আমরা সঞ্চয় করি কেন? কষ্টার্জিত অর্থকে অযাচিত খরচের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। অথবা ভবিষ্যতের অজানা শঙ্কায় ভরসা হিসেবে কিছু অর্থ জমিয়ে রাখার জন্য। দুর্দিনের দুশ্চিন্তায় আস্থা হিসেবে যে সঞ্চয় পরিকল্পনা, সে সঞ্চয়কে ঘিরেই আবার রয়েছে নানা দুশ্চিন্তা। কোথায় রাখব সঞ্চয়?
আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার দরুন কিছু প্রশ্ন তো আমি প্রায়ই শুনি। যেমন ‘আপনাদের প্রতিষ্ঠানে কেন টাকা রাখব?’, কিংবা ‘ব্যাংকে টাকা না রেখে কেন এনবিএফআইতে রাখব?’ বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই মনে হয়েছে আসলে শুধু আইপিডিসি না, বরং যেকোনো প্রতিষ্ঠানেই টাকা রাখার ক্ষেত্রে যথাযথ একটা গাইডলাইন সম্মানিত গ্রাহকের কাছে থাকা উচিত। এর ওপর ভিত্তি করে গ্রাহক নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারবে সে সঠিক স্থানে সঞ্চয় রাখছে কিনা। ফলে ব্যাংক ও অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে পুরো আর্থিক খাতই আদতে দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে। কীভাবে? সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। শুরুতে দেখে নিই কী কী নিয়ামক দিয়ে আমরা একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকে যাচাই করব।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে নিরাপদ সঞ্চয়ের জন্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে মানদণ্ডগুলো সব প্রতিষ্ঠানে একই রকম। এখানে অন্যতম প্রধান একটা বিষয় হলো ক্রেডিট রেটিং। ট্রিপল এ হলো সেরা ক্রেডিট রেটিং। ট্রিপল এ রেটিং থাকার অর্থ দায় পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। আপনার অর্থ তাই সেখানে নিরাপদ।
আরেকটি বহুল প্রচলিত নিয়ামক হলো খেলাপি ঋণের হার। এটি যত কম, ততই উত্তম। খেলাপি ঋণ বিষয়টি বর্তমান গ্রাহকের কাছে অনেক বেশি জানাশোনা একটা শব্দগুচ্ছ হওয়ায় একটা কথা এখানে বলে রাখা ভালো। গ্রাহক যখন প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে, তাকে চিন্তা করতে হবে সব নিয়ামক মিলিয়ে। তাই শুধুই সবচেয়ে কম খেলাপি ঋণ দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে তা নয়। গ্রাহক হিসেবে একটা মানদণ্ড সে ঠিক করে নিতে পারে যে খেলাপি ঋণ ৫ বা ৬ শতাংশের বেশি নয়, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটিকে বেছে নেবে। তবে সঙ্গে অন্যান্য নির্ধারকও তাকে বিবেচনা করতে হবে।
যেমন একটি ব্যাংক বা নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ কতগুলো সেক্টরে রয়েছে, অর্থাৎ কত ধরনের খাতে ঋণ প্রদান করেছে তা জেনে নেয়া। বিভিন্ন সেক্টরে তারা যে অর্থ বিনিয়োগ করে তা কিন্তু গ্রাহকেরই অর্থ। বিনিয়োগ একটি দুটি সেক্টরের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বরং বিনিয়োগের খাতে বৈচিত্র্য যত বেশি থাকে, ওই প্রতিষ্ঠান হয় সঞ্চয়ের জন্য তত নিরাপদ। পাশাপাশি বিনিয়োগের মেয়াদও বিবেচ্য বিষয়। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বেশি থাকলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের আয় নিশ্চিত হয়। এটিও সঞ্চয়কে নিরাপত্তা দেয়।
খেলাপি ঋণের মতো আরেকটি উপাদান আজকের দিনের অনেক গ্রাহকের মধ্যে প্রচলন পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানের মালিকানা যাচাই। একজন সচেতন গ্রাহক অবশ্যই যাচাই করে নেবে যে প্রতিষ্ঠানের মালিক বা প্রধান শেয়ারহোল্ডার কে বা কারা। স্বনামধন্য শেয়ারহোল্ডার থাকা মানে আপনি অনেকাংশে নির্ভার হয়ে সেখানে সঞ্চয় রাখতে পারেন। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনাকে সাজানো হয় অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সেখানে প্রতিষ্ঠান দেখভাল করে। সুদৃঢ় করপোরেট গভর্ন্যান্সের প্রাথমিক শর্তই ভালো ব্যবস্থাপনা। গ্রাহকের অধিকার সেখানে যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়। তাদের মর্যাদা থাকে সমুন্নত। গ্রাহকসেবার মানও ভালো হয়, যা মানসিকভাবে গ্রাহককে স্বস্তি প্রদান করে।
এ বিষয়গুলো সম্পর্কে নিশ্চিত হলে গ্রাহকের জন্য প্রতিষ্ঠান বাছাই বেশ সহজ হয়ে আসে। এর পরেও নিজের সুবিধার কথা চিন্তা করে সঞ্চয় স্কিমের বৈচিত্র্য, ডিজিটাল সেবার ধরন এগুলো নিয়ে একজন গ্রাহক ভাবতে পারেন।
আর সবশেষে, অনেকের জন্য একটি নিয়ামক হতে পারে রেট অব রিটার্ন। কিন্তু এটি কোনোভাবেই উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর চেয়ে অধিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত না। তাতে সিদ্ধান্ত ভুল হয়ে যেতে পারে। নিরাপত্তায় ঘাটতি নেই এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কে বেশি রিটার্ন দেয় সেটি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বর্তমানে বাজারে সব প্রতিষ্ঠানই কাছাকাছি এবং ভালো রেট দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে নিরাপত্তার গুরুত্বই সর্বাধিক বলা যায়।
শুরুতে বলেছিলাম অনেকে প্রশ্ন করেন কেন এনবিএফআইতে অর্থ সঞ্চয় করব। উত্তরটা সহজ। যাচাই-বাছাইয়ের মানদণ্ড ব্যাংক ও এনবিএফআইতে একদম এক। সুতরাং বিবেচ্য বিষয় আসলে প্রতিষ্ঠানের ধরন না, বরং ওপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো। সেগুলোয় টিকমার্ক পেলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানই নিরাপদ।
শুরুতে আরো বলেছিলাম, সিদ্ধান্ত গ্রহণে গ্রাহকের যথাযথ অংশগ্রহণ পুরো খাতের জন্য আশীর্বাদ। কেন? সেটি বোধহয় এতক্ষণে অনেকখানি পরিষ্কার হয়ে গেছে। গ্রাহক যখন নিজের সুবিবেচনা কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে, তখন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য একমাত্র রক্ষাকর্তা হবে তাদের মান। আলোচিত মানদণ্ডগুলোয় যখন প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যথাযথ অবস্থান নিশ্চিতকরণে একাগ্র হবে, তা আসলে পুরো ব্যাংক ও অ-ব্যাংক আর্থিক খাতে আনবে সঠিক ব্যবসায়িক চর্চার প্রচলন। ফলে এর সুফল ভোগ করবে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, গ্রাহকসহ সবাই।





