দেশের সিরামিকস পণ্যের চাহিদা এ শতাব্দীর শুরুর দশক পর্যন্ত অধিকাংশই ছিল আমদানিনির্ভর। পরবর্তী সময়ে দেশী কংলোমারেটরা এসব পণ্য উৎপাদনে আগ্রহ দেখাতে শুরু করলে বাজার পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে শুরু করে। বাজার চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আকিজ সিরামিকস বাংলাদেশের সেরা টাইলস ব্র্যান্ডগুলোর একটি হিসেবে ২০১২ সালে এ শিল্প খাতে প্রবেশ করে। ভোক্তাদের জন্য নিয়ে আসে বৈচিত্র্যপূর্ণ পণ্য। কঠোর পরিশ্রম এবং নিষ্ঠা আকিজ সিরামিকসকে বাংলাদেশের টাইলস শিল্পে একটি শীর্ষস্থানীয় অবস্থান অর্জন করতে সক্ষম করেছে। 

কারখানা বিবেচনায় দেশের চতুর্থ বৃহৎ শিল্প-কারখানা আকিজ সিরামিকসের। শুরুর দিকে একদিনে উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২০ হাজার বর্গমিটার, যা এখন উন্নীত হয়েছে এক লাখ বর্গমিটারে। কারখানাটি অবস্থিত ময়মনসিংহের ত্রিশালের মোক্ষপুরে। সিরামিক শিল্পের তিনটি পণ্য আকিজ বশির গ্রুপ বর্তমানে তৈরি করছে। সেগুলো হলো টাইলস, টেবিলওয়্যার ও স্যানিটারিওয়্যার। বর্তমানে আকিজ সিরামিকস গৃহস্থালি, বাণিজ্য ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার উপযোগী ওয়াল টাইলস, ফ্লোর টাইলস, পার্কিং ও ছাদের টাইলস ইত্যাদি উৎপাদন ও সরবরাহ করছে।

সিরামিকস পণ্যের মাঝে দৈনন্দিন গৃহস্থালিতে সবচেয়ে বড় জায়গাজুড়ে রয়েছে টেবিলওয়্যার বা খাবার টেবিলে নিত্যদিন ব্যবহার্য তৈজসপত্র। রাজকীয় নান্দনিকতার মিশেলে আকিজ টেবিলওয়্যার ব্র্যান্ডের মাধ্যমে গ্রাহকদের জন্য এসব সিরামিক পণ্য বাজারজাত শুরু করে আকিজ বশির গ্রুপ। প্রতিটি পণ্যই তৈরি হয় চিন্তাভাবনা করে পরিশীলিত আকারে, যেন ভোক্তার প্রতিদিনের খাবার গ্রহণের মুহূর্তটাকে নান্দনিকতায় সাজিয়ে দেয়।

আকিজের টেবিলওয়্যার কারখানা পেয়েছে এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় টেবিলওয়্যার ফ্যাক্টরির তকমা, যেখানে দৈনিক উৎপাদন হয় বর্তমানে ৪৫ টন। কেবল দেশে নয়, রফতানির ক্ষেত্রেও এগিয়ে রয়েছে আকিজ সিরামিকস। প্রতিষ্ঠানটি বছরে ১ লাখ ৩৫ হাজার পিস টেবিলওয়্যার রফতানি করে। গত দুই বছরে আকিজ সিরামিকস দেশের সর্ববৃহৎ টেবিলওয়্যার এক্সপোর্টার ছিল। 

নিজেদের কারখানায় শক্তিশালী গ্লাস ফিনিশ দিয়ে তৈরি করা হয় আকিজ টেবিলওয়্যারের পণ্যগুলো, যা স্থায়িত্ব ও মসৃণতাকে বাড়িয়ে দেয়। এমনভাবে প্যাকেটজাত করা হয়, যাতে পণ্য পরিবহন হয় অনেক সহজতর।

আকিজ টেবিলওয়্যারের পণ্যগুলো ভিট্রিফায়েড সিরামিকস দিয়ে তৈরি এবং দাগ-প্রতিরোধী, যা পণ্যকে পরিষ্কার করা ও অক্ষত রাখার বিষয়গুলো সহজ করে তোলে। এ টেবিলওয়্যারগুলো ভিন্ন তাপমাত্রা সহ্য করার ক্ষমতাসম্পন্ন। ফলে ফ্রিজার, এসি, ওভেন, মাইক্রোওয়েভ, ডিশওয়াশার ইত্যাদিতে নিরাপদে ব্যবহার করা যায় এবং তাপীয় শক ও চিপ (ভঙ্গুরতা বা ফাটল ধরা) প্রতিরোধী হওয়ায় সহজে নষ্ট হয় না। এসব বৈশিষ্ট্যই আকিজ টেবিলওয়্যারকে করেছে অনন্য এবং যেকোনো রান্নাঘরে ব্যবহারের জন্য করে তুলেছে উপযুক্ত। তাই গ্রাহক চাহিদাও বেড়েছে সমানতালে। 

আধুনিক জীবনযাপনে সহযোগী পণ্যগুলোর মাঝে বড় একটি জায়গাজুড়ে আছে স্যানিটারি ও বাথওয়্যার। শীর্ষস্থানীয় স্যানিটারিওয়্যার পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করে আকিজের স্যানিটারি ও বাথওয়্যার ব্র্যান্ড রোসা (ROSA)। পণ্য উৎপাদনে শুরু থেকেই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অগ্রাধিকার দিয়েছে আকিজ সিরামিকস, তার প্রমাণ পাওয়া যায় রোসা স্যানিটারিওয়্যারের ক্ষেত্রে। পণ্য তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহার করে থাকে অত্যাধুনিক রোবোটিকস প্রযুক্তি, যা খুবই বিদ্যুৎসাশ্রয়ী। আর সেই রোবোটিক কাস্টিং এবং স্প্রে করার প্রযুক্তিটি আমদানি করা হয়েছে ইতালির বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান SACMI থেকে। পাশাপাশি রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ডাবল ডেকার টানেল ভাটা বা চুল্লি, আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাব এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি। এ মুহূর্তে কারখানাটির উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক তিন হাজার ইউনিট।

স্যানিটারিওয়্যার ব্যবসার সফল যাত্রার ধারাবাহিকতায় রোসা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য ২০২২ সালে বাথওয়্যার পণ্য উৎপাদন শুরু করে। রোসা বাথওয়্যারের সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ইউনিটে দৈনিক আড়াই হাজার পিসের বেশি শীর্ষ গ্রেডসম্পন্ন বাথওয়্যার পণ্য তৈরি করা হয়। এ উৎপাদন কেন্দ্রটি স্বয়ংক্রিয় স্যান্ড কোর মেশিন, এলপিডিসি প্রযুক্তি, ৩৬০ ডিগ্রি ভিএমসি ও এইচএমসি মেশিন, রোবোটিক গ্রাইন্ডিং ও পলিশিং প্রযুক্তি, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ইলেকট্রোপ্লেটিং লাইন ও পিভিডি কোটিং প্রযুক্তি দিয়ে সজ্জিত। এর পাশাপাশি রোসা বাথওয়্যারে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাব, যা এখন পর্যন্ত দেশে একমাত্র তাদেরই রয়েছে। 

রোসা বাথওয়্যারের সবচেয়ে নান্দনিক নতুন নিদর্শন বিভিন্ন ডিজাইনের ফসেট। গৃহস্থালি, বাণিজ্যিক কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি যেকোনো জায়গার টয়লেট, ওয়াশরুম, বাথরুম ও কিচেনে ব্যবহারযোগ্য আন্তর্জাতিক মানের নান্দনিক ডিজাইনের ফসেট, সিংক, গিজার ইত্যাদি তৈরি করা হয় আকিজ সিরামিকসের রোসা ব্র্যান্ডের অধীনে। সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্পন্ন ও দেশী পণ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় রোসা ফসেট এখন মধ্যবিত্ত মানুষের ঘর ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান–সবখানেই শোভাবর্ধন করছে। অংশীদারত্বের দিক থেকে গত দুই বছরে রোসা ব্র্যান্ডের বিভিন্ন ডিজাইনের ফসেট বাজারে শীর্ষস্থান দখল করে রয়েছে।

টেবিলওয়্যার উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেক আগে থেকেই বেশ উন্নত। আকিজ বশির গ্রুপ বাজারে আসার পর তাদের মোট উৎপাদনের ৪০ শতাংশ বিদেশে রফতানি করা হচ্ছে। স্যানিটারিওয়্যারের পণ্য রফতানি আগে অবশ্য অতটা ভালো ছিল না, বরং আমদানিই করতে হতো। এক্ষেত্রে আকিজ বশির গ্রুপের স্যানিটারি পণ্য প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র ব্র্যান্ড হিসেবে ইউরোপের বাজারেও রফতানি হচ্ছে। টাইলসের ক্ষেত্রে তেমন কোনো রফতানি এখনো না হলেও আগামীতে এ পণ্যও রফতানির একটা সম্ভাবনা সম্প্রতি দেখা দিয়েছে।

পরিবেশের কথা মাথায় রেখে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কয়েক দফায় বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে আকিজ বশির গ্রুপ। এটি একটি জিরো গ্রাউন্ড ওয়াটার কোম্পানি। সিরামিক বানাতে গেলে প্রচুর গ্রাউন্ড ওয়াটার ব্যবহার করতে হয়। আকিজ সিরামিকস সেটা কমিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। এর মধ্যেই পানির ব্যবহার ৬০-৬৫ শতাংশ কমিয়ে ফেলেছে প্রতিষ্ঠানটি। বাকি ৪০ শতাংশ পানি সারফেস থেকে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের আরেকটি বড় উদাহরণ নবায়নযোগ্য এনার্জি অর্থাৎ সোলার এনার্জির ব্যবহার। নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতির মাধ্যমে আকিজ সিরামিকের জন্য সরবরাহ করা বিদ্যুতের উৎপাদন প্রায় ৩১ মেগাওয়াট পার আওয়ার, যা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সোলার সিস্টেম। ৭০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রায় জিরো গ্রাউন্ড ওয়াটার ও একই সময় মোস্ট অ্যাডভান্সড প্রযুক্তির সিরামিক কোম্পানি হিসেবে দেশে বর্তমানে একমাত্র নাম আকিজ সিরামিকস। 

নিজেদের ক্রমবর্ধমান উন্নতির স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত একটানা চারবার আকিজ সিরামিকস বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের আয়োজনে বেস্ট ব্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড অর্জন করছে। এছাড়া চলতি বছর আকিজ সিরামিকস ব্র্যান্ডিং শিল্পে বিশ্বের বৃহত্তম স্বাধীন পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান সুপারব্র্যান্ডস থেকে এ বছরের ‘সুপারব্র্যান্ড’ হিসেবে মনোনীত হয়েছে। আকিজ সিরামিকসের কারখানাটি প্রায় ৫০০-৫৫০ বিঘা জায়গার ওপর নির্মিত। শুরুর সময়কালে এখানে বিনিয়োগ করা হয়েছিল ২০০ কোটি টাকার মতো, যেটা ফাইন্যান্সার ও ব্যাংকের মাধ্যমে বাড়তে বাড়তে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা হয়েছে। দেশের বাজারে আকিজ সিরামিকসের এ মহাকাব্যিক উত্থান দেশের সিরামিক শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অর্থনীতির জন্য চমৎকার প্রাপ্তি।