বর্তমানে এনবিএফআইগুলোর আর্থিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি কেমন যাচ্ছে?

আপনি যদি গত বছরের কথা জিজ্ঞেস করেন তাহলে আমি বলব এটি ছিল আরেকটি চ্যালেঞ্জিং বছর। চ্যালেঞ্জিং ছিল এ অর্থে যে ২০২২ সাল থেকে এনবিএফআই খাতের আমানত ও ঋণের সীমা বেঁধে দেয়া হয়। এতে স্প্রেড দাঁড়ায় ৩ শতাংশে। কিন্তু সেটিও সব সময় পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই আমানতের বিপরীতে বেশি সুদ পেতে চান গ্রাহকরা। অন্যদিকে ভালো গ্রাহককে ঋণ দিতে গেলে তারাও কম সুদ দিতে চান। ফলে ৩ শতাংশ স্প্রেড ধরে রাখাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে গত বছর থেকেই ব্যাংক খাতে সুদহারের সীমা তুলে নেয়া হয়েছে। ফলে এনবিএফআইয়ের সঙ্গে ব্যাংকের প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে প্রতি মাসেই আমাদের কিছু না কিছু আমানতের মেয়াদ পূর্তি হচ্ছে। এগুলো নবায়নের ক্ষেত্রে সুদ বেশি দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে ঋণের সুদের হার বাড়াতে গেলে ছয় মাস অপেক্ষা করতে হয়। ফলে এনবিএফআইগুলোর মুনাফা সংকুচিত হয়ে গেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তালিকাভুক্ত বড় ও ভালো এনবিএফআইগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের মুনাফা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। অন্যদিকে সম্পদ ও আমানতের ক্ষেত্রে যৎসামান্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কারো কারো ক্ষেত্রে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিও হয়েছে। শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর এ অবস্থা হলে অন্যদের পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়। গত বছর শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের সহায়তা করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। কিন্তু এর প্রভাব ব্যাংক গ্রাহকদের মধ্যে পড়েছে, যা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সংক্রমিত করেছে। এছাড়া এনবিএফআই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও অনেক বেড়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে সেটি বেড়ে ২৯ দশমিক ৭৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বেশকিছু প্রতিষ্ঠান আছে যাদের খেলাপি ঋণ ৫০ শতাংশেরও বেশি। খেলাপি ঋণ একদিনে বাড়েনি। অনেকদিন থেকেই এ সমস্যা বিরাজ করছে। ফলে সময় হয়েছে এসব দুর্বল প্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধানের বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার। সম্প্রতি পাস হওয়া ফাইন্যান্স কোম্পানি আইনে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত করার বিষয়টিও উঠে এসেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আশা রাখি। 

অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি কেমন?

গত ডিসেম্বর শেষে আমাদের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশে। আমাদের ব্যবসায়িক কর্মকৌশল হলো আমানতকারী তার টাকা যেদিন ফেরত চাইবেন সেদিনই তাকে সেটি ফেরত দেয়া। এক্ষেত্রে আমরা একদিনও দেরি করতে রাজি নই। আমরা এখন পর্যন্ত এতে সফল হয়েছি। আমানতকারীর অর্থ আমরা বেছে বেছে ভালো ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসায় বিনিয়োগ করছি এবং সেখান থেকে তা সময়মতো ফেরতও আসছে। এ কারণে আমাদের খেলাপি ঋণ নেই বললেই চলে।

শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা আছে কি?

ভবিষ্যতে হয়তো আমরা শরিয়াহ উইং চালু করতে পারি। কারণ এটি আমানত সংগ্রহের একটি ভালো উৎস। গ্রাহকদের মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক সেবার চাহিদা বাড়ছে। এটি এখনো আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে ইন্স্যুরেন্স বিক্রির সুযোগ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে এনবিএফআইগুলোকেও এ সুযোগ দিলে তাদের আয়ের একটি নতুন উৎস যোগ হতো। আর্থিক খাতে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেগুলো মোকাবেলা করেই আমরা বড় হচ্ছি। তবে আমরা বিশ্বাস করি বড় হতে গেলে শুধু ঋণের সুদ আয়ের ওপর নির্ভর করলে হবে না। এ কারণে আমরা ফি-ভিত্তিক আয়ের দিকেও নজর দিয়েছি। এজন্য আমরা স্ট্রাকচারড ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে করপোরেটদের বিভিন্ন ধরনের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। 

নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে আপনাদের আমানত সংগ্রহ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাই।

আমরা লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে আমানত সংগ্রহ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। এনবিএফআই খাতের ইমেজ সংকট ও সুদহারের সীমা বেঁধে দেয়ার মতো বিষয়গুলো আমাদের আমানত সংগ্রহের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে আমানতের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের খানিকটা ঘাটতি পূরণ করেছি বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে আমরা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল সুবিধা নিয়েছি। 

বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেও তহবিলের চাহিদা পূরণ করা যায়?

দুই বছর ধরেই আমাদের বন্ড ইস্যুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু আমাদের বন্ড মার্কেট এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি।

তবে আমাদের বন্ডের দিকে যেতে হবে। পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে ভবিষ্যতে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর বাইরে গত বছর আমরা উত্তরায় একটি বুথ খুলেছি। আমরা বিশ্বাস করি বর্তমানে যেভাবে সবকিছু ডিজিটাইজেশনের দিকে যাচ্ছে, সেখানে শুধু শাখার সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ নেই। এতে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। আমরা এরই মধ্যে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রোভাইডারদের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমানত, কিস্তি সংগ্রহ পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করেছি। আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ও অ্যাপভিত্তিক ন্যানো লোন করার চেষ্টা করছি। এর কাজ চলছে এবং এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনও নেয়া আছে।

এ বছরটি চ্যালেঞ্জিং হবে বলে আপনি মনে করছেন। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আপনাদের কৌশল কী হবে?

আমি মনে করি, শুধু সুদ আয়ের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, আমাদের ফি-ভিত্তিক আয় বাডাতে হবে। পাশাপাশি সম্পদ বাড়ানোর জন্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়নের সুবিধা নেয়ার কার্যক্রম বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে ঋণের চাহিদা নির্ভর করবে শিল্প-কারখানার প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর। অধিকন্তু আমরা যাদের অর্থায়ন করছি তারা সমস্যায় পড়লে আমাদের ওপরও এর প্রভাব পড়বে। ফলে মন্দ ঋণ বেড়ে যেতে পারে। এ বছর অর্থনীতির মূল চ্যালেঞ্জ হবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। এ দুটো বিষয় সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে পারলে পরিস্থিতি আয়ত্তের মধ্যে থাকবে আশা করা যায়।