দূষিত কোষ দূর করে সমাজদেহের শোধন ছিল জাহানারা ইমামের জীবনের ব্রত, সেজন্য একাত্তরের ঘাতক-দালাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ন্যায়ের দণ্ড তুলে নিয়েছিলেন হাতে। এ অনন্য সংগ্রামের সঙ্গে সমান্তরালভাবে তাঁর দেহেও বাসা বেঁধেছিল মরণ-ব্যাধি ক্যান্সার। যে আন্দোলনের সূচনা তিনি করেছিলেন, এর পরিণাম দেখে যাওয়ার অবকাশ তাঁর মেলেনি। ১৯৯২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গণ-আদালতে একাত্তরের ঘাতক গোলাম আজমের বিচার-অনুষ্ঠান শেষে তাঁর অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য হিসেবে প্রদত্ত হয়েছিল রায়। গণ-আদালতের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যেতে তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু রোগের দ্রুত বিস্তার তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি, ১৯৯৪ সালের ২৩ জুন তাঁর জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যু যখন এসে দাঁড়িয়েছে শিয়রে, তখনো তাঁর প্রত্যয় ও কর্মে কোনো ঘাটতি ছিল না, মৃত্যুর আগে কাঁপা কাঁপা হাতে তিনি লিখে গিয়েছিলেন দেশবাসীর প্রতি শেষ আহ্বান, সেখানে নবীন সমাজের ওপর আস্থা আরোপ করেছিলেন যুদ্ধাপরাধের বিচারের অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। শেষ ইচ্ছাপত্র হিসেবে এমন রচনা জগত্সংসারে খুব বেশি মিলবে না। বস্তুত নানা দিক দিয়েই জাহানারা ইমাম ছিলেন অনন্যা, তাঁর সবটুকু আমরা বুঝতে পেরেছি বলে মনে হয় না। এই অনন্যতার দু-একটি দিকের ওপর আমরা এখানে আলোকপাত করতে পারি।
বাংলাদেশে সামাজিক, রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীর সম্পৃক্তি শুরু হয়েছিল ১৯০৫ সালে বঙ্গবঙ্গবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, যা পরে স্বদেশী আন্দোলন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। এই আন্দোলনে বিশিষ্ট হয়ে উঠেছিলেন ঠাকুরবাড়ির কন্যা সরলাবালা দেবী চৌধুরানী। তিনি আরো অনন্যা এ বিচারে যে গৃহের বাইরের আন্দোলন-সংগ্রামে নারীর অংশগ্রহণের একটি বৃত্ত থাকে, এর বাইরে নারী সাধারণত পা বাড়ান না অথবা পা বাড়াতে দেয়া হয় না। একেবারে সূচনার সেই কালে সরলাবালা দেবী চৌধুরানী নারীর জন্য নির্ধারিত ভূমিকায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নানা ধরনের সামাজিক ব্রত পালনের উদগাতা হয়ে তিনি তরুণদের সহিংস সংগ্রামে উত্সাহিত করেছিলেন, প্রবর্তন করেছিলেন বীরপূজার, মহারাষ্ট্রের শিবাজিকে নায়ক হিসেবে গণ্য করে তাঁকেও নিবেদন করেছিলেন পূজার অর্ঘ্য। সরলা দেবী এসব কারণে বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছিলেন, তবে বড় যে কাজ তিনি করেছিলেন, সেটা হলো সামাজিক-রাজনৈতিক বলয়ে পুরুষের আধিপত্য ভেঙে নারীর জন্য বিশিষ্ট ভূমিকার দাবি তিনি দাখিল করেছিলেন।
এর পর রাজনীতিতে নারীর সম্পৃক্ততা অনেক বেড়েছে, সামাজিক কর্মকাণ্ডে নারীর ভূমিকা ক্রমে বেড়ে চলেছে, কিন্তু গণ্ডি মোচন করে নারী-পুরুষ সমতা অর্জিত হয়নি আজো। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা বৃত্তাবদ্ধ ছিল ভিকটিম বা ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে ফরিয়াদ জানানোর মধ্যে। জঙ্গি ধর্মাদর্শের বাহক প্রবল ক্ষমতাধর শক্তির বিরুদ্ধে যে আন্দোলন, সেটা পৌরুষময় হিসেবে বিবেচিত, সেখানে নারীর নেতৃভূমিকা বড়জোর হতে পারে প্রেরণাদায়ী। জাহানারা ইমাম প্রেরণাদাত্রী হয়েছিলেন ঠিকই, মহাত্মা গান্ধী যেমন বলেছিলেন, ‘মাই লাইফ ইজ মাই মেসেজ,’ জাহানারা ইমামের জীবনও তো হয়ে উঠেছিল তেমনি উদ্দীপক বার্তা, কিন্তু সেখানেই তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, পোশাকি কোনো পদধারী তিনি হননি। একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক তিনি ছাড়া আর কারো হওয়ার উপায় ছিল না, সেটা তিনি প্রমাণ করেছেন এবং তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছেন অন্য সবাই।
অনেক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে চলতে হয়েছিল যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজম ও তার সহযোগীদের বিচারের আন্দোলন। সেসবের কোনো খতিয়ান এখনো নেয়া হয়নি, ভেতরে-বাইরের সংকটের ছবিও পুরোপুরি উদ্ভাসিত হয়নি। তেমনটা হলে বোঝা যেত কীভাবে দৃঢ় হাতে এই আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন জাহানারা ইমাম; নারী হিসেবে নয়, যে মানবসত্তায় মিলিত হয় নারী ও পুরুষ, তেমনি সর্বজনীন মানব হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহিমামণ্ডিত এ আন্দোলনের নেতৃত্বে। বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে এ এক অভিনব-অনন্য উত্থান ও জাগরণ, যা এখনো আমরা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। তবে বিরোধীরা ঠিকই চিনেছিল এ নারীকে, তিনি যে বৃত্তাবদ্ধ নারী নন, সেটা বুঝে তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ‘জাহান্নামের ইমাম’ হিসেবে। গোটা স্বর্গ-নরক খুঁজলে নারীকে পাওয়া যাবে অপ্সরা হিসেবে অথবা নরকের দ্বার রূপে, কিন্তু পরলোকে একজন নারীকে ইমাম হিসেবে গণ্য করল ধর্মপসারীরা, যিনি আমাদের জাহানারা ইমাম, পুরুষ-প্রাধান্যের জগতে নারীর মানবসত্তা প্রতিষ্ঠার এ এক বড় স্বীকৃতি বটে, যদিও পরোক্ষে।
গণ-আদালত গঠন করে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষী-সাবুদ জোগাড় করে যখন পরিচালিত হলো বিচার, তখন বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। একাত্তরের গণহত্যার রক্তসমুদ্র পার হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের যে উত্থান, সেই বিধ্বস্ত-বিহ্বল দেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি জোরদার হয়ে উঠেছিল। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশে গণহত্যার বিচারের দাবি কোথাও থেকে উত্থিত হয়নি। বিশ্বসমাজের জন্য অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনে বাংলাদেশ মানবতার পক্ষে মানবতাবিরোধীদের বিচারের জন্য একের পর এক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছিল, প্রণীত হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আইন, গণহত্যার বিচারের ইতিহাসে যা স্বর্ণাক্ষরে খচিত হওয়ার দাবি রাখে, কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয়নি। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং তত্পরবর্তী রাজনীতির ভূতগ্রস্ততা জাতিকে নিমজ্জিত করেছিল নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে। সেই পতিত সমরে আলোকমশালের মতো উদ্ভাসিত হলো গণ-আদালত, মশালবাহক হলেন জাহানারা ইমাম এবং জাতিকে বিশেষভাবে নবীন-নবীনাদের আলোড়িত করেছিলেন বিপুলভাবে। গণ-আদালত গঠনের পেছনে উদাহরণ হিসেবে কাজ করেছিল ষাটের দশকে দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল প্রতিষ্ঠিত ভিয়েতনামে মার্কিন বর্বরতার বিচার-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল, যা ব্রাসেলসে গণশুনানি অনুষ্ঠান করে রায় প্রদান করে। ১৯৯২ সালে যখন ঢাকায় গোলাম আজমের যুদ্ধাপরাধের বিচারে গণ-আদালত পরিচালিত হয়, তখন গণহত্যার হুমকি আবার নতুনভাবে দেখা দিয়েছিল ইউরোপে, পূর্বতন যুগোশ্লাভাকিয়ায় এবং আফ্রিকার রুয়ান্ডায়। দীর্ঘ নিদ্রা ভঙ্গ করে বিশ্বসমাজ গণহত্যার বিচারে তড়িঘড়ি উদ্যোগ গ্রহণ করে। অন্যদিকে বাংলাদেশে সরকারের বিপরীত অবস্থান উপেক্ষা করে গৃহীত হয় নাগরিক উদ্যোগ। জাহানারা ইমামের জীবনেও তখন নেমে আসছিল কালো ছায়া। এর পর খুব বেশি দিন আর তিনি বাঁচেননি, দুই বছরের মধ্যেই ঘটে তাঁর জীবনাবসান।
তার পর বুড়িগঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে, কিন্তু দেশের মানুষ সরে আসেনি গণহত্যার বিচারের দাবি থেকে, তারা ভোলেনি জাহানারা ইমামকে। সেই সময়ে যারা ছিল যুবা অথবা বালক-কিশোর, তারাও বহন করেছে স্মৃতির দাবি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমরা দেখি এর প্রতিফলন, আর দেখি গণজাগরণ মঞ্চের উত্থানে। জাহানারা ইমামের ছবি আবার উদ্ভাসিত হয় জনমানসে, তিনি হয়ে ওঠেন প্রত্যক্ষ প্রেরণা; প্রতিষ্ঠিত হয় যুদ্ধাপরাধের বিচারার্থে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং আইনের বিধিসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে একের পর এক সম্পন্ন হচ্ছে গণহত্যাকারীর বিচার। এর তাত্পর্য যে কত সুদূরপ্রসারী ও ঐতিহাসিক, সেটা আমরা এখনো সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারিনি।
বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনও ক্রমে বাড়ছে, বিশেষত যারা গণহত্যার বিচার নিয়ে কাজ করছেন, তারা বাংলাদেশকে বিশেষ বিবেচনায় নিচ্ছেন এবং সেখানে উঠে আসছে বা আসবে জাহানারা ইমামের ভূমিকা। আমার এক ছোট অভিজ্ঞতার কথা এখানে ভাগাভাগি করে নেয়া যাক। ২০১২ সালের জুনে কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সভায় বিচারের অন্বেষায় বাংলাদেশের অভিযাত্রা বিষয়ে আমি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলাম। পরে সেই সভায় অংশগ্রহণকারী দুই খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ আমেরিকার অধ্যাপক অ্যালেক্স হিনটন, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলার্সের বিদায়ী সভাপতি এবং পরবর্তী সভাপতি আর্জেন্টিনার ড্যানিয়েল ফেইরস্টাইন আমার কাছে গণ-আদালত বিষয়ে সবিস্তার জানতে চান। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ যে পিপলস ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল, সেটা তাঁদের কাছে খুবই তাত্পর্যপূর্ণ মনে হয়েছিল। সেই সুবাদে পরে আমি জানি আইপিটি বা ইন্টারন্যাশনাল পিপলস ট্রাইব্যুনালের কথা। রোমে এ প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্র এবং প্রতি বছর তারা একটি করে গণহত্যা/মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের গণশুনানি ও বিচার অনুষ্ঠান করেন। গত বছর তারা নেদারল্যান্ডসের রাজধানী দা হেগে আয়োজন করেছে ৫০ বছর আগে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার। কোনো দেশ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেসব আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে ব্যর্থ হয়েছে আইপিটি সেই অপরাধ নিয়ে গণ-আদালত পরিচালনা করে। গণহত্যার দেশীয় সহযোগীদের বিচারে বাংলাদেশ সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীরা আমাদের বিচারের আওতার বাইরে থেকে গেছে। জাহানারা ইমামের কাছ থেকে প্রেরণা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণ-আদালতে হাজির হওয়ার সুযোগ আমাদের রয়েছে।
একাত্তরে জাহানারা ইমামের জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল ঝড়, তাঁর ছোট্ট-সুন্দর-সাজানো সংসার তছনছ হয়ে গিয়েছিল। সেই বেদনা বুকে ধারণ করে তিনি লিখেছিলেন ‘একাত্তরের দিনগুলি’, যে গ্রন্থ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গৌরবের, সংগ্রাম ও যুদ্ধের অসাধারণ আলেখ্য হয়ে উঠেছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোড়িত করে চলেছে। এই একটি বই-ই তাঁকে অমর করে রাখার জন্য ছিল যথেষ্ট। কিন্তু জাহানারা ইমাম তো সেখানেই থেমে থাকেননি, লিখেছেন আরো কিছু স্মরণীয় বই, এমন কি নিজের রোগজর্জর শরীর নিয়ে মানসিক শক্তিতে উদ্বেলিতভাবে লিখেছেন ‘ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস’। এর পাশাপাশি নব্বইয়ের গোড়ায় গোলাম আজমের নাগরিকত্ব প্রদান এবং জামায়াতে ইসলামী সংগঠনের দায়িত্ব গ্রহণের প্রতিবাদে জ্বলে উঠলেন তিনি এবং এই মশাল থেকে প্রজ্বলিত করলেন অনেক আলোকমশাল।
লেখক: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি






