আমার ছাত্রীজীবনের সচেতন সময়ে আমার প্রিয় লেখক কবি নির্মলেন্দু গুণের একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক ২০০০-এর ১৬ মার্চের সংখ্যাটিতে। লেখাটি আর কাউকে নিয়ে নয়, আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় আর অনুকরণযোগ্য ব্যক্তিত্ব আমার বাবা শহীদ শওকত আলীকে নিয়ে। কবি লিখেছিলেন, ইতিহাসের বিকৃতিরোধ এবং ইতিহাসকে তার স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে শহীদ সুবেদার মেজর শওকত আলীকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব প্রদানের আহ্বান রেখে।

আমার বাবা শহীদ শওকত আলী এই দেশের জন্য তার জীবনটা স্রেফ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন তিনি যা করতে যাচ্ছেন, তা নিশ্চিত মৃত্যুর পথ। ওয়ান ওয়ে জার্নি। কিন্তু তিনি ভাবনায় আর কোনো কিছু আনেননি, ভাবনায় আনেননি তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী আর একমাত্র কন্যার কী হতে পারে সেই কথাটিও। যখন আমার ছেলে-মেয়ে দুটিকে তাদের নানার এবং তাদের দাদার (শহীদ) মুক্তিযুদ্ধে গর্বিত অবদানের কথা বলি, তাদের সাহাদতের কথা বলি, তখন মাঝে মাঝেই চোখে জল নামে, হূদয়ে আসে বাঁধভাঙা অশ্রুর জোয়ার। তখন মনকে গ্লানিমুক্ত লাগে, আর অশ্রুসিক্ত মনোজগেক মনে হয় শুচিশুভ্র। শুধু মনে হয় আমার সন্তানদের তাঁরা এক উজ্জ্বল অতীত দান করে গেছেন; যা তাদের পদচারণাকে কলুষমুক্ত করবে, আর তাদেরকে দেবে যথার্থ প্রতিষ্ঠা।

আমার বাবা সুবেদার মেজর শওকত আলী ছিলেন তত্কালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস সিগনাল কোরের একজন সৈনিক। ইপিআরের সিগনাল কোরে বাঙালিদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে সিনিয়র অফিসার এবং ইপিআরের নিজস্ব সৈনিকদের একজন। তাঁর ওপর যেসব অফিসার ছিলেন, তারা সবাই এসেছিলেন সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে এবং তারা সবাই পাকিস্তানি। সিগনাল কোরের কমান্ডার ছিলেন অবাঙালি অফিসার কর্নেল আওয়ান। তার টু-আই-সি বা সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন আরেকজন পাঞ্জাবি মেজর। ওই সময় পিলখানায় সব বাঙালি সৈনিকের একান্ত কাছের লোক ছিলেন সুবেদার মেজর শওকত। সাধারণ এবং বাঙালি সৈনিকদের হয়ে তিনি প্রায়ই দরকষাকষি করতেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। এজন্য তাদের সুনজর থেকে বঞ্চিতও হয়েছিলেন তিনি। এমনকি একবার সাসপেন্ডও হতে হয়েছিল তাঁকে।

বাবার পোস্টিং তখন পিলখানায় হলেও আমি ও মা রাজশাহীতে থাকতাম। সে সময় মা ছিলেন রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজের বাংলার অধ্যাপক। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাবার কাছে ঢাকায় বেড়াতে যাই আমি। সেবার আমি বাবাকে বেশ চিন্তিত দেখতে পাই। একরাশ উদ্বেগ যেন তাকে ঘিরেছিল, তেমনই প্রচণ্ড কর্মব্যস্ত ছিলেন তিনি। অন্যবার বাবা আমাকে নিয়ে মোটরসাইকেলে সারা ঢাকা চক্কর মেরে বেড়াতেন। কিন্তু সেবার আর সে রকম বেড়ানো হয়ে ওঠেনি। কার্যত তিনি তখন থেকেই নজরবন্দি ছিলেন। মাত্র একদিন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তিনি আমাকে নিয়ে বেড়াতে বেরোনোর সুযোগ পেয়েছিলেন। সাতদিন বাবার সঙ্গে থাকার পর আমাকে তিনি রাজশাহীতে মায়ের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেন। পিলখানায় ওই সময় আমি বাবাকে নিজের কোয়ার্টারে বসে একাধিক ট্রান্সমিটার বানাতে দেখেছিলাম। ট্রান্সমিটারগুলো বসানো হয়েছিল নাবিস্কো বিস্কুটের চারকোনা টিনের ভেতর, যাতে কেউ বুঝতে না পারে ওর ভেতর কী আছে? বাবাকে প্রশ্ন করায় তিনি বলেছিলেন ওগুলো পোর্টেবল ট্রান্সমিটার।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ট্রেনিং সেরে ফিরে আসার পর সুবেদার মেজর শওকত অমানুষিক পরিশ্রম করে গড়ে তুলেছিলেন ইপিআরএর সিগনাল ওয়ার্কশপ। ওই সময় তিনি কাজপাগল বলে পরিচিতি পেয়ে যাওয়ায় কখন কোন যন্ত্রপাতি নিয়ে কী করছেন, কী বানাচ্ছেন, সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাত না। আর সে সুযোগই তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন। একদিন আমি বাবাকে ওই ট্রান্সমিটারগুলো বানানোর কারণ জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাতে মৃদু বকুনি খেতে হয়েছিল। তখন কারণ জানা না হলেও পরে আর বুঝতে বাকি থাকেনি, কেন বানানো হয়েছিল ওইসব ট্রান্সমিটার।

২৫ মার্চ, ১৯৭১ সন্ধ্যা হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ইপিআর সিগনাল সেন্টার বন্ধ করে দেয়া হয় অস্বাভাবিকভাবে। অথচ স্বাভাবিক সময়, এমনকি ঈদের দিনও অপারেটররা পালা করে সিগনাল সেন্টারে ডিউটি করতেন। তখন ঢাকা শহরে থমথমে অবস্থা। সিগনালের পাঞ্জাবি সেকেন্ড ইন কমান্ড এসে সবাইকে ব্যারাকে যেতে বলে নিজে সেন্টারে তালা লাগিয়ে দেয়। অপারেটররা একথা তড়িত্ গতিতে গিয়ে জানান সুবেদার মেজর শওকত আলীকে। তিনি তখন সবাইকে ব্যারাকের ঘরে শুতে নিষেধ করলেন এবং ছাদে ঘুমাতে বললেন। এর আগে কয়েক দিন থেকেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবাঙালি সৈনিকদের হেলিকপ্টারে করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে পিলখানায় নামানো হচ্ছিল। প্রতিটি ব্যারাকের পেছনে সারি করে ট্রেঞ্চ কেটে তাতে অবস্থান নিয়েছিল পাকবাহিনী। এ নিয়ে পিলখানার বাঙালি সৈনিকদের মধ্যে তীব্র বিরূপভাব বিরাজ করছিল। ২৫ মার্চের আগেই অধিকাংশ বাঙালি সৈনিককে কৌশলে নিরস্ত্র করা হয়েছিল। আর ২৪ মার্চ ওরা সুবেদার মেজর শওকতের কাছ থেকে সিগনাল সেন্টারের চাবি নিয়ে নিয়েছিল। তখন ইপিআরের সৈনিকরা অস্ত্র ছাড়া খালি হাতে গেটে পাহারা দিত। তাদের বলা হয়েছিল অস্ত্রহাতে সৈনিক দেখলে বাঙালিরা উত্তেজিত হবে।

২৫ মার্চ রাত ১১টার কাছাকাছি সময় ইপিআরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার নেসার আহমেদের বাড়ির দিক থেকে একটা ট্রেসার শেল আকাশে গিয়ে ফাটার সঙ্গে সঙ্গে পাকবাহিনী গোটা ইপিআর ব্যারাক, কোয়ার্টারগার্ড দখলে নিয়ে নেয়। নিহত হয় হতচকিত অনেক বাঙালি সৈনিক। তবে প্রাথমিক হতাহতের মধ্যে সিগনাল কোরের লোক ছিল কম। কারণ তারা সবাই গিয়ে ঘুমিয়েছিলেন ছাদে। এদিকে সুবেদার মেজর শওকত আলী তার কোয়ার্টারে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। সচল হয়ে উঠেছিল তাঁর ট্রান্সমিটার। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা তিনি ট্রান্সমিট করতে শুরু করে দিয়েছেন ততক্ষণে। এ ট্রান্সমিশনে তিনি ডিজির বাসভবনের ওয়্যারলেস মাস্টকে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর সহকর্মীরা একথা আমার মাকে অনেক পরে জানালেও বঙ্গবন্ধুর ওই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তাঁর কাছে কী করে এসেছিল, সে কথা কেউই নিশ্চিত করে তাঁকে বলতে পারেননি। একটি সূত্র থেকে পরে জেনেছিলাম আজিমপুর গেটে প্রহরারত সৈনিকের মারফত রাত ১০টার কিছু পর তাঁর কাছে মেসেজ পৌঁছে যায়। তাঁর সঙ্গে সে রাতে আরো দু-একজন জড়িত ছিলেন। সে রাতের কথা পরে মিসেস শওকত জানতে পারেন কর্নেল আওয়ানের কাছ থেকেই। যতটুকু খবর পেয়েছিলাম তাতে জানা যায়, রাত সোয়া ১২টা বা তার কাছাকাছি কিছু সময় পরই ওয়্যারলেস মেসেজ ট্রান্সমিটরত অবস্থায়ই তিনি পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। ‘উল্লিখিত ঘোষণাটি বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে টেপ করা হয়েছিল (কাজী আরেফ প্রদত্ত তথ্য)। মুক্ত স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পাঁচদিন পর (১৬/০১/৭২) বঙ্গবন্ধু নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিনিধি সিডনি স্কানবার্গকে দেয়া সাক্ষাত্কারে ওই ঘোষণা রেকর্ড করার তথ্য প্রকাশ করেন। মেসেজটি ছিল, ‘This may be my last message, from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh where ever you might be and whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.’ (তথ্যসূত্র বঙ্গবন্ধু যেভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, দৈনিক আজকের কাগজ ০২/০২/১৯৯৯)।

৭ মার্চ ২০১১ বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (সাবেক বিডিআর) ঢাকা সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল হাবিবুল করীম (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) আমাকে তাঁদের দপ্তরে নিয়ে যান। আমি ১৯৯৭-৯৮ সালে একবার তাদের ডাকে ঢাকা সেক্টরে গিয়েছিলাম। সেবার তাঁরা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ইপিআর ওয়্যারলেস থেকে প্রচারের পূর্ণ ইতিহাস খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। কিন্তু সেবার তাঁদের সমন্বয়হীনতা এবং অনুদার মনোভাবের কারণে আমি ব্যর্থ মনোরথ হয়ে রাজশাহীতে ফিরে আসি। বিজিবি ঢাকা সেক্টর থেকে কর্নেল হাবিবুল করীম, সিগনাল উইংয়ের মেজর আহসান জাহিন এবং ডিজিএফআই থেকে সম্ভবত কর্নেল সালাউদ্দীন ঢাকা যাওয়ার জন্য ইতিবাচক চাপ সৃষ্টি করেন। অবশেষে যেয়ে দেখি তাঁরা এক অসাধ্য সাধন করেছেন। ’৭১-এর সেই কালরাতে যাঁরা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার মেসেজ প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন বা গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্য থেকে অনেক ব্যক্তিকে সেখানে জড়ো করেছেন। এ আমার কাছে এক অভাবিত আনন্দের পরিবেশ। আমার দেখা-অদেখা, জানা-অজানা অনেককেই সেখানে উপস্থিত পেলাম। এজন্য আমি বিজিবি কর্তৃপক্ষের কাছে কৃতজ্ঞ। এসব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খুঁজে পাওয়ার ঘটনাটি আরো আগে হওয়াটা উচিত ছিল।

সেই রাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সুবেদার মেজর শওকত আলী যখন ট্রান্সমিট করছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন সিগনালম্যান আব্দুল মোত্তালিব। আব্দুল মোত্তালিব সেই বিরল সৌভাগ্যবানদের একজন, যিনি সেই রাতে শহীদশওকত আলীর সঙ্গে গ্রেফতার হয়েও বেঁচে ফিরে আসতে পেরেছেন এবং এখনো জীবিত। তাঁর সাক্ষাত্কার আমি সেদিনই নিয়েছি। জানতে পারি বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা ট্রান্সমিশনে শহীদ শওকত আলী মটোরোলা এসবিসিএল৩ সেট ব্যবহার করেন। এটি ইপিআর সিগনাল কোরে ব্লাকসেট বলে জনপ্রিয়। সেটটিতে ভয়েস অপশন ও টিজি অপশন দুটোই রয়েছে। ২৫ ‘মার্চ রাতে চট্টগ্রামে সিগনালম্যান আবুল খায়ের ওয়্যারলেস সেট নিয়ে ডিউটিতে ছিলেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে তিনি তাঁর এসবিসিএল৩ সেটে ভয়েস অপশন অফ করে রেখেছিলেন। রাত সাড়ে ১১টার কাছাকাছি সময়ে তিনি তার সেটে টিজি (টেলিগ্রাফিক) অপশনে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপ্রাপ্ত হন এবং মেসেজ আনকোড করে তত্কালীন কমান্ডার ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলামকে হস্তান্তর করেন। ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম মেসেজপ্রাপ্তি মাত্র তা চট্টগ্রামে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রেরণের ব্যবস্থা করেন। সুবেদার মেজর আবুল খায়ের জীবিত এবং তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাতে কথা হয়েছে। মেসেজ রিসিভ করার অন্যতম সাক্ষী ওই সময় চট্টগ্রামে ইপিআরের ৪র্থ ব্যাটালিয়নে কর্মরত সিগনালম্যান মিজানুর রহমান। তিনি জীবিত আছেন এবং তার সঙ্গে ওই সময়ই আমার আলাপ হয়েছে। জীবিত আরো যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে; যারা সে রাতের সঙ্গী, তারা হলেন মেজর (অব.) জহিরুল হক, ট্রেনার সিগনাল উইং (বর্তমান বয়স ৭৫); সুবেদার (অব.) আবুল হাশেম, তিনি সিগনালম্যান হিসেবে তখন মিরপুরে কর্মরত ছিলেন, পরে মোহাম্মদপুর শরীরচর্চা কেন্দ্রে বন্দি ছিলেন এবং স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তি পান। ওই রাতে ইপিআরে কর্মরত অনেকে সুবেদার মেজর শওকত আলী কর্তৃক প্রেরিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ভয়েস অপশনে (অর্থাত্ বঙ্গবন্ধুর স্বকণ্ঠে রেকর্ডকৃত ভাষণ) রিসিভ করেছেন। ওই সময় ঠাকুরগাঁওয়ে কর্মরত সিগনালম্যান শামসুল হক, চাঁপাইনবাবগঞ্জে কর্মরত সিগনালম্যান ফারুকসহ অনেকেই তার সাক্ষী। এ রকম আরো অনেকেই তা রিসিভ করেছেন। টিজি অপশনে প্রেরিত মেসেজ হ্যান্ডবিল আকারে পরবর্তীতে বহু স্থানে বিলি হয়েছে এবং পুনঃটেলিগ্রাফ করা হয়েছে বিভিন্ন এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে (পরবর্তীতে পুনঃটেলিগ্রাফকারী অনেকের সঙ্গেই আমার সরাসরি কথা হয়েছে)। ৭ মার্চ ২০১১ সালে বিজিবি হেডকোয়ার্টারে অনুষ্ঠিত সামগ্রিক সাক্ষাত্কারগুলো বিজিবি কর্তৃপক্ষ ভিডিওতে ধারণ করেছেন।

২৫ মার্চ রাতে সুবেদার মেজর শওকত আলীকে রাত ১টার দিকে হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে যায় ১১ নম্বর ব্যারাকে। তারপর নেয়া হয় মোহাম্মদপুর শরীরচর্চা কলেজের টর্চার সেন্টারে। অবশ্য ইপিআর সৈনিকদের অধিকাংশকেই মেরে ফেলা হয় পিলখানাতেই। আর বাকিদের নেয়া হয় মোহাম্মদপুরে টর্চার করে তথ্য আদায় করার উদ্দেশ্যে। পিলখানা থেকে শওকত আলীর সঙ্গে আরো বন্দি করে যাদের আনা হয় ওই টর্চার সেন্টারে, তাদের মধ্যে ছিলেন সুবেদার মোল্লা, সুবেদার জহুর মুন্সী, সুবেদার আবদুল হাই, সুবেদার আইয়ুব প্রমুখ। এদের মধ্যে দুজন সুবেদার মোল্লা ও মুন্সী পরিবার নিয়ে থাকতেন পিলখানার বাইরে। তাই তাঁদের পক্ষে বাইরের সঙ্গে পিলখানার ভেতরের যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব ছিল। সন্দেহের কারণে এ দুজনকে সেজন্য পাকবাহিনীর অমানুষিক অত্যাচারও সহ্য করতে হয়েছিল।

আমার বাবার শহীদ হওয়ার কথা আমরা সুনিশ্চিতভাবে জানতে পারি ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। এর আগে বাবার কোনো খোঁজ না পেয়ে আমার মা আমাকে নিয়ে সোজা পিলখানায় হাজির হন। সিগনাল কোরের কর্নেল আব্দুল রহমান আওয়ান মাকে চিনতেন অনেক আগে থেকেই এবং কলেজের শিক্ষক হিসেবে তাকে সম্মানও করতেন। তিনি মাকে বলেন, তাকে কী করে বাঁচাব বলুন? তিনি কোয়ার্টার থেকে ধরা পড়েছেন ট্রান্সমিটারসহ। তার কাছে মুজিবের মেসেজ পাওয়া গেছে। এ কথাগুলো বলার সময় কর্নেল আওয়ান বিব্রতবোধ করছিলেন। কারণ তিনি বাবাকে ব্যক্তিগতভাবে খুবই পছন্দ করতেন। মা সেদিন ঢাকা সেনানিবাসে ক্যাপ্টেন আখতার ও মেজর এজাজ মাসুদের সঙ্গেও দেখা করেছিলেন, বাবার কোনো খোঁজ পাওয়া যায় কিনা, সেটা দেখার জন্য। তারাও মাকে একই কথা জানিয়েছিলেন। তারা দুজন ছিলেন আমার ছোট চাচা তত্কালীন মেজর সাখাওয়াত আলীর বন্ধু। চাচা তখন পাকিস্তানে বন্দি। কর্নেল আওয়ান বাবার লুট হয়ে যাওয়া টেলিভিশন, মোটরসাইকেল ইত্যাদি ফেরত দিলেও, তাঁর ডায়েরি এবং বই-খাতা ফেরত দেননি।

এর পর অনেক চেষ্টা করে আমরা সুবেদার মেজর শওকতের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তার আবছা কিছু চিত্র জানতে পেরেছিলাম। প্রথমে তাঁর সামনেই সুবেদার আবদুল হাই ও সুবেদার জহুর মুন্সীর ওপর নির্মম অত্যাচার করা হয়। বাবার সামনের একটি দেয়ালে পাকহায়েনারা পেরেক দিয়ে গেঁথে দেয় হাই ও মুন্সীকে। তার পরও তাঁদের শরীরের ওপর অত্যাচার অব্যাহত থাকে। ওভাবে পেরেকগাঁথা অবস্থায়ই তাদের মৃত্যু ঘটে। এসবই ঘটেছিল তাঁর সামনে সরাসরি তাঁকে মানসিকভাবে নত করার জন্যই।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ট্রান্সমিশন করার অপরাধে মোহাম্মদপুর শরীরচর্চা কলেজের টর্চার সেন্টারে সুবেদার মেজর শওকতের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। তার প্রতিটি নখ তুলে ফেলেছিল ওরা। তারপর দুই চোখে লোহার শিক ঢুকিয়ে দিয়েছিল। সারা শরীরে জ্বলন্ত সিগারেটের দগদগে ঘা তৈরি করে দিয়েছিল। মাথার চুলও সব উপড়ে নিয়েছিল। এত অত্যাচারেও তিনি প্রাণ হারাননি, জ্ঞানও হারাননি। পাকবাহিনী তার কাছ থেকে তাদের সুবিধাজনক স্বীকারোক্তিও নিতে পারেনি। অবশেষে ২৮ এপ্রিল গভীর রাতে তাকে আরো ২৫ জনসহ ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় নারায়ণগঞ্জের পাগলা ঘাটে। ওই ২৬ জনকে লাইন ধরে দাঁড় করানো হয়। তারপর তাদের দেশদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় এবং গুলি চালিয়ে দেয়া হয় সঙ্গে সঙ্গে। এদের মধ্যে সুবেদার আইয়ুব এক রকম অলৌকিকভাবেই বেঁচে যান। গুলি হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেই প্রচণ্ড শারীরিক ব্যথায় তিনি কুঁকড়ে গিয়েছিলেন, আর ঠিক ওই সময়ই গুলি চলে যায় তাঁর মাথার ওপর দিয়ে। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ায় পাকসেনারা তাকেও মৃত মনে করে এবং অন্যদের সঙ্গে তাকেও ঠেলে ফেলে দেয় নদীতে। পরদিন সকালে গ্রামের মানুষ তাঁকে উদ্ধার করে অজ্ঞান অবস্থায়ই। পরে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের কল্যাণীতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। সেখানেই তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল রাজশাহী থেকে পালিয়ে যাওয়া সিগনাল কোরের আরেক সুবেদার নাসিম আলীর। তিনি সুবেদার আইয়ুবের কাছ থেকে জানতে পেরেছিলেন ওইসব ঘটনা। আমরা জেনেছিলেন ওইসব মর্মন্তুদ ঘটনা সুবেদার নাসিমের কাছ থেকে। এছাড়া মিসেস শওকত তার শহীদ স্বামীর পেনশন আনার জন্য ১৯৭২ সালে পিলখানায় গেলে, তাঁর স্বামীর অনেক সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হয় এবং তাঁরা ওইসব বন্দিদিনের কথা আবার জানান তাঁকে।

সুবেদার আইয়ুব কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। ইপিআরের জিডি ব্রাঞ্চের একজন স্টেনোগ্রাফার মো. নুরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে চরমভাবে অত্যাচারিত হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা মুক্তি পান মোহাম্মদপুরের সেই টর্চার ক্যাম্প থেকে। তিনিও ওইসব ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী এবং এখনো জীবিত রয়েছেন। আরো দুজন সৈনিক আমার মাকে জানিয়েছিলেন, তাঁর স্বামীর বন্দিদিনগুলোর কথা এবং তাঁর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া চরম অত্যাচারের কথা। তাঁদের একজনের নাম আবদুল মজিদ। তাঁরা জানিয়েছিল, পাঞ্জাবিরা সুবেদার মেজর শওকতকে মেরে ফেলার পর ওদের ওপর অত্যাচার চালানোর সময় টিটকারি দিয়ে বলত, ‘কিধার তেরা সুবেদার মেজর? আব তেরা সুবেদার মেজর মুজিবকা ব্রিগেডিয়ার বন গ্যায়া।’

পিলখানা থেকে দুজন সুইপার এবং একজন কার্পেন্টার আবদুর রউফকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মোহাম্মদপুর শরীরচর্চা কলেজে, সবকিছু পরিষ্কার রাখা এবং বন্দিদের একবেলা করে খাবার দেয়ার জন্য। তারাও ওইসব ঘটনার সাক্ষী। তারা দেখেছেন, পাকহায়েনারা ট্রান্সমিশন-সংক্রান্ত তথ্য জানার জন্য কী অমানুষিক অত্যাচারই না করেছে সুবেদার মেজর শওকতসহ অন্যদের ওপর।

সুবেদার মেজর শওকত ছিলেন বংশানুক্রমে বিপ্লবী রক্তের উত্তরাধিকারী। তাঁর পূর্বপুরুষ মো. সাফদার আলী সাওতাঁল বিদ্রোহে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। তাঁর সন্তান মো. লাবদার আলীকে ব্রিটিশদের অত্যাচার এড়াতে নিজভূমি ছেড়ে বীরভূমে নলহাটিতে এসে আস্তানা গাড়তে হয়। শওকত আলীর জন্ম ১৯২৭ সালে বীরভূমের পাইকপাড়া গ্রামে। ম্যাট্রিক পাসের পর আনুমানিক ১৯৪৩ সালে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং শুরু থেকেই সিগনাল কোরে কর্মরত ছিলেন। ’৪৫-এ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি বেঙ্গল পুলিশের সিগনাল উইংয়ে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা নিরসনে তাঁর আপ্রাণ চেষ্টা তাঁকে ঊর্ধ্বতন সবার স্নেহভাজন করে তোলে। বেঙ্গল পুলিশ তাঁকে সম্মাননা সনদ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্মানী ভাতা প্রদান করে। দেশ বিভাজনের পর তিনি কলকাতা পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে নানাবিধ ওয়্যারলেস যন্ত্রপাতি নিয়ে এসে পূর্ব পাকিস্তান পুলিশে যোগদান করেন এবং পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। তার ফলে পাকিস্তান সরকার তাঁকে প্রেসিডেন্ট পুলিশ মেডেলে ভূষিত করে। সম্ভবত সদ্য গঠিত ইপিআর বাহিনীর সিগনাল উইংয়ে তিনি ১৯৪৮ সালে যোগদান করেন এবং সামগ্রিকভাবে সারা দেশে (পূর্ব পাকিস্তান) ওই বাহিনীর সিগনাল-সংক্রান্ত কাঠামো গড়ে তোলেন। ১৯৬২ সালে আসালং, লাঠিটিলা, ডোমাবাড়ী, পাথারিয়া সীমান্ত সংঘর্ষে তাঁর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে তাঁকে পাকিস্তান সরকার দেড় বছর মেয়াদি রেডিও কমিউনিকেশন কোর্সে প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস স্টেটের সেন্ট্রাল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে প্রেরণ করেন। এছাড়া তিনি ১৯৪৯ সাল থেকেই লন্ডনের ব্রিটিশ ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজির ব্যাচেলর অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে করসপন্ডেন্স কোর্সের ছাত্র ছিলেন (ছাত্র নম্বর বিই/৪১৮৫)। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি তমঘা-এ-জঙ্গ খেতাবে (সামরিক সাফল্যের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেতাব) ভূষিত হন। এত কৃতিত্ব সত্ত্বেও তাঁর সুবেদার মেজর পদে ভূষিত হওয়া নিয়ে যথেষ্ট সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল। কেননা সেখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল এক পাঞ্জাবি জেসিও। তাঁর সার্ভিস বুক, যা আমাকে ঢাকার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল হারিবুল করীম দেখিয়েছিলেন, তাতে সমাপ্তিতে এসে লেখা ছিল, Sevice Record satisfactory. But he is suspected to keep in touch with Indian high officials through his relations in Rajshahi. জানা যায় তাঁকে তারা আগরতলা মামলার বিষয়েও সন্দেহ করত। পরিশেষে সার্ভিস বুকে লেখা আছে, He was found absconding from 29th April.

গত বছর ২০ ডিসেম্বর মেজর শওকত আলীকে বিজিবির সর্বোচ্চ সম্মাননা বিজিবি পদক (মরণোত্তর) দেয়া হয়। এত দিন মরণোত্তর পদক দেয়ার নিয়ম ছিল না বলে মেজর শওকত আলীকে সম্মান দেখাতে বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। পরে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আমি সে পদক গ্রহণ করি।

পরিশেষে বলতে চাই, এখন তো আমাদের কিছুই চাওয়ার নেই। আমার মা (২৩ মার্চ ২০১৪ সালে ইন্তেকাল করেছেন) তীব্র সংগ্রাম করে আমাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আমি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর। আমার মায়ের মনে একটিই বাসনা ছিল, বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাঁর আবেদন দেশমাতৃকার ডাকে প্রাণ বিসর্জন দেয়া এ মহান ব্যক্তিত্বের জন্য এমন কিছু করা হোক, দেয়া হোক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা, যা তাঁর প্রতি যথার্থভাবে প্রযোজ্য। শুধু নৈতিক কারণে ও সেনা-শৃঙ্খলায় যথাযথ ভূমিকা পালনে এবং সাহসিকতাময় কাজের জন্য সাম্রাজ্যবাদী পাকিস্তান সরকার তাঁকে সামরিক সাফল্যের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেতাব তমঘা-এ-জঙ্গ দিয়ে সম্মানিত করেছে, ভূষিত করেছে প্রেসিডেন্ট পুলিশ মেডেল দিয়ে। তাহলে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের সঠিক ইতিহাস প্রতিষ্ঠার জন্য, সত্য তুলে ধরা তথা শহীদের কাজকে যথাযথ মূল্যায়নের জন্য শহীদ সুবেদার মেজর শওকত আলীকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে সরকার কেন ভূষিত করতে পারে না? কেননা তাঁর সময়োচিত আত্মদান ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে এবং তিনি জানতেন, তাঁর এ যাত্রা ছিল ওয়ান ওয়ে জার্নি..., যাতে শুধু যাওয়া আছে, আছে আত্মদান, আছে ত্যাগ, আছে সাফল্য; নেই শুধু বিজয়ীর বেশে ফিরে আসা। আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ মহিমার জন্য এ সম্মাননা তাঁর একান্ত প্রাপ্য, যা অনাগত কালের ভবিষ্যত্ নাগরিকদের প্রেরণা জোগাবে আর ইতিহাসকে যথার্থভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করবে।

 

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শহীদ শওকত আলীর একমাত্র সন্তান