দেশের সিমেন্ট খাতের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাই।

দেশের সিমেন্ট খাত কয়েক বছর ধরেই চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্যান্য ব্যবসাও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, আমরাও এর ব্যতিক্রম নই। কভিড-১৯ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। আমরা খুব অল্পের মধ্য দিয়ে এর প্রভাব মোকাবেলা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। তিন বছর ধরে দেশের সিমেন্ট খাত অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যাচ্ছে। চ্যালেঞ্জগুলো সবারই জানা। সিমেন্টের কাঁচামালের প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আমরা কেউ কখনো কল্পনা করতে পারিনি যে আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হবে। কখনো কল্পনা করিনি বিনিময় হার আকাশচুম্বী হয়ে যাবে। তবে এটি বলতে হয় সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তা, কর্মী, শ্রমিক সবার অক্লান্ত পরিশ্রমে আমরা টিকে আছি। খুব ভালো আছি সেটি বলা যাবে না, আবার খুব যে খারাপ আছি তাও নয়।

কভিডের পর তো আমরা দেখেছি সিমেন্ট শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। কিন্তু তারপর আবার ছন্দপতন হলো কেন?

ব্যবসা-বাণিজ্য তো পরের বিষয়! কভিডের সময় আমরা বেঁচে থাকতে পারব কিনা সেটি নিয়েই তো অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু সেখান থেকে আমরা বেঁচে ফিরেছিলাম। ২০২০ সালে ব্যবসায় যে ধস নেমেছিল তার পরের বছর অর্থাৎ, ২০২১ সালে কিন্তু সেটি পুনরুদ্ধার হতে শুরু করেছিল। ২০২১-২৩ পর্যন্ত তিন বছর সিমেন্ট খাতের বিক্রিতে তেমন কোনো প্রবৃদ্ধি হয়নি। এ ধরনের ঘটনা এর আগে কখনো এ খাতে দেখা যায়নি। চ্যালেঞ্জ তো মোকাবেলা করছি কিন্তু শিল্পে যদি প্রবৃদ্ধি না হয় তাহলে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার কীভাবে উন্নতি হবে? কারণ দ্রব্যমূল্য তো থেমে নেই। ২০১১ থেকে কভিডের আগের বছর ২০১৮ সাল পর্যন্ত সিমেন্ট খাতে গড়ে ১০-১১ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু গত তিন বছরে এ খাতের উৎপাদন ৩ কোটি ৮০ লাখ টনের কাছাকাছি আছে। এ বছরের জানুয়ারিতেও ব্যবসা ভালো যায়নি। যদিও এ সময়ে জাতীয় নির্বাচনের কারণে ব্যবসায় কিছুটা শ্লথগতি থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে আমি মনে করি, সামনের দিনগুলোয় দেশের সিমেন্ট খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আমি এর উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছি।

মাঝে কাঁচামালসহ জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সিমেন্টের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে গিয়েছিল। বর্তমানে এগুলোর দাম কমেছে কি?

আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি জাহাজ ভাড়াও সহনীয় পর্যায়ে। এতে অনেকেই মনে করতে পারেন তাহলে দেশে সিমেন্টের দাম কেন কমছে না। কিন্তু আমাদের বিদেশ থেকে প্রায় ৯৫ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশী টাকায় ডলার কিনে আমদানি ব্যয় পরিশোধ করি। গত দেড় বছরে ডলারের দাম ৮৬ থেকে বেড়ে ১২৪-১২৫ টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর বেশিও হয়। টাকার অবমূল্যায়নে আমাদের স্থানীয় মুদ্রায় আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম কমেছে কিন্তু ডলারে। ফলে আমরা এ দাম কমার সুবিধা পাচ্ছি না। তবে মন্দের ভালো হিসেবে বলতে হয় ডলারের দাম কমায় কাঁচামাল আমদানিতে ডলার কিছুটা কম লাগছে। দেশের সিমেন্ট শিল্পের স্থাপিত সক্ষমতা ৯ কোটি ১০ লাখ টন। কার্যকর সক্ষমতা হিসাব করলে এটি আট থেকে সাড়ে আট কোটি টন হবে। এর মধ্যে বর্তমানে কোম্পানিগুলোর প্রকৃত উৎপাদন হচ্ছে ৩ কোটি ৮০ লাখ টন। ফলে অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা কিন্তু অব্যবহৃত থাকছে। এটি যেকোনো শিল্পের জন্য আশঙ্কাজনক। কারণ একদিকে আমাদের বিক্রয় প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। অন্যদিকে সক্ষমতা কাজে লাগাতে না পারায় ব্যয় উঠে আসছে না। তবে আমরা সবাই আশাবাদী, ভবিষ্যতে সিমেন্ট খাতে সুদিন ফিরে আসবে। 

বর্তমানে ডলারের সংকট কি কেটেছে? 

চাহিদা অনুসারে ডলার পাচ্ছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ডলারের উচ্চমূল্য। বিনিময় হার এখনো বেশ অস্থিতিশীল। তবে আমরা আশা করছি, সরকারের পদক্ষেপে এটি স্থিতিশীল অবস্থায় চলে আসবে।

অর্ধেকের বেশি উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকায় প্রশ্ন উঠতে পারে সঠিক প্রক্ষেপণের ভিত্তিতে সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল কিনা। ভবিষ্যতে সক্ষমতা আরো বেশি কাজে লাগানোর বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

সিমেন্ট শিল্পে জনপ্রতি ভোগের একটি বিষয় রয়েছে। গত বছর আমাদের দেশে জনপ্রতি সিমেন্টের ব্যবহার ছিল ২২০ কেজি। ভারতে এটি ৩২০, শ্রীলংকায় ৪৩০, চীনে ১ হাজার ৭০০, মালয়েশিয়ায় ৫০০-৬০০ ও থাইল্যান্ডে ৭০০-৮০০ কেজি। আমরা সামনে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর হচ্ছি। এতে আমাদের আরো বেশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন এবং এতে সিমেন্টের ব্যবহার বাড়বে। ৬০০ কেজি পর্যন্ত সিমেন্ট ব্যবহারের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী থাকে। ফলে সে পর্যন্ত আমাদের সিমেন্টের চাহিদা বাড়বে বলে আশা করা যায়। আমাদের গ্রামীণ এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে। তাছাড়া সরকারের বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প যেমন পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো প্রকল্পের কারণে আশপাশের এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে। এসব কিছু মিলিয়েই সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তারা ভবিষ্যৎ চাহিদা প্রক্ষেপণ করে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছেন।

কৃচ্ছ্রসাধন নীতির অংশ হিসেবে সরকারি অবকাঠামোগত প্রকল্পে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। এতে সিমেন্ট শিল্পে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে?

এর প্রভাব গত বছর থেকেই পড়েছে। তিন বছর ধরে যে আমাদের প্রবৃদ্ধি হয়নি এর মধ্যে এটিও অন্যতম কারণ। তবে আমি মনে করি সামনে সরকার এ নীতি থেকে বের হয়ে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখবে এবং সিমেন্ট শিল্পের আগের যে প্রবণতা ছিল সেখানে আমরা ফিরে যাব।

দেশে কোন খাতে কী হারে সিমেন্ট ব্যবহার হয়?

সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে ৩৫-৪০ শতাংশ সিমেন্ট ব্যবহার হয়। সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ব্যক্তি পর্যায়ের নির্মাণকাজে। তাছাড়া আবাসন খাতেও সিমেন্টের ব্যবহার হয়। মাথাপিছু আয় যত বাড়ে মানুষ তত বেশি জীবনমান উন্নয়নে অর্থ খরচ করে। এক্ষেত্রে বাসস্থান নির্মাণে সিমেন্টের ভোগও বেড়ে যায়।

মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে। ফলে সিমেন্টের চাহিদার ক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়েছে?

দুই বছর আগেও আমাদের মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে ছিল, যেটা বর্তমানে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও কিছুটা শ্লথগতি দেখা যাচ্ছে। তিন বছর ধরে সিমেন্ট শিল্পে প্রবৃদ্ধি না হওয়ার পেছনে এ বিষয়গুলোও অবদান রেখেছে।

সরকারের রাজস্ব নীতি নিয়ে সিমেন্ট খাতসংশ্লিষ্টরা বেশ কয়েক বছর ধরে সোচ্চার। বিশেষ করে অগ্রিম আয়কর, কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো এ শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে দাবি করছেন খাতটির উদ্যোক্তারা। 

আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ে আপনাদের প্রত্যাশার বিষয়ে জানতে চাই।

সিমেন্ট তৈরির মূল কাঁচামাল হচ্ছে ক্লিংকার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে ক্লিংকার আমদানির ওপর শুল্ক টনপ্রতি ৫০০ থেকে কমিয়ে ২০০ টাকা নির্ধারণে আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু বাজেটে এটি বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে সামনের বাজেটে কিংবা তারও আগে এটি কমিয়ে ২০০ টাকায় নির্ধারণ করা হোক। অগ্রিম আয়করের ক্ষেত্রে ক্লিংকার আমদানির সময় প্রতি টনে ৫ শতাংশ, ফ্লাই অ্যাশ ও স্লাগের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ এবং জিপসাম ও লাইমস্টোনের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ করে কেটে রাখা হয়। আমরা দাবি করেছিলাম ভিন্ন ভিন্ন হারে না দিয়ে গড়ে দশমিক ৫ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর নির্ধারণে। কিন্তু আমাদের এ দাবিগুলো এখন পর্যন্ত মানা হয়নি। আবার বিক্রির ওপরও ২ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর রয়েছে। এটিও সিমেন্ট শিল্পের জন্য একটি প্রতিবন্ধকতা। কোম্পানিগুলোর মুনাফা করার জন্য নয় বরং মানুষ যাতে সুলভে গৃহ নির্মাণ করতে পারে তার জন্য কর ও শুল্কে সরকার ছাড় দেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। সিমেন্ট শিল্পের টিকে থাকার জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজন। আমাদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। আমরা চাইছি করছাড়ের মাধ্যমে যাতে মানুষের কাছে সুলভ মূল্যে সিমেন্ট সরবরাহ করা যায়।

সামনের দিনগুলোয় দেশের সিমেন্ট খাত কেমন যাবে বলে মনে করছেন?

দীর্ঘমেয়াদে পূর্বাভাস দেয়াটা বেশ কঠিন। বিশেষ করে বৈশ্বিক এ অস্থিরতার সময়ে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। তবে আমি মনে করি, আমরা কঠিন সময়ের ৭০ শতাংশ পথ অতিক্রম করে ফেলেছি। সামনে ৩০ শতাংশ পথ পাড়ি দিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা প্রয়োজন।

আমান সিমেন্টের উৎপাদন সক্ষমতা ও ব্যবসার বিষয়ে জানতে চাই। আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

বাংলাদেশে যেসব সিমেন্ট কারখানা রয়েছে, তার মধ্যে আমান সিমেন্টের দ্বিতীয় ইউনিটে সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ইউনিটটির সক্ষমতা বার্ষিক ৩৬ লাখ টন। প্রথম ইউনিট নামে আমাদের আরেকটি কারখানা আছে। এটি অনেক আগে স্থাপন করা হয়েছিল। আমাদের কারখানায় শ্রমিক-কর্মচারী মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে সর্বোচ্চ গুণগত মানের সিমেন্ট সহনীয় মূল্যে ভোক্তার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়া। সর্বোচ্চ গুণগত মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে আমরা এখন পর্যন্ত সফল হয়েছি। এর আগে সংকটকালেও আমরা ভালো করেছি। আমরা এখনো হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোচ্ছি। আশা করছি এ চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করে ভালো অবস্থানে যেতে পারব। আমরা একটা সময় সিমেন্ট খাতের শীর্ষ ১০ কোম্পানির তালিকার বাইরে ছিলাম। সেখান থেকে বর্তমানে আমরা নবম স্থানে উঠে এসেছি। আশা করছি, অতি শিগগিরই আমান সিমেন্ট শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির তালিকায় স্থান করে নেবে।

ভবিষ্যতে উৎপাদন সক্ষমতা আরো বাড়ানোর সম্ভাবনা আছে কি?

আমান ইকোনমিক জোনের মধ্যে আমাদের দ্বিতীয় ইউনিটটি অবস্থিত। এর আশপাশে অনেক জায়গা আছে। ফলে ভবিষ্যতে চাইলে সেখানে কারখানা সম্প্রসারণ করা যাবে। আমাদের যাবতীয় পরিকল্পনা দ্বিতীয় ইউনিটকে ঘিরে।

সিমেন্ট খাতে আপনাদের বিনিয়োগের পরিমাণ কত?

আমাদের এখানে বেশ বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। তবে আমরা যে পরিমাণ বিনিয়োগ করেছি তার তুলনায় খুব বেশি রিটার্ন আসেনি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, ক্রেতাদের কাছে সুলভে মানসম্পন্ন সিমেন্ট সরবরাহের মাধ্যমে বাজারে নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করা।