সবুজে ঘেরা নান্দনিক এক কারখানা ভবন। নানা প্রজাতির গাছগাছালিতে ছেয়ে আছে পুরো ফ্যাক্টরি। ছাদবাগানে গাছের ফাঁকে ফাঁকে বসার জন্য আছে ছোট ছোট বেঞ্চ। সেগুলোতেও শিল্পীর রংতুলির ছোঁয়া। দুপুরের বিরতিতে প্রাকৃতিক পরিবেশে খাবার খেতে খেতে সবুজের বুকে পানির ফোয়ারা আর পদ্মফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করেন কর্মীরা। শতভাগ রফতানিনির্ভর কারুপণ্য রংপুর লিমিটেডের কারখানাটিতে শতরঞ্জি তৈরি করেন প্রায় আট হাজার শ্রমিক। তাদের ৯০ ভাগই নারী। 

রংপুর শহরের রবার্টসনগঞ্জে সবুজের সান্নিধ্য গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল কারখানাটি। স্থাপত্যকলার দৃষ্টিনন্দন উপস্থাপনা থাকলেও নেই কোনো এসি বা ফ্যান। তবু স্বস্তি নিয়ে কাজ করছেন কর্মীরা। তৈরি করছেন রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি। প্রাকৃতিক ও নবায়নকৃত কাঁচামাল যেমন কটন মিলের তুলা, গার্মেন্টসের বর্জ্য ঝুট, পাটের আঁশ ব্যবহার করে দেশীয় এ পণ্য বুনে চলেছেন তারা। রংপুর ছাড়িয়ে এটি রফতানি হচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের ৫৫টি দেশে। দেশের মোট হস্তশিল্প রফতানির ৮০ শতাংশই যায় এ প্রতিষ্ঠান থেকে। 

এ সফলতার নেপথ্যের মানুষটির নাম সফিকুল আলম সেলিম। ১৯৯১ সালে যে স্বপ্নের বীজ তিনি বুনেছেন তা আজ এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর জাতীয় রফতানি ট্রফি (গোল্ড) অর্জন করে আসছে কারুপণ্য। স্বীকৃতি লাভ করেছে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে। 

কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড একটি লিড-প্লাটিনাম সনদপ্রাপ্ত ও বাংলাদেশে শতরঞ্জির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা বুনিয়াদি গ্লোবাল ব্র্যান্ড। পাটের বৈচিত্র্যময় পণ্য, ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি, ডোর ম্যাট, বাথ ম্যাট, প্লেসম্যাট, কুশন কভার, স্টোরেজ বাস্কেট, কোস্টারস, ওয়াল হ্যাংগিং ইত্যাদি দিয়ে কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড লিখে চলেছে সাফল্যগাথার অনন্য অধ্যায়। ২০০৬ সালে পণ্য রফতানির গোড়াপত্তনের দুই বছর পর থেকেই কারুপণ্য রংপুর লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত হয় মার্কেন্টাইল ব্যাংক। ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রফতানির মাধ্যমে দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসছে কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড। ২০২২ সালে ২৪৮ দশমিক ৩৩ কোটি টাকার পণ্যসামগ্রী রফতানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত এর পরিমাণ ছিল ১৭৯ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা। 

শুরুটা এতো মসৃণ ছিল না। ১৯৮৬ সালে ঢাকার শিল্প মেলায় একটি স্টল দিয়েছিলেন কারুপণ্যের স্বপ্নদ্রষ্টা সফিকুল আলম সেলিম। গম গাছের খড় দিয়ে দেড় হাজার ছবি বানিয়ে অংশ নিয়েছিলেন ওই মেলায়। আশা ছিল প্রচুর বিক্রি হবে। তবে শেষ পর্যন্ত সেটি আশাই থেকে গেল। একটিও বিক্রি হলো না। অথচ ছবিগুলোতে ফুটে উঠেছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বর্ণাঢ্য ইতিহাস। স্থান পেয়েছিল দেশ-বিদেশের বহু বরেণ্য ব্যক্তির ছবি। কিন্তু কিছুই টানতে পারলো না ক্রেতাদের। 

ঢাকার শিল্প মেলা শেষে ফিরে যান রংপুরে। তবে তার মাথায় তখনো ব্যবসায়িক চিন্তা। হস্তশিল্পের কাজ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। ১৯৮৭ সালে ছাত্ররাজনীতি করতে গিয়ে কারাগারে যেতে হয় তাকে। গ্রেফতারের পর তিন মাসের জন্য তার ঠিকানা হয় রংপুর কারাগার। জেলে কয়েদিদের হস্তশিল্প বুননের কাজ মুগ্ধ করে তাকে। তাদের কাজ দেখে আরো সমৃদ্ধ করে তোলেন নিজেকে। জেল থেকে বের হয়ে ফের ভাবতে শুরু করেন বুনন শিল্প নিয়ে। এবার হস্তশিল্পের একটি কারখানা গড়ে তুলতে মনোনিবেশ করেন। তার যাবতীয় ধ্যানজ্ঞান তখন এ কারখানা ঘিরে। একপর্যায়ে ১৯৯১ সালে ‘কারুপণ্য’ নামে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি বুননের ছোট্ট একটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে যাত্রা শুরু করেন সফিকুল আলম সেলিম। এরপর পেরিয়ে গেছে তিন দশকেরও বেশি সময়। এ সময়ে প্রতিনিয়ত নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করেছে কারুপণ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রংপুরের হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি রফতানি করে দেশকে এনে দিচ্ছেন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। 

আজকের শতভাগ রফতানিনির্ভর কারুপণ্য রংপুর লিমিটেডের উদ্যোক্তা সফিকুল আলম সেলিমের বাবা মরহুম এম এ সোবহান ছিলেন একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। বাবার সুবাদে তিনিও ছোটবেলা থেকে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ভালো ছাত্র হওয়ায় ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন রংপুর ক্যাডেট কলেজে। তবে অষ্টম শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হতে না পারায় ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে তাকে বের করে দেয়া হয়। রংপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে ছিটকে পড়ার পর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। ওই পরীক্ষায় প্রথম হন তিনি। ফলে বিনা পয়সায় স্কুলের নবম শ্রেণীতে ভর্তির সুযোগ পান। তবে সেখানেও বেশিদিন থাকতে পারলেন না। স্কুল ফাঁকি দেয়ায় ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজকেও বিদায় জানাতে হয়। বাধ্য হয়ে ভর্তি হন অন্য একটি স্কুলে। সেখান থেকেই ১৯৮২ সালে এসএসসি সম্পন্ন করেন তিনি। পরে ১৯৯১ সালে রংপুর সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স করেন। 

দোকান থেকে কারখানা: 

এরশাদ আমলে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তৎকালীন রংপুর প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার (বিসিক) বন্ধ থাকা হস্তশিল্পের একটি দোকান ভাড়া নেন সফিকুল আলম সেলিম। সেখানে শতরঞ্জি বিপণন কেন্দ্র চালু করেন তিনি। দোকান তো নিলেন। কিন্তু এ পেশায় দক্ষ কারিগর খুঁজে পাওয়া কঠিন। অনেক চেষ্টায় ২০ জন কারিগরকে খুঁজে বের করতে সমর্থ হন। কিন্তু আরো কারিগর প্রয়োজন। অবশেষে সিদ্ধান্ত নেন পুরনোদের দিয়ে নতুনদের প্রশিক্ষিত করে তোলার। এ উদ্যোগ সফল হয়। নতুন ও পুরনো কারিগরদের সম্মিলিত প্রয়াসে শুরু হয় রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি বুননের কাজ। এর পর থেকে আর পেছনে ফিরতে হয়নি সফিকুল আলম সেলিমকে। 

১৯৯১ সালে গড়ে তোলা দোকানটি সহজেই আকৃষ্ট করে স্থানীয়দের। একের পর এক অর্ডার আসতে শুরু করে। সে অনুযায়ী ক্রেতাদের শতরঞ্জি সরবরাহ করতে শুরু করেন। একসময় ভাবলেন, দোকান থেকে যে আয় হয় এটি আসলে যৎসামান্য। ফলে এখানেই থেমে থাকলে চলবে না। নতুন কিছু করার চিন্তা তখন তার মাথায় ভর করে। যেই চিন্তা সেই কাজ। নিজ পণ্যের পরিচিতি বাড়াতে তথা ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য দেশজুড়ে ব্যাপক প্রচারণা চালান। অংশ নেন দেশের বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্য মেলায়। এসব মেলায় তার স্টলগুলোয় ভিড় করেন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী। তার স্টলের শতরঞ্জি মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের। ফলে অল্প সময়ে দেশজুড়ে তার পণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা মাথায় রেখে একপর্যায়ে ঢাকায় ‘শতরঞ্জি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন।

রংপুরের দোকান থেকে এবার তার পথচলা রাজধানী শহরে। তবে সেখানেও স্থির থাকতে পারেননি সফিকুল আলম সেলিম। জাতীয় পর্যায়ে চাহিদা তৈরির পর এবার তার নজর বিদেশের বাজারে। ২০০২ সালে জাপানে শতরঞ্জি রফতানির সুযোগ পেয়ে ভাবলেন, অন্য দেশে তাহলে কেন নয়? কারণ ভালো ব্র্যান্ডিং করতে পারলে পুরো দুনিয়াজুড়েই বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী এ পণ্যকে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব। এ চিন্তাকে সামনে রেখে রংপুরে বিসিকের বন্ধ থাকা একটি ছোট কারখানা ভাড়া নেন। সেখানে গ্রামের ৫০ জন নারী-পুরুষকে নিয়ে গড়ে তোলেন শতরঞ্জি তৈরির কারখানা। কালক্রমে তার ব্যবসার পরিধি আরো বাড়তে থাকে। গড়ে তোলেন ‘কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড।’ রংপুর শহরের রবার্টসনগঞ্জের সবুজ এ কারখানা যেন উদ্যম আর সমৃদ্ধির এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।