অকস্মাৎ সেই ভয়াল রাত্রি ২৫ মার্চ সমগ্র বাঙালি জাতির ওপর নেমে আসে। ওই সময়ে সৈয়দ আমীর আলী হলের প্রাধ্যক্ষ হিসেবে হলটির প্রাধ্যক্ষ ভবনে আমরা বসবাস করছিলাম। আমার ছেলে বিপুল বেশ কয়েক দিন ধরে টায়ফয়েডে ভুগছিল। আমি তার সঙ্গে রাতে শুয়েছিলাম। আমার স্ত্রী আমার মা ও মেয়েদের নিয়ে পাশের ঘরে ছিল। তার মৃদু ঝাঁকুনিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল; সে জানালার দিকে ইশারা করল। আমি উঠে দেখলাম, আমার বাসার উত্তরের দেয়ালঘেঁষে বেশকিছু সৈন্য; তারা গুলি করছে স্টেশনের দিকে; আর একটু ভালো করে দেখার চেষ্টা করলে দেখতে পাই, একজন লোক গুলি এড়িয়ে উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে আসছে। কিছুক্ষণ পর তিনি রাস্তার পাশের ড্রেনে নেমে যান এবং ধীরে ধীরে আমাদের বাসার দিকে আসতে থাকেন। সৈন্যদের কাছে এসে তিনি দুহাত তুলে দাঁড়ান। তখন বুঝতে পারি, তিনি আমার বন্ধু ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ড. সিরাজুল আরেফিন। ভোরবেলা হাঁটা তার অভ্যাস। পারিপার্শ্বিক অবস্থা বোঝার আগে অভ্যাসমতো প্রাতর্ভ্রমণে বেরিয়েছেন এবং গুলির মধ্যে পড়ে গেছেন। সৈন্যরা তার অবস্থা বুঝতে পেরে চলে যেতে বলে এবং তিনি দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।
ধীরে ধীরে বিভিন্ন দিকে তাকানোর চেষ্টা করি, যাতে অবস্থা উপলব্ধি করা সম্ভব হয়। বেশ কিছুদিন ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলন চলছে। আমি সবচেয়ে বড় হলের প্রাধ্যক্ষ; সুতরাং আমার হলে এবং ইউনিট এক ও দুইয়ের [অনেকগুলো টিনের ঘরের সমন্বয়ে গঠিত অস্থায়ী ছাত্রাবাসদ্বয়ের একটিতে মুসলমান (ইউনিট এক) ও অন্যটিতে হিন্দু (ইউনিট দুই) ছাত্র থাকত] সর্বত্র কালো পতাকার সমাবেশ। আমার বাসার ওপরও কালো পতাকা। আমার বাসার দক্ষিণে আব্দুল লতিফ হলের প্রাধ্যক্ষ, আইন বিভাগের ড. আব্দুল হকের বাসা। সেখানেও কালো পতাকার ছড়াছড়ি। পাকিস্তানি সৈন্যরা রাস্তায় টহল দিতে দিতে আড়চোখে পতাকাগুলোর দিকে তাকাচ্ছে। দিন-রাত সব সময়ের জন্য কারফিউ। সাহস করে কে বাসার ওপর উঠে পতাকা নামানোর চেষ্টা করবে? কালো পতাকাগুলো উড়ছে এবং বাড়ির ভেতর আমরা ভয়ে ভয়ে কালক্ষেপণ করছি এবং আশঙ্কা করছি, কখন সৈন্যরা বাসায় ঢোকার চেষ্টা করে।
এভাবে ২৬ তারিখ গোটা দিন ও ২৭ তারিখের দুপুর পর্যন্ত কারফিউ জারি থাকে। দুপুরের দিকে সান্ধ্য আইন শিথিল করা হয়। এর মধ্যে আমি ড. আব্দুর রফিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এবং ঠিক করেছি যে সান্ধ্য আইন শিথিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তার গাড়িতে বাসা ত্যাগ করে পশ্চিমপাড়ায় চলে যাব। আমার বৃদ্ধ মা এত ঘাবড়িয়ে গিয়েছিলেন যে তিনি কিছুতেই নিজে দোতালা থেকে নামতে পারছিলেন না। আমি তাকে প্রায় ঘাড়ে করে নিচে নামাই এবং আমরা সবাই বাড়ি ছেড়ে ড. আলী ইউনুস সাহেবের বাসায় আশ্রয় নিই। এই যে আমি নিজ বাসা থেকে বের হলাম আর কখনো সেখানে ফিরে যেতে পারিনি। ড. ইউনুসের বাসায় এক রাত ছিলাম। পরদিন তার বাসার কাছেই অধ্যাপক সালাহ উদ্দিন সাহেবের বাসা খালি। তিনি ঢাকায়; তার একজন কাজের ছেলে ছিল, তাকে বলে নিচ তলায় আমরা বাসা বাঁধলাম। সালাউদ্দিন সাহেবের বাসাটি ডুপ্লেক্স অর্থাৎ দোতলায় শোয়ার তিনটি ঘর এবং নিচের তলায় একটি বড় ঘর যেটি বসা ও খাওয়ার ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হতো, একটি ছোট্ট অতিথি ঘর, রান্নার ঘর এবং গ্যারেজ। ওপরের ঘরগুলো তালাবন্ধ; আমরা সেদিকে না গিয়ে নিচের বড় ঘরটিতে থাকার ব্যবস্থা করলাম।
শহরের নানা ঘটনার কথা কানে আসছিল। রাজশাহীতে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ছোট ক্যান্টনমেন্ট উপশহর এলাকায় ছিল। যতদূর মনে পড়ে, এতে ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ারদের প্রাধান্য বেশি ছিল। সৈন্য সংখ্যা ছিল কম। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ সেই অসহযোগ আন্দোলনের কাল থেকে। প্রাধ্যক্ষ পদে বহাল থাকলেও আমার বিশেষ কোনো কাজ ছিল না। ছাত্ররা যে যার বাড়িতে চলে গেছে। লোকজন স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছে, দোকানপাট খোলা; আমরা নিয়মিত মাইনা পাচ্ছি, অথচ বিশেষ কোনো কাজ নেই। একবার মনে হলো ক্যাম্পাস ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাই। কারণ ওই সময়ে অনেকে ক্যাম্পাস ছেড়ে গ্রামাঞ্চলে বা নিজ নিজ বাড়িতে চলে যাচ্ছিল। এর মধ্যে ফজলুল হালিম চৌধুরী সপরিবারে ক্যাম্পাসের উত্তরে ১০/১২ মাইল দূরে বখতিয়ারপুরে চলে গেলেন। তিনি গেলেন মনোয়ার হোসেন সাহেবের এক আত্মীয়ের বাড়িতে, যেখানে কয়েক দিন আগেই মনোয়ার সাহেব সপরিবারে আশ্রয় নিয়েছেন। মুশাররফ সাহেবও চলে গেলেন ওই অঞ্চলে—মনোয়ার সাহেবদের আশ্রয়স্থলের কাছেই একটি স্কুলে। সঙ্গে স্ত্রী ও দুই ছেলে। কয়েক দিন পর শুনলাম, সিদ্দিকী সাহেব সপরিবারে নাটোরের দিকে চলে গেছেন। ফজলুল হালিম চৌধুরী ক্যাম্পাস ছাড়ার আগে আমাদের বাসায় এসে বলে গেলেন যে তিনি যাচ্ছেন, আমিও যেন কোনো এক জায়গায় চলে যাই।
ক্যাম্পাসের পশ্চিমপাড়ায় আমি একা হয়ে পড়লাম। হাবিব সাহেব মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ব্যস্ত। তিনি কিন্তু আমাদের ক্যাম্পাস ছেড়ে না যাওয়ার জন্য সজোরে মত দিলেন। সালাহউদ্দিন সাহেবের বাসার উত্তরে তিনতলা দালানে আলী আনোয়ার আশ্রয় নিয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের গোলাম মুরশীদ সাহেবের বাসায়। একদিন দেখা গেল, তারাও ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেছেন। যদিও রাজশাহী মুক্ত অঞ্চল, তবুও অনেকে নিরাপদ মনে করছেন না। কারণ প্রতি রাতে মর্টারের শব্দে ঘুম ভেঙে যেত। খবর নিয়ে জানা গেল, পাকিস্তানি বাহিনী দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর ক্যান্টনমেন্টে শক্ত খুঁটি গেড়ে বসেছে। এমন সময় আরেফিন সাহেবের সঙ্গে দেখা, তিনি আমাকে পশ্চিমপাড়ায় একা না থেকে পূর্বপাড়ায় যেতে বললেন এবং তার বাসায় থাকার আমন্ত্রণ জানালেন। আরেফিন সাহেবের প্রস্তাবে একমত হয়ে আবার আমরা সালাহউদ্দিন সাহেবের বাসা থেকে পাততাড়ি গোটালাম। পাঠক অনায়াসে বুঝতে পারেন, এ সামান্য কয়েকদিনের মধ্যে আমাকে কতবার আস্তানা বদলাতে হলো। পূর্বপাড়ায় বেশকিছু বন্ধু ও সহকর্মীকে পাওয়া গেল। এদের মধ্যে হাসিবুল হোসেন, তার স্ত্রী আমাদের বিভাগীয় সহকর্মী জোন হোসেন, অর্থনীতি বিভাগের আব্দুর রহমান, জাফর রেজা খান (ভূগোল), পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ড. আব্দুর রকিব এবং তার ভায়রা ভাই ড. ফজলুল হক উল্লেখযোগ্য। আরেফিন সাহেব তো আছেনই। আব্দুর রহমান আমার রাজশাহী কলেজের ছাত্র। তার কাছে একই বিভাগের মু. ইউনুস আসতেন। তিনিও আমার রাজশাহী কলেজের ছাত্র। ওই সময় ইউনুস কোথায় থাকত—এখন সঠিক মনে করতে পারছি না।
ছাত্রছাত্রীদের অবর্তমানে ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছে অনেকখানি নির্জন, কর্মচাঞ্চল্যহীন এবং উদ্বেগহীন হলেও একঘেয়ে, নিরানন্দ। গোটা এলাকাটা এক এক সময়ে, বিশেষ করে আড্ডা মেরে বাড়ি ফেরার সময় খাঁ খাঁ লাগত। আগেই বলেছি, আমাদের দিন কাটত বেশকিছুটা সময় নিয়ে বিভাগীয় অফিসে সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে। দেশের খবরের নানা ভাষ্য যা সংগ্রহ করা হতো রেডিওর বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রচারণার মাধ্যমে। এপ্রিলের প্রথমার্ধে বোধ হয় ১০/১২ তারিখে সন্ধ্যায় রেডিও থেকে প্রচারিত হলো যে, পাকিস্তানি বাহিনী পাবনা দখল করে নিয়েছে। আমরা পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকালে ক্যাম্পাস ছাড়ব বলে প্রস্তুতি নিলাম। রাত্রে গরুর গাড়ির গাড়োয়ানকে খবর দেয়া হলো সকালেই যেন সে দুটি গাড়ি নিয়ে বাসায় আসে। কথামতো পরদিন সকালে গাড়ি দুটি এসে হাজির। আমাদের সঙ্গে আরেফিন সাহেবও যাবেন। আমরা ধীরে ধীরে রওনা হলাম।
আমরা বিকালের দিকে বখতিয়ারপুর হাই স্কুলে পৌঁছলাম। আমাদের আগেই বেশকিছু লোক ওই স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের মধ্যে এখলাস সাহেব ও তার পরিবার, সদর উদ্দিন চৌধুরী ও তার পরিবার, এক সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সালাহউদ্দিন ও তার বিরাট পরিবার—এদের নাম উল্লেখ করা যায়। এভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক, তাদের পরিবার ও অন্যান্য কর্মচারী বখতিয়ারপুর ও তৎসংলগ্ন নানা জায়গায় আশ্রয় নেন এরই মধ্যে ক্যাম্পাস থেকে প্রায় দৈনিক নানা সংবাদ আমাদের ক্যাম্পে আসা আরম্ভ করল। সংবাদ সংগ্রহে সবচেয়ে উৎসাহী ছিলেন এখলাস সাহেব, তার স্ত্রী এবং সদর উদ্দিন সাহেব। তাদের নিজস্ব লোক ছিল, যেমন পিয়ন ও অন্যান্য চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। তারা প্রতিদিন ক্যাম্পাস থেকে বখতিয়ারপুরে আসত এবং ক্যাম্পাসের খবরাখবর দিত। তাদের কাছে আমরা শুনলাম যে, হাজার হাজার মিলিটারি ক্যাম্পাস দখল করে নিয়েছে। প্রথম শোনা গেল যে, ১৩/১৪ এপ্রিলের সন্ধ্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই ডিভিশন সৈন্য ঢুকেছে। কারণ রাজশাহীর মতো অনুন্নত শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছাড়া অত বড় জায়গা, অত বড় বড় ছাত্রাবাস, অফিস, বাড়িঘর আর কোথাও নেই। সুতরাং পাকিস্তানি বাহিনী যুক্তিযুক্ত কারণে বিশ্ববিদ্যালয়কে অতি দ্রুত একটি ক্যান্টনমেন্টে রূপান্তর করল। প্রথম রাতেই তারা দুজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীকে হত্যা করে। তাদের রণমূর্তি সব মানুষের মনে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। কোনো কোনো অফিসার সোজা মতিউর রহমানের বাসায় গিয়ে হাজির হয় এবং এমন ভাব করে যেন এক ধরনের বন্দিত্ব দশা থেকে মতিউর রহমান ও তার পরিবারকে উদ্ধার করা হলো।
ছাত্রাবাসগুলোয় সেনাবাহিনীর থাকার ব্যবস্থা করা হলো। কোনো কোনো বাড়িতে তল্লাশি চালান হলো। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীসহ বিভিন্ন বাড়িতে সেনাবাহিনী তল্লাশি চালিয়েছিল—সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। মতিউর রহমান তাদের ঘনিষ্ঠতম সংগীতে পরিণত হলো। আমরা বখতিয়ারপুর থেকে শুনতে পেলাম যে হাবিব ভাইকে সবার আগে সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। এও শুনলাম যে, ক্যাম্পাস দখল করে নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করাকে সেনাবাহিনী একটি বিরাট বিজয় রূপে দেখছে। তাদের ধারণা, বিদ্রোহের মূল স্থল ক্যাম্পাস দখল করার অর্থ হলো শত্রুকে অনেকখানি ঘায়েল করা। এ বিজয় মূল্যবান এবং তা উদযাপন করা প্রয়োজন।
বখতিয়ারপুর ছেড়ে যেতে হবে—এ ধারণা ক্রমে দৃঢ় হতে লাগল। এমন সময়ে ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিকতম অবস্থা কী তা স্বচক্ষে দেখার জন্য আমরা কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে রওনা হলাম। আরেফিন সাহেবসহ আমি হাসিব ভাইয়ের বাসায় তাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। হাসিব সাহেবের কাছে ক্যাম্পাসের সব খবর পেলাম। তিনি বরাবর জোন ও তাদের মেয়েদের নিয়ে ক্যাম্পাসেই ছিলেন। সুতরাং তাদের কাছে পাক সেনাবাহিনী কীভাবে ক্যাম্পাসে ঢুকেছে তার সঠিক বর্ণনা পেলাম। পাকিস্তানি বাহিনী কামান ও মেশিনগানের মুহুর্মুহু গোলা বর্ষণ করে প্রবল গতিতে রাজশাহী শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। শত্রুর কবল থেকে নিজ রাজ্য পুনর্দখল করার জন্য যে সামরিক প্রস্তুতির দরকার তা তারা পরিপূর্ণভাবে নিয়েছিল। রাস্তার দুধারের বাড়িঘর ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং বহু লোকের মৃত্যু ঘটেছিল। হাসিব ভাই এমন অবস্থায় নিজ ফ্ল্যাটে থাকা নিরাপদ মনে না করে উপাচার্য সাহেবের সঙ্গে দেখা করে তার অনুমতি নিয়ে উপাচার্য ভবনসংলগ্ন পশ্চিম দিকের একটি প্রফেসর ভবনে সাময়িক উঠে এসেছিলেন। হাসিব ভাইয়ের একটা সুবিধা ছিল যে তার স্ত্রী জোন ব্রিটিশ নাগরিক। এর জোরে তিনি ক্যাম্পাস ছাড়েননি।
যখন আমাদের মধ্যকার বেশকিছু লোক ও তাদের পরিবার ক্যাম্পাসে ফিরে আসার জন্য ব্যাকুল, ঠিক তখনই উপাচার্য সাজ্জাদ সাহেব এপ্রিলের শেষ দিকে রেডিওর মাধ্যমে প্রচার করলেন যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পুনরাগমন ও তাদের বলিষ্ঠ হস্তক্ষেপে দেশে সব বিশৃঙ্খলা দূরীভূত এবং পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসগুলো খুলে দেয়া হয়েছে। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্যাম্পাসের বাইরে আছেন তাদের অবিলম্বে নিজ নিজ পদে যোগদানের অনুরোধ করা হলো। এ ঘোষণার পর আর আমাদের অফিসারদের ধরে রাখা সম্ভবপর হলো না। তাদের সঙ্গে আমরাও অনেক ভয়, দুশ্চিন্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সীমাহীন অনিশ্চয়তাবোধ নিয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে আসার জন্য প্রস্তুত হলাম। দুখানি বাস ভাড়া করা হলো এবং তাতে চড়ে আমরা ক্যাম্পাসে ফিরে এলাম। সময়টা বোধ হয় মে মাসের মাঝামাঝি।
বাহ্য জগতের সঙ্গে সম্পর্ক বা পরিচিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা হলে স্বাভাবিক কারণে ক্যাম্পাসে বসবাসরত বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী ও তাদের পরিবারের দিকে দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। কানে যেসব খবর আসতে লাগল তা যেমন নৃশংস ও লোমহর্ষক তেমনি অসীম বেদনায় পূর্ণ। আমাদের প্রিয় হাবিব ভাইকে মিলিটারিরা নিয়ে গেছে ক্যাম্পাসে ঢোকার পরপরই; এ পর্যন্ত তার কোনো খোঁজখবর নেই। সবাই আশঙ্কা করছে তাকে কোথাও হত্যা করা হয়েছে ও তার লাশ গায়েব করা হয়েছে।
এ সংগ্রাম যে একেবারে অসম তা বলা বাহুল্য। একদিকে শক্তিশালী সরকার কর্তৃক মদদপুষ্ট দুর্ধর্ষ পেশাদারি সেনাবাহিনী, অন্যদিকে অগণিত জনগণ, যাদের না আছে অর্থ-অস্ত্র বা সামরিক প্রশিক্ষণ। সামান্য কিছু পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং দল ত্যাগকারী সামরিক জোয়ান ও কর্মকর্তা ছাড়া যুদ্ধবিদ্যায় অভিজ্ঞ এমন আর কেউ নেই প্রতিদ্বন্দ্বী দলে। অস্ত্রের মধ্যে আছে কিছু পুরনো ৩০৩ রাইফেল আর ৩" মর্টার। কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তান সরকারের দীর্ঘকালীন অন্যায়-অবিচার, শাসন ও শোষণ, শঠতা ও মিথ্যাচরণ দেশটি এমনভাবে দ্বিধাবিভক্ত করেছে যে, একে অন্যকে শত্রু ছাড়া অন্য কোনোভাবে চিন্তা করতে পারে না। কোটি কোটি বাঙালি পাকিস্তান সরকার ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। তাদের অমোঘ অস্ত্র হচ্ছে এ ইস্পাত কঠিন ঐক্যবোধ, অমলিন দেশপ্রেম এবং জুলুমবাজদের বিরুদ্ধে পবিত্র মানবতাবোধপ্রসূত দৃঢ় ও অসীম প্রতিরোধ স্পৃহা।
আমাদের দেহ আছে কিন্তু মন মরে গেছে। প্রতিদিন মৃত্যুচিন্তা ও আতঙ্কে শরীর অবশ হয়ে থাকে। প্রতিদিন সকালে বিভাগে যাই; গোটা রাস্তাটা দোয়া ইউনুস পড়তে পড়তে পার হই। মিলিটারি দেখলে রাস্তার পাশে সরে যাই। ততোধিক ভয় করি তাদের চর-অনুচরদের-উর্দুভাষাভাষী এককালের সহকর্মীদের, এখন আমাদের তদারককারীদের আর তাদের অনুগত দালালদের। বস্তুত মিলিটারিদের অনেক সময় দেখা যায় না। কিন্তু এরা আমাদের সবসময় ঘিরে রয়েছে। এদেরই ভয় বেশি। আমরা যতই মাথা নত করে চলি, ততই তারা আমাদের সন্দেহ করে। এ রকম পরিবেশে একদিন বিভাগে যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি মনোবিজ্ঞানের মতিউর রহমান আমার দিকে জোরে জোরে হেঁটে আসছে। কাছে এসে ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করে: ‘ভাই, তুমি আমাকে দেখলে এড়িয়ে যাও কেন? কেন কাচুমাচু কর?’ আমি অপ্রস্তুত হওয়ার ভান করি এবং সে যে আমার আপনজন তা বোঝানোর জন্য যতদূর সম্ভব ভাষা ও হাসির আশ্রয় নিই। মন যখন নানা ভয়ে ভরা, মুখ যখন বিরস তখন চেষ্টা করে খুশির হাসি ফোটানো যায় না।
এখানে হাসিবুল হোসেন অর্থাৎ আমাদের হাসিব ভাই সম্পর্কে কিছু বলা প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের সহকর্মী ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপিকা জোন হোসেনের স্বামী এবং নিজে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। হাসিব ভাই অত্যন্ত সাহসী ও স্পষ্ট বক্তা ছিলেন। বিস্ময়ের সঙ্গে দেখতাম, তিনি অনর্গল খান সেনাদের কার্যকলাপের নিন্দা করতেন এবং এ কথা প্রায় বলতেন যে, নিরীহ জনগণের ওপর এ অত্যাচারের অবসান অবশ্যম্ভাবী এবং গণহত্যাকারীরা শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না। হাসিব ভাই বয়সে আমার অনেক বড়; তার এ মানবপ্রেম ও দৃঢ় প্রত্যয়পূর্ণ আশাবাদে আমরা নিরন্তর সিক্ত হতাম।
[আমানুল্লাহ্ আহমদ (১৯৩১-২০১৭): প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাজ্যের লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথম জীবনে রংপুর কারমাইকেল কলেজ ও রাজশাহী কলেজে ইংরেজি পড়িয়েছেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৮৫-৮৮ সময়পর্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও ১৯৮৮-৯২ সময়পর্বে উপাচার্য ছিলেন। তাঁর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস: অবরুদ্ধ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাকা, ২০০৮) থেকে বর্তমান রচনাংশটি সংকলিত; শিরোনামটি আমাদের দেওয়া।]





