২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট তৈরি করা হয়েছে সেই বাজেটে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়েছে তা হলো সিমেন্ট খাতে  আমদানি শুল্কের বড় ধরনের পরিবর্তন। যদিও উৎপাদন খাতে শিল্পের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক আমদানি পর্যায়ে ৫ শতাংশের বেশি হওয়া খুবই দুঃখজনক। সিমেন্টের মূল উপাদান ক্লিংকার আমদানি পর্যায়ে প্রতি টন ৭০০ টাকা ধার্য করা হয়েছে, যা আগে ছিল ৫০০ টাকা। শিল্পের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশের ওপরে হলে ওই শিল্প ফিজিবল হয় না। আগে যখন ৫০০ টাকা ছিল, তখন আমদানি শুল্ক ছিল ৯ শতাংশের বেশি। আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম এবং আশ্বস্ত করা হয়েছিল এমনটি থাকবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয় সংশোধন তো হয়ইনি বরং চলতি অর্থবছরে তা  বাড়িয়ে দেয়া হলো, যা এখন প্রায় ১১ শতাংশ। পাশাপাশি প্রতি টন ৬০ ডলার হিসেবে শুল্কায়িত হচ্ছে এবং ডলারের মূল্য ধরা হচ্ছে ১১০ টাকা। শুল্ক যত বেশি হবে তার সঙ্গে ভ্যাট এবং অন্যান্য ট্যাক্স গাণিতিক হারে বেড়ে যাবে, যা এ শিল্পের টিকে থাকা দুরূহ করে তুলবে। বিদ্যমান ৭০০ টাকা প্রতি টন শুল্কায়িত হওয়ার কারণে প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের উৎপাদন খরচ ১৫ টাকা বেড়েছে। মূল্যবৃদ্ধির কারণে সিমেন্টের চাহিদা নিঃসন্দেহে কমে যাবে। বর্তমানে ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে খুবই কঠিন অবস্থা বিরাজ করছে। তদুপরি অতিরিক্ত শুল্ক এ শিল্পের জন্য অনেক বেশি ক্ষতি করছে। এতে আবাসন ব্যবস্থা থমকে দাঁড়াবে এবং পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে কয়েক লক্ষাধিক শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 

সিমেন্ট উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপে পড়ছে। এমনিতেই গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ সমস্যা বিরাজমান থাকায় উৎপাদন ব্যাপক ব্যাহত হচ্ছে। বর্ধিত জ্বালানি মূল্যের কারণে উৎপাদন পর্যায়ে এবং পরিবহন খাতে ব্যাপক খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি অর্থবছরে গত সাত মাসে সিমেন্টের চাহিদা গড়ে সাড়ে ৪ শতাংশ কমে গেছে। অতিরিক্ত শুল্কায়নের বাইরেও আরো আগে থেকেই এ শিল্পে  দ্বৈত কর বিদ্যমান। অগ্রিম  আয়কর (এআইটি) উৎসে কেটে রাখা হচ্ছে, যা চূড়ান্ত দায় হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি টন ৪৩ ডলারে ক্লিংকার আমদানি করা হচ্ছে অথচ শুল্কায়ন হচ্ছে ৬০ ডলারের ওপর, যা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। সিমেন্ট শিল্পে মুনাফা না করলেও আয়কর দিতে হচ্ছে, যা বিশ্বে বিরল।

ডলারের বর্তমান মূল্য ক্ষেত্রবিশেষে ১২৩ থেকে ১২৫ টাকা। প্রকৃত অর্থে ডলার সংগ্রহ করতে হচ্ছে ব্যাংক এবং রফতানিকারকের সমন্বয়ে। কাজটি করতে গিয়ে অতিরিক্ত পুঁজির প্রয়োজন হচ্ছে। তাছাড়া ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রার মূল্যের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করে যেতে হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি হওয়ার কারণে কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি করতে হয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। এ অবস্থায় অতিরিক্ত শুল্কায়ন এবং আয়করে চূড়ান্ত দায় দুটোই অতিরিক্ত বোঝা, যা এ শিল্পকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। 

দেশে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪০টি সিমেন্ট কারখানা চালু রয়েছে। এ খাতে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর এ শিল্পের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯ কোটি ২০ লাখ টন, এর বিপরীতে বাজারে চাহিদা রয়েছে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন। বোঝাই যাচ্ছে বাজারে কী ধরনের প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। এ অবস্থায়ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নতুন সিমেন্ট কারখানা করার সুযোগ দিচ্ছে, যা নিকট ভবিষ্যতে চরম অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। কারণ বাজার গবেষণা না করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত উদ্যোক্তা ও ব্যাংক উভয়কেই বিপদে ফেলতে পারে।

এমনিতেই সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের নীতির কারণে অবকাঠামো খাতে ব্যাপক সংকোচন হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে এবং অতিরিক্ত শুল্কায়ন ও করারোপের কারণে পণ্যের মূল্য বেড়েছে। ফলে বেসরকারি খাতে নির্মাণ ব্যয় বাড়ার কারণে অনেকাংশেই নতুন নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।