বাংলাদেশের কৃষি খাতের চাষবাস প্রক্রিয়াকে প্রাচীন থেকে আধুনিক যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষি ক্ষেত্রে একটি পদ্ধতিগত পরিবর্তন প্রচারের লক্ষ্য থেকে ২০০৭ সালে যাত্রা করে এসিআই মোটরস। শুরুতে জমি তৈরি ও উৎপাদনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কৃষি যন্ত্রপাতি—ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, রিপার, মিনি কম্বাইন হারভেস্টার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ইত্যাদি আমদানি, উৎপাদন ও যন্ত্রাংশ সংযোজনের কাজ করত এসিআই। ২০১৪ সালে সিএএসই কন্সট্রাকশন ইকুইপমেন্ট চালুর মাধ্যমে নির্মাণসামগ্রীতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি তৈরির শিল্পে প্রবেশ করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর দেশের অটোমোবাইল শিল্পে প্রবেশের লক্ষ্য নিয়ে ২০১৬ সালে এসিআই মোটরস বাংলাদেশে বিশ্বখ্যাত ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের পরিবেশক হয়ে ওঠে।
তখন ইয়ামাহার সম্পূর্ণ মোটরসাইকেল উচ্চ ট্যাক্স দিয়ে আমদানি করা হলেও ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এগিয়ে যাওয়ার জন্য দেশেই একটি অ্যাসেম্বলি কারখানা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়।
প্রায় আড়াই বছরের কর্মযজ্ঞ শেষে ১৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৯ সালে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বড়চালায় প্রায় ছয় একরের বিশাল জায়গাজুড়ে চালু করা হয় ইয়ামাহা মোটরসাইকেলে সিকেডি (কমপ্লিটলি নকডাউন) অ্যাসেম্বলি কারখানা। এ জাতীয় কারখানায় মূলত মূল পণ্যকে বিভিন্ন অংশে নিয়ে এসে জোড়া লাগিয়ে সম্পূর্ণ পণ্যটি প্রস্তুত করা হয়। অর্থাৎ টু-হুইলার মোটরসাইকেলের সম্পূর্ণ বডি ও ইঞ্জিন পৃথক পৃথক যন্ত্রাংশ আকারে আমদানি করে পরে জোড়া লাগানো হয়। ইয়ামাহার কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৬০ হাজার ইউনিট মোটরসাইকেল।
শিল্প খাতে নতুন করে বড় কারখানা চালুর বিষয়টি বাংলাদেশে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। কারখানা স্থাপনের জন্য বিশাল মূলধন সংস্থান ছিল একেবারে শুরুর চ্যালেঞ্জ। উদ্যোক্তারা ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারকদের কাছ থেকে ঋণ ও বিনিয়োগ সংগ্রহের চেষ্টা করেন। সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প ও প্রণোদনাও তারা কাজে লাগান। কারখানার কার্যক্রমের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহও অত্যন্ত জরুরি। উদ্যোক্তারা স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন সংগ্রহ করেন। কখনো কখনো বেসরকারি কোম্পানিরও সাহায্য নেয়া হয়েছে ইয়ামাহার কারখানা প্রতিষ্ঠায়। এছাড়া স্থানীয় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে চাকরি মেলা ও কর্মশালার আয়োজন করেন উদ্যোক্তারা। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রিন্সিপাল প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নেয়া হয়, যাতে কর্মীরা কারখানার প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। আর যন্ত্রপাতির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের বিভিন্ন মেশিনারি সরবরাহকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। মাঝে মাঝে বিদেশী মেশিনারির জন্য ট্রেড শো বা এক্সপোতে অংশ নিয়েও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির সন্ধান করা হয়। এসব ক্ষেত্রে বেশ ধৈর্য নিয়েই কাজ করেছেন উদ্যোক্তারা। বিভিন্ন ধরনের নেটওয়ার্কিং ও অংশীদারত্ব তৈরি করেছেন এবং সরকারের সাহায্য নেয়ার জন্য লবিংও করেছেন। বিশেষ করে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক দাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে, কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে তাদের সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছেন। এভাবে ধাপে ধাপে এবং কার্যকরভাবে তারা তাদের উদ্যোগ সফল করতে সক্ষম হন।
প্রতিষ্ঠাকালে কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১১৪, বর্তমানে ৩৭২ জন কাজ করছেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার শ্রমিক প্রত্যক্ষভাবে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। শ্রমিকদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও আর্থিক সুবিধা, চাকরির নিরাপত্তা প্রদান, কাজের উপযুক্ত শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতির ব্যবস্থা করা, গুরুতর অসুস্থ বা দুর্ঘটনার সম্মুখীন হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা, ব্যয়ভার বহন ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা, শ্রমিক-কর্মচারীদের বিনোদনের সুযোগ রাখা ইত্যাদির মাধ্যমে ইয়ামাহার কারখানা দেশের দক্ষ কর্মসংস্থানের জন্য আদর্শ জায়গা হয়ে উঠেছে। ইয়ামাহা মোটরস করপোরেশন জাপানের সরাসরি তত্ত্বাবধান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে কারখানার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠার শুরুতে কারখানার আয়তন ছিল মাত্র ৬২০ দশমিক ৯৯ শতাংশ, যা সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমানে প্রায় ৮০০ শতাংশ হয়েছে। শুরুতে একটা মাত্র প্রডাকশন শেডে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা হতো। বর্তমানে সাতটি শেডে উৎপাদন, সংযোজন, মজুদকরণ ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে; যার সম্মিলিত আয়তন প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার ২২০ বর্গফুট। দেশে মোটরসাইকেলের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় অদূরভবিষ্যতে কারখানার আয়তন আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তাদের।
ইয়ামাহা প্লান্টের বর্তমানে বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ১ লাখ ১০ হাজার ইউনিট মোটরসাইকেল। শিগগিরই বর্তমান মডেলগুলোর সঙ্গে আরো কয়েকটি নতুন মডেলের উৎপাদন শুরু করতে যাচ্ছে ইয়ামাহা। পাশাপাশি মোটরসাইকেলের কিছু যন্ত্রাংশ দেশে প্রস্তুতের পরিকল্পনাও রয়েছে, যা আগামী বছরগুলোয় বাস্তবায়ন করা হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গুণগত মান নির্ধারণ, সুরক্ষিত কর্মপরিবেশ এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নির্মূল ও এসিআই মোটরসের লক্ষ্য এবং এ উদ্দেশ্য নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন নিয়মিতভাবে চলমান রয়েছে।
এসিআই মোটরস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উদ্দেশে আধুনিক সব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে। যেমন পাইপ কাটিং, বেন্ডিং, ড্রিলিং, পাঞ্চিং, প্রেস মেশিন, ওয়েল্ডিং জিগ, মিগ ওয়েল্ডিং মেশিন, পেইন্টিং বুথ ও প্রিটিটমেন্ট লাইন। এছাড়া কারখানায় রয়েছে ডায়নামো মিটার, গুণগত মান নির্ণয়ের জন্য ইন্সপেকশন জিগ ও টুলস এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাড়তি আগুন নির্বাপণ ব্যবস্থা। এসিআই মোটরসের ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে কো-অর্ডিনেট মেজারিং মেশিন (সিএমএম), ইলেক্ট্রো স্ট্যাটিক ব্যালান্স, ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপ ইত্যাদি। প্রোগ্রামভিত্তিক পাইপ বেন্ডিং মেশিন, এয়ার প্লাগ গেজ, পিএলসি প্রোগ্রামভিত্তিক প্রিট্রিটমেন্ট লাইন, স্বয়ংক্রিয় ট্রান্সপোর্টার, পিএলসি প্রোগ্রামভিত্তিক কনভেয়র, হট ওয়াটার জেনারেটর চেসিস নাম্বার মার্কিং মেশিন, রেস বল প্রেসিং মেশিন, সুইং আর্ম বুশ প্রেসিং মেশিন, রোবটিক ফুয়েল ফিলিং মেশিন। এসব আধুনিক যন্ত্রপাতি এশিয়া, ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত দেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে।
ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানাটি ইয়ামাহা জাপানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় নির্মিত হয়েছে এবং উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে গুণমান নিশ্চিত করতে তাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা সরবরাহ করা হয়েছে। কারখানায় প্রথম ছয় মাস ইয়ামাহা স্যালুটো এবং ইয়ামাহা এফজেডএস ভার্সন ২–এ দুটি মডেলের বাইক যন্ত্রাংশ আমদানি করে অ্যাসেম্বল করা হতো, যা প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের বাজারে অনেকাংশেই কমিয়ে নিয়ে আসে। ছয় মাস পর থেকে কারখানায় এ দুই মডেলসহ পর্যায়ক্রমে ইয়ামাহার অন্য মডেলগুলোর যন্ত্রাংশ দেশেই তৈরি করে সংযোজন শুরু হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও সংযোজনের ফলে টু-হুইলারের খরচ কমানো সম্ভব হয়েছে, যা মূল্য প্রতিযোগিতায় সহায়তা করেছে। এ কারখানায় উৎপাদিত মোটরসাইকেলের মান ভারত ও জাপানের মতোই এক। ফলে দেশ-বিদেশের বাজারে উন্নতমানের মোটরসাইকেল সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে ১৫০ সিসি ইঞ্জিনের টু-হুইলার মোটরসাইকেল বিক্রিতে ইয়ামাহার বাজার অংশীদারত্ব ৩০ শতাংশের বেশি। এছাড়া মোটরসাইকেলের সম্পূর্ণ বাজারে ইয়ামাহার পণ্যের অংশীদারত্ব ১৫ শতাংশের বেশি।
কারখানা স্থাপনের পর বাজারে ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এসিআই মোটরস কারখানায় তাদের উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে দ্বিগুণ সক্ষমতায় পৌঁছায়। বর্তমানে ইয়ামাহা তাদের বিভিন্ন মডেলের মাধ্যমে ৭০ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি করছে প্রতি বছর। সারা দেশে গ্রাহকদের জন্য এসিআই মোটরস পরিচালিত ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের ৯৯টির বেশি থ্রিএস (বিক্রয়, পরিষেবা, খুচরা যন্ত্রাংশ) ডিলার পয়েন্ট রয়েছে। এসব পয়েন্ট থেকে বাইক ক্রয় ছাড়াও ইয়ামাহার গ্রাহকরা বাইক ওয়াশ থেকে শুরু করে মেরামতসংক্রান্ত অসংখ্য সেবা নিতে পারেন।
বর্তমানে বাংলাদেশে ইয়ামাহা ব্র্যান্ডের এফজেডএসভি-টু, এফজেডএসভি-থ্রি, এফজেডএসভি-ফোর, এফজেডএক্স, স্যালুটো—এ পাঁচটি মডেলের মোটরসাইকেল উৎপাদন, অ্যাসেম্বল ও বাজারজাত করা হচ্ছে। এর মধ্যে গতি, নিয়ন্ত্রণ ও নান্দনিক ডিজাইনের জন্য এফজেড সিরিজের মোটরসাইকেলগুলোই পুরো উপমহাদেশে বেশি জনপ্রিয়।
বাংলাদেশে এক দশক ধরে মোটরসাইকেলের বাজার বৃদ্ধির ফলে আগের চেয়েও বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। অচিরেই সে বাজারের আকার বার্ষিক ৬-৭ লাখ ইউনিট স্পর্শ করবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে পুরনো কিছু কোম্পানি বাজার থেকে ছিটকে পড়লেও ইয়ামাহার মতো জাপানি ব্র্যান্ড দেশে কারখানা স্থাপন করায় তাদের জনপ্রিয়তা আরো বৃদ্ধি পাবে, এমনটাই প্রত্যাশা উদ্যোক্তাদের।





