্দেহে তার ছাত্ররা অনেক কিছুই শিখতে পারছে। অনেক জটিল কিছুকে সহজভাবে হাজির করতে পারেন ছাত্রদের সামনে। যতদিন কাজে থাকবেন, ছাত্রছাত্রীরাই উপকৃত হবে। নীতিনির্ধারকরাও তার কথা শুনলে উপায় খুঁজে পাবেন। এক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ। সিভিল সার্ভিস কীভাবে কাজ করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়—এ ব্যাপারে তার ধারণা স্পষ্ট। শুধু ভালো নীতি না, নীতিকে বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে কী কৌশল হতে পারে, সেক্ষেত্রেও ধারণা প্রকট। খুব স্বচ্ছ মানুষ। আমরা সাধারণত অনেক কিছু জটিল করে ফেলি। উনি খুব ভালো চিন্তা করতে পারেন। সমস্যার সমাধানগুলো ভালো পাওয়া যায় তার থেকে।

যে দুই বছর তিনি অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন, তখন সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা ছিল খুবই পরিষ্কার। সঠিক নির্দেশনা তিনি দিতে পেরেছেন। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ ছিলেন ওনার ব্যাচমেট। তার ওপর যথেষ্ট আস্থা রাখতেন। প্রধান উপদেষ্টা জানতেন তার মেধা সম্পর্কে। জানতেন অর্থনীতি নিয়ে তার উচ্চমাত্রার গবেষণা রয়েছে। তখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে সমস্যা হয়নি। অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য ছিল। উনি একটা স্থিতিশীল অবস্থা রেখে গেছেন, যার কারণে পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লিগ সরকার এ থেকে উপকার পেয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য জরুরি। ২০১০ সালের পর থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক বেড়েছে। এক্ষেত্রে স্বীকার করতে হবে ওনার দুই বছরের অবদানকে। তিনি দুই-তিনটা বাজেট পেশ করেছেন। বাজেটের গুণগত মান অন্য বাজেটের তুলনায় ভালো। বাজেটের লেখা কিংবা বিষয়বস্তু বা বিশ্লেষণ অনেক ভালো। তিনি খুব বেশি প্রচারমুখী মানুষ না। কিন্তু তার অবদান অনেক। খুব সাদাসিধে মানুষ তিনি, একজন আদর্শ ব্যক্তি। আমার সরাসরি শিক্ষক না হলেও বুঝতে পারি তাকে পেলে আরো ভালো হতো। যদিও পেশাগত জীবনে তার সাহচর্য পেয়েছি।

উনি গভীর মানুষ। আমি যখন বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে ঢুকি, উনি তখন শেষ ধাপে আছেন। উনি বোধ হয় আরো বছর খানেক ছিলেন। উনি তখন খুব ব্যস্ত। থিসিস লেখা ও ডিফেন্স করা নিয়ে। আমার তাকে খুব বেশি আড্ডা দেয়া মানুষ বলে মনে হয়নি। খুব কম কথা বলেন। কিন্তু সে কম কথার মধ্য দিয়েই অনেক জটিল কিছু তুলে ধরতে পারেন অনায়াসে। গভীরতা থাকে তার বক্তব্যে। সেই অর্থে আমি হাসিঠাট্টা করার সুযোগ পাইনি।

ব্যক্তি, আমলা ও অর্থনীতিবিদ হিসেবে তাকে স্মরণ করবে বাংলাদেশ। তিনটি ক্ষেত্রেই তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো খুব বেশি বইপত্র লেখেননি। কিন্তু তার কাজকর্মে ছড়িয়ে আছে মেধার ছাপ। সরকারি কাজে ছিলেন এবং দুই বছরের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যারাই তার সঙ্গে কাজ করেছেন, তারা সবাই স্বীকার করেন তার মেধা ও ব্যক্তিত্ব। উনি সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন। স্পষ্ট করে দিতেন এটা-ওটা করার জন্য। কাউকে দ্বিধার মধ্যে রাখতেন না। যখন বাজেট নিয়ে আলোচনা করতেন, তা স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দিতেন। সে মুহূর্তে কী করণীয় ও কী করণীয় নয় সেটা তুলে ধরতেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ই তিনি সফলতার প্রমাণ দিয়েছেন। কিছু উদাহরণ তৈরি করে গেছেন যেটা ভবিষ্যতে স্মরণ করা হবে।

তাকে আমি একজন ঘনিষ্ঠ পরামর্শক হিসেবে পেয়েছি। আমার অর্থনৈতিক চিন্তা ও বাণিজ্য নীতি উনি সমর্থন করেন। বেশকিছু বক্তব্যে আমাদের ঐকমত্য রয়েছে। বাণিজ্য নীতি নিয়ে দেয়া আমার বক্তব্যগুলোর সঙ্গে তিনি একমত। আমরা যখনই আলাপ করেছি, উনি দ্বিমত করেননি। আমরা যে রিসার্চ করেছি, তাতে পেয়েছি তার সমর্থন। অর্থনীতির নীতিগুলো খুব ভালো বোঝেন তিনি। আমার বাণিজ্য উদারীকরণ ও শুল্কবিষয়ক যে নীতি, সেখানে ওনার যে সমর্থন, সেটা একটা বড় পাওনা। কেবল একই জায়গা থেকে পিএইচডি করিনি, একই বিষয় নিয়ে পিএইচডি করেছি। সে জায়গা থেকে দুজনের যোগসূত্র আছে। তার থেকে অনেক কিছু শিখেছি, যা কাজে লাগাতে পেরেছি পরবর্তী জীবনে।

ড. জাইদী সাত্তার: চেয়ারম্যান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)