বর্তমান যুগে কর্মজীবী নারীদের ঘরে-বাইরে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে প্রায় হিমশিম খেতে হয়। এরই মধ্যে রান্না সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অত্যাবশ্যকীয় কাজ। দৈনন্দিন জীবনে যার জন্য আমাদের সময়ের এক বিশাল অংশ ব্যয় করতে হয় রান্নাঘরে। সারাদিন কর্মব্যস্ত থাকার পর যদি বাড়িতে এসে রান্নাঘরেও অনেকটা সময় চলে যায়, তাহলে অবসর বলতে দৈনন্দিন জীবনে কিছু থাকে না। এতে অবসাদ ও বিষণ্নতা তৈরি হতে পারে। এজন্য চাই স্মার্ট কিচেন। প্রচলিত ধারণামতে, স্মার্ট কিচেন বলতে আমরা সেই রান্নাঘরকে বোঝাই যাতে রান্নার সব সরঞ্জাম ও উপকরণ সুন্দরভাবে গোছানো ও হাতের নাগালে থাকে, কারো সাহায্য ছাড়াই যেখানে বিভিন্ন ধরনের কাজ একাই খুব সহজে কম সময়ে সুন্দরভাবে ও সুচারু রূপে সম্পন্ন করা যায়। আর রান্নাঘরটি হওয়া চাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। রান্নাঘরে যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস যাতায়াত করতে পারে এজন্য থাকতে হবে জানালা দরজা। রান্নাঘরে যাতে তেল চিটচিটে ভাব না হয় সেজন্য থাকতে হবে এক্সস্ট ফ্যান, কিচেন হুড। এছাড়া কিচেন ক্লিনার, জার্ম ও ইনসেক্ট কিলারও রাখতে হবে। তবে বর্তমানে স্মার্ট কিচেনের সংজ্ঞা আরো বিস্তৃতি লাভ করেছে। অর্থাৎ স্মার্ট কিচেনের সরঞ্জামগুলোকে স্মার্ট মোবাইলের অ্যাপের মাধ্যমে কিচেনের বাইরে থেকেও পরিচালনা করা যায়। 

মহিলাদের পাশাপাশি বাড়ির পুরুষরাও অনেকেই চান রান্নাঘরে যেয়ে পছন্দের কিছু রান্না করতে। কিন্তু হাতের কাছে সবকিছু থাকলে তবেই তো ইচ্ছেমতো পছন্দের কিছু রান্না করতে পারবে, তাই রান্নাঘরটি হওয়া চাই যেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, তেমনি সবকিছু থাকবে হাতের নাগালে। যেমন হলুদ, মরিচ, ধনিয়া, জিরা ইত্যাদি যত রকমের মসলা আছে, প্রতিটি মসলার কৌটায় নাম লিখে ট্যাগ লাগানো থাকলে যে মসলা দরকার তা খুঁজে পেতে একদম দেরি হবে না। একই রকমভাবে বিভিন্ন ধরনের ডাল, চা পাতা, গরমমসলা, চিনি, লবণ ইত্যাদি কৌটার গায়ে ট্যাগ লাগিয়ে ক্যাবিনেটে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা যায়। রান্নাঘরে তাকের ওপর এক পাশে মাটি, সিরামিক অথবা প্লাস্টিকের কন্টেইনারে রাখা যায় বড় চামচ, হাতা, খুন্তি, স্প্যাচুলা ইত্যাদি আর স্পুন হোল্ডারে থাকবে ছোট-বড় বিভিন্ন সাইজের চামচ, নাইফ হোল্ডারে থাকবে বিভিন্ন টাইপের ছুরি আর পাশেই থাকবে চপিং বোর্ড, টিস্যু হোল্ডার ইত্যাদি। যদি বাসায় মাইক্রোওয়েভ ওভেন, রাইস কুকার, প্রেসার কুকার, কারি কুকার, ইনফ্রা রেড ইলেকট্রিক কুকার, ইলেকট্রিক ওভেন, ইলেকট্রিক টোস্টার, গ্রিলার, এয়ার ফ্রায়ার, স্টিমার, ব্লেন্ডার, রেফ্রিজারেটর, ডিপ ফ্রিজ, ডিশ ওয়াশার ইত্যাদি থাকে তাহলে সেগুলো রান্নাঘরেই সাজিয়ে রাখা যায়। এছাড়া ভেজিটেবল কাটার, পিলার, বিটার ইত্যাদি উপকরণ থাকতে পারে, যা আমাদের কাজকে আরো সহজ করে দেয়। আপনি যখন যে জিনিস চাচ্ছেন সবই হাতের নাগালে পেয়ে যাবেন। 

কাজ করার সঙ্গে সঙ্গেই যাতে রান্নাঘর ও রান্নার সরঞ্জামগুলোকে পরিষ্কার করা হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। না হলে রান্নার উপকরণ ও সরঞ্জামগুলো দ্রুত অকেজো হয়ে যাবে ও পরবর্তী সময়ে রান্নাঘর ব্যবহারের সময় কালক্ষেপণ হবে ও অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে। রান্নার সরঞ্জামগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। উচ্ছিষ্ট ফেলার জন্য পলিথিন ব্যাগসহ ঢাকনাসহ বিন থাকতে হবে। দুর্ঘটনা এড়াতে যথাযথ ব্যবস্থা থাকতে হবে। 

শুধু প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সরঞ্জাম ব্যবহার করলেই হবে না। ওইসব সরঞ্জাম ব্যবহার করে কীভাবে কতটুকু সময়ে কী কী ধরনের রান্না করা যায় সেটাও আমাদের জানা দরকার। যেমন বিকালে কোনো গেস্ট এলে আর তাদের সঙ্গে ছোট বাচ্চা থাকলে তাদের জন্য এয়ারফ্রায়ারে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস, সসেজ, কাটলেট, চপ, নাগেট, চিকেন বল, চিকেন স্ট্রিপ, কাবাব, শিঙাড়া ইত্যাদি ফ্রোজেন ফুড তৈরি করা যায়। লাঞ্চ বা ডিনারে কারি কুকার, রাইস কুকার, মাইক্রোওভেন এগুলোর যেকোনো একটিতে খুব অল্প সময়ের মধ্যে পোলাও, খিচুড়ি, বিরিয়ানি, মাছ, মাংস ইত্যাদি পরিবেশন করা যায়। বাইরে থেকে এসে এ গরমে চট জলদি ব্লেন্ডারে লাচ্ছি, স্মুদি, মিল্কশেক, ম্যাংগোশেক বা যেকোনো ড্রিংকস বানিয়ে ফেলা যায়। স্টিমারে মোমো, সুশি, ডাম্পলিং, ইডলি, যেকোনো ধরনের পিঠা বানিয়ে পরিবেশন করা যায়। ইলেকট্রিক ওভেনে খুব সহজে কেক, পেস্ট্রি, পিজ্জা পাই, ব্রেড, বান, বিস্কুট ইত্যাদি তৈরি করা যায়।

রান্নার কৌশলের বিবর্তনের ধারাকে বোঝার জন্য আমরা একটু পেছন ফিরে তাকাই। আগুন আবিষ্কারের পর থেকেই যুগে যুগে রান্নার কৌশলে আমূল পরিবর্তন এসেছে। আদিম যুগে আগুনে ঝলসে রান্না হতো। পরবর্তী সময়ে খড়ি, ভুসি ও ঘুঁটের চুলায় রান্না হতো। ধীরে ধীরে কেরোসিন, গ্যাস, হিটারে রান্নার প্রচলন শুরু হয়। বর্তমানে প্রযুক্তির উৎকর্ষের উপহার হিসেবে আমরা পেয়েছি ইলেকট্রিক ওভেন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, রাইস কুকার, কারি কুকার, প্রেশার কুকার, ইন্ডাকশন কুকার, স্টিমার ইত্যাদি যা আমাদের রান্নার অভিজ্ঞতাকে করেছে আরো সমৃদ্ধ।

একসময় ঝড়-বৃষ্টি বা অন্ধকার রাত উপেক্ষা করে খাবার রান্না বা গরম করার জন্য ঘর থেকে বেশকিছুটা দূরে হেঁশেলে খড়ির চুলা জ্বালাতে হতো। আর বর্তমানে দিন বা রাতের যেকোনো সময় কয়েক সেকেন্ডে আমরা খাবার গরম করতে পারি এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই যেকোনো খাবার চটজলদি রান্না করে গরম গরম পরিবেশন করতে পারি।

কাজ সহজ করা ও ভিন্ন স্বাদের খাবার রান্নার জন্য রাইস কুকার, প্রেশার কুকার, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ইলেকট্রিক ওভেন, কারি কুকার ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। এ যন্ত্রগুলোর প্রত্যেকটির মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন খাবার তৈরি করা যায়। অনেকেরই সব ধরনের অ্যাপ্লায়েন্স থাকে না। তাই বলে কি তারা ভিন্ন স্বাদের খাবার তৈরি করতে পারবে না?

সময় নামক পাগলা ঘোড়াটি যে রকম বেসামাল গতিতে ছুটে চলেছে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমাদের জীবন ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে। সোনার হরিণের মতো সময় আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছুটে বেড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আমরা চাই কত কম সময়ে সহজে ও ঝামেলাহীনভাবে বেশি কাজ করা যায়। বহির্বিশ্বের মতো আমাদের দেশের নারী-পুরুষও পেশাগত জীবনে সমানতালে এগিয়ে চলেছে। আর তাই রান্নার কাজকে সহজ ও দ্রুত করার বিভিন্ন প্রযুক্তির আবিষ্কার আমাদের আধুনিক জীবনকে আরো গতিময় করেছে।

লেখক: রন্ধনবিদ; রাঁধুনি গুঁড়া মসলা আয়োজিত ‘‌সেরা রাঁধুনি’ প্রতিযোগিতার বিচারক। 

‘‌স্মার্ট কিচেন’ গ্রন্থের প্রণেতা