দেশের এন‌বিএফআ‌ইগুলোর ২০২৩ সালে পারফরম্যান্স কেমন ছিল?

২০২৩ সাল বিভিন্ন দিক দিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং বছর ছিল বলে আমি মনে করি। ম্যাক্রো ইকোনমিক ইনডিকেটরগুলো দেশের অর্থনীতিকে যেভাবে প্রভাবিত করেছে, ঠিক তেমনি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রভাবিত করেছে। আমরা যদি ম্যাক্রো অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, অর্থনীতিতে ডলারের যে অপ্রতুলতা, ব্যবসায়ীদের ম্যানুফ্যাকচারিং বা প্রডাক্টশনগুলো পুরাদমে চালাতে না পারা, পর্যাপ্ত কাঁচামালের অভাব, ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাব যেভাবে তাদের প্রভাবিত করেছে, ঠিক তেমনি এর প্রতিফলন আর্থিক খাতের ওপরও পড়েছে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষকে যেভাবে কষ্টের মধ্যে ফেলেছে, আর্থিক খাতে ডিপোজিটের ক্ষেত্রেও তার একটা প্রভাব আমরা দেখেছি। ডিপোজিটের ক্ষেত্রে ছোট সঞ্চয়ীদের টাকাগুলো উত্তোলন করে নেয়া এবং সুদহার মূল্যস্ফীতির নিচে থাকায় তাদের সঞ্চয়ের প্রতি যে অনাগ্রহতা, সেটাও আমরা লক্ষ করেছি। তবে এ সংকটের মধ্য দিয়েও ২০২৩ সালে কিছু বিষয় ছিল, যেগুলোয় আমরা ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ করেছি। সেটা হচ্ছে, ২০২৩ সালে ইন্টারেস্ট রেটের ম্যাকানিজম হিসেবে স্মার্ট (সিক্স মান্থস মুভিং অ্যাভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিল) এ বছর থেকে চালু হতে দেখেছি এবং ফলে সেখানে একটা মার্জিন আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি। যেখানে আগে ৯ ও ১১ শতাংশের একটা সীমা ছিল সেটা উঠে যাওয়ার পরে জুলাই থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ছয় মাসের ট্রেজারি বিলের সঙ্গে একটা ভালো মার্জিন কাস্টমারকে আমরা চার্জ করতে পেরেছি। অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যেখানে স্প্রেড নামতে নামতে ২ শতাংশের নিচে চলে গিয়েছিল, সেখানে আমরা ৩ শতাংশের ওপরেও এ মার্জিন তুলতে সক্ষম হয়েছি। এভাবে ইন্টারেস্ট মার্জিনের একটা ইতিবাচক প্রভাব আমরা দেখেছি।

ঋণের ক্ষেত্রে দুই ধরনের প্রভাবই আমরা দেখেছি। প্রথম সারির আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তাদের এসএমই ও সিএমএসএমই ঋণের প্রবৃদ্ধি দেখেছি। আবার সার্বিকভাবে ঋণ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটা ধীরগতি আমরা লক্ষ করেছি। অন্যদিকে ডিপোজিটের ক্ষেত্রে প্রথম সারির আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি আমরা লক্ষ করেছি। যদিও এনক্যাশমেন্ট ও প্রি-ম্যাচিউর এনক্যাশমেন্ট অনেক বেশি ছিল। এ বছরের শেষের দিকে এসে নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনের ফলে মানুষের মধ্যে হঠাৎ একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সে শঙ্কার কারণে আমরা অনেকের ক্ষেত্রে টাকা দ্রুত উত্তোলনের একটা প্রবণতা দেখেছি। বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে কিছু ব্যাংকের ওপর মানুষের অনাস্থা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নেতিবাচক একটি প্রভাব ফেলেছে। ইন্ডাস্ট্রিতে আমরা এনপিএলের একটা ঊর্ধ্বগতি দেখেছি। সেপ্টেম্বর ২০২৩-এ ইন্ডাস্ট্রিতে এনপিএল ছিল প্রায় ২৯ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সসহ চার-পাঁচটা শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান এনপিএলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে, যা ছিল ৭-৮ শতাংশের নিচে।

প্রতিষ্ঠানগুলো আমানত সংগ্রহ করতে গিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে কি?

প্রতিষ্ঠানগুলো আমানত সংগ্রহ করতে গিয়ে যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে তা আমাকে নির্দ্বিধায় বলতে হবে। আর্থিক খাতে মানুষের দীর্ঘদিনের কিছুটা আস্থার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাবে গ্রাহকের টাকা উত্তোলন করতে না পারা ২০২৩-এ আরো অনেক কঠিন হয়েছে। কেননা মার্কেটে যথেষ্ট তারল্য সংকটও আমরা লক্ষ করেছি। মানি মার্কেটে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ক্রেডিট এক্সটেন্ড না করা এবং সেটার ধারাবাহিকতায় তারল্য সংকট হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান যে সময়মতো এনক্যাশমেন্ট দিতে পারেনি, তা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমস্যার সম্মুখীন করেছে।

এর মধ্যে যদি আমরা ইতিবাচক বিষয়গুলোর দিকে তাকাই, অনেক ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন হয়েছে, যেমন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম ও ওয়ালেটের মাধ্যমে ডিপিএস কালেকশনসহ নতুন নতুন ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট ওপেনের ক্ষেত্রে নতুন দ্বার উন্মোচন হয়েছে, যার মাধ্যমে নতুন ছোট ছোট অনেক সেভিংস অ্যাকাউন্ট যুক্ত হয়েছে। একদিকে যেমন প্রাতিষ্ঠানিক ডিপোজিট পাওয়াটা হয়তো কিছুটা কমেছে কিন্তু ব্যক্তিগত আমানতের ক্ষেত্রে একটা প্রবৃদ্ধি আমরা লক্ষ্য করেছি।

গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত আকৃষ্ট করতে আপনারা কী ধরনের ব্যবসায়িক কৌশল অবলম্বন করছেন?

বাংলাদেশ ফাইন্যান্স ২০২৩ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম বিশেষ একটি প্রডাক্ট নিয়ে এসেছে, যার নাম হচ্ছে গ্রিন ডিপোজিট। ডিপোজিটরদের মধ্যে বিশেষ একটি সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে এ গ্রিন ডিপোজিট। এটা এমন একটা ডিপোজিট স্কিম যে ডিপোজিট স্কিমে এর মাধ্যমে ডিপোজিটররা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সে ডিপোজিট করার মাধ্যমে দেশ ও পরিবেশের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টকে ত্বরান্বিত করতে পারেন। এ আমানতের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফাইন্যান্স শুধু পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন এবং সবুজ ও নারীবান্ধব অর্থায়ন কর্মসূচিগুলোয় ফাইন্যান্সিং করবে। তিন বছরে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের ফাইন্যান্সিং বুকের টোটাল ২১ শতাংশ হচ্ছে গ্রিন ফাইন্যান্সিং, যার এনপিএল শূন্য। জায়গাটিতে আমরা আরো উৎসাহিত এবং কাস্টমারকে একটা ভালো কাজের সঙ্গে শরিক হওয়ার জন্য এ গ্রিন ডিপোজিট স্কিম চালু করেছি। এছাড়া ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের ডিজিটাল সেভিংস স্কিমগুলো আমানতকারীদের আকৃষ্ট করতে পেরেছে। রিটায়ারমেন্ট প্ল্যানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফাইন্যান্স নিশ্চিত করছে একজন ডিপোজিটর যেন তার ফাইন্যান্সিয়াল ফিউচার নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন এবং একটি গ্যারান্টেড মান্থলি রিটার্নের মাধ্যমে তার অবসর-পরবর্তী জীবন স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাতে পারেন। এ রিটায়ারমেন্ট স্কিমও বাংলাদেশ ফাইন্যান্স ২০২৩ সালে গ্রাহকের জন্য নিয়ে এসেছে।

অতীতের কিছু ঘটনার কারণে এনবিএফআই খাতের প্রতি মানুষের মধ্যে কিছুটা আস্থা সংকট রয়েছে। এটি দূর করতে আপনারা কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

অতীতের কিছু কারণে এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে মানুষের কিছুটা আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, সেটা অবশ্য আমরা বলতে পারি ২০১৭-১৮ সাল থেকে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তবে এর মধ্যে দিয়েই কিন্তু আমরা অনেক ধরনের উদ্যোগ নিয়েছি, যে উদ্যোগের কারণে অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্স যেখানে বিভিন্ন ইনডিকেটরে ১০-১২তম পজিশনে ছিল, সেখান থেকে কয়েক বছরে সেরা চার-এ নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্স বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটির মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। গ্রাহকের প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন কাস্টমাইজড প্রডাক্ট তাদের কাছে নিয়ে যাওয়া, পরিবেশবান্ধব ফাইন্যান্সিং বিশেষ করে এসএমইতে বিশেষ নজর দেয়া এবং গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করার মাধ্যমে গ্রাহকের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে।

গত তিন বছরে বেস্ট প্রেজেন্টেড ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট ও বেস্ট করপোরেট গভর্ন্যান্স ফলো করা অর্গানাইজেশন হিসেবে আইসিএবি, আইসিএসবি ও সাফা থেকে কিন্তু বাংলাদেশ ফাইন্যান্স স্বীকৃতি পেয়েছে। এগুলো মানুষের মধ্যে অনেকটা আস্থার জায়গা করে নিতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সকে সাহায্য করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ ফাইন্যান্স পরপর দুই বছর ২০২১ ও ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সিয়াল রেটিংয়ে যথাক্রমে সেরা পাঁচ এবং সেরা চার এনবিএফআইয়ের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। আমি মনে করি, এগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ফাইন্যান্স কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিতে আস্থার যে সংকট, সেটা অনেকটাই দূর করতে একটা বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেছে।

এ বছর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কেমন যাবে বলে মনে করছেন?

এ বছর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বেশ চ্যালঞ্জিং বলে আমি মনে করি, যেহেতু নতুন খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া একটি অন্যতম সমস্যা এবং বর্তমানে তা প্রকট আকার ধারণ করেছে। সেই সঙ্গে এসব সমস্যার পাশাপাশি নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনের প্রণয়ন এবং প্রয়োগের ফলে বেশকিছু বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। তবে এর মধ্যে দিয়েই বেশকিছু নতুন সুযোগ তৈরি হবে, যা ইন্ডাস্ট্রিকে একটা সাসটেইনেবল জায়গায় নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। এছাড়া নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে মানুষের আস্থার জায়গাটা কিছুটা হলেও আগের চেয়ে শক্ত হয়েছে এবং নিঃসন্দেহে এটা অর্থনীতিকে বেগবান করতে কাজ করবে।

পুঁজিবাজারের শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দেয়ার ফলে আমরা কিন্তু পুঁজিবাজারকে আবার চাঙ্গা হতে দেখছি এবং এখানে যদি ট্রেড বাড়ে, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ে, তাহলে ক্যাপিটাল মার্কেট কিন্তু একটা বড় ভূমিকা পালন করবে ২০২৪ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে। অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরই সাবসিডিয়ারি কোম্পানি আছে যেমন মার্চেন্ট ব্যাংক, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ও ব্রোকারেজ হাউজ এবং সেগুলোর মাধ্যমে কিন্তু ভালো বিজনেস করার একটা সুযোগ আছে ২০২৪ সালে। এর বাইরে  আমি মনে করি যে দেশের এখন এ মুহূর্তে ক্রেডিট গ্রোথের একটি বিরাট অপরচুনিটি আছে, সেই সঙ্গে সেভিংস মোবিলাইজেশনেরও সুযোগ আছে। যেহেতু বিলের রেট বাড়ছে, স্মার্টের এভারেজ বাড়ছে, তাই সেভিংস মোবিলাইজেশন গ্রোথটাও কিন্তু তার সঙ্গে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাড়ি থেকে টাকা আবার ব্যাংকে ফেরত আসা শুরু করেছে। এসব বিষয় যদি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কাজে লাগাতে পারে, তাহলে ২০২৪ একটা দারুণ বছর হতে পারে আর সেই সঙ্গে একটু সচেতনতা এবং এনপিএলের মতো একটি কঠিন বিষয়কেও মাথায় রাখতে হবে। যদি এনপিএল একটা সহনীয় মাত্রায় রাখা যায়, তাহলে ২০২৪ সাল অনেক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।